বৈদিক ঐতিহ্য, প্রাকৃত ভাষা ও ঔপনিবেশিক বিকৃতি পেরিয়ে বাংলা ভাষার গৌড়-বঙ্গীয় শিকড়ের অনুসন্ধান
প্রভু বোলে “বৈদ্য! তুমি ইহা কেনে পঢ়
লতা পাতা নিঞা গিয়া রোগী কর দঢ় ॥
ব্যাকরণশাস্ত্র এই বিষমের অবধি।
কষ্ণ-পিত্ত-অজীর্ণ-ব্যবস্থা নাহি ইথি ॥
প্রভু কহে “সন্ধি-কার্য্য” জ্ঞান নাহি যার।
কলিযুগে ভট্টাচার্য্য-পদবী তাহার (চৈতন্যভাগবত)
“যখন প্রথম চারি দিকে বাঙ্গালা স্কুল বসান হইতেছিল এবং লোকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বর্ণপরিচয়, বোধোদয়, চরিতাবলী, কথামালা পড়িয়া বাঙ্গালা শিখিতেছিল, তখন তাহারা মনে করিয়াছিল, বিদ্যাসাগর মহাশয়ই বাঙ্গালা ভাষার জন্মদাতা। কারণ, তাহারা ইংরাজীর অনুবাদ মাত্র পড়িত, বাঙ্গালা ভাষার যে আবার একটা সাহিত্য আছে এবং তাহার যে আবার একটা ইতিহাস আছে, ইহা কাহারও ধারণাই ছিল না। তার পর শুনা গেল, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আবির্ভাবের পূর্ব্বে রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ও গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্য (১৭৯৯-১৮৫৯) বাঙ্গালার অনেক বিচার করিয়া গিয়াছেন এবং সেই বিচারের বহিও আছে। ক্রমে রামগতি ন্যায়রত্ন (১৮৩১-১৮৯৪) মহাশয়ের বাঙ্গালা ভাষার ইতিহাস ছাপা হইল। তাহাতে কাশীদাস, কৃত্তিবাস, কবিকঙ্কণ প্রভৃতি কয়েক জন বাঙ্গালা ভাষার প্রাচীন কবির বিবরণ লিখিত হইল।” (হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা ১৯৫১, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত)
ঐতরেয় আরণ্যকের দ্বিতীয় আরণ্যকের প্রথম অধ্যায়ে স্পষ্ট উল্লেখ আছে — বঙ্গ, অবগধ (অঙ্গ ও মগধ) এবং চেরপাদ জাতিগুলি কোনো এক সময়ে বেদসংগত ধর্ম ও আচরণ লঙ্ঘন করে পূর্ব দিকে গমন করেছিল। তারা এসেছিল তাদের বৈদিক ঐতিহ্য, শব্দভাণ্ডার ও সংস্কার বহন করে। পূর্ব গঙ্গা সমভূমিতে এসে তারা মুখোমুখি হয়েছিল অন্য এক বৈদিক ধারার জনগোষ্ঠীর সাথে, যারা তাদের পূর্বকালে থেকেই এখানে বাস করছিল। তারা নিয়মিত বৈদিক আচারে শৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল কি না, তা যাই হোক, তাদের মধ্যে ভারতীয় সংস্কারের এক ধারা প্রবহমান ছিল, যা প্রাকৃত কিংবা সংস্কৃতধর্মী উভয় ভাষায় প্রকাশ পেত। বঙ্গ, মগধ ও চেরপাদের এই মানুষরা পাশেই পেয়েছিল ‘কোল’ জনগোষ্ঠীকে, যাদের ভাষা ছিল প্রাকৃতের এক বিশেষ রূপ — পিশাচ প্রাকৃত। এই পিশাচ প্রাকৃতেই গুণাঢ্য (২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রচনা করেছিলেন মহাভারতের চেয়েও বৃহৎ এক গ্রন্থ, এবং বহু লেখক লিখেছিলেন অমূল্য সাহিত্য, যা আমরা হারিয়েছি ইসলামী আক্রমণ, গ্রন্থাগার দহন এবং পণ্ডিত হত্যার কারণে। শ্রুতি-স্মৃতি ধারা আজও বিলুপ্ত নয়—বর্তমানের বহু বনবাসী জনজাতি তাদের প্রাচীন কাহিনি বলার অসাধারণ ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
এই পটভূমি বোঝার পর আমরা স্থির করলাম—আমরা গৌড়-বঙ্গীয় ভাষায়, অর্থাৎ আজকের বাংলাভাষায়, আমাদের গৌড়-বঙ্গীয় ব্যাকরণ রচনা করব। এই ভাষা ১৮৫০ খ্রি -পরবর্তী পূর্ব গঙ্গা সমভূমিতে জনপ্রিয় রূপ পেয়েছে, যার অন্তর্গত আজকের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ত্রিপুরা অঞ্চল। ইতিহাসের ধারায় যখন সমুদ্রবাণিজ্যের পথ ধরে ইউরোপীয় বণিকেরা বাংলায় এসে দেশের দেওয়ানি দখল করল, তারা বুঝল ভারতবর্ষ বিশাল এবং এর সংস্কৃতি রক্ষিত আছে প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য প্রতিষ্ঠান ও সনাতন ধর্মের হাতে। তখন তারা খুঁজতে লাগল নিজেদের আধিপত্যের যুক্তি।
ইসলামী আক্রমণকারীরা যেমন অবৈধ মনে হওয়া গ্রন্থাগার ধ্বংস করত, ইউরোপীয় বণিকেরা তা করত না—বরং যা লাভজনক, তা নিজেদের জন্য নিয়ে নিত, আর বাকিটা বিকৃত করত তাদের সুবিধামতো। বৈদিক শাস্ত্র সম্পর্কে তারা কোনো বৈদিক পণ্ডিতকে প্রশ্ন করত না; বরং বাইবেলের বাইরে যা কিছু, তা শয়তানপ্রসূত বলে ধরে নিয়ে তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনত। এই ‘নিয়ন্ত্রিত শয়তান’ ছিল তাদের বাণিজ্যিক পুঁজি। তাই ম্যাক্সমুলার, যিনি সংস্কৃত পড়েননি, একটিও বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারেননি এবং কখনো ভারতে আসেননি, তিনি হয়ে গেলেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মহান’ বৈদিক পণ্ডিত। তাদের দাসসুলভ ভারতীয় অনুগামীরা তাদের প্রতিটি কথায় ‘তথাস্তু’ বলতে লাগলো। তারা সিদ্ধান্ত করলো বাঙালি জাতি অস্ট্রিক জাতীয় বান্দর , কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের বাবুরা তাতেই হা হা, যথাবৎ ,হুজুর হ্যায়, বলে ক্ষান্ত দিলো ।
১৮০০ খ্রি কলকাতায় হঠাৎ করেই খ্রিস্টান মিশনারিরা ‘পণ্ডিত’ হয়ে উঠল—কীভাবে, তার ব্যাখ্যা কেউ দিল না। তারা নিজ দেশে মূর্খ, ভারতে এসে সৌভাগ্য খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ সংস্কৃত-বাংলার বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠল ! তারা কখনো বলেনি কোন ভট্টাচার্য বা বৈদিক আচার্যের কাছে তারা ভাষা শিখেছে। তারা গোবিন্দপুরে জমি দখল করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ খুলল, তারপর সংস্কৃত কলেজ, যাতে তাদের সশস্ত্র বণিকেরা স্থানীয় ব্যবসা ও লেনদেনের ধরন শেখে, এবং তাদের চর্বিত উৎচ্ছিস্ট, নেটিভদের মধ্যে বিতরণ করে তাদের আলোকিত করে । তারপর এশিয়াটিক সোসাইটি (১৭৮৪ খ্রি) ভারতের ধৰ্ম, ইতিহাস ও পরম্পরাকে বিকৃত করতে শুরু করলো ।
আমরা তাদের এই মতবাদ মানি না—আমরা আমাদের ইতিহাস ও অবস্থান খুঁজব আমাদের হাতে থাকা প্রমাণ থেকে। তাদের মনগড়া ও প্রতারণাপূর্ণ ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’, ‘ইন্দো-আর্য’, ‘আক্রমণ’ বা ‘অভিবাসন’ তত্ত্ব আমরা স্বীকার করব না। কল্পনা কখনো প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না—যতই ক্ষুদ্র হোক, প্রমাণই সত্যের ভিত্তি। তাই আমরা গৌড়-বঙ্গীয় ব্যাকরণ লিখব আমাদের আত্মার তৃপ্তির জন্য, এবং আমাদের আত্মাকে পুনরুদ্ধারের জন্য।
ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন — তাদের চোখে ভারতীয় বৈদিক শাস্ত্র, সংস্কৃতি, ভাষা—সবই ছিল সংশোধনের যোগ্য, কারণ তা ছিল তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের পথে অন্তরায় ।
সুযোগের সদ্ ব্যবহার করে খ্রীষ্টান মিশনারিরা কিছু মাইকেল, এন্থনি, হ্যারি, হাবড়া-গাবড়া উৎপাদন করলো। হাবড়া-গাবড়ারা সিগারেটে ফুকটান দিয়ে, হুঁকোখোরদের গালিগালজ মেরে কলকাতা তথা বাঙালিদের অন্ধকার দূর করতে লাগলো। এটাই ছিল তাদের রিফর্মেশন। কাঁসার ঘটিতে ইংরেজি মদ্য পান করে, ব্রহ্মসমাজিদের বেকাকেষ্ট নাটক দেখে, সোনাগাছি ঘুরে, রাত্রির তৃতীয় প্রহরে, মেথরের যাবার রাস্তা দিয়ে গৃহে প্রবেশ করা ছিল বাঙালিদের রিফর্মডনেস ।
তাদের কথিত “reformation” ও ইংরেজি শিক্ষা আসলে ছিল এক ধরনের trade adjustment—ভারতের জন্য কোনো কল্যাণকর মানবিক সংস্কার নয়, বরং ভারতের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যাতে তা ব্রিটিশ বাণিজ্য, প্রশাসন ও চিন্তাধারার সঙ্গে খাপ খায়। ভারতীয়দের চোখে পশ্চিমা আধুনিকতার মোহ জাগিয়ে দিয়ে, নিজেদের মানদণ্ডে ভারতীয় জ্ঞানপ্রথাকে মাপতে শিখিয়ে, তারা ভারতের আত্মবিশ্বাস ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অবস্থানকে ক্ষয় করতে চেয়েছিল। অর্থাৎ, তাদের সংস্কার ও শিক্ষা—বাহ্যত উন্নয়নের মুখোশে—আসলে ছিল ভারতের ঐতিহ্যকে trade policy অনুযায়ী পুনর্গঠন করার এক হিসেবি পরিকল্পনা, যাতে ভারতীয় সমাজ নিজে আর নিজের উৎসের দিকে ফিরে তাকাতে না পারে। তাই আমরা গৌড়-বঙ্গীয় ব্যাকরণ লিখব আমাদের ভাষার মধুরতা, শক্তিমত্ততা এবং কার্যকারিতা প্রকাশের জন্যে ।
যখনই আমরা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (বা গৌড়ীয় ব্যাকারণ) নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা এক ধরনের মান্য গঠনকাঠামো মেনে নিই। আমাদের বঙ্গীয় উপভাষা বিষয়ক প্রবন্ধে আমরা দেখেছি যে বাংলার একাধিক উপভাষা প্রচলিত আছে। চর্যাপদকে বাংলা বলা চলে না, তাই আমরা চর্যাপদের আলোচনায় আগ্রহী নই। আমাদের কাছে বাংলা ভাষার মান্য রূপ (আদর্শ) প্রতিষ্ঠা পেয়েছে চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে, এবং আমরা এই অবস্থান গ্রহণ করি যে আধুনিক বাংলা ভাষার সূচনা হয়েছে নবদ্বীপ শহরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম (১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষার ব্যাকরণ বর্তমানকালের বাংলা ভাষার মতোই পরিশীলিত ও যথাযথ। (বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ > বাংলা ভাষার ব্যাকরণ)
গৌড়-বঙ্গীয় ব্যাকরণের নির্ঘন্ট
- ব্যাকরণ
- বাংলা ভাষার ব্যাকরণ
- গৌড়ীয়-বঙ্গীয় বর্ণমালা
- বাংলা শব্দ (শব্দানুশাসন)
- বঙ্গীয় উপভাষা
- বাংলাদেশি ভাষা
- সাধু ভাষা (গৌড়ীয় শুদ্ধ ভাষা)
- চলিত ভাষা (বাজারের ভাষা)
- সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড এবং রিপোর্টিং
চলবে
