বঙ্গীয় উপভাষা

Bangiya Upabhasha. Sahitya Samrat

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

বাংলা ভাষার উপভাষা ও কথ্য রূপসমূহ: মানক বাংলা, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটি ভাষা

বঙ্গদেশে মহাপ্রভু হইলা প্রবেশ।
অদ্যাপিহ সেই ভাগ্যে ধন্য বঙ্গদেশ ।
পদ্মাবতীতীরে রহিলেন গৌরচন্দ্র
শুনি সর্বলোক বড় হইল আনন্দ।। (চৈতন্যভাগবত – ১৫৩৫ খ্রি)

বঙ্গীয় উপভাষা ( বঙ্গ প্রজাতীয় ভাষা) পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ (বঙ্গীয় ভূখণ্ড) অঞ্চলে প্রচলিত। এর মধ্যে পরে ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চল। এই গুচ্ছের আওতায় ঢাকাইয়া, চাটগাঁইয়া, সিলেটি প্রভৃতি উপভাষা পড়ে, যেগুলি বহুক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা দাবি করে। সিলেটি ভাষা, যেমন অনেক গবেষকের মতে, নিজস্ব ধ্বনিগত কাঠামো, শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা ভাষা হিসেবে গণ্যযোগ্য। এই গুচ্ছে ‘আবহট্ট’ ও ‘পিশাচী’ উৎসের ছাপ সুস্পষ্ট এবং পূর্ববঙ্গের প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা উপভাষাগুলিকে অধিক বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

বাংলা ভাষার উপভাষাগুলিকে চারটি বৃহৎ গুচ্ছের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে: রাঢ়ী, বঙ্গীয়, কামরূপী এবং বরেন্দ্রী

রাঢ়ী উপভাষা ব্যবহার হয় ভারতের দক্ষিণবঙ্গ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এই গুচ্ছভুক্ত অঞ্চলের মধ্যে পরে ভারতের পুরো প্রেসিডেন্সি বিভাগ, বর্ধমান বিভাগের দক্ষিণাংশ, মেদিনীপুর বিভাগ, এবং বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের উত্তরাংশ ও মুর্শিদাবাদ জেলা।

বরেন্দ্রী উপভাষা বরেন্দ্র ভূমি, অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, চাঁপাই-নবাবগঞ্জ ও ভারতের মালদা বিভাগের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত। এ উপভাষায় ধ্বনি উচ্চারণে ঘনত্ব, বাক্যগঠনে সংক্ষিপ্ততা এবং পুরনো প্রাকৃত-আবহট্ট অনুরণন পাওয়া যায়। বরেন্দ্রী গুচ্ছ পূর্ববঙ্গের তুলনায় অপেক্ষাকৃত রুক্ষ, এবং ভিন্ন রকম শ্বাসধ্বনি, উপসর্গ-প্রত্যয় প্রয়োগে তফাত রয়েছে।

এই চারটি গুচ্ছের বাইরে, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপভাষাগত গোষ্ঠী বর্তমান। তার মধ্যে অন্যতম:

মানভূমী উপভাষা—পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্তবর্তী জেলা যেমন—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান এবং ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সিংভূম, রাঁচি, সাঁওতাল পরগনা, ময়ূরভঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচলিত। এই উপভাষায় হিন্দি, ওড়িয়া ও উপজাতীয় ভাষার প্রবল প্রভাব আছে।

ঝাড়খণ্ডি বাংলা বা “আদিবাসী প্রভাবিত বাংলা” মানভূমীর অন্তর্গত একাধিক জেলায় প্রচলিত। এটি স্থানীয় আদিবাসী ভাষা যেমন খরিয়া, হো, মুন্ডারি, সাঁওতালি ইত্যাদির সঙ্গে বাংলার সংমিশ্রণে গঠিত। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বিহারের কিছু অংশ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় এই ভাষাচলনের ব্যবহার দেখা যায়।

কামরূপী-রংপুরী বাংলা উপভাষা মূলত উত্তর-পূর্ব বাংলার অঞ্চলজুড়ে, যেমন—বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের দক্ষিণাংশ, ভারতের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও গোয়ালপাড়া (অসম) জেলায় প্রচলিত। এই উপভাষা বাংলা, অসমীয়া ও মৈথিলি প্রভৃতির এক ধরণের মিশ্র রূপ প্রকাশ করে। কামরূপী বাংলা ধ্বনিগতভাবে কিছুটা ধীর, লঘু ও প্রাকৃতমূলক; এটি রাঢ়ী বা বঙ্গীয় বাংলার তুলনায় ব্যাকরণিক কাঠামোয় পুরাতনী ধারা বজায় রেখেছে।

ত্রিপুরার বাংলা এক বিশেষ উপভাষাগত রূপে চিহ্নিত। আগরতলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রচলিত বাংলা উপভাষা পূর্ববঙ্গীয় ধাঁচে গঠিত, তবে স্থানীয় কোকবরক ভাষার সঙ্গে মিশ্রণের কারণে কিছু নতুন ধ্বনি ও শব্দ গৃহীত হয়েছে।

ঢাকাইয়া বাংলা, শান্তিপুরী বাংলা, কলকাতার নারীবাচক রীতি, সিলেটি বিকল্প রূপ, এবং নোয়াখালীয় বিভিন্ন রূপ—প্রত্যেকটি নিজস্ব সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিসরে গঠিত হয়েছে।

এছাড়া রয়েছে তথাকথিত ঝাড়খণ্ডি উপভাষা, যা সাঁওতাল পরগনা এবং কোলহান বিভাগে প্রচলিত।

বাংলা ভাষার (বঙ্গীয় ভূখণ্ডর) স্থানীয় উপভাষার কিছু নিদর্শন নিচে দেওয়া হলঃ

  • রাজশাহী:
  • পাবনা:
  • দিনাজপুর:
  • সিরাজগঞ্জ:
  • বগুড়া:
  • মালদা:
  • রংপুর:
  • জয়পুরহাট:
  • পূর্ব পুরনিয়া (সিরিপুরিয়া):
  • নদিয়া-কুষ্টিয়া:
  • মেহেরপুর:
  • চুয়াডাঙ্গা:
  • কলকাতা:
  • কলকাতা (মেয়েলি ভাষা):
  • হাওড়া:
  • হাওড়া (মেয়েলি ভাষা):
  • ঘাটাল:
  • কাটোয়া-মুর্শিদাবাদ:
  • মানিকগঞ্জ:
  • ময়মনসিংহ:
  • টাঙ্গাইল:
  • ঢাকা-বিক্রমপুর:
  • কুমিল্লা:
  • আগরতলা/পশ্চিম ত্রিপুরা:
  • সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত উপজেলা):
  • নোয়াখালী (ফেনী, ছাগলনাইয়া):
  • নোয়াখালী (হাতিয়া):
  • নোয়াখালী (লক্ষ্মীপুর, রামগঞ্জ):
  • চট্টগ্রাম:
  • সিলেট:
  • সিলেটি বিকল্প:
  • কাছাড়:
  • খুলনা:
  • বাগেরহাট:
  • যশোর:
  • বরিশাল (বাকেরগঞ্জ):
  • পটুয়াখালি:
  • ফরিদপুর:
  • গোয়ালপাড়া:
  • রংপুর:
  • জলপাইগুড়ি:
  • কোচবিহার:
  • দার্জিলিং (তরাই):
  • মানভূমী:
  • পূর্ব মেদিনীপুর:
  • তমলুক:
  • ধালভূম/পূর্ব সিংভূম:
  • পশ্চিম বর্ধমান:
  • রাঁচি:
  • ময়ূরভঞ্জ:
  • অসমীয়া:
  • হাজং:
  • চাকমা:
  • খরিয়া থার:
  • মাল পাহাড়িয়া:
  • হালবী:
  • ওড়িয়া:
  • ভোজপুরী:
  • মৈথিলি:
  • রোহিঙ্গা:
  • সম্বলপুরী:

এর বাইরে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ঝাড়খণ্ডি উপভাষা প্রচলিত রয়েছে পশ্চিম প্রান্তের জেলাগুলিতে ও ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে। এই উপভাষাগুলিতে হিন্দির প্রভাব দেখা যায়। বিশেষ করে বাঁকুড়া, বীরভূম, মানভূম, সিংভূম, পুরুলিয়া, পুরনিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এদের ব্যবহার প্রচলিত।

কামরূপী/রংপুরী উপভাষা ব্যবহৃত হয় জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, সম্ভবত দার্জিলিং এলাকায়, এবং বাংলাদেশেও।বঙ্গদেশী

বর্তমান বাংলাদেশে উপভাষাগুলি মূলত Eastern Bengali Dialects নামে পরিচিত। এই উপভাষাগুলি বাংলাদেশের প্রধান ভাষা রূপে ব্যবহৃত হয় এবং অন্তর্ভুক্ত করে:

  • মানক বাংলা ভাষা (যা গণমাধ্যম ও শিক্ষায় ব্যবহৃত)
  • ঢাকা উপভাষা
  • চট্টগ্রাম উপভাষা (চাটগাঁইয়্যা ভাষা)
  • সিলেটি উপভাষা (যা অনেকের মতে স্বতন্ত্র ভাষা)

চট্টগ্রামের বর্তমান বাংলা (চাটগাঁইয়া বা চিটাগাং বাংলা) একটি স্বতন্ত্র উপভাষা, যা ধ্বনি, শব্দভাণ্ডার, ও ব্যাকরণগত গঠনের দিক থেকে মানক বাংলা বা পূর্ববঙ্গের অন্যান্য উপভাষা থেকে যথেষ্ট ভিন্ন। এটি প্রধানত চট্টগ্রাম শহর, পটিয়া, বাঁশখালী, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, রাউজান, হাটহাজারী প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচলিত।

চাটগাঁইয়া ভাষায়: “তুই হডে গেছিলি হ ত? , আই ত রাতুয়া তোরে খুঁজি খুঁজি এক্কেবারে হয়রান হই গেইলাম। আজুয়া বাড়ি ফির্গুস, তাও আবার মুখ গড়ি !”

মানক বাংলায়: “তুই কোথায় গিয়েছিলি বল তো? আমি তো রাতে তোকে খুঁজে খুঁজে একেবারে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আজকে বাড়ি ফিরেছিস, তাও মুখ গোমড়া করে!”

“বাউ রে বাউ, এতারা দো সেই এক্টিং হইজ্জে দে ইতেরার অগ্গলরে আর বত ভাল্লাগজেদে, আরারে এত ভালা নাটক উপহার দেয়ার লাই ইতারারে বত ধন্যবাদ”।

সিলেটি: কত সুন্দর লাগের সিলেটী মাত হুনিয়া……সিলেটী ওইয়া আমরা গর্বিত।

বাংলাদেশের সব ভাষাই চট্টগ্রামের মানুষ বোঝে , কিন্তুু চট্টগ্রামের ভাষাটা বোঝা দেশের মানুষের বেশ মুশকিল। শুদ্ধ বাংলার সঙ্গে সিলেটের ভাষা বেশি মিল আছে, চট্টগ্রামের ভাষার মিল অনেক কম। চট্টগ্রামে ইন্দো চায়না, আরবী ,ফারসী, আর পুর্তগীজ ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিভিন্ন দেশের বনিক গন‌ ব্যাবসার জন্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় গেছে,অনেকেই স্থায়ী ভাবে থেকে গেছে, যার জন্য সমাজ, সংস্কৃতি ও ভাষায় প্রভাব টা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন।

সিলেটি ( প্রাচীন শ্রীহট্ট > হরিকেল ) ভাষা ও জাতি বাংলার উপভাষাগুলির মধ্যে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শাখা হিসেবে পরিচিত হলেও, এটির নিজস্ব উচ্চারণরীতি, শব্দভাণ্ডার ও সাংস্কৃতিক রূপ সিলেটিকে একটি স্বকীয় ভাষিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ইতিহাসে সিলেট অঞ্চল একাধিকবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে, যার ফলে ভাষাগত ও জাতিগত দিক থেকেও তাদের মধ্যে আলাদা সত্তার অনুভব তৈরি হয়েছে। সিলেটি কোন আঞ্চলিক ভাষা নয়, এটা বাংলা, ইংরেজি এর মতো আলাদা একটা পরিপূর্ণ ভাষা, সিলেটি ভাষার নাম ‘নাগরি’ এবং সিলেটের নিজস্ব একটি বর্ণমালা আছে , সেটির নাম হল ‌‌নাগরি লিপি । আজ সিলেটি জনগোষ্ঠী শুধু বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়—ভারতের ত্রিপুরা, কাছাড়, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ, গৌহাটি, ডিমাপুর, জিরিবাম থেকে শুরু করে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে; এমনকি বিশ্বব্যাপী, বিশেষত ব্রিটেনে সিলেটিরা একটি সুসংগঠিত প্রবাসী সমাজ গড়ে তুলেছে। এই বিস্তার ও ভাষার নিজস্ব রূপ সিলেটি জাতিসত্তাকে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করেছে ।

সিলেটি ভাষায় বলা হয়—”জানেনা শিং মাছ ধরার মন্ত্র, হাত ঢুকাইছে সাপের গর্ত”—তা এই ভাষার প্রাচীনতা ও প্রাণশক্তির নিদর্শন। “বাংলা ভাষার জনক সিলেটি ভাষা” — এই দাবিটি ইতিহাস ও ভাষাবিজ্ঞানের বিচারে বিতর্কযোগ্য, তবে বাংলার ৮০ টা শব্দই সিলেটি ।

সিলেট ও চট্টগ্রামের মাঝখানে ভৌগোলিকভাবে কুমিল্লা জেলার অবস্থান, ফলে এই অঞ্চলের মানুষ উভয় দিকের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত প্রভাব গ্রহণ করার এক বিশেষ সুবিধায় রয়েছে। কুমিল্লার অনেক মানুষই সিলেটি ও চাটগাঁইয়া—এই দুই উপভাষার শব্দরীতি, ধ্বনিগত ভঙ্গি ও কথ্য ছন্দ কিছুটা হলেও বুঝতে ও অনুভব করতে সক্ষম, যেটা অন্য জেলার মানুষের পক্ষে সহজ নয়।

সভার সঙ্গিত প্রভু হাস্য-কথা-রঙ্গে।
কহিলেন হেনমত আছিলেন বঙ্গে এ ॥
বঙ্গদেশি-বাক্য অনুকরণ করিয়া-
বাঙ্গালেরে কদর্থেন হাসিয়া-হাসিয়া॥ (বৃন্দাবন দাস ১৫৩৫ খ্রি)

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের Standard Bengali বলতে বোঝানো হয় চৈতন্য মহাপ্রভুর (১৪৮৬ খ্রিঃ – ১৫৩৪ খ্রিঃ) ভাষাচলন বা রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজভাষা, যা পরবর্তীকালে কলকাতার ভাষা হয়ে উঠে। চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বপুরুষ সিলেটে বাস করতেন ।

সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ১০০-র অধিক প্রধান ও উপ-উপভাষা চিহ্নিত করা সম্ভব। বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে এক একটি উপভাষা বা কথ্যরীতি ব্যবহৃত হয়, যেগুলির idiom, ধ্বনিগত প্রকৃতি, শব্দরূপ বা ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং শুধুমাত্র একটি ছোট গোষ্ঠী দ্বারা ব্যবহৃত।

সব উপভাষার মূল উৎস হল প্রাকৃত, আবহট্ট (অবহট্ট) ও পিশাচী। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, অখণ্ড বঙ্গভূমির সিলেট অঞ্চলের মানুষ ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই আবহট্টমূলক ভাষাচলন গ্রহণ করেছিল। যেমন চট্টগ্রামের ভাষায় বর্মী প্রভাব, তেমনই সিলেটির ভাষায় অসমীয়া প্রভাব বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, ও মুর্শিদাবাদের ভাষার মধ্যেও যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি সিলেটি নিজস্বতাও স্বীকৃতির দাবিদার। এগুলির কোনটিই শুদ্ধ বা অশুদ্ধ নয়—সব ভাষার রূপই সমানভাবে মূল্যবান। প্রাচীন কালে চট্টগ্রাম ও সিলেট উভয়ই হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা এই ভাষাগত সংযোগ ও স্বাতন্ত্র্যকে ঐতিহাসিক ভিত্তি দেয়।

হাসি প্রভু সভা-প্রতি করিয়া আশ্বাস।
কথো-দিন বঙ্গদেশে করিলা বিলাস ॥
সেই ভাগ্যে অদ্যাপিহ সর্ব্ব-বঙ্গদেশে। (বৃন্দাবন দাস – ১৫৩৫ খ্রি)

সহস্রসহস্র শিষ্য হইল তথাই।
হেন নাহি জানি, কে পঢ়য়ে কোন্ ঠাঁই ॥
শুনি সব বঙ্গদেশী আইসে ধাইয়া।
নিমাঞি-পণ্ডিত-স্থানে পঢ়িবাঙ গিয়া

সার্বিকভাবে, পূর্ববঙ্গে (বঙ্গদেশী) উপভাষার সংখ্যা ও বৈচিত্র্য পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি।

আধুনিক কালের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভাষার রূপান্তর স্পষ্টতই দুটি ভাগে ভাগযোগ্য—চলিত ভাষাসাধু ভাষাসাধু ভাষা বা চলিত ভাষা বলতে বোঝানো হয় একটি প্রমিত ভাষার রূপ, যা স্থানীয় উপভাষার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। সাধু ভাষা, মূলত উনবিংশ শতকে প্রমথনাথ তর্কবাগীশ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা পায় এবং মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য ধারণ করে। অপরদিকে চলিত ভাষা মূলত চৈতন্য মহাপ্রভুর অগ্ৰগণ্য বৈষ্ণব সাহিত্যের ভাষাচলন থেকে উৎপন্ন, যা পরবর্তীতে কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের ভাষায় আত্মীকৃত হয়।

প্রত্যেকটি উপভাষা তার নিজস্ব ধ্বনি, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার ও রীতি নিয়ে বাংলা ভাষার মেধা ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে তোলে। স্থানীয় উপভাষাগুলি শুধু ভাষাবিজ্ঞানের নয়, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব ও ইতিহাসের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার উৎস।


১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ: নদীয়া (নবদ্বীপ) জেলার বাংলা গদ্য

“এই সংসার জগৎ অস্থির। লোকের মতি নানা দিকে চলে। কেহ শাস্ত্রে বিচারে প্রবৃত্ত, কেহ তন্ত্রে নিযুক্ত। ইহলোক সুখ লাগি যাহারা কর্ম করে, তাহারা পরলোক চিনে না। কিন্তু যেই জন গুরুর বচনে বিশ্বাস করে, সে তত্ত্ব জানে। ব্রহ্ম এক, কিন্তু বোধ বহু। কলি কালে হরি-ভক্তি বিনা গতি নাই।”

১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ: কলকাতার বাংলা গদ্য

“এই শহর কালীঘাট হইতে গঙ্গার ধারে বিস্তৃত হইয়াছে। বাণিজ্যকরিয়া ইংরেজ সাহেবেরা বড় বড় গদিঘর স্থাপন করিয়াছে। গোমস্তা ও দালালগণ চলাচল করিয়া থাকে। হাটে বাজারে নানা জাতির লোক, বাঙাল, পাঠান, মগ ইত্যাদি দেখা যায়। কালীমায়ের পূজো মহা ধুমধামে হয়।”

১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ: ঢাকার বাংলা গদ্য

“এহানে নবাবের দেওয়ানখানা আছে। বাজারে হাটে অনেক জিনিস বিক্রয় হয়। মসলিনের জন্যে এই নগরী বিখ্যাত। দরবারে কবি, পণ্ডিত ও ফকিরবৃন্দ সমাগম করেন। ঈদ ও মহরমের উৎসব মহা ধুমধামে পালিত হয়। বাঙালি মুসলমানেরা ফারসি ও আরবি ভাষায় পটু, কিন্তু আপন ভাষাতেও অনেক কাব্য রচনা হয়।”


উপভাষার মোহনায় এক কবিতা

রাজশাহীর রোদে পাকা ধানের ঘ্রাণ,
পাবনার মাঠে বউ কইল— “এবার আয় না প্রান!”
দিনাজপুরে মেঘে বাঁশির টান,
সিরাজগঞ্জে বলে, “ভাই, হেইডা বড়ো জান!”

বগুড়া বলে, “তুই কই যাচস রে?”
মালদার গন্ধে আম মধু ভরে।
রংপুর গাই, “আয় রে সাথী, জাই রে মাঠে,”
জয়পুরহাটে দুলে “আসল কথা কই রে পটে।”

সিরিপুরিয়া নদীর ঢেউ বলে, “এরে কহন চিনি?”
নদিয়া-কুষ্টিয়ায় বাজে দোতারা, “ও প্রিয়জনিনী!”
মেহেরপুরে ফোটে ফুল, “বলি হেথায় থামো,”
চুয়াডাঙ্গা বারে বারে ডাকে, “তুমি জানো, আমি কামের লোক হান।”

কলকাতা রে, “কি রে বাপু, কি অবস্থা হোল?”
কলকাতার মেয়েলি গলায়, “উফফ, মরি গো, ছেলেটা একদম গেল!”
হাওড়া হেঁকে বলে, “আরে ও ননীচোরা, চল ঘাটে,”
হাওড়ার মেয়েরা হাঁকে, “চুপ কর, দেখি তো কার সাথে!”

ঘাটাল বলে, “গা দিয়া বোঝো সব,”
কাটোয়া-মুর্শিদাবাদে—“আল্লা জানে প্রেমের জব।”
মানিকগঞ্জে বলে, “তুই জানস রে কিতা?”
ময়মনসিংহে খুদি ডাকে—“তোরে চাই, এইটাই সত্য কথা।”

টাঙ্গাইলে বলে, “তোমারে দেই চিঠি,”
ঢাকা-বিক্রমপুরে বাজে, “ও মোর হিয়া-মিঠি।”
কুমিল্লা গায়, “যাইমু না দূরে,”
আগরতলায় বলে, “ভাই, তোরা থাইক ভালো হুতে।”

সন্দ্বীপ ডাকে, “তুমি আইবা নি?”
নোয়াখালীর ফেনী তুইলা কয়, “তুমি আমা সোনামণি।”
হাতিয়ার হাওয়ায় ভাসে, “যাও না অই পাড়ে,”
লক্ষ্মীপুর-রামগঞ্জে মিষ্টি বুলি, “তুমি মোর অমর সাথারে।”

চট্টগ্রামে উজানে চলে, “তুমি অইবাম নি বাপো?”
সিলেটের ঝরনায় বাজে, “তুমি আসবা গো সাঁঝো।”
সিলেটির বিকল্পে টানে, “তোমার লগে কথা ছিল রে ভাই,”
কাছাড়ের বাঁকে বাঁকে, “মই তো হম তোমার ছায়।”

খুলনার কানে বাজে, “তুই আসিস রে, রাইতে?”
বাগেরহাটে ঠাকুর বলে, “তুমি আইবা ফুল নিতে।”
যশোরে শুনি, “তুই রসিক পোলাপাইন,”
বরিশালের বাকেরগঞ্জে—“তুই কিতা দেহস রে ভাই?”

পটুয়াখালি বলে, “তোমারে দেখলে মন শান্তি পায়,”
ফরিদপুরে বাজে, “ও মনু, তুই কোথায়?”
গোয়ালপাড়ার কন্ঠে, “মোর পিরিতত তুই হোস গিয়া ফাঁই,”
জলপাইগুড়ি বলে, “তুমি আসবি তো ভাই?”

কোচবিহারে পুঁথি পড়ে, “রাধে তুমি জানো?”
দার্জিলিং তরাই গায়—“তুমি পাহাড়ে আসো জানো।”
মানভূমী ঝংকারে বলে, “পিরিত এক ধাঁধা,”
তমলুক ঘাটে বলে, “তুই আয়, আয় না সাঁঝা।”

ধলভূমে গাছেরা বলে, “চিনলে মোরে?”
পশ্চিম বর্ধমানে বাজে, “তুই না পাগল আমারে?”
রাঁচির বাঁশিতে বাজে “আয়, গানের সুরে,”
ময়ূরভঞ্জের অরণ্যে—“ভালোবেসো রে দূরে।”

অসমীয়া সুরে বলে, “মই তোমাক ভালপাওঁ,”
হাজংয়ের ঘ্রাণে বাজে, “তুমি মোর হৃদয়জোড়া পাও।”
চাকমার বন বলে, “মই হম তোমার সাঁথি,”
খরিয়া থার গায়, “তুই জঙ্গলরে জানিস কত রাতি?”

মাল পাহাড়িয়া কই, “তুই মন পাহাড় হ, ভাই,”
হালবীর গানে বাজে, “তুই আমার প্রিয় গাঁই।”

অনেক সুরে, নানান রঙে, কত রঙের বানাই বেশ…
বঙ্গভাষা, বাঙালির আশা—বুক জুড়ে থাক্‌ বঙ্গদেশ।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল