সম্পূর্ণ বাল্মীকি রামায়ণ: তন্ময় ভট্টাচার্য অনূদিত এবং সম্পাদিত

বাল্মীকি রামায়ণ

ভারদ্বাজ গোত্রীয় মহর্ষি বাল্মীকির সহিত প্রাচীন কালে মহর্ষি নারদের এক গম্ভীর সাক্ষাৎকার সংঘটিত হইয়াছিল। উক্ত সাক্ষাৎকারে নারদ ঋষি তাহাকে এক পরিপূর্ণ কাব্যরূপে রামকথার সারাংশ প্রদান করিয়াছিলেন। তদনুসারে বাল্মীকির অন্তরে আবির্ভূত হইল এক শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, যাহা তিনি ষট্‌কাণ্ডে বিভক্ত করিয়া, চतुর্বিংশতি সহস্র শ্লোকে, পঞ্চশত অধ্যায়ে গূঢ়ভাবে গাঁথিয়াছেন। ইহার রচনাকাল অনুমান করা যায় খ্রীষ্টপূর্ব ৭২০০ অব্দে । যাহা পরবর্তীকালে খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের নিকটবর্তী সময়ে বর্তমান ‘বাল্মীকিরামায়ণ’ নামে স্বীকৃত পাঠরূপে সমরূপ হইয়াছে। ইহা ব্যাকরণাচার্য পাণিনি ও নিরুক্তকার য়াস্কাচার্যের পূর্ববর্তী গ্রন্থ।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, স্বয়ং বাল্মীকিই কহিয়াছেন—

“शृण्वन्ति य इदं काव्यं पुरा वाल्मीकिना कृतम्।
ते प्रार्थितान् वरान् सर्वान् प्राप्नुवन्तीह राघवात्॥”

— ইহা স্পষ্ট ইঙ্গিত করিতেছে যে, বাল্মীকির পূর্বেও রামায়ণকাহিনী প্রচলিত ছিল এবং তিনি পূর্বতন স্মৃতি ও সাধুসংবাদ অনুসরণ করিয়াই মহাকাব্য রচনা করেন।

বাল্মীকিরামায়ণের সংক্ষিপ্ত সার নিম্নরূপ

(১) বালকাণ্ডঃ মহারাজ দশরথের অযোধ্যায় মহাতেজস্বী রঘুকুলতিলক রামচন্দ্রের আবির্ভাব, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে তাহার বনযাত্রা, তাড়কা বধ, মহর্ষি-সংগতি, জনকনন্দিনী সীতার স্বয়ংবর ও বিবাহাদি বিস্তৃত বিবরণ।

(২) অযোধ্যাকাণ্ডঃ রামের অভিষেকের প্রস্তুতি, মন্দভাবাপন্ন কৈকেয়ীর কুবাক্য ও বরদান, রামের বনগমন, দশরথবিয়োগ ও ভরতচরিত।

(৩) অরণ্যকাণ্ডঃ রামের বনবাসকালীন জীবন, পঞ্চবটী নির্জনে বসবাস, শূর্পণখার অপমান, খর-দূষণবধ, ও সীতাহরণের ঘটনাসমূহ।

(৪) কিষ্কিন্ধাকাণ্ডঃ হনুমান ও রামের প্রথম সাক্ষাৎ, সুগ্রীবের সহিত মৈত্রী, বালিবধ, সীতার সন্ধান এবং বানরবাহিনীর গঠনের সূচনা।

(৫) সুন্দরকাণ্ডঃ মহাবলী হনুমানের লঙ্কায় গমন, সীতাদর্শন, অগ্নিদাহে লঙ্কার বিভীষিকা, বার্তালাভ ও প্রত্যাবর্তন।

(৬) যুদ্ধকাণ্ড (লঙ্কাকাণ্ড): নীলজল সাগরে সেতুবন্ধন, রাক্ষসদের সহিত মহাযুদ্ধ, রাবণবধ, বিভীষণের অভিষেক এবং রামের অযোধ্যাপ্রত্যাবর্তন।

এই কাব্যের এক বিস্ময়কর উপাদান হইতেছে, প্রায় প্রতি সহস্রতম শ্লোকের প্রথম অক্ষর একত্রিত করিলে যে চব্বিশটি অক্ষর গঠিত হয়, তাহাই গায়ত্রী মন্ত্র“तत्सवितुर्वरेण्यं भर्गो देवस्य धीमहि। धियो यो नः प्रचोदयात्॥”— এইভাবে এক ঋষির কাব্য অন্বয়ে বৈদিক মন্ত্রের সহিত লীন হইয়াছে।

এই মহাকাব্যের সমাপ্তিতে বাল্মীকি বলিতেছেন—

“एवमेतत् पुरावृत्तमाख्यानं भद्रमस्तु वः।
प्रव्याहरत विस्रब्धं बलं विष्णोः प्रवर्धताम्॥”
(১২১)

“देवाश्च सर्वे तुष्यन्ति ग्रहणाच्छ्रवणात् तथा।
रामायणस्य श्रवणे तृप्यन्ति पितरः सदा॥”
(১২২)

“भक्त्या रामस्य ये चेमां संहितामृषिणा कृताम्।
ये लिखन्तीह च नरास्तेषां वासस्त्रिविष्टपे॥”
(১২৩)

“कुटुम्बवृद्धिं धनधान्यवृद्धिं
स्त्रियश्च मुख्याः सुखमुत्तमं च।
श्रुत्वा शुभं काव्यमिदं महार्थं
प्राप्नोति सर्वां भुवि चार्थसिद्धिम्॥”
(১২৪)

“आयुष्यमारोग्यकरं यशस्यं
सौभ्रातृकं बुद्धिकरं शुभं च।
श्रोतव्यमेतन्नियमेन सद्भि-
राख्यानमोजस्करमृद्धिकामैः॥”
(১২৫)

সর্বশেষে, বাল্মীকি কহিয়াছেন—

“दशवर्षसहस्राणि दशवर्षशतानि च।
भ्रातृभिः सहितः श्रीमान् रामो राज्यमकारयत्॥”

— অর্থাৎ শ্রীরাম দীর্ঘ দশ হাজার ও এক শত বৎসর তাহার ভ্রাতৃগণের সহিত রাজ্যপালন করিয়াছিলেন। এই রাম কোন সাধারণ রাজা নহেন; তিনি বৈদিক ধর্মের আদর্শ পুরুষ। তিনি বহু যজ্ঞ সম্পাদন করিয়াছিলেন, যাহার মাধ্যমে সমাজের অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন সাধিত হয়। ইহাই প্রমাণ করে, ‘রাম’ শুধু পুরাণনায়ক নন, তিনি ভারতীয় সভ্যতার এক ঐতিহাসিক পুরুষ ও ধর্মশাসিত শাসনব্যবস্থার প্রতীক।

তন্ময় ভট্টাচার্য অনূদিত


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল