বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
বেদ সাহিত্য, যা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ—এই সমগ্র বৈদিক গ্রন্থভাণ্ডারের ভিত্তি, তার শব্দভান্ডারে প্রায় ১,২৫,০০০ মৌলিক শব্দমূল রয়েছে। প্রায় ৪০০টিরও বেশি বৈদিক ও বেদাঙ্গ গ্রন্থে ব্যবহৃত সব রূপসহ শব্দসংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ। সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ঋগ্বেদে আছে ১০,৫৮০ মন্ত্র এবং মোট ১,৫৩,৮২৬টি শব্দ। বৈদিক ভাষায় ব্যবহৃত ধাতুর সংখ্যা ২,০০০–এরও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৫০০টি কেবল বৈদিক সাহিত্যে পাওয়া যায়। সংস্কৃত ব্যাকরণের ধাতু ও প্রত্যয়ের সংযোগক্ষমতা অসীম শব্দসৃষ্টির সুযোগ দেয়; ফলে “জল” বা “প্রেম”-এর মতো একেকটি ধারণার জন্য শতাধিক শব্দ গঠিত হয়েছে—জলের জন্য ১০০–র বেশি এবং প্রেমের জন্য ৯৬টি শব্দ উল্লেখযোগ্য। এই কারণে বৈদিক শব্দভান্ডারের সম্ভাব্য পরিসর কোটিকোটি রূপে বিস্তৃত বলে ধরা হয়।
ওয়েবস্টারের বৃহৎ ইংরেজি অভিধানে প্রায় ৪০,০০০টি শব্দ সংস্কৃত-জাত বলে উল্লেখ আছে। নিরুক্তকার য়াস্ক প্রায় ৪০০ বৈদিক শব্দের অর্থ তার অজানা বলে স্বীকার করেছেন। এক প্রাচীন কাহিনি অনুসারে, বৃহস্পতি দেবরাজ ইন্দ্রকে শত মানববর্ষ ধরে বৈদিক শব্দ শিখিয়েও কেবলমাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশই শেখাতে পেরেছিলেন। বৃহস্পতি ইন্দ্রকে পরামর্শ দেন, বিষ্ণুর ধ্যানে মগ্ন হয়ে গায়ত্রী–মন্ত্রের মাধ্যমে চেতনাকে উচ্চস্তরে উত্তীর্ণ করলে ধ্বনি ও অর্থের সম্পর্ক স্বতঃসিদ্ধ উপলব্ধ হবে।
পাণিনির ব্যাকরণ-প্রণয়নের পূর্বে ভারতে ইন্দ্র-ব্যাকরণ প্রচলিত ছিল। বেদ মূলত মন্ত্র বা ছন্দ নয়, এবং প্রাচীনকালে লিখিতও ছিল না। বেদ হলো শব্দ, নিত্য ধ্বনি, মহাবিশ্বের প্রাণশ্বাস। ঋষিরা এই অনাদিকালীন ধ্বনিকে রূপ দিয়েছেন বৈদিক সংহিতার মাধ্যমে, যেখানে শব্দ, ধাতু, পদ, ক্রিয়া, ছন্দ ও ব্যাকরণ পরিপূর্ণভাবে সংগঠিত। ঐতিহ্যমতে, ঋগ্বেদের দ্বারা ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন দৃশ্যমান বিশ্ব, যজুর্বেদে প্রতিষ্ঠা করেন কর্মব্যবস্থা, অথর্ববেদে জ্ঞানতন্ত্র, এবং সামবেদের সহায়তায় তিনি প্রত্যাবর্তন করেন সৃষ্টির-পূর্ব চৈতন্যাবস্থায়, যা শিবম্ নামে পরিচিত।
