বাংলাদেশি ভাষা

Bangladeshi-Bhasha. বাংলাদেশি ভাষা

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

যখন আমরা বাংলাদেশের ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা আসলে প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ডের স্থানীয় কোনো একটি উপভাষা বা আঞ্চলিক রীতিকে বোঝাই। এটি পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড বাংলা (মানক বাংলা) ভাষা, যা গৌড়ীয় ভাষারীতি হিসেবে পরিচিত, তার থেকে ভিন্ন। “বাংলাদেশি ভাষা” বলতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা—চিটাগাংর (চিটাগাংয়ের) ভাষা—বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যদি কারও পিতার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে আর মাতার বাড়ি পুরান ঢাকায় হয়, তবে তিনি এই দুই ধরনের বাংলাদেশি ভাষাই জানবেন। এমনকি কক্সবাজারি ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভাষার মধ্যেও আলাদা ধাঁচ রয়েছে।

চিটাগাংয়ের ভাষা চিটাগাংবাসীর কাছে এক অত্যন্ত প্রিয় ভাষা। যেমন তারা গর্ব করে বলে—“ওয়া বদ্দা আঁরার চট্টগ্রামর ভাষা অইলদি বিশ্বের ৭২তম ভাষা আঁরার ভাষা ন বুঝিবের হনো হারন নাই, আর বাংলা ভাষা চট্টগ্রাম ত আই হনে বতে নিহত ন অইয়ো। এগিন বেয়াগ্গুন মিচে হতা হইতে লাইগ্গুনদে অনেরা আঁরা চিটাংগে অক্কল বেশি মায়া পুরেল্লে বেয়াগেরে সহজে আপন গড়ি নিত পারি।” মিরসরাই অঞ্চলে “তুমি কেমন আছো” বলা হয় “তুইঁ কেইচ্ছা আছো।” খাঁটি চিটাগাংয়ের ভাষা কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী, চকোরিয়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচলিত।

বাংলাদেশি ভাষার উৎস দেশের নানা অঞ্চলে বিস্তৃত—কুমিল্লা, নোয়াখালী, বরিশাল, সিলেট—প্রত্যেকের ভাষায় নিজস্ব বৈচিত্র রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী দেশে একটি মানক বাংলা রূপ থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশি ভাষাগুলোই তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে প্রভাবশালী। তাই সহজেই বোঝা যায় কারও মুখে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা নাকি বাংলাদেশি আঞ্চলিক রীতি। এখানে আমরা ‘দেশি’ ধাঁচের ওপর গুরুত্ব দিই, যা স্থানীয় ভাষার পরিচায়ক।

সিলেটের ভাষা বাংলাদেশের আর কোনো অঞ্চলের মতো নয়; এর নিজস্ব ভাষা নাগরি ভাষা নামে পরিচিত, যা বাংলা ভাষা থেকে ভিন্ন বর্ণমালাও ধারণ করে। সিলেটে সবাই সিলেটি, এবং তারা গর্বের সঙ্গে বলে—“আমরা অইলাম সিলেটর মানুষ, এল্লাগি আমি বেশি খুশি আইও, আমরার সিলেটর ছা খাওয়াত দেখবায়নে, কিলা মনর মত মজা লাগে, একবার খাইলে বেজান খাইতে খইবায়, টিক কইছি না।”

কেউ গর্ব করে বলে—“সিলেটি ভাষা অইলো আমার সব তাকি প্রিয় ভাষা, আমি সিলেটি ভাষায় মাততাম ফারি, আমার যে বালা লাগে।” আবার অন্য কেউ বলে—“জ্বি ওয় ভাইসাব, ইকান আমরার সিলেটি মাত, আমরার সিলেটি ওখলোর মাঝে অনেক আন্তরিকতা আছে, আর সিলেট আইলে অনেক সেবা ফাইবা।” এমনকি আন্তরিক আমন্ত্রণের ভাষাও আলাদা—“আমরা বাড়ী ও আইও, হাগ এর কচু খাওয়ামু, খাইলা কালি কইবায় আর খাইতায়, কোনদিন আইবায় কউচাইন।” সিলেটি আতিথেয়তায় থাকে বিশেষত্ব—“আইইয়ককা হোকলোর দাওয়াত হুটকির শাটনি দিয়া ভাত কাইবা, এরপরে হকলোরে হাতকরা দিয়া আর টেংগা বর্তা বানাইয়া কায়াইমুনে, আমরা হক্কল সিলেটি।”

নাটোর জেলার লালপুর থানার ভাষা অত্যন্ত মধুর, আবার কেউ কেউ বলে নোয়াখাইল্যা ভাষা সবচেয়ে মিষ্টি। ময়মনসিংহের ভাষা এক ধরণের ক্লাসিক সুরে ভরা, নোয়াখালী-চট্টগ্রামের ভাষায় আছে একধরনের লবণাক্ত স্বাদ। সিলেটি ভাষা শুনতে আলাদা আনন্দ দেয়—“কিতা মাত মাথরে হুরি।”

পঞ্চগড় জেলার আঞ্চলিক ভাষা, বিশেষ করে বোদা উপজেলার ভাষা, আরেকটি বাংলাদেশি ভাষা—“মুই কহচু হামার পঞ্চগড় এর ভাষা লা জোস ভাইয়া।” নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও ঢাকার কিছু অংশে এক ধরনের ভাষা প্রচলিত, যা মানিকগঞ্জ ও দক্ষিণ টাঙ্গাইলের ভাষার সঙ্গেও মিলে। শরীয়তপুরের ভাষার সঙ্গে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রতিটিরই নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে—যশোরের ভাষা (সবডি বলে যশোর এর ভাষা শুদ্ধ), রংপুরের ভাষা, দিনাজপুরের ভাষা, রাজশাহী ও নওগাঁর ভাষা, খুলনা অঞ্চলের ভাষা, নীলফামারীর ভাষা, নড়াইল, কুমিল্লা, বগুড়ার ভাষা, নোয়াখালীর ভাষা (“আংগো নোয়াখালীর ভাষা কতো সুন্দর, নোয়াখালীর হিসেবে অ্যাই গর্ব বোধ করি”), টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের ভাষা, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, খুলনা বিভাগের ভাষা, নাটোর, বরিশাল (বরিশাইল্লা>“তুমি মোগো বরিশাল একদিন আইও”), ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহের মহেশপুর কোটচাঁদপুর এর ভাষা—সবাই তাদের ভাষায় গর্ব করে। ঠাকুরগাঁওয়ের ভাষাটার মধ্যে কেমন যেন একটা আপন-আপন ভাব আছে।

বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র মেহেরপুর জেলাতেই শুদ্ধ বাংলাভাষায় কথা বলা হয়, আর ভারতের মধ্যে একমাত্র নদীয়া জেলায় শুদ্ধ বাংলা প্রচলিত। বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে নদীয়া জেলাতেই। দেশভাগের সময় আন্তর্জাতিক সীমানা নদীয়া জেলার উপর দিয়েই নির্ধারিত হয়েছিল। নদীয়া জেলায় একসময় পাঁচটি মহকুমা ছিল, যার মধ্যে গাংনী ও মেহেরপুর বাংলাদেশে পড়ে। যশোর অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অংশ ছিল, পূর্ববঙ্গের নয়। তাই যশোরের ভাষার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট ও বনগাঁ অঞ্চলের ভাষার মিল আছে। বৃহত্তর যশোরের ভাষাকে ধরা হয় সবথেকে শুদ্ধ—বৃহত্তর যশোর মানে যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর। রামরাম বসুর ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ গ্রন্থ পড়লেই বোঝা যায় সেই সময় যশোর অঞ্চলের অভিজাত সমাজের ভাষা কেমন ছিল—

“একদিন রাজার এক সহিলি পলায়ন করিয়া কোথায় ছিল, তাহার ঠেকানা ছিল না। পরে চৌকিতে ধরা পড়িল। রাজা তাহার নষ্ট ক্কয়ার সাজা নিমিত্তে দুইস্তন কাটিয়া ফেলিল। ছুকরী স্তন কাটা জ্বালাতে নিতান্ত কাতর হইয়া প্রাণত্যাগ করিতে করিতে বলিল, রাজা আমাকে বৃহত্ জন্ত্রনা দিয়া নষ্ট করিলা কিন্তু তোমার সর্ব্বনাশ হওনের সময় উপস্থিত জানিও। তাহারও আর বিস্তর কাল অপিক্ষা নাই। ত্বরাই সংহার হইব। এই কহিতেই প্রাণত্যাগ করিল।”

খুলনার ভাষায় “খেতে যাবো” হয় “খাতি যাবো”, “টাকা” হয় “টাহা”, “ভাই” হয় “ভাইডি”, “বোন” হয় “বুন্ডি”, “বলছো” হয় “কচ্ছিস”, “মুখ” হয় “মুহি”, “দৌড়” হয় “দোড়োয়”, “বিদায়” হয় “খেদায়”, “দারুন” হয় “বিদিক”, “পুচ্ছ/পাছা” হয় “পুংগা”, “করছে” হয় “করতিছে” বা “এরতিছে” বা “এত্তিছে”, “খোজ” হয় “বাত্তা”, “দিব” হয় “দিবানি”, “খাবো” হয় “খাবানি”, “পাবো” হয় “পাবানি”, “খাবোনা” হয় “খাবোনানে”, “দিবোনা” হয় “দেবোনানে”, “এরকম” হয় “এইরাম”, “সেরকম” হয় “সেইরাম”, “বুঝছো” হয় “বুজিছো?”, “গভীর রাত” হয় “বিয়ান রাত্তির”, “কে” হয় “কিডা”, “খুব” হয় “জম্মের”, “মাখানো” হয় “মাহানো”, “কোথা থেকে” হয় “কুয়ান্তে”।

কিছু দৈনন্দিন বাক্যের উদাহরণ—“খবর নে” হয় “বাত্তা ন”, “মুরগি” হয় “কুড়ো”, “চিনি দিয়ে মাখায় খা” হয় “চেনি দিইয়ে তারফর মাইহে খাইসকেনে”, “শুনে যা” হয় “এ এহেনে” বা “এবোই আয়, শুইনে যা”, “কোথায় যাও” হয় “এ কুয়ানে যাচ্চিস?”, “পায়খানা চেপেছে” হয় “আগা চাপিছে”, “বর” হয় “ভাতার”, “প্রেমিক” হয় “নাং” বা “লাং”, “পুত্রবধূ” হয় “পুতিরবৌ”, “জামাই” হয় “জামই”, “গেছিলে” হয় “গেইলে” বা “গিলে”, “গেছিলাম” হয় “গেইলাম” বা “গিলাম”, “এসেছো” হয় “আইছো”, “এসেছিলে” হয় “আইলে”, “কখন” হয় “কহন”, “আহ্লাদ” হয় “ছিনাল”, “আহ্লাদীপনা” হয় “ছিনাইলেপানা”, “ভাল লেগেছিলো” হয় “ভাল্ ঠেয়িলো”, “স্কুল” হয় “ইস্কুল”, “ভার্সিটি” হয় “ভাস্সিটি”, “তুই একটা অসহ্য” হয় “তুই এট্টা কাটাকলা”, “মারবো কিন্তু” হয় “ভালো মোতো দিবানি কলাম”, “চুপ কর” হয় “চুবো”, “চুপ করো তো” হয় “চুবোওদিনি”, “দিব” হয় “দিবানে”, “খাবো” হয় “খাবানে”, “হইছে” হয় “হচ্ছে”, “বলছে” হয় “কচ্চে”, “খাইছে” হয় “খাচ্ছে”, “কোথায় যাইস” হয় “কোনায় যাচ্চিস”, “কি করো” হয় “কি করতিছিস”, “ভালো আছো” হয় “ভালো আচিস?”, “কে” হয় “কিডা”, “কোথায়” হয় “কনে”, “বারান্দা” হয় “হ্যাতনে” বা “হাইত্নে”, “তাড়িয়ে” হয় “খ্যাদায়”, “সিঁড়ি” হয় “পোটে”, “মুরগী” হয় “কুড়ো”, “সুপারি” হয় “গুয়ো”, “টক” হয় “চুপো”, আর “গালি” হয় “কাজানো”।

প্রতিটি ভাষার স্বাদ আলাদা, উচ্চারণের ধরণ আলাদা, এবং প্রতিটির পেছনে আছে স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গে ‘ঘটি’ র বাংলা উচ্চারণ অনেক সময় বাংলাদেশি বাঙাল’দের (ঢাকার বাংলা ভাষা > বাঙাল ভাষা) চেয়েও শুদ্ধ শোনায়। কিন্তু বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষার এই বহুমুখী বৈচিত্র দেশের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ—প্রতিটি জেলার আঞ্চলিক ভাষা মিলে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের এক অনন্য ভাষিক মানচিত্র, যা শুধু মরমস্পর্শী ভাষা নয়, মানুষের মাটির গন্ধ ও সাংস্কৃতিক সত্তার প্রতিফলন।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল