বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ব
বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ বলিলে, যে ব্যাকরণের সাহায্যে এই ভাষার স্বরূপটি সব দিক দিয়া আলোচনা (বিশ্লেষণ) করিয়া বুঝিতে পারা যায়, এবং শুদ্ধরূপে (অর্থাৎ ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজে যে রূপ প্রচলিত সেই রূপে) ইহা পড়িতে ও লিখিতে ও ইহাতে বাক্যালাপ করিতে পারা যায়, সেইরূপ ব্যাকরণ বুঝায়। (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯৪২)। ভাষা-প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ,কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।)
যখনই আমরা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (বা গৌড়ীয় ব্যাকারণ) নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা এক ধরনের মান্য গঠনকাঠামো মেনে নিই। আমাদের বঙ্গীয় উপভাষা বিষয়ক প্রবন্ধে আমরা দেখেছি যে বাংলার একাধিক উপভাষা প্রচলিত আছে। চর্যাপদকে বাংলা বলা চলে না, তাই আমরা চর্যাপদের আলোচনায় আগ্রহী নই। আমাদের কাছে বাংলা ভাষার মান্য রূপ (আদর্শ) প্রতিষ্ঠা পেয়েছে চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে, এবং আমরা এই অবস্থান গ্রহণ করি যে আধুনিক বাংলা ভাষার সূচনা হয়েছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম থেকে। চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষার ব্যাকরণ বর্তমানকালের বাংলা ভাষার মতোই পরিশীলিত ও যথাযথ।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে, বাংলা ভাষা দুটি ভাগে বিভক্ত—সাধু ও চলিত। এটাই বাংলা ভাষার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এমন নয় যে সাধু ভাষা কখনো বাজারের ভাষা ছিল না। বাস্তবিক অর্থে চলিত ভাষার উৎপত্তি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের আগেই। ১৭৫০ খ্রি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এবং তাঁর সভাসদরা কৃষ্ণনগর ও কলকাতা অঞ্চলে চলিত ধাঁচের এক প্রকার বাংলা ভাষাতেই কথা বলতেন। এমনকি ১৬০০ খ্রি গোবিন্দপুর হাটে চলিত বাংলা প্রচলিত ছিল।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সময়ে এসে চলিত ভাষা একটি বহুল ব্যবহৃত ধাঁচে পরিণত হয় এবং এক ধরনের বাঁধাধরা আকার ধারণ করে। তাই বাংলা ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন বিশ্লেষণ করতে গেলে সাধু ও চলিত এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করাই যুক্তিযুক্ত।
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ গ্রন্থ বাংলা ব্যাকরণ গঠনের ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সহায়ক উৎস। আমাদের বাংলা ভাষার ব্যাকরণ গৌড়ীয় ব্যাকারণ থেকে একটু আলাদা হলে ভালো হতো।
ভাষার উৎপত্তি যেখান থেকেই হোক না কেন, ভাষা কখনোই স্থির থাকে না—তা সর্বদা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই চলে। ভাষা আসলে “উন্নত” হয় না, পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নতুন রূপ ধারণ করে। সংস্কৃত ভাষার বেলায় এই পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত ধীর। পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ যে সংস্কৃত ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে, তা পাণিনির জন্মের অন্তত এক হাজার বছর আগেকার সংস্কৃত ভাষাকে ধারণ করে এবং সেই একই ব্যাকরণ আজও আধুনিক সংস্কৃত ভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তবে আধুনিক সংস্কৃত মানে এটা নয় যে সেটা হিব্রু বা সরলীকৃত মান্দারিন চীনা ভাষার মতো কোন নতুন সংস্করণ। এক অর্থে সংস্কৃত ভাষা (ব্যাকরণ) এক ধরণের স্থির ভাষা, যার রয়েছে বিশাল প্রাচীন শব্দভাণ্ডার।
সংস্কৃত সকল ভাষার জননী , তারপরও বাংলা ব্যাকরণ তার অনুকরণে গঠিত হতে পারে না। বরং বাংলা ভাষা তার নিজস্ব কাঠামো ও ইতিহাসকে মেনে চলতে বাধ্য। ভাষার উপর বহিরাগত আগ্রাসন বা অনুপ্রবেশকে সব সময় জায়গা দেওয়া যায় না। ‘জল’ শব্দের পরিবর্তে ‘পানি’ বললে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সেই স্থানান্তর যদি ব্যাকরণের কাঠামোকে প্রসারিত করে ফেলে এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
সাহিত্যে আমরা যে-ভাষা ব্যবহার করি ক্রমে ক্রমে তার একটা বিশিষ্টতা দাঁড়াইয়া যায়। তার প্রধান কারণ সাহিত্যে আমাদিগকে সম্পূর্ণ করিয়া চিন্তা করিতে এবং তাহা সম্পূর্ণ করিয়া ব্যক্ত করিতে হয়, আমাদিগকে গভীর করিয়া অনুভব করিতে এবং তাহা সরস করিয়া প্রকাশ করিতে হয়। অর্থাৎ সাহিত্যের ক্ষেত্র প্রধানত নিত্যতার ক্ষেত্র। অতএব এই উদ্দেশ্যে ভাষাকে বাছিতে সাজাইতে এবং বাজাইতে হয়। এইজন্যই স্বভাবতই সাহিত্যের ভাষা মুখের ভাষার চেয়ে বিস্তীর্ণ এবং বিশিষ্ট হইয়া থাকে। (ভাষার কথা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1909)

আমরা ব্যাকরণ পড়ি কেন—এই প্রশ্নটা খুব বড়, কারণ ভাষা তো সবসময়ই বদলাচ্ছে। আসলে ভাষা যদি চলমান থাকে, তবেই সে জীবিত; না হলে সেটা মৃত ভাষা। যাদের মাতৃভাষা বাংলা, তারা তো বাংলা বা গৌড়ীয় ব্যাকরণ না পড়েই দিব্যি কথা বলছে, রোজগার করছে, জীবন কাটাচ্ছে—তাদের জন্য আলাদা করে কিছু শেখার প্রয়োজনই পড়ে না। কিন্তু বিদেশিদের বাংলা ভাষা শিখতে হলে ব্যাকরণ দরকার হয়, কারণ তারা তো স্বাভাবিকভাবে ভাষাটায় অভ্যস্ত নয়।
আবার আমরা যখন বাংলা ব্যাকরণ লিখি, সেটা হয় বিদেশিদের জন্য, নয়তো বাংলা ভাষাকে একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা—যাতে ভাষাটা বদলাতে না পারে। কিন্তু ভাষা যদি বদলাতেই না পারে, তবে তো সে মৃত হয়ে যায়। যেমন ধরো, আমেরিকানরা তাদের ইংরেজি ভাষাকে বদলে ফেলেছে। ১৬০৪ সালে ভার্জিনিয়ায় যখন তাদের প্রথম উপনিবেশ গড়ে ওঠে, তখন তারা ব্রিটিশ উপভাষায় কথা বলত, ব্রিটিশ বানান আর সিনট্যাক্স অনুসরণ করত। অথচ আজ, ২০২৫ সালে, তারা একেবারে আলাদা ইংরেজি বলে আর লেখে—ব্রিটিশদের থেকে একেবারে ভিন্ন।
বাংলাতেও একই ব্যাপার। যখন আমরা সাধু ভাষা বলি, তখন সেটা আসলে একটা স্ট্যান্ডার্ডাইজড বা বাঁধা ভাষা, যার ব্যাকরণ আলাদা। আর এখন বাজারে যে চলিত ভাষা চলে, সেটাই আস্তে আস্তে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা হয়ে উঠেছে। এখন কেউ সাধু ভাষায় লেখে না বললেই চলে, সেটা পুরোনো ফ্যাশন হয়ে গেছে। আরও একশো বছর পর এই চলিত ভাষাটাও বদলে যাবে, তখন নতুন ব্যাকরণ লাগবে।
পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ যেটা করছে, সেটা হলো একটা মিশ্র ব্যাকরণ চালু করা—যেখানে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের গৌড়ীয় (সাধু) ভাষা আর চলিত ভাষার একটা সংমিশ্রণ। এটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের ভাষার রূপকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরে রাখা—যাতে পড়ানো যায়, শেখানো যায়। কিন্তু বাস্তব ভাষা তো সবসময়ই গতি পরিবর্তন করে, এবং সেটাই তার প্রাণচিহ্ন।
