বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও ধর্মীয় বিতর্কের সমন্বয়ে এক প্রাচীন তীর্থস্থান
নবদ্বীপ (নতুন দ্বীপ) বাংলার ইতিহাসে এক অত্যন্ত প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শহর। পুরাতন সিংহলী ইতিহাস মহাবংশে (খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী) নবদ্বীপের উল্লেখ আছে। এর নাম ও খ্যাতি শুধু বঙ্গদেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতবর্ষে। নবদ্বীপের উত্তর দিকে আমরা বল্লাল ঢিপি (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) দেখতে পাই। বল্লাল সেন রাজ্যকে পাঁচটি রাজস্ব জেলায় বিভক্ত করেছিলেন, মিথিলা, রাড়, বরেন্দ্র, বাগরী এবং বঙ্গ। তিনি নবদ্বীপ এবং বিক্রমপুরে (বর্তমান ঢাকা) বিকল্পভাবে বসবাস করতেন। নবদ্বীপ ছিল তার প্রধান রাজধানী এবং বিক্রম পুর ছিল গৌণ রাজধানী।
নবদ্বীপে থাকাকালীন বল্লাল এক ডোম্বিনী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, যদিও তিনি ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণ্যবাদ বজায় রাখার জন্য দানসাগর নামে একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। লক্ষ্মণ সেনের সময়ে বখতিয়ার খিলজি ১২০৩ সালে নবদ্বীপ দখল করেন।
তবে এই শহরের পত্তন পাল যুগের পূর্বে ঘটে বলে অনেকে অনুমান করেন। ১৬৮৩ থেকে ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজা রুদ্র রায় নবদ্বীপে (পোড়ামা তলা) গৌরীপট্ট সমন্বিত ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির প্রথম শিব মূর্তিটি স্থাপন করেছিলেন। তবে নবদ্বীপের আসল খ্যাতির সময়কাল ছিল সেন যুগ (১১০০–১২০০ খ্রিস্টাব্দ)। এই সময় নবদ্বীপ হয়ে ওঠে বাঙালির বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রস্থল—যেখানে স্থাপিত হয় বহু বিখ্যাত টোল ও বিদ্যালয়। এমনই জ্ঞানবৃক্ষের পল্লবিত পরিবেশে, নবদ্বীপ অর্জন করে এক গৌরবময় খ্যাতি—“প্রাচ্যের অক্সফোর্ড”। আধুনিক বাংলা (১৪৮৬-১৯৪১) এখানেই রূপ লাভ করেছিল।
চতুৰ্দ্দিগ হৈতে লোক নবদ্বীপে যায়।
নবদ্বীপে পড়িলে সে বিদ্যারস পায়॥
চাটীগ্রামনিবাসীও অনেক তথায়।
পড়েন বৈষ্ণব সব রহেন গঙ্গায় (শ্রীচৈতন্যভাগবত)
নবদ্বীপ, গৌড়-বঙ্গের অন্যতম প্রাচীন এবং বিদ্বৎসমৃদ্ধ জনপদ, যেখানে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাসুদেব সার্বভৌম নামক এক খ্যাতনামা নব্যন্যায় পণ্ডিত একটি বটবৃক্ষতলে দক্ষিণাকালীর ঘট স্থাপন করেন। ধর্মীয় এই স্থাপনাটি ছিল আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র, এবং এটি ছিল একাধারে বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রও। এই স্থানেই বাসুদেব সার্বভৌম প্রথমবারের মতো একটি চতুষ্পাঠী প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে নব্যন্যায় শিক্ষার সূচনা ঘটে। এই চতুষ্পাঠী নবদ্বীপে নব্যন্যায়চর্চার একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
কালের পরিক্রমায় বটবৃক্ষটি অগ্নিদগ্ধ হলে, সেখানে পূজিতা কালীদেবী এক বিশেষ রূপে পরিচিতি লাভ করেন – ‘পোড়ামা’ বা ‘বিদগ্ধজননী’ নামে। এই নাম নবদ্বীপের মানুষের মধ্যে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এই ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় নবদ্বীপের ‘পোড়ামাতলা মন্দির’, যা আজও শহরের একটি আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল হিসেবে গণ্য হয়।
পোড়ামাতলা মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন বিশিষ্ট সাধকশিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য। বাংলার আধুনিক গানের ইতিহাসে যিনি এক মগ্ন ভাবুক শিল্পী হিসেবে পরিচিত। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এবং পিতৃব্য ছিলেন পার্বতীচরণ ভাদুড়ী, যিনি মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের পিতা ছিলেন। এই পারিবারিক সূত্রে নবদ্বীপের বিদ্যাচর্চা, সাধনাভিত্তিক জীবন ও সাহিত্যসংস্কৃতির এক অসাধারণ সংমিশ্রণ প্রতিফলিত হয়।
নবদ্বীপ শহরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ছিল মায়াপুর গ্রাম। কিন্তু ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ (অন্যান্য মতে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে) গঙ্গার গতিপথে ঘটে যায় এক নাটকীয় পরিবর্তন। প্রাচীন পুঁথি ও ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন (যেমন পূর্বস্থলীর অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ) প্রমাণ করে যে, একসময় গঙ্গা নদী নবদ্বীপ শহরের পশ্চিমদিক দিয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু ভূমিকম্প ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে গঙ্গা তার পথ পরিবর্তন করে কৃষ্ণনগরের নিকটস্থ জলঙ্গি নদীর সঙ্গে মিশে যায়। এর ফলে মায়াপুর গ্রামটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়—একটি পূর্বপারের গ্রাম নব্য মায়াপুর, অপরটি পশ্চিমপারের আদি মায়াপুর। এই আদি মায়াপুরেই অবস্থিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান, যা ঐতিহাসিকভাবে নবদ্বীপ শহরের সন্নিহিত অঞ্চল বলে বিবেচিত।
কিন্তু এখানেই জন্ম নেয় এক দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক। নবদ্বীপ এবং মায়াপুর—উভয় স্থানই শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান হিসেবে দাবি করে এসেছে বিভিন্ন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়। বিশেষ করে, আধুনিক যুগে প্রতিষ্ঠিত ইসকন (ISKCON), তাদের মূল দপ্তর স্থাপন করেছে মায়াপুরে, এবং তারা ধারাবাহিকভাবে প্রচার করে আসছে যে, শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থল মায়াপুরেই। তাদের এই অবস্থানের প্রতিবাদে, গৌড়ীয় মঠের ৬৪টি শাখা বরাবরই নবদ্বীপকেই শ্রীচৈতন্যের প্রকৃত জন্মস্থান হিসেবে মেনে আসছে। তাঁদের মতে, ইসকনের “মায়াপুর” বলে চিহ্নিত স্থানটি আসলে নব্য মায়াপুর, যা নবদ্বীপের মূল ঐতিহাসিক শহরভাগ থেকে গঙ্গা দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে মাত্র আধুনিক ভূগোলের কারণে।
এই বিতর্ক শুধুমাত্র ভূগোল বা ইতিহাসের নিরিখে সীমাবদ্ধ নয়—এটি ধর্মীয় অনুভব, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিপত্তির প্রশ্নে এক গভীর মতানৈক্যের প্রতিফলন। স্থানবিশেষে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের নিকট নবদ্বীপ একটি আধ্যাত্মিক তীর্থ, যেখানে মহাপ্রভুর আত্মপ্রকাশ ও মহাসংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল।
তবে যা-ই হোক, নবদ্বীপ ও মায়াপুর উভয়ই যুগ যুগ ধরে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রাণকেন্দ্র, আর দুই পক্ষের এই স্থান-সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও ভক্তির অনুভব এক জটিল বিন্যাস সৃষ্টি করেছে। ইতিহাসের আলোয় একে বিশ্লেষণ করা গেলেও, আস্তিক দর্শনে এই দ্বন্দ্ব কখনও সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হয় না—কারণ, প্রতিটি পক্ষ তাদের প্রাপ্ত ঐতিহ্যকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে ভাবতে চায়।
কারো জন্ম নবদ্বীপে, কারো চট্টগ্রামে।
কেহো রাঢ়ে, উড্রদেশে, শ্রীহট্টে পশ্চিমে।।
নানাস্থানে অবতীর্ণ হৈলা ভক্তগণ।
নবদ্বীপে আসি হৈল সভার মিলন।। চৈ.ভা. ১০
উৎসসমূহ:
- Dinesh Chandra Sen, History of Bengali Language and Literature, University of Calcutta Press, 1911.
- Sukumar Sen, Bangala Sahityer Itihas, vol. 1, Kolkata University Press, 1959.
- Bimal Krishna Matilal, The Navadvip Traditions, Jadavpur University Archives, 1983.
- Bhaktivinoda Thakur, Navadvipa Dham Mahatmya, (Late 19th century ISKCON reference text).
- Geological Survey of India Reports on Nadia District (regarding Ganga river changes).
- তন্ময় ভট্টাচার্য, চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়ে নবদ্বীপ ও নদিয়া জেলার বাংলা ভাষা
- তন্ময় ভট্টাচার্য, বাংলার ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস এবং বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি
- তন্ময় ভট্টাচার্য, চৈতন্য-পূর্ব গৌড়বঙ্গের বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিকগণ
- Phanibhusan Dutta, Nabadwip-mahima Ed. 2 Vol. 1 And 2
