বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
অথ শব্দানুশাসন (গৌড়ীয় ভাষাতে)। এখন “শব্দানুশাসন” নামক শাস্ত্রটি যেটি নির্দিষ্টভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন — লৌকিক (সাধারণ মানুষের কথ্যভাষা) ও বৈদিক (জ্ঞানময় সাধু ভাষা) উভয়েরই। তবে শব্দ কাকে বলে? — যার উচ্চারণে সাস্না, লাঙ্গূল, ককুদ, খুর ও বিষাণযুক্ত জীবের বিষয়ে প্রত্যয় (নিশ্চিত জ্ঞান) জন্মে, সেটিই শব্দ। এখানে শব্দকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে যে ধ্বনি অর্থ জাগায় — এই দৃষ্টিকোণ থেকে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি “গৌঃ” (গরু) শব্দটি উচ্চারণ করে, আর শ্রোতার মনে সাথে সাথে শিং, খুর, লেজওয়ালা এক প্রাণীর চিত্র জেগে ওঠে — সেটিই “শব্দ”। “শব্দানুশাসন” বলতে বোঝানো হয়েছে শব্দ-সংক্রান্ত শাস্ত্রের নিয়মশৃঙ্খলা । এখানে শাস্ত্র মানে শুধু ব্যাকরণ নয়, বরং এমন সমস্ত বিধান যা শব্দের প্রকৃতি, ব্যবহার ও প্রয়োগ নিয়ে শাস্ত্রীয় দিক থেকে আলোচনা করে। ব্যাকরণ কেবল আচার্যদের বেদাধ্যয়নের জন্য নয়, সাধারণ ব্যবহার্য ভাষাকেও নিয়মে আনতে চায়।
শব্দশাস্ত্র অসীম। বাংলা শব্দ (বঙ্গ ভাষা/গৌড়ীয় ভাষাতে) সেইসব শব্দ, যা সেই মানুষরা ব্যবহার করেন, যারা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দেন। একটি শব্দের ধ্বনি অর্থের সঙ্গে যুক্ত থাকে, বাঙালিরা সেই অর্থ তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে বোঝেন এবং বিষয় সংরক্ষণের জন্য সেই শব্দ-অর্থকে লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ করেন। মনের ভাবের সঙ্গে মিশে শব্দাবলি বাক্য রচনা করে। সেই বাক্যের প্রয়োগ বিশ্লেষণকেই ব্যাকরণ বলা হয়। বাঙালি শব্দভাণ্ডারকে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়—সার্থক শব্দ, অর্থাৎ যার নির্দিষ্ট অর্থ আছে এবং বাক্যে ব্যবহারযোগ্য, দুষ্ট শব্দ বা বিকৃত শব্দ, এবং অনর্থক শব্দ, অর্থাৎ বাঙালির কাছে যার কোনো অর্থ নেই এমন শব্দ বা ধ্বনি। সার্থক শব্দ আবার বিভক্ত হয় বৈদিক-সংস্কৃত শব্দ, বৈদিক-সংস্কৃতজাত শব্দ, প্রাকৃত-অপভ্রংশ-অবহট্ট-দেশজ শব্দ, বৈদেশিক শব্দ এবং ধ্বন্যমূলক শব্দে। বাংলাদেশি ভাষার (স্থানীয়) শব্দাবলি প্রাকৃত-অবহট্টের ভিতরে সমাহিত । বৈদিক-সংস্কৃতজাত শব্দ সাধু ভাষায় অধিক ব্যবহৃত হয় ।
দেশজ শব্দ আবার চার ভাগে বিভক্ত—অঙ্গজ (বিহার/বিহারি), বঙ্গজ (গৌড়, রাঢ়ী, বারেন্দ্রী, কোচ-কামরূপী), কলিঙ্গজ এবং পূর্বজ (বাংলাদেশী, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনা, ইত্যাদি ক্ষেত্রজ)। বর্তমানে বাংলা ভাষা সংসদীয় ও অসংসদীয় শব্দভাণ্ডারে বিভক্ত। সংসদীয় শব্দসমষ্টি অনুমোদিত হয় আইনগত আলাপচারিতা, সংবিধানের বাংলা অনুবাদ ও অন্যান্য আইনি নথি প্রণয়নের জন্য। অসংসদীয় শব্দসমষ্টি অশোভ্য বা অশালীন বলে গণ্য হয়। বঙ্গদেশের অন্যতম অধিবাসী কোল, ভিল, মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতির ভাষা থেকে যে সমস্ত শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলিও দেশজ (দেশি) শব্দের অন্তর্ভুক্ত। দেশজ শব্দ সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, মানভূমি, পিশাচ, ভূত, চট্ট (চট্টল) ভাষা—যে উৎস থেকেই উদ্ভূত হোক না কেন, সবই বিশুদ্ধ। আবার শব্দকে মূল শব্দ ও যোগিক (যৌগিক) শব্দ—এই দুই ভাগেও বিভক্ত করা যায়। প্রাকৃত, অপভ্রংশ, মানভূমি, পিশাচ, ভূত, চট্ট (চট্টল) শব্দ চলিত ভাষায় অধিক ব্যবহৃত হয় ।
অঢেল, কচি, কুকুর, কুলা, কুলো, কোল, খুনসুটি/খুনসুড়ি, খেঁকশিয়াল, খোকা, গঞ্জ, গাড়ি, গোলাপ, ঘাড়, চাঁপা, চাল, চিংড়ি, চিড়া, চোঙ্গা, ছানা, ছিপি, ঝাঁকা, ঝাঁটা, ঝানু, ঝাল, ঝিঙা, ঝিঙে, ঝুল, ঝোল, টোপর, ডগমগ, ডাগর, ডাব, ডাহা, ডিঙা, ডোবা, ঢাল, ঢিল, ঢেঁকি, ঢেউ, ঢোল, তিন, তেঁতুল, তুড়ি, থোড়, দরমা, দাবা, দোকান, ধানাইপানাই, নাক, নালা, পাঁঠা, পেট, পয়লা, বাদুড়, বিচালি, বিটকেল, ভীম, মই, মা, মুড়কি, মরিচ, মুণ্ডা, মুড়ি, লদপদ, লাল,হলুদ, হেঁইয়ো, হাতুড়ি….
উল্লিখিত এই সমস্ত শব্দই বিশুদ্ধ, কারণ এগুলি আধুনিক ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব, প্রায়োগিক ভাষাতত্ত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক শাখার আলোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণযোগ্য। দেশজ শব্দ ও অন্যান্য শব্দসমূহকে আমরা বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করতে পারি—বিশেষ্য যেমন মেয়ে, বাড়ি, জল, ধারণা, সত্য; বিশেষণ যেমন ভালো, বড়, লাল, সুন্দর, আন্তরিক; ক্রিয়া যেমন খাওয়া, যাওয়া, বলা, বিশ্বাস করা, বোঝা; অব্যয় যেমন এবং, কিন্তু, অথবা, কারণ, তাই; অনুসর্গ যেমন মধ্যে, উপরে, নিচে, সঙ্গে, থেকে; পদাশ্রিত নির্দেশক (আর্টিকেল); সর্বনাম যেমন সে, তারা, আমরা, আমি; উপসর্গ; সমাস; সংমিশ্রণ; আদ্যক্ষর-শব্দ; অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক শব্দ; দ্বিত্ব বা পুনরাবৃত্তি; আদুরে নাম প্রভৃতি। এভাবে শব্দগঠন, ব্যবহার ও প্রয়োগের ভিত্তিতে বাংলা ভাষার দেশজ ও অন্যান্য শব্দভাণ্ডারকে সুনির্দিষ্টভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়।
