বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন | সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬)

THE ORIGIN AND DEVELOPMENT OF THE BENGALI LANGUAGE. Sahitya Samrat Journal. বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন

বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে প্রথম বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা গ্রন্থ। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এই কালজয়ী কাজে বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারের বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন (১৯২৬)
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

প্রস্তাবনা

১৯২১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় আমার ‘বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন’ বিষয়ক গবেষণাপত্রটি ‘ডক্টর অফ লিটারেচার’ ডিগ্রির জন্য গ্রহণ করে। বর্তমান গ্রন্থটি মূলত সেই গবেষণাপত্রেরই পুনর্লিখিত ও সংস্কৃত রূপ—কিছু অংশ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং নতুন তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে তা সম্প্রসারিতও করা হয়েছে।

আমার মাতৃভাষার ইতিহাস নিয়মিত অনুসন্ধানের ধারণাটি প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে বারো বছর আগে, যখন আমি কলকাতার আমার নিজ শহরে কলেজে এম.এ. পরীক্ষার জন্য ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করছিলাম—প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজি এবং ইংরেজি ভাষার ইতিহাস আমার বিশেষ বিষয় ছিল। ইংরেজিতে প্রয়োগ করা আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা পদ্ধতিগুলো আমাকে মুগ্ধ ও উদ্দীপ্ত করেছিল; এবং যেহেতু ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সমস্যা আমার নিজের ভাষার সাথেও যুক্ত, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার আগ্রহ সেই দিকে ঝুঁকে পড়ে। মরিস, স্কিট, সুইট, রাইট, জেসপারসেন, হেলফেনস্টাইন, ব্রুগম্যান—এবং ইন্দো-আর্য ভাষাতত্ত্বের মাস্টারদের যেমন ক্লেনবেক, ওয়াকারনাগেল, হুইটনি, পিশেল, বিমস, ভাণ্ডারকর, হোর্নলে ও গ্রিয়ারসন—সবাইকে আমি গভীরভাবে অধ্যয়ন করি এবং নিজেও ভাষার লিখিত ও কথিত রূপ পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি।

কয়েক বছর ধরে এলোমেলো পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ ও নোট নেওয়ার পর, ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য আমি ‘বাংলা ভাষার একটি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ব্যাকরণের রূপরেখা’ প্রস্তাব করি, যার একটি নমুনা হিসেবে ‘আধুনিক বাংলার ধ্বনিসমূহ’ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র জমা দিই। আমার প্রস্তাব ও গবেষণাপত্র বিচারকমণ্ডলী—মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও প্রয়াত অধ্যক্ষ রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী—অনুমোদন করেন। পরবর্তী বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবিলি গবেষণা পুরস্কারের জন্য ঘোষিত বিষয় ছিল ‘বাংলা উপভাষাসমূহের বিশেষ উল্লেখসহ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব’, যা আমাকে বাংলা উপভাষাসমূহের উপর আমার নোটগুলো গুছিয়ে তোলার সুযোগ দেয় এবং পুরস্কার জেতায় সহায়তা করে।

১৯১৯ সালে আমি ইউরোপে সংস্কৃতের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নের জন্য ভারত সরকারের ভাষাতাত্ত্বিক বৃত্তি লাভ করি। লন্ডন ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার তিন বছরের (১৯১৯-১৯২২) অবস্থান আমার গবেষণার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান প্রমাণিত হয়। লন্ডনে আমি ড. এল. ডি. বার্নেটের সাথে প্রাকৃত ভাষা পড়ি, ড. এফ. ডব্লিউ. থমাসের অধীনে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব অধ্যয়ন করি, এবং প্রফেসর ড্যানিয়েল জোন্সের কাছ থেকে ধ্বনিবিজ্ঞান শিখি। প্যারিসে, প্রফেসর আঁতোয়ান মেইয়ের মতো ভাষাবিদের সান্নিধ্যে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্বের বিভিন্ন শাখা নিয়ে কাজ করি এবং প্রফেসর জুল ব্লখের অধীনে সংস্কৃত ও অন্যান্য ইন্দো-আর্য ভাষাতত্ত্ব অধ্যয়ন করি।

এই গ্রন্থটি প্রণয়নে প্রফেসর জুল ব্লখের ‘ফর্মেশন দে লা ল্যাঙ্গু মারাথে’ বইটি আমাকে একটি আদর্শ মডেল দিয়েছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস রচনায় আমি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আধুনিক পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। যদিও অনেক বিষয় এখনও গবেষণার অপেক্ষায় রয়েছে—বিশেষ করে বাংলা উপভাষাসমূহের পদ্ধতিগত অধ্যয়ন এবং সম্পর্কিত ভাষাগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

ভারতে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কলেজের শিক্ষার্থীরা সংস্কৃত বা ইংরেজিতে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স পড়লেও, এটি ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। এছাড়াও, বাংলা ব্যাকরণ রচনায় সংস্কৃতের প্রভাব এতটাই প্রকট যে, প্রকৃত বাংলা রূপগুলিকে প্রায়শই ‘অশুদ্ধ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। প্রথম ঐতিহাসিক বাংলা ব্যাকরণ ও শব্দকোষ রচয়িতা রায় বাহাদুর যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধিও সংস্কৃতের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেননি।

এই বইটি রচনায় দুটি কাজ বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে—জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাংলা অভিধান এবং বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ কর্তৃক সম্পাদিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (মধ্য বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ)। এছাড়াও, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রও কাজে লেগেছে।

গ্রন্থটির মুদ্রণে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের সুপারিন্টেন্ডেন্ট বাবু অতুলচন্দ্র ঘটক, প্রধান সহকারী বাবু কালীপদ দাস এবং কম্পোজিটারদের কাছে কৃতজ্ঞ—যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই বিশাল কাজটি সম্ভব হয়েছে।

সূচি প্রস্তুত করতে আমার সহকর্মী বাবু সুকুমার সেন আমাকে অমূল্য সহায়তা প্রদান করেছেন।

এই বইটি যখন প্রকাশের জন্য প্রস্তুত, তখন সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো—স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর আমাদের মধ্যে নেই। বাংলা ভাষা ও ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধু জাতির জন্য নয়, আমার ব্যক্তিগত জীবনেরও এক অপূরণীয় ক্ষতি।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫ জুন, ১৯২৬


বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন

বাংলা অনুবাদ: তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)


THE ORIGIN AND DEVELOPMENT OF THE BENGALI LANGUAGE. Sahitya Samrat Journal. বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন

THE ORIGIN AND DEVELOPMENT OF THE BENGALI LANGUAGE

BY

SUNITI KUMAR CHATTERJI

M.A. (Calcutta), D.Lit. (London)

Khaira Professor of Indian Linguistics and Phonetics and Lecturer in English and Comparative Philology in the University of Calcutta

In Two Parts

Part I: Introduction, Phonology
Part II: Morphology, Bengali Index

CALCUTTA UNIVERSITY PRESS 1926



Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল