কৃষ্ণনগরের সামাজিক ইতিহাস এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ভূমিকা

মহারাজা ক্ষিতীশ চন্দ্র রায় বাহাদুর Sahitya Samrat Journal

কৃষ্ণনগরের উৎপত্তি

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কৃষ্ণনগর ছিল দক্ষিণবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শহর, যা দীর্ঘকাল ধরে বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শহরটির ইতিহাস মূলত কৃষ্ণনগরের রাজবংশ এবং তাদের শাসনব্যবস্থার চারপাশে গড়ে উঠেছে। কৃষ্ণনগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক কাঠামো এবং সংস্কৃতি আজও তার স্বকীয়তা বহন করে চলছে। প্রাক-আধুনিক বাংলায় কৃষ্ণনগরের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, এবং এটি কেবল একটি আঞ্চলিক রাজধানী নয়, বরং বঙ্গীয় সংস্কৃতির একটি প্রাণকেন্দ্র ছিল। কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের শাসনামলে এই শহর বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং একটি সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কলিকাতার উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে কৃষ্ণনগরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, এবং এটি দীর্ঘকাল ধরেই বঙ্গদেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাচর্চা ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।

কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষ এবং উত্তরাধিকার

কৃষ্ণনগরের রাজবংশের সূচনা হয় ভবানন্দ মজুমদারের মাধ্যমে, যিনি সম্রাট জাহাঙ্গিরের (১৫৬৯-১৬২৭) অনুমোদনে নবদ্বীপসহ আশেপাশের পরগণার জমিদার নিযুক্ত হন। তাঁর বংশধররা কালক্রমে কৃষ্ণনগরের রাজ্যকে শক্তিশালী করে তোলেন।

এরূপ জনশ্রুতি যে বঙ্গেশ্বর আদিশূর (৯৫৪ শাকে বা ১০৩২ খৃষ্টাব্দে) কোনও যজ্ঞ সম্পাদনার্থ কান্যকুব্জ হইতে পাঁচজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ আনয়ন করেন। ভট্টনারায়ণ তাঁহাদের মধ্যে একজন। এই ভট্টনারায়ণ হইতে উনবিংশ পুরুষ পরে কাশীনাথ নামে একজন জন্ম গ্রহণ করেন। ইনি ভূম্যধিকারী ও ধনবান ছিলেন। বিক্রমপুর (এখন বাংলাদেশে) ইহাঁদের আদিস্থান ছিল।

“आसीत् पुरा महाराज आदिशूर प्रतापवान्।
आनीतवान् द्विजान् पञ्च पञ्चगोत्र-समुद्भवान्॥”

কাশীনাথ সম্রাট আকবরের অধিকার কালে বাঙ্গালার নবাবের দৌরাত্ম্যে বিক্রমপুর হইতে তাড়িত হন। পথে নবাবের সেনানীকর্ত্তৃক ধৃত ও নিহত হন। কাশীনাথের আসন্ন-প্রসবা বিধবা পত্নী আন্দুলিয়া নিবাসী, বাগওয়ান (হাওড়া জেলা) পরগণার জমিদার, হরেকৃষ্ণ সমাদ্দারের ভবনে আশ্রয় প্রাপ্ত হন। সমাদ্দারের ভবনে তাঁহার একটী পুত্র সন্তান জন্মে। তাহার নাম রামচন্দ্র রাখা হয়। নিঃসন্তান হরেকৃষ্ণ, তাহাকে স্বীয় পুত্ররূপে গ্রহণ করিয়া তাহাকে সমাদ্দার উপাধি প্রদান করেন। রামচন্দ্র সমাদ্দারের চারিটী পুত্র তন্মধ্যে ভবানন্দই সুপ্রসিদ্ধ।

এই ভবানন্দ, বিদ্রোহী যশোহররাজ প্রতাপাদিত্যের দমনার্থে প্রেরিত, সম্রাট জাহাঙ্গিরের সেনাপতি রাজা মানসিংহকে বিশেষ সাহায্য করেন। তন্নিবন্ধন সম্রাট তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে নবদ্বীপ প্রভৃতি কয়েকটী পরগণার জমিদারী ও মজুমদার উপাধি প্রদান করেন। এই ভবানন্দ মজুমদার কৃষ্ণনগরের রাজবংশের প্রতিষ্ঠাকর্ত্তা। পূর্বে মাটিয়ারি নামক স্থানে এই রাজবংশের রাজধানী ছিল। কিন্তু ভবানন্দের পৌত্র রাঘব বর্তমান কৃষ্ণনগরে রাজধানীর পত্তন করেন।

আবুল্ ফজল্ মিন্‌হাজের “নোদিয়হ্‌কে” “নদীয়া” বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, এবং বাঙ্গলায় সংস্কৃত-চর্চ্চার গুরুস্থান নবদ্বীপই যে লখ্‌মনিয়ার “নদীয়া” তাহার আভাস দিয়াছেন। আবুল্ ফজলের মতই এখন সর্ব্বত্র সমাদর লাভ করিয়াছে। কিন্তু আবুল্ ফজলের সময়েও, সকলে “নোদিয়হ্”কে “নদীয়া” বলিয়া মনে করিত না। “মুন্তখাব্-উৎ-তওয়ারিখ”-গ্রন্থে আবদুল কাদির বেদৌনি মিন্‌হাজের “নোদিয়হ্”কে “নোদীয়া” বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। (আইন-ই-আকবরী)

তখন ঐ স্থানে রেউই নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম ছিল। ঐ গ্রামে বহুসংখ্যক গোপজাতীয় লোকের বাস ছিল। ঐ সকল গোপ মহাসমারোহ পূর্ব্বক কৃষ্ণের পূজা করিত বলিয়া রাঘবের পুত্র রুদ্র রাজধানীর নাম কৃষ্ণনগর রাখিলেন। তদবধি কৃষ্ণনগর বঙ্গদেশের ইতিবৃত্তে প্রসিদ্ধ স্থান হইয়া উঠিল। কৃষ্ণনগরই এই রাজগণের বাসস্থান হইয়া রহিয়াছে। কেবল মধ্যে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একবার মহারাষ্ট্রীয়দিগের (ভাস্কর পণ্ডিত কর্তৃক বর্গি আক্রমণ-১৭৫১) উপদ্রবে উত্ত্যক্ত হইয়া কৃষ্ণনগর পরিত্যাগ পূর্ব্বক ইহার ছয় ক্রোশ দূরে, নিজ জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্রের নামে, শিবনিবাস নামক এক নগর স্থাপন করিয়া তাহাতে কিছু দিন বাস করিয়াছিলেন এবং ১৭৫২ সালে কৃষ্ণনগরে পুনর্বাসিত হন।

ভবানন্দ মজুমদারের সময় হইতে ইঁহাদের জমিদারির উত্তরোত্তর উন্নতিই হইতে থাকে। অবশেষে কৃষ্ণচন্দ্রের সময় ৮৪টী পরগণা এই রাজ্যের অন্তর্ভূত হয়। কবিবর ভারতচন্দ্র (১৭১২-১৭৬০) তাহার নিম্নলিখিত বিবরণ দিয়াছেন—

“অধিকার রাজার চৌরাশী পরগণা, খাড়ি জুড়ী আদি করি দপ্তরে গণনা॥ রাজ্যের উত্তর সীমা মুরশিদাবাদ, পশ্চিমের সীমা গঙ্গা ভাগিরথী খাদ। দক্ষিণের সীমা গঙ্গা-সাগরের ধার, পূর্ব্ব সীমা ধুল্যাপুর বড় গঙ্গা পার॥”

অতএব বর্তমান কলকাতা (Kolkata) রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শাসনের অংশ ছিল।

নদীয়ার রাজগণ এই বিস্তীর্ণ রাজ্যের অধিকারী ছিলেন; বহু সংখ্যক পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য রাখিতেন; সর্ব্বদাই দেশের অপরাপর রাজগণের সহিত যুদ্ধ বিগ্রহে প্রবৃত্ত থাকিতেন; এবং নামতঃ যবন রাজাদিগের (আলিবর্দ্দী খাঁ : মৃত্যু: ৯ এপ্রিল ১৭৫৬, মুর্শিদাবাদ) অধীনে থাকিয়াও সর্ব্ব বিষয়ে স্বাধীন রাজার ন্যায় বাস করিতেন। এই রাজবংশের রাজগণের মধ্যে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই সমধিক প্রসিদ্ধ। রুদ্রের পুত্র রামজীবন; রামজীবনের পুত্র রঘুরাম; রঘুরামের পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র। ১৭১০ খ্রীষ্টাব্দে কৃষ্ণচন্দ্রের জন্ম হয়।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও কৃষ্ণনগরের স্বর্ণযুগ

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০–১৭৮৩) ছিলেন কৃষ্ণনগরের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর পিতা রুদ্র রায় এবং ঠাকুর রামচন্দ্র ছিলেন এই বংশের বিখ্যাত পূর্বপুরুষ। তাঁর শাসনামলে কৃষ্ণনগর একটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। তিনি বিদ্বানদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং তার রাজসভা ছিল জ্ঞানচর্চা এবং সাহিত্যচর্চার এক প্রাণকেন্দ্র। ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ “অন্নদামঙ্গল” রচনা করেন কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় বসে। কৃষ্ণচন্দ্র রায় শুধুমাত্র একজন বিদ্যাপ্রেমী রাজা ছিলেন না, বরং তিনি কৃষ্ণনগরের অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেন। তিনি কৃষি, বাণিজ্য এবং কারুশিল্পের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কৃষ্ণনগর থেকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে পাট, কাপড় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হতো।

“ইঁহার জীবদ্দশাতেই বঙ্গদেশ মুসলমান-রাজাদিগের হস্ত হইতে ইংরাজদিগের হস্তে নিপতিত হয়। কৃষ্ণচন্দ্রের অধিকারের মধ্যকালে নবাব আলিবর্দ্দী খাঁ পরলোক গমন করেন; এবং তাঁহার দৌহিত্র বিখ্যাত সিরাজদ্দৌলা বাঙ্গালার সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিরাজদ্দৌলা সুখপ্রিয় তরলমতি অব্যবস্থিত-চিত্ত লোক ছিলেন। তাঁহার রাজত্বকালে তাঁহার বিবিধ অত্যাচারে রাজ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ উত্ত্যক্ত হইয়া উঠিলেন; এবং তাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া যোগ্যতর কোনও ব্যক্তির হস্তে রাজ্যভার অর্পণ করিতে পারেন এই মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন।(শিবনাথ শাস্ত্রী)”

“মুর্শিদাবাদবাসী জগৎশেঠ নামক একজন ধনবান ব্যক্তির ভবনে এই মন্ত্রণা-সভার অধিবেশন হইতে লাগিল। রাজা মহেন্দ্র, রাজা রাম নারায়ণ, রাজা রাজবল্লভ, রাজা কৃষ্ণদাস, মীরজাফর প্রভৃতি প্রথমে এই মন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন। তাঁহাদের দ্বারা আহুত হইয়া কৃষ্ণচন্দ্র পরে আসিয়া তাহাতে যোগ দেন; এবং তাঁহারই পরামর্শক্রমে ইংরাজদিগের সাহায্য প্রার্থনা করা স্থিরীকৃত হয়।(শিবনাথ শাস্ত্রী)”

“ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট বঙ্গদেশকে নানা পরগণাতে ভাগ করিয়া জমিদারদিগের সহিত রাজস্বের নূতন বন্দোবস্ত করিতে প্রবৃত্ত হন। সেই সময় কৃষ্ণচন্দ্র স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্রের নামে জমিদারির নূতন বন্দোবস্ত করিয়া লন। কৃষ্ণচন্দ্রের দুই মহিষী ছিলেন। প্রথমার গর্ভে শিবচন্দ্র, ভৈরবচন্দ্র, হরচন্দ্র, মহেশচন্দ্র ও ঈশানচন্দ্র এই পঞ্চ পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন; কনিষ্ঠার গর্ভে শম্ভুচন্দ্রের জন্ম হয়। শম্ভুচন্দ্র পিতার বিরুদ্ধাচারী হইয়া তাঁহার অপ্রিয় হইয়াছিলেন।”

কৃষ্ণচন্দ্রের পর তাঁর পুত্র শিবচন্দ্র রায় সিংহাসনে আরোহণ করেন। শিবচন্দ্রের পর দীনবন্ধু রায় এবং পরে গিরীশচন্দ্র রায় রাজত্ব করেন। তাঁদের শাসনামলেও কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ থাকে। চৈতন্য মহাপ্রভুর (১৪৮৬ থেকে ১৫৩৪) ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব কৃষ্ণনগরের জনজীবনে সুগভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়।

“কৃষ্ণচন্দ্রের সময় ৮৪ পরগণা নদীয়া রাজ্যের অন্তর্গত ছিল; গিরীশচন্দ্রের সময়ে তাহ ৫।৭-খানি পরগণা ও কতকগুলি নিষ্কর গ্রামে দাঁড়াইল। এই রাজার সময়ে ইঁহাদের জমিদারীর সারভূত প্রসিদ্ধ উখড়া পরগণা নিলাম হইয়া যায়। এই দারুণ দুর্ঘটনার পর গিরীশচন্দ্র একজন তান্ত্রিক ব্রহ্মচারীর প্ররোচনায় নিতান্ত সুরাসক্ত ও অমিতব্যয়ী হইয়া পড়েন। গিরীশচন্দ্র নিঃসন্তান হওয়াতে একটী দত্তক পুত্র গ্রহণ করেন ও তাহার নাম শ্রীশচন্দ্র রাখেন। এই দত্তক পুত্রকে জমিদারীর ভার দিয়া ১৮৪১ খ্রীষ্টাব্দে গিরীশচন্দ্র লোকান্তরিত হন। দেশে ইংরাজী শিক্ষা বিস্তার বিষয়েও শ্রীশচন্দ্র বিশেষ উৎসাহী হইয়াছিলেন। ১৮৪৫ খ্রীষ্টাব্দে, গবর্ণর জেনেরল সার হেনরি হার্ডিঞ্জ বাহাদুরের অধিকারকালে, কৃষ্ণনগর কালেজ প্রতিষ্ঠিত হইলে, শ্রীশচন্দ্র, পূর্ব্ব পুরুষের রীতি লঙ্ঘন পূর্ব্বক, স্বীয় পুত্রকে কৃষ্ণনগর কলেজে ভর্ত্তি করিয়া দিয়াছিলেন; এবং নিজে কলেজ কমিটীর সভ্যপদ গ্রহণ করিয়াছিলেন” (শিবনাথ শাস্ত্রী)।

সুতানুটি ও গোবিন্দপুর: কলিকাতার পূর্ব ইতিহাস

সুতানুটি এবং গোবিন্দপুর ছিল প্রাচীন গৌড়বঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। মধ্যযুগে এই অঞ্চলগুলি কৃষ্ণনগরের শাসকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং এখান থেকেই গৌড়বঙ্গের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হতো। এই সময়ে সুতানুটি ও গোবিন্দপুরের বন্দরসমূহে বস্ত্র, চাল, লালচিনি এবং মশলার বাণিজ্য চলত। সুতানুটি ছিল প্রধানত বস্ত্র ব্যবসার কেন্দ্র, যেখানে বাংলা ও মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য করতে আসতেন। গোবিন্দপুর ছিল তদ্রূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, যেখানে বিদেশি বণিকরা বাণিজ্য করতেন। কৃষ্ণনগরের শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলগুলো ক্রমে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের শাসনামলে কৃষ্ণনগর ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে তাঁতশিল্প, কাঁসা-পিতলের সামগ্রী এবং টেরাকোটা শিল্প প্রসিদ্ধ ছিল। তৎকালীন সময়ে কৃষ্ণনগর থেকে সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতার অন্যান্য অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ করা হত। বাণিজ্যিকভাবে কলকাতার বিকাশের পেছনে কৃষ্ণনগরের ব্যবসায়ীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

সুতানুটি এবং গোবিন্দপুর পরে কৃষ্ণনগরের আওতাধীন হয়। কৃষ্ণনগর থেকে নিয়ন্ত্রিত এই অঞ্চলগুলি ছিল গঙ্গাতীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। জনশ্রুতি অনুযায়ী, জব চার্নকের কলকাতা প্রতিষ্ঠার প্রচলিত ধারণা বাস্তবে অতিরঞ্জিত এবং ইতিহাস বিকৃতি। কৃষ্ণনগরের, এবং পরে মুখ সুদ্ধি আবাদের ব্যবসায়ীরা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই শহরের প্রাথমিক অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।

বহু পূর্বেই সুতানুটি এবং গোবিন্দপুর ছিল একটি সক্রিয় বাণিজ্যকেন্দ্র, যা কৃষ্ণনগরের শাসকদের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করার আগেই কৃষ্ণনগরের রাজারা এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছিলেন।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরে রাজা শিবচন্দ্র, (১৭৮২ হইতে ১৭৮৮ পর্য্যন্ত) তৎপরে রাজা ঈশ্বরচন্দ্র,(১৭৮৮ হইতে ১৮৭২ পর্যন্ত) নদীয়ার রাজসিংহাসনে আসীন হন।

১৭৮৬ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস বাহাদুর এতদ্দেশীয় জমিদারদিগের সহিত দশ বৎসরের জন্য বার্ষিক দেয় রাজস্ব নির্দ্ধারণ করেন। কথা থাকে যে বিলাতের কর্ত্তৃপক্ষের অভিমত হইলে এই বন্দোবস্তই চিরস্থায়ী হইবে। তদনুসারে ১৭৯৩ সালে সেই বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী হয়।

কলিকাতার বাস্তব উন্নয়ন: কৃষ্ণচন্দ্রের প্রভাব

কলিকাতার প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের শাসনামলে। তিনি কৃষ্ণনগরকে সাংস্কৃতিক এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সুতানুটি ও গোবিন্দপুরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কলিকাতার অর্থনৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখেন। কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে কৃষ্ণনগর থেকে সুতানুটি ও গোবিন্দপুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং বিলাসবহুল সামগ্রী সরবরাহ করা হতো। তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করেন এবং বিদেশি বণিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করেন। কৃষ্ণচন্দ্রের এই নীতিগুলি কলিকাতার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।

বর্তমান আলীপুর এবং খিদির পুর এলাকা আলীবর্দী খানের (১৬৭১ – ৯ এপ্রিল ১৭৫৬) সময়ে অত্যন্ত উন্নত ছিল। নদীয়া কৃষ্ণনগর থেকে পণ্য আসত। শেঠ এবং বসাকরা ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী এবং তাদের কেন্দ্রস্থল ছিল বর্তমান ধর্মতলা এলাকা।

কৃষ্ণনগরের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস কলিকাতার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষ্ণনগরের শাসকগণ বাংলার অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কলিকাতার উন্নয়ন প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের যুগ থেকেই শুরু হয় এবং এটি ধাপে ধাপে একটি আধুনিক শহরে পরিণত হয়। কলিকাতার প্রকৃত বিকাশে কৃষ্ণনগরের প্রভাবই মুখ্য ছিল। চৈতন্য মহাপ্রভুর সময় থেকে শুরু করে কৃষ্ণচন্দ্রের শাসনামলে কৃষ্ণনগর যে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ধারণ করেছিল, সেটিই কলিকাতার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের প্রকৃত ভিত্তি।

যখনই আমরা মানসম্মত বাংলার কথা বলি, তখন আমরা কৃষ্ণনগরের বাংলার কথা বলি। কৃষ্ণনগরের বাংলা বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হয়নি, বরং এটি নবদ্বীপে চৈতন্য এবং তাঁর শিষ্যদের দ্বারা কথিত বাংলার উত্তরাধিকার বহন করে। এখন, যখন আমরা কলকাতায় বাংলা বলি এবং লিখি, তখন আমরা কৃষ্ণনগরের বাংলা এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর বাংলা বলি।

Date: 25th March 2025

Image: মহারাজা ক্ষিতীশ চন্দ্র রায় বাহাদুর


সাহিত্য সম্রাট জার্নাল

Alipur and Khidirpur, Bhavananda, Chaitanya, Dharmatala, Kolkata, Krishnanagar, Mansingh, Nabadwip, Nadia, Pratapaditya,


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল