ভদ্রলোক থেকে ডিমবাজ: বাংলার নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি

Made in India, Rotten in India

স্বদেশি ডিম, জাতীয়তাবাদী ডিম: বাংলায় পচা ডিমের রাজনৈতিক উত্থান

ডিমের রাজত্ব

October 5th, 2006

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন নায়কের আবির্ভাব ঘটেছে—ডিম। এককালে ডিম ছিল স্রেফ ডিম। সকালের জলখাবার, ডিমের ঝোল, ডিমের ডেভিল, ডিমের অমলেট—বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে তার সম্মানজনক কিন্তু নীরব অবস্থান ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনের পর, ডিম যেন হঠাৎ রাজনৈতিক নাগরিকত্ব লাভ করেছে। তার দাম বেড়েছে, মর্যাদা বেড়েছে, ব্যবহার বেড়েছে; এমনকি রাজনৈতিক অভিধানেও সে ঢুকে পড়েছে। যে ডিম এতদিন কড়াইতে ফাটত, এখন সে সভা-সমিতি, আদালত-চত্বর এবং রাজনৈতিক বিরোধের আকাশে উড়তে শিখেছে।

বাঙালি অবশ্য গালাগালি করতেও বিশেষ পারদর্শী নয়। বাংলা ভাষা এমনিতেই মিষ্টি ভাষা। শত্রুকেও গালি দিলে তার মধ্যে এক ধরনের রসগোল্লার কোমলতা এসে যায়। “তুই একটা…” বলেও বাঙালি মাঝপথে থেমে যায়; তারপর চা খেতে বসে। প্রকৃত গালিগালাজের জন্য যে পেশীশক্তি, কণ্ঠশক্তি ও মানসিক প্রস্তুতি দরকার, ভদ্রলোক বাঙালির তার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে খুব একটা সখ্য নেই। ফলে নতুন রাজনৈতিক যুগে যদি কেউ আবিষ্কার করে থাকে যে মুখে গালি দেওয়ার চেয়ে হাতে ডিম নেওয়া অনেক সহজ, তবে তাকে বাঙালি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অভিনব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বলতেই হয়।

এখন সেই ডিম-নিক্ষেপ সংস্কৃতি যেন নতুন রাজনৈতিক ক্রীড়া। যাকে ভালোবাসতেন, তার দিকে ডিম; যাকে একসময় নিজের লোক ভাবতেন, তার দিকে ডিম; যে বিরোধী দলে চলে গেছে, তার দিকে ডিম; যে আইনজীবী আদালতে কারও পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর দিকেও ডিম। ভালোবাসা, দলবদল, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ডিম—সবকিছুর মধ্যে এক আশ্চর্য ত্রিভুজ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

ব্যঙ্গ করে কেউ বলতে পারেন, আগামী Valentine’s Day-তে ফুলের বদলে ডিমের ঝুড়ি নিয়ে প্রেম নিবেদন হবে। প্রাক্তন প্রেমিকের জন্য গোলাপ নয়—এক ডজন ডিম। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির তরুণ কর্মী হয়তো বলবে, “তোমাকে আমি এত ভালোবাসতাম যে তোমার জন্য ডিম কিনেছিলাম; এখন তুমি আমার বিরোধী, তাই সেই ডিমই তোমার উদ্দেশে ফেরত পাঠাচ্ছি।” এ যেন প্রেমেরও Bajrangikaran, আর প্রেমপত্রের বদলে প্রোটিনসমৃদ্ধ প্রতিবাদ।

কিন্তু আসল হাস্যকর জায়গাটি আদালত চত্বর। আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে অভিযুক্তের পক্ষে যুক্তি দেবেন—এটাই তাঁর পেশা। তিনি অপরাধীকে অপরাধী বানান না, বিচারকের রায়ও লেখেন না। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার যুগে যদি কোনও আইনজীবীর দিকে ডিম ছোড়া হয়, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে—আইনের যুক্তির উত্তর কি এখন ডিম? সংবিধানের ব্যাখ্যার পাল্টা যুক্তি কি এখন সিদ্ধ ডিম? জামিনের আবেদনের বিরোধিতা কি অমলেট দিয়ে? আর আদালতের আদেশ পছন্দ না হলে কি পরবর্তী ধাপে ডিমের কুসুম?

৩ অক্টোবর ২০২৬-এ Howrah Bar Association-এর জরুরি বৈঠকে Banksal Court Campus-এ কথিত ডিম-নিক্ষেপের ঘটনার প্রতিবাদে প্রস্তাব গ্রহণের ঘটনা আরও একটি মাত্রা যোগ করেছে। Barasat-এর ঘটনায় এক High Court advocate-এর দিকে ডিম নিক্ষেপের অভিযোগ এবং তার প্রতিবাদে High Court আইনজীবীদের উদ্যোগও প্রশ্নটিকে আদালত-চত্বরের নিরাপত্তা ও আইনজীবীদের পেশাগত মর্যাদার দিকে নিয়ে যায়। আদালত যদি যুক্তির স্থান হয়, তবে ডিমের স্থান কড়াই—বিচারালয় নয়।

ব্যঙ্গ আরও তীব্র হয় যখন মানুষ বলতে শুরু করে—আদালতের এক কিলোমিটারের মধ্যে ডিম বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হোক। কারণ যদি ডিম এতটাই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একদিন হয়তো অস্ত্রের তালিকায় বন্দুকের পাশে লেখা থাকবে—“১ নম্বর: পচা ডিম।” পুলিশ তখন জিজ্ঞাসা করবে, “লাইসেন্স আছে?” ডিম বলবে, “আমাকে কিনতে লাইসেন্স লাগে না।” আইনশৃঙ্খলা তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে।

ব্যঙ্গ করে বলা যায়, পুলিশ যেন আলাদিনের সেই জিন—তবে প্রদীপ যার হাতে, জিনও যেন তারই ইশারায় হাজির। শাসকপক্ষের ইচ্ছায় প্রশাসনের দরজা খুলে যায়, আর বিরোধী পক্ষের কপালে জোটে FIR, নোটিশ, মামলা, পুলিশি তৎপরতা—আর পরিস্থিতি আরও ‘উন্নত’ হলে ডিম। অর্থাৎ, আইনের হাত সবার জন্য সমান—এই পুরনো ধারণাটিকে বিদায় জানিয়ে নতুন রাজনৈতিক রসায়নে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত সমীকরণ: প্রদীপ যার, জিন তার; ক্ষমতা যার, পুলিশ তার; আর বিরোধী হলে—FIR, মামলা এবং প্রয়োজনে ডিম।

এই পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের দিকে ডিম ছোড়ার অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক, কারণ আইনজীবী আদালতে যে পক্ষের হয়ে দাঁড়ান, সেটি তাঁর সাংবিধানিক ও পেশাগত কাজ। আজ তিনি TMC-র অভিযুক্তের পক্ষে, কাল Congress-এর, পরশু CPI(M)-এর; আইনজীবীর পেশা কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ নয়। Defence lawyer-এর গায়ে ডিম ছোড়া মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে অপমান করা নয়; সেটি বিচারব্যবস্থার দরজায় ডিম ছোড়ার মতো।

আর সরকারি আইনজীবী ও Public Prosecutor-দের নিয়ে রাজনৈতিক বিদ্রূপের বাজারে যত কথাই থাকুক, তাঁদের কাছ থেকে অন্তত আদালত-চত্বরে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি দৃঢ় পেশাগত অবস্থান প্রত্যাশিত। আদালত কোনও রাজনৈতিক মিছিলের extension counter নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচারিক প্রতিষ্ঠান।

একসময় যে ভদ্রলোক সংস্কৃতি বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন, শ্যামাপ্রসাদ, শক্তি-সুনীল-শঙ্খ এবং অসংখ্য বাঙালি বিচারক, আইনজীবী, সাহিত্যিক ও চিন্তকের বৌদ্ধিক পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল, তার উত্তরাধিকার যদি শেষ পর্যন্ত ডিম ছোড়ার দক্ষতা দিয়ে মাপা হয়, তবে সেটি নিছক রাজনৈতিক হাস্যরস নয়—একটি সাংস্কৃতিক অবনমনও বটে।

তাই আজকের ব্যঙ্গের শেষ বাক্যটি খুব সহজ: পশ্চিমবঙ্গের নতুন Boss নাকি ডিম। ডিমই কথা বলছে, ডিমই প্রতিবাদ করছে, ডিমই রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করছে। আর বাজারে ডিমের দামও যদি বাড়ে, তার কারণ অর্থনীতির supply-demand নয়—রাজনৈতিক মর্যাদা! এ ডিম সাধারণ ডিম নয়; স্বদেশি ডিম, জাতীয়তাবাদী ডিম, Made in India ডিম, এবং প্রয়োজনে Rotten in India ডিম।

বাঙালির হাতে একসময় ছিল বই, কলম, যুক্তি, কবিতা ও শাস্ত্রার্থ। এখন ব্যঙ্গের আয়নায় দেখা যাচ্ছে—হাতে ডিম। প্রশ্ন শুধু একটাই: ডিমটা কবে আবার কড়াইতে ফিরবে?

তন্ময় ভট্টাচার্য


Note: “ভদ্রলোক থেকে ডিমবাজ: বাংলার নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি” প্রবন্ধটি মূলত ৪ঠা অক্টোবর ২০২৬ তারিখের ‘All-Bengal Lawyers’ Conference‘-এ (নিখিল বঙ্গ আইনজীবী সম্মেলন) প্রকাশিত হয়েছিল।

Read more


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল