১৯০৬ সালের বঙ্গভাগ ও ব্রিটিশ শাসন: প্রশাসনিক সংস্কার নাকি ঔপনিবেশিক স্বার্থ

Old Kolkata

বঙ্গবিভাগ ১৯০৬: প্রশাসনিক যুক্তি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশ্ন

বঙ্গভাগ হয়েছে কি হয়নি—১৯০৬ সালে এই প্রশ্নটি কেবল শব্দের বিতর্ক ছিল না; এর ভিতরে লুকিয়ে ছিল বঙ্গভাগের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর রাজনৈতিক সংশয়। ব্রিটিশ সরকার একে Partition of Bengal বলতে অনাগ্রহী ছিল। লর্ড কার্জন ঢাকার বক্তৃতায় বলেছিলেন, বঙ্গ সম্পর্কে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাকে তিনি ঠিক “partition” বলতে চান না। পরে প্রাক্তন ভারতসচিব লর্ড জর্জ হ্যামিল্টনও যুক্তি দেন, এখানে নাকি বাংলাকে ভেঙে অন্য কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি; শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তে দুটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন ছিল সহজ। একটি বৃহৎ ভূখণ্ডের সীমানা নির্দিষ্ট করে তাকে দুই প্রশাসনিক এককে ভাগ করা হয়েছে, দুই প্রদেশের জন্য পৃথক শাসনকর্তা, পৃথক কর্মচারী, পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো এবং পৃথক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। তাহলে সাধারণ অর্থে এটিকে বঙ্গভাগ বলা হবে না কেন?

একটি বৃহৎ যৌথ পরিবার কল্পনা করা যাক। দুই ভাই একই বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। সমস্ত সম্পত্তি এক, একটি তহবিল, একজন কর্তা এবং এক সেট কর্মচারী। পরিবার বড় হয়ে গেলে যদি দুই ভাই সম্পত্তির সীমানা নির্দিষ্ট করে আলাদা সংসার গড়ে তোলেন, একজন পুরনো বাড়ি পান, অন্যজন নতুন বাড়ি তৈরির জন্য অর্থ পান, দুটি তহবিল তৈরি হয় এবং দুই পরিবারের জন্য আলাদা কর্মচারী নিয়োগ করা হয়—তাহলে সেটিকে সম্পত্তির বিভাজন বা partition বলা হয়। বাংলার ক্ষেত্রে প্রশাসনিকভাবে ঠিক এমনই একটি পরিবর্তন ঘটেছিল।

১৯০৫ সালের বঙ্গভাগে পুরনো বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হয় এবং পশ্চিমাংশ নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে থাকে। ঢাকাকে পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী করা হয়। ফলে একক প্রশাসনের পরিবর্তে দুটি প্রশাসনিক কেন্দ্র, দুটি শাসনব্যবস্থা এবং পৃথক সরকারি ব্যয়ের কাঠামো তৈরি হয়। শব্দটি “পার্টিশন” হোক বা অন্য কিছু—বাস্তব প্রশাসনিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করা তাই কঠিন ছিল।

বঙ্গভাগের পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের প্রধান যুক্তি ছিল জনসংখ্যার বিশালতা। বলা হয়েছিল, বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিপুল জনসংখ্যা একজন লেফটেন্যান্ট-গভর্নরের পক্ষে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই যুক্তির মধ্যেই সমালোচকদের আপত্তির সূত্র ছিল। একটি প্রদেশে জনসংখ্যা বাড়লে ডাক, পুলিশ, আদালত ও শিক্ষা বিভাগের কাজ বাড়তে পারে; কিন্তু সেই বৃদ্ধির প্রতিটি অংশ সরাসরি লেফটেন্যান্ট-গভর্নরের ব্যক্তিগত কাজ বাড়ায় না। ডাক বিভাগের জন্য ডাককর্মী বাড়ানো যায়, পুলিশের জন্য থানা ও কর্মী বাড়ানো যায়, আদালতের সংখ্যা ও বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো যায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও কর্মচারী বাড়ানো যায়। অর্থাৎ প্রশাসনিক কাঠামো সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব।

এই যুক্তি থেকে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন—প্রশাসনের ভার যদি সত্যিই সমস্যা হয়ে থাকে, তবে দক্ষ সচিব, অধিক কর্মচারী এবং বিভাগীয় পুনর্গঠন কেন যথেষ্ট হবে না? একটি বিশাল প্রদেশ পরিচালনার অসুবিধা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অসুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদেশ বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে না।

বরং আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল অন্য জায়গায়। যদি জনসংখ্যার আধিক্যকে শাসনব্যবস্থার মূল সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে কি ব্রিটিশ প্রশাসন ক্রমে আরও কেন্দ্রনির্ভর ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে? সমালোচকদের চোখে প্রশ্নটি ছিল প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে বড়—শাসক কীভাবে জনগণকে দেখছেন এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কীভাবে গড়ে তুলছেন।

দ্বিতীয় যুক্তি ছিল দূরত্ব। ব্রিটিশ সরকার বলেছিল, কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গের বহু এলাকা এত দূরে যে সেখানকার প্রশাসনিক সমস্যা রাজধানী থেকে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। বিশেষ করে ঢাকা ও ময়মনসিংহের উদাহরণ দেওয়া হয়েছিল।

লর্ড কার্জন ঢাকার শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থার কথা তুলে ধরে যুক্তি দিয়েছিলেন যে কলকাতা থেকে দূরে থাকার কারণে ঢাকা কলেজ দীর্ঘদিন অবহেলিত হয়েছে। অধ্যাপকের সংখ্যা কম, বেতন কম, ছাত্রদের জন্য যথেষ্ট আবাসন নেই, খেলাধুলার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই এবং শিক্ষক-ছাত্রের পারস্পরিক যোগাযোগেরও যথেষ্ট সুযোগ নেই—এই সমস্যাগুলিকে তিনি নতুন প্রদেশের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

কিন্তু এই যুক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা প্রশ্ন ছিল আরও কঠিন। কলকাতার কাছাকাছি হুগলি ও কৃষ্ণনগরের কলেজগুলিও কি সবসময় উন্নত অবস্থায় ছিল? কলকাতার কেন্দ্রস্থলে থাকা প্রেসিডেন্সি কলেজও কি তখন আগের মতো অর্থ ও উচ্চমানের শিক্ষক পাচ্ছিল? যদি রাজধানীর কাছে থাকা প্রতিষ্ঠানও আর্থিক সংকটে পড়ে, তাহলে কেবল দূরত্বকে ঢাকা কলেজের দুরবস্থার কারণ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এই সমালোচনার পেছনে ছিল ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির দীর্ঘ পরিবর্তন। লর্ড মেয়োর সময় থেকে উচ্চশিক্ষায় সরকারি ব্যয় কমানোর যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব কলকাতা, হুগলি, কৃষ্ণনগর ও ঢাকা—সব জায়গাতেই পড়েছিল। ফলে ঢাকা কলেজের দুরবস্থাকে কেবল কলকাতা থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা প্রশাসনিক ইতিহাসের বৃহত্তর বাস্তবতাকে আড়াল করত।

ময়মনসিংহের উদাহরণও একই প্রশ্ন সামনে আনে। লর্ড কার্জন উল্লেখ করেছিলেন যে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষের ময়মনসিংহ জেলায় মাত্র একজন ব্রিটিশ নির্বাহী কর্মকর্তা বা কালেক্টর ছিলেন, অথচ তুলনামূলক জনসংখ্যার উড়িষ্যায় একাধিক কালেক্টর ও কমিশনার ছিলেন। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্ন ছিল—কলকাতায় অবস্থিত সরকার যদি এত দূরের একটি জেলার প্রশাসনিক প্রয়োজন বুঝতে না পারে, তাহলে ঢাকায় একটি স্থানীয় সরকার থাকলে হয়তো পরিস্থিতি বদলাত।

কিন্তু এখানেও তুলনামূলক উদাহরণ সামনে আসে। মেদিনীপুর কলকাতার তুলনায় অনেক কাছাকাছি, অথচ তার আয়তন ও জনসংখ্যাও যথেষ্ট বড় ছিল। যদি প্রশাসনিক ঘাটতির মূল কারণ দূরত্ব হয়, তবে কাছাকাছি জেলায় একই ধরনের ঘাটতি কেন দেখা যাবে? আবার ময়মনসিংহের প্রশাসনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, কমিশনারসহ একাধিক স্তরের কর্মকর্তা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যদি দীর্ঘদিন প্রশাসনিক ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তার কারণ কি সত্যিই কলকাতার দূরত্ব, নাকি স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা?

এই প্রশ্নগুলিই বঙ্গভাগের সরকারি যুক্তির ভিতকে দুর্বল করেছিল।

তৃতীয় যুক্তি ছিল শাসক ও শাসিতের ঘনিষ্ঠতা। ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য ছিল, ভালো প্রশাসনের অন্যতম শর্ত হল প্রশাসক ও জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ। নতুন প্রদেশ গঠিত হলে ঢাকায় একটি স্থানীয় সরকার থাকবে এবং পূর্ববঙ্গের মানুষের সমস্যা দ্রুত প্রশাসনের কাছে পৌঁছবে।

নীতিগতভাবে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা কঠিন। কিন্তু বাস্তব প্রশাসনিক আচরণই প্রশ্ন তুলেছিল—স্থানীয় সরকার থাকলেই কি শাসক জনগণের কাছাকাছি চলে আসেন?

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সফরে বেরোতেন, কমিশনার সফর করতেন, লেফটেন্যান্ট-গভর্নরও বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করতেন। কিন্তু সরকারি সফর অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকত অফিস, আদালত, বিদ্যালয়, কলেজ, কারাগার, হাসপাতাল কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, কৃষক, তাঁতি, কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কতটা ঘটত, সেটিই ছিল আসল প্রশ্ন।

শাসক যদি জনগণের বাস্তব জীবন দেখতে না চান, তাহলে রাজধানী বদলালেই সেই দূরত্ব দূর হয় না। কলকাতার বদলে ঢাকা প্রশাসনের কেন্দ্র হলেই একজন কর্মকর্তা কৃষকের ঘরে যাবেন, তাঁর ফসলের সমস্যা শুনবেন, গ্রামের অর্থনৈতিক সংকট বুঝবেন—এমন নিশ্চয়তা কোথায়?

এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সমালোচকেরা বলেছিলেন, প্রশাসনিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ বাংলার প্রতিটি জেলাতেই ছিল। দরকার ছিল জনগণকে জানার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের চেয়ে সেই মানসিকতার পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গভাগ নিয়ে সরকারের যুক্তির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের বাণিজ্য ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্রের ফলে পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হবে এবং চট্টগ্রাম একটি বড় বন্দর হিসেবে বিকশিত হবে—এই প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছিল।

কিন্তু এখানেও প্রশ্ন উঠেছিল—এই উন্নয়নের লাভ কার কাছে যাবে?

চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৎকালীন প্রশাসনিক বক্তব্যে জেটি, পন্টুন, গুদাম, বাষ্পীয় ক্রেন, জাহাজ ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর বিস্তারের ছবি আঁকা হয়েছিল। কিন্তু বন্দর ও বাণিজ্যের প্রসার মানেই কি পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি? ঔপনিবেশিক অর্থনীতির অভিজ্ঞতা থেকে সমালোচকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, বন্দর যত বড় হবে, বিদেশি বাণিজ্যিক স্বার্থের সুযোগও তত বাড়বে।

কৃষক পাট উৎপাদন করে কিছু বেশি দাম পেতে পারেন, কিন্তু সেই পাটের বৃহত্তর বাণিজ্যিক মূল্য, রপ্তানি, পরিবহন, বন্দর ও আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—সেই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া “সমৃদ্ধি” শব্দটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বন্দর নির্মাণ, রেলপথ, গুদাম বা ক্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন হতে পারে; কিন্তু তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি নিশ্চিত করে না।

এই কারণেই বঙ্গভাগের অর্থনৈতিক যুক্তি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক বিকাশ যদি প্রধানত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও ঔপনিবেশিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, তবে সেটিকে নিঃশর্তভাবে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি বলা যায় না।

বঙ্গভাগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সরকারি তথ্য প্রকাশের প্রশ্ন। ব্রিটিশ সরকার দাবি করেছিল যে বহু অভিজ্ঞ প্রশাসক বঙ্গভাগকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু সেই সমর্থনের পূর্ণ বিবরণ, কে কোন যুক্তিতে সমর্থন করেছিলেন এবং বিরোধীদের বক্তব্যের বিপরীতে সরকারের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন কী ছিল—সবকিছু জনসমক্ষে সমানভাবে প্রকাশিত হয়নি।

অন্যদিকে বঙ্গভাগের বিরোধিতায় অভিজ্ঞ প্রশাসকদের নাম সামনে এসেছিল। ফলে সরকারি ব্যাখ্যার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। একটি বড় প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যদি জনগণের আপত্তি থাকে, তবে সরকারের উচিত ছিল কারণ, পরিসংখ্যান, প্রশাসনিক প্রতিবেদন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে তুলে ধরা। তা না হলে প্রশাসনিক সংস্কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে।

এই সন্দেহই বঙ্গভাগ-বিরোধী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে। ১৯০৫ সালের সিদ্ধান্ত ১৯০৬ সালে এসে কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের বিষয় থাকেনি; তা পরিণত হয় জনমত, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বৈধতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে।

তৎকালীন সমালোচকের মূল বক্তব্য ছিল—সরকার জনসংখ্যার যুক্তি দিয়েছে, কিন্তু জনসংখ্যা প্রশাসনিক বিভাজনের অনিবার্য কারণ নয়; দূরত্বের যুক্তি দিয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে দূরত্বের সমস্যা সমাধানের বহু উপায় আগে থেকেই ছিল; জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলেছে, কিন্তু কর্মকর্তাদের বাস্তব আচরণ সেই দাবিকে সমর্থন করে না; অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলেছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের লাভের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক স্বার্থই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই যুক্তিগুলির ভিত্তিতে বঙ্গভাগের বিরোধিতা কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। এর মধ্যে ছিল প্রশাসনিক যুক্তির পরীক্ষা, সরকারি পরিসংখ্যানের সমালোচনা, শিক্ষানীতির ইতিহাসের পুনর্বিবেচনা, অর্থনৈতিক স্বার্থের বিশ্লেষণ এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন

১৯০৬ সালের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই বঙ্গভাগকে বোঝার জন্য শুধু “প্রশাসনিক সুবিধা” কথাটি যথেষ্ট ছিল না। প্রশ্ন ছিল—কাকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, কার অর্থে সেই সুবিধা তৈরি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক পুনর্গঠনের রাজনৈতিক ফল কী?

পরবর্তী ইতিহাস দেখায়, বঙ্গভাগকে ঘিরে এই প্রশ্নগুলি অমূলক ছিল না। বঙ্গভাগ-বিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, বয়কট, জাতীয় শিক্ষার উদ্যোগ এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে জনমত একই সময়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বঙ্গভাগ তাই কেবল একটি মানচিত্র পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে থাকেনি; এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক গভীর রাজনৈতিক মোড় তৈরি করেছিল।

সরকার বলেছিল, প্রশাসনকে সহজ করতেই বঙ্গভাগ। কিন্তু বিরোধীদের কাছে প্রশ্নটি ছিল আরও মৌলিক—যে প্রশাসন জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারে না, সেই প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য মানচিত্র ভাগ করাই কি সত্যিই অপরিহার্য?

আর যদি নতুন প্রদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ফল হয় বন্দর, রেল, পাট ও বাণিজ্যের প্রসার, তবে সেই উন্নয়নের মালিকানা ও লাভের বণ্টন কী হবে? যদি তার প্রধান সুবিধাভোগী হয় ঔপনিবেশিক সরকার ও বিদেশি বণিক, তবে তাকে কেবল জনগণের কল্যাণের প্রকল্প বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এই প্রশ্নগুলিই ১৯০৬ সালের বঙ্গভাগ-বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। বঙ্গভাগের বিরোধিতা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ছিল না; এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের যুক্তি, স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য এবং শাসক-শাসিত সম্পর্কের বিরুদ্ধে এক গভীর রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল