দ্বিতীয় ভাগ
নাগরিকত্ব
৫. সংবিধানের প্রারম্ভে নাগরিকত্ব।— সংবিধানের প্রারম্ভে, যে কোন ব্যক্তি যাহার ভারতভূমিতে আবাস রহিয়াছে এবং—
(ক) যিনি ভারতভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন; অথবা
(খ) যাঁহার পিতা বা মাতার মধ্যে কোন একজন ভারতভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন; অথবা
(গ) যিনি সংবিধান প্রারম্ভের অব্যবহিত পূর্ববর্তী পাঁচ বৎসর বা তদপেক্ষা অধিককাল ভারতভূমিতে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করিয়া আসিতেছেন—
তাঁহাকে ভারতের নাগরিক বলিয়া গণ্য করা হইবে।
৬. পাকিস্তান হইতে ভারতে আগত কতক ব্যক্তির নাগরিকত্বের অধিকার।— অনুচ্ছেদ ৫ এ যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও, যে ব্যক্তি বর্তমানে পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ড হইতে ভারতের ভূখণ্ডে গমন করিয়াছেন, তিনি সংবিধান প্রারম্ভে ভারতের নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন, যদি—
(ক) তিনি অথবা তাঁহার পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহগণের মধ্যে কেহ ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ অনুসারে নির্ধারিত “ভারত”তে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন; এবং
(খ) (i) যদি উক্ত ব্যক্তি উনবিংশ জুলাই, ১৯৪৮ তারিখের পূর্বে ভারতে আগমন করিয়া থাকেন, তবে তিনি আগমনের তারিখ হইতে ভারতে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করিয়া থাকিলে; অথবা
(ii) যদি তিনি উনবিংশ জুলাই, ১৯৪৮ তারিখ বা তদপরে আগমন করিয়া থাকেন, তবে তিনি ভারতের ডোমিনিয়ন সরকারের কর্তৃক নিযুক্ত কোন কর্মকর্তার নিকট সংবিধান প্রারম্ভের পূর্বে নির্ধারিত রীতি ও পদ্ধতিতে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করিয়া নিবন্ধিত হইয়া থাকিলে।
শর্ত এই যে, কোন ব্যক্তিকে নিবন্ধিত করা হইবে না, যদি না তিনি আবেদনপূর্ব ছয় মাসকাল অবধি ভারতে বসবাস করিয়া থাকেন।
৭. পাকিস্তানে গমনকারী কতক ব্যক্তির নাগরিকত্বের অধিকার।— অনুচ্ছেদ ৫ ও ৬-এ যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও, যে ব্যক্তি ১লা মার্চ, ১৯৪৭ তারিখের পরে ভারতভূমি হইতে পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলে গমন করিয়াছেন, তিনি ভারতের নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন না।
তবে শর্ত এই যে, উক্ত বিধান সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে না, যিনি পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল হইতে পুনর্বাসন বা স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের অনুমতির ভিত্তিতে ভারতভূমিতে প্রত্যাগত হইয়াছেন; এইরূপ প্রত্যেক ব্যক্তিকে অনুচ্ছেদ ৬(খ)-এর উদ্দেশ্যে উনবিংশ জুলাই, ১৯৪৮ তারিখের পর ভারতে আগত বলিয়া গণ্য করা হইবে।
৮. ভারতের বাহিরে বসবাসরত ভারতীয় উৎসের কতক ব্যক্তির নাগরিকত্ব।— অনুচ্ছেদ ৫-এ যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও, যে ব্যক্তি বা তাহার পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহগণের মধ্যে কেহ ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ অনুসারে নির্ধারিত ভারতভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং যিনি বর্তমানে সেইরূপভাবে নির্ধারিত ভারতের বাহিরে কোন দেশে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করিতেছেন, তিনি যদি ভারতে নাগরিকপদ লাভের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ভারতীয় কূটনৈতিক বা দূতাবাসিক প্রতিনিধির নিকট নির্ধারিত রীতিতে (সংবিধান প্রারম্ভের পূর্বে বা পরে যেকোন সময়ে) আবেদন করিয়া নিবন্ধিত হন, তবে তিনি ভারতীয় নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন।
৯. বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণকারী ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক হইবেন না।— যে ব্যক্তি অনুচ্ছেদ ৫, ৬ বা ৮ অনুসারে নাগরিক বলিয়া গণ্য হইতে পারেন, তিনি যদি কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন, তবে তিনি ভারতের নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন না।
১০. নাগরিকত্বের অধিকার বজায় রাখা।— এই ভাগের পূর্বোক্ত কোন বিধানের অধীন যিনি নাগরিক বা নাগরিক বলিয়া গণ্য, সংসদের দ্বারা প্রণীত যে কোন আইনের বিধান সাপেক্ষে, তিনি নাগরিক বলিয়া অব্যাহত থাকিবেন।
১১. নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ন্ত্রণের জন্য সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা।— এই ভাগের কোন বিধান সংসদের নাগরিকত্ব অর্জন, পরিহার বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমাকে খর্ব করিবে না।
ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মূলনীতি নির্ধারণ করে। সংবিধান প্রারম্ভকালে ভারতীয় ভূখণ্ডে যাহাদের আবাস ছিল এবং যাঁহারা ভারতভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, অথবা যাঁহার পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষগণ ভারতীয় ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, অথবা যাঁহারা নিরবিচারে পাঁচ বৎসর কাল বসবাস করিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই ভারতের নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন।
পাকিস্তান হইতে ভারতে আগত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকত্ব প্রদান করা হইয়াছে। ১৯ জুলাই ১৯৪৮ তারিখের পূর্বে যাঁহারা আগমন করিয়াছেন, তাঁহাদের স্বাভাবিক বসবাসই যথেষ্ট। উক্ত তারিখের পর যাঁহারা আগমন করিয়াছেন, তাঁহাদেরকে সংবিধান কার্যকর হইবার পূর্বে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট নিবন্ধিত হইতে হইয়াছে এবং আবেদনপূর্ব ছয় মাস ভারতে বাস করিতে হইয়াছে।
অন্যদিকে, ১লা মার্চ ১৯৪৭ পর পাকিস্তানে যাঁহারা গমন করিয়াছেন, তাঁহারা নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন না; তবে যদি তাঁহারা আইনানুযায়ী পুনর্বাসনের অনুমতি লইয়া ভারতে প্রত্যাগত হন, তবে তাঁহাদের নাগরিকত্বের দাবি স্বীকৃত হইতে পারে।
ভারতের বাহিরে বসবাসরত ভারতীয় উৎসসম্পন্ন যাঁহারা, অর্থাৎ যাঁহাদের পূর্বপুরুষ ভারতভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারাও নির্ধারিত রীতিতে আবেদন করিয়া ও নিবন্ধিত হইয়া নাগরিকত্ব লাভ করিতে পারেন।
কিন্তু, যেই ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অপর কোন রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিয়াছেন, তিনি আর ভারতীয় নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন না।
সংবিধান এইরূপ নাগরিকত্বের অধিকার প্রদান করিলেও সংসদ ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত যে কোন বিষয়, যেমন—অর্জন, পরিহার ও নিয়ন্ত্রণ—বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিবার পূর্ণ অধিকার রাখে।
আইনি অর্থে, নাগরিকত্ব (Citizenship) হইতেছে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার একটি আনুষ্ঠানিক, আইনসম্মত সম্পর্ক, যাহার মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রের আইনের অধীন বিশেষ অধিকার, সুবিধা ও দায়িত্ব লাভ করে। অপরদিকে, জাতীয়তা (Nationality) হইতে পারে জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচিতি; কিন্তু নাগরিকত্ব সর্বাংশে আইনিক ও রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়।
উদাহরণস্বরূপ, জাপানে বসবাসকারী জাতিগত কোরীয় ব্যক্তি জাপানের নাগরিকত্ব ধারণ করিতে পারেন, কিন্তু তাহার জাতীয় পরিচিতি কোরীয় বলিয়াই গণ্য হয়। অর্থাৎ, তাহার নাগরিকত্ব জাপানি হইলেও জাতীয়তা কোরীয়।
আবার, যাঁহাদের কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনিক নাগরিকত্ব সম্পর্ক নাই, তাহারা রাষ্ট্রহীন (Stateless persons) বলিয়া পরিচিত। কিন্তু তাহারাও কোনও জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত হইয়া জাতীয়তা ধারণ করিতে পারেন—যেমন, কিছু রাষ্ট্রে বসবাসরত কুর্দ সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিবর্গ।
কিছু কিছু রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব ও জাতীয়তার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রহিয়াছে। যেমন—যুক্তরাজ্যে, “British nationals (overseas)” নামে পরিচিত একটি শ্রেণি রহিয়াছে যাহারা সম্পূর্ণ British citizens নহেন; তাঁহাদের অধিকার সীমিত। হংকং ও ম্যাকাও অঞ্চলে বাসিন্দারা আইনি দৃষ্টিকোণে চীনা জাতীয় (Chinese nationals) হইলেও, তাঁহারা পৃথক ও বিশেষ নাগরিকত্বসদৃশ মর্যাদা ভোগ করেন (যেমন—HKSAR passports)। এই অঞ্চলের বাসিন্দারা “এক দেশ, দুই ব্যবস্থা” (One Country, Two Systems) নীতির অধীনে বিদেশি নাগরিকত্বের অধিকার ও সুবিধা সংরক্ষণ করিয়া থাকেন।
ইসরায়েল: ইসরায়েল রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব ও জাতীয়তার ধারণা পরস্পরের সহিত অভিন্ন নহে, বরং ইহারা স্বতন্ত্র দুইটি সত্তা—একটি আইনিক, অপরটি জাতিগত ও ধর্মীয়। “নাগরিকত্ব” (אזרחות, Ezrachut) হইতেছে রাষ্ট্রের প্রতি আইনি আনুগত্য, যাহা ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অন্যান্য অধিকার প্রদান করে; অপরদিকে “জাতীয়তা” (לאום, Le’om) নির্দেশ করে ইহুদিদের ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়, যাহা হালাখা অনুসারে সংজ্ঞায়িত এবং যাহার ভিত্তিতে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত “Law of Return”-এর দ্বারা বিশ্বের যেকোনো ইহুদি ব্যক্তি ইসরায়েলে অভিবাসন ও নাগরিকত্বের দাবি করিতে পারেন। তবে ইহুদী জাতীয়তা থাকিলেই নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ হয় না; তদজন্য আনুষ্ঠানিক অলিয়াহ (Aliyah) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিতে হয়।
ইহুদী জাতীয়তার সংজ্ঞা প্রধানতঃ Orthodox মতবাদের অধীন, যাহার ফলে Reform বা Conservative মতানুসারী ইহুদিগণ ধর্মান্তরের প্রশ্নে বৈষম্যের সম্মুখীন হন। পূর্বে ইসরায়েলি পরিচয়পত্রে “নাগরিকত্ব” ও “জাতীয়তা” উভয়ই পৃথকভাবে উল্লেখ ছিল—কেহ “ইসরায়েলি নাগরিক” হইলেও তাহার জাতীয়তা “ইহুদি”, “আরব”, “দ্রুজ” ইত্যাদি হইতে পারিত। “Nation-State Law, 2018” অনুযায়ী ইহুদিদের জাতীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি বলিয়া ঘোষিত করা হইয়াছে, যাহাতে সংখ্যালঘু নাগরিকদের সমতা ও অধিকার প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ইহা ইসরায়েলকে একাধারে “ইহুদি রাষ্ট্র” ও “গণতন্ত্র” হইবার মধ্যে একটি উত্তেজনাপূর্ণ দ্বন্দ্বে নিক্ষিপ্ত করিয়াছে। উল্লেখযোগ্য যে, ইসরায়েল দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে এবং বহু ইসরায়েলি ইহুদি ব্যক্তির বিদেশি পাসপোর্ট রহিয়াছে, যাহা ইহাদের বহুস্বরিক পরিচয়ের প্রতিফলনস্বরূপ বিবেচিত।
Read More
