ভারতের সঙ্ঘ ও তাহার ভূখণ্ড: গণ-প্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষের সংবিধান 

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ভারতের সংবিধান

প্রস্তাবনা (Preamble)

প্রথম ভাগ

ভারতীয় সঙ্ঘ ও তাহার ভূখণ্ড

১. সঙ্ঘের নাম ও ভূখণ্ড।— (১) ইন্ডিয়া, অর্থাৎ ভারতবর্ষ, এক রাজ্যসমষ্টিগত সঙ্ঘ (Union of States) হইবে।

[](২) রাজ্যসমূহ ও তাহাদের ভূখণ্ড প্রথম তফসিলে যেরূপ নির্ধারিত, সেইরূপ হইবে।

(৩) ভারতের ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করিবে—
(ক) রাজ্যসমূহের ভূখণ্ডসমূহ;
[২](খ) প্রথম তফসিলে নির্দিষ্ট কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভূখণ্ড; এবং
(গ) যেকোনো অতিরিক্ত ভূখণ্ড, যাহা অধিগৃহীত হইতে পারে।

২. নূতন রাজ্য গৃহীতকরণ বা স্থাপন।— সংসদ বিধি দ্বারা, উপযুক্ত শর্ত ও বিধান অনুসারে, নূতন রাজ্য সঙ্ঘে গৃহীত করিতে অথবা স্থাপন করিতে পারিবে।

[] [২ক. সিক্কিমের সঙ্ঘভুক্তি] (সংবিধানের ৩৬তম সংশোধন আইন, ১৯৭৫ দ্বারা (ধারা ৫) রহিত, কার্যকর ২৬-৪-১৯৭৫ হইতে।)

৩. নূতন রাজ্য গঠন এবং বর্তমান রাজ্যের সীমা, সীমানা বা নাম পরিবর্তন।— সংসদ বিধি দ্বারা—
(ক) কোন রাজ্য হইতে ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করিয়া বা দুই বা ততোধিক রাজ্য অথবা রাজ্যের অংশসমূহ একত্র করিয়া অথবা কোন ভূখণ্ডকে অন্য রাজ্যের অংশভুক্ত করিয়া, নূতন রাজ্য গঠন করিতে পারিবে;
(খ) কোন রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি করিতে পারিবে;
(গ) কোন রাজ্যের আয়তন হ্রাস করিতে পারিবে;
(ঘ) কোন রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন করিতে পারিবে;
(ঙ) কোন রাজ্যের নাম পরিবর্তন করিতে পারিবে:

[] তবে শর্ত এই যে, উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যে কোন বিল সংসদের উভয় কক্ষে উপস্থাপিত হইবে না, যদি না রাষ্ট্রপতির সুপারিশপ্রাপ্ত হয় এবং যেক্ষেত্রে উক্ত বিলের প্রস্তাব কোনও রাজ্যের [৫] আয়তন, সীমানা বা নামকে প্রভাবিত করে, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি উক্ত বিল সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভায় মতামতের জন্য প্রেরণ করিবেন, এবং উক্ত বিধাননির্দেশে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত অতিরিক্ত সময়সীমার মধ্যে সেই মতামত প্রদান করিতে হইবে, এবং উক্ত নির্ধারিত বা অনুমোদিত সময়সীমা অতিবাহিত হইলে বিল উপস্থাপিত হইতে পারিবে।

ব্যাখ্যা ১— এই অনুচ্ছেদের (ক) হইতে (ঙ) উপধারায় “রাজ্য” শব্দে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু শর্তাংশে “রাজ্য” দ্বারা কেবলমাত্র রাজ্য বোঝায়, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নয়।

ব্যাখ্যা ২— (ক) উপধারায় সংসদের উপর যেই ক্ষমতা অর্পিত, তাহাতে কোন রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অংশকে অপর রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সঙ্গে একত্র করিয়া নতুন রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করিবার ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত।

৪. অনুচ্ছেদ ২ ও ৩ অনুসারে গৃহীত আইন প্রথম ও চতুর্থ তফসিল সংশোধন এবং পরিপূরক বিষয়াবলির জন্য বিধান রাখিবে।—
[৬] (১) অনুচ্ছেদ ২ বা ৩ অনুসারে যেই বিধি গৃহীত হইবে, তাহাতে প্রথম তফসিল ও চতুর্থ তফসিলের প্রয়োজনীয় সংশোধন সংক্রান্ত বিধান থাকিবে, এবং সেইসঙ্গে এমন পরিপূরক, আনুষঙ্গিক ও ফলশ্রুত বিধান (যেমন সংসদে ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা রাজ্যসমূহের বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত বিধান) অন্তর্ভুক্ত হইতে পারিবে, যাহা সংসদ উপযুক্ত মনে করিবে।

(২) উপর্যুক্ত ধারা অনুসারে গৃহীত কোন আইনকে সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদের দৃষ্টিকোণে সংবিধানের সংশোধন বলিয়া গণ্য করা যাইবে না।


ভারতীয় সঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত রাজ্যসমূহ কেবলমাত্র প্রশাসনিক উপাদান, তাহারা যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকার ন্যায় সঙ্ঘ-গঠনকারী উপাদান নহে। যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকায়, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাজ্যসমূহ একত্রিত হইয়া এক সঙ্ঘাত্মক রাষ্ট্র গঠনের পন্থা গ্রহণ করিয়াছিল; কিন্তু ভারতবর্ষে রাজ্যসমূহ মূলতঃ সঙ্ঘের অধীনস্থ প্রশাসনিক বিভাগমাত্র। ইহাদের আয়তন বৃদ্ধি বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ভারতের সঙ্ঘ সরকারের হস্তে অর্পিত।

তবে, এই বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণীয় যে, রাজ্যসভা—যা সংসদের উচ্চকক্ষ—তাহার সদস্যবৃন্দ কেবলমাত্র পৃথক পৃথক রাজ্য হইতেই নির্বাচিত হন। অতএব, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় রাজ্যসমূহের সক্রিয় ভূমিকা রহিয়াছে এবং তাহারা সম্মিলিতভাবে ভারতের সঙ্ঘাত্মক প্রবণতা ও নীতিবোধের প্রতিফলন প্রদান করে।

ভারত ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হইলেও, তাহাদের সাংবিধানিক কাঠামো বহু দিক হইতে পরস্পর অপেক্ষা ভিন্নতর। উভয় রাষ্ট্রে শাসনব্যবস্থা লিখিত সংবিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং দুইটি রাষ্ট্রই একটি সঙ্ঘাত্মক কাঠামো অনুসরণ করিয়া চলে; তথাপি, তাহাদের সঙ্ঘতাত্ত্বিক ভিত্তি, ক্ষমতার বিভাজন, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক, বিচারব্যবস্থা, এবং সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতিতে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।

ব্রিটিশগণ ভারত ত্যাগের পূর্বে ভারতের একটি অংশ ছিন্ন করিয়া এক স্বাধীন ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করেন, যাহার নাম পাকিস্তান। ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ এই মর্মে ক্ষমতা প্রদান করে যে, ভারত পূর্বতন ঐ ছিন্নভিন্ন ভূখণ্ড—পাকিস্তান—পুনরায় অধিগ্রহণ (রাষ্ট্রের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার) করিয়া তাহাকে ভারতীয় সঙ্ঘের অন্তর্গত রাজ্যরূপে পরিণত করিতে পারে। সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে উক্ত অন্তর্ভুক্তি ও প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ করিতে সক্ষম।

অতএব, ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান বা বাংলাদেশ আক্রমণ করিবার বা উহাদিগকে ভারতের সঙ্ঘে অন্তর্ভুক্ত করিবার পূর্বে অন্য কোনো পক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। উহারা একদা ঐতিহাসিক ভারতভূমির অংশ ছিল বলিয়াই, উহাদের পুনঃঅন্তর্ভুক্তি ভারতীয় সার্বভৌম অধিকারের অন্তর্গত বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক সাংবিধানিক কাঠামো

১. সঙ্ঘতাত্ত্বিক কাঠামোর প্রকৃতি

যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্ঘ গঠিত হইয়াছে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাজ্যসমূহের সম্মিলনে। সংবিধানের মাধ্যমে এই রাজ্যসমূহ এক স্বতন্ত্র সঙ্ঘ গঠনের জন্য সম্মত হয়। এই সঙ্ঘ গঠন ছিল তলদেশীয় (bottom-up) প্রক্রিয়া, অর্থাৎ রাজ্যই ছিল মূল ও প্রাথমিক একক।

ভারত: ভারতবর্ষের সঙ্ঘ একটি একত্রীকৃত রাষ্ট্র কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সঙ্ঘ সরকারই মুখ্য এবং রাজ্যসমূহ তাহার প্রশাসনিক উপাদান মাত্র। সংবিধান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে—“India, that is Bharat, shall be a Union of States”—কিন্তু এই সঙ্ঘে রাজ্যসমূহ স্বাধীন সত্তা নয়। সুতরাং ইহা একটি শীর্ষনির্ভর (top-down) সঙ্ঘ।

২. রাজ্যসমূহের মর্যাদা ও পরিবর্তনক্ষমতা

যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে পরিবর্তিত হইতে পারে না। একবার কোনও রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হইলে, তাহার অস্তিত্ব সংরক্ষিত থাকে এবং তাহার আয়তন, সীমা বা নাম ইচ্ছামত পরিবর্তন করা যায় না।

ভারত: ভারতে সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে যেকোন রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি বা হ্রাস, নাম পরিবর্তন বা বিভাজন করিতে পারে, রাষ্ট্রপতির সুপারিশক্রমে ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য বিধানসভার মতামত গ্রহণ করিয়া। তবে সেই মতামত বাধ্যতামূলক নহে। সুতরাং রাজ্যের অস্তিত্ব সঙ্ঘ সরকারের ইচ্ছাধীন।

৩. সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি

যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধান সংশোধনের জন্য কঠিন প্রক্রিয়া নির্ধারিত রহিয়াছে। সংশোধনের প্রস্তাব কংগ্রেসের দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন সাপেক্ষে গৃহীত হইয়া, ৫০টি রাজ্যের মধ্যে অন্তত ৩৮টি রাজ্যের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

ভারত: ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া তুলনায় সহজ। অনেক ক্ষেত্রে কেবল সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটেই সংশোধন সম্ভব। কেবলমাত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা রাজ্য-কেন্দ্র সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে, অর্ধেক রাজ্যের অনুমোদন আবশ্যক হইয়া থাকে।

৪. ক্ষমতার বিভাজন

যুক্তরাষ্ট্র: ক্ষমতা তিনটি পৃথক স্তম্ভে—বিধায়ন, নির্বাহ ও বিচার বিভাগে সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার পরস্পর পৃথক ও স্বাধীন ক্ষমতা ভোগ করে। ক্ষমতার সীমা যুক্তরাষ্ট্রে সুগঠিতভাবে নির্ধারিত।

ভারত: ভারতে আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, কৃষি, ভূমি প্রভৃতি অনেক বিষয়ে রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়েরই কর্তৃত্ব রহিয়াছে (সমবায় তালিকা)। তবে সংঘ সরকার অধিক ক্ষমতা অধিকার করে, এবং জরুরি অবস্থায় রাজ্যের অধিকাংশ ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট কেন্দ্রীভূত হয়।

৫. রাজ্যসভা ও সিনেট

যুক্তরাষ্ট্র: সিনেটরগণ প্রত্যেক রাজ্য হইতে সমসংখ্যক (২ জন) নির্বাচিত হন, রাজ্যের জনসংখ্যা নির্বিশেষে। ফলে ছোট রাজ্যও সম মর্যাদা ভোগ করে।

ভারত: রাজ্যসভায় সদস্যসংখ্যা রাজ্যের জনসংখ্যা অনুসারে নির্ধারিত হয়। অতএব, বৃহৎ রাজ্যের প্রভাব তুলনায় অধিক। তদ্ব্যতীত, রাজ্যসভা কার্যত সংসদের উচ্চকক্ষ হইলেও সংসদীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্রীকরণ উপলব্ধ হয়।

ভারতীয় সঙ্ঘ গঠনের ক্ষেত্রে এমন কখনোই হয় নাই যে, পৃথক স্বতন্ত্র রাজ্যসমূহ পারস্পরিক এক সম্মিলিত চুক্তির ভিত্তিতে একত্র হইয়া ভারতীয় সঙ্ঘ গঠন করিয়াছিল। অতএব, যদি কোন রাজ্য নিজেদের স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করিয়া সঙ্ঘ হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিত, তাহা হইলে ভারতীয় সঙ্ঘের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হইত—এইরূপ যুক্তি বা আশঙ্কা ভারতীয় সংবিধান অনুমোদন করে না। বরং, সংবিধানে স্পষ্টভাবে প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, ভারত এক অবিভাজ্য সঙ্ঘ এবং তাহার অখণ্ডতা, ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ করিবার দায়িত্ব ভারতের রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর অর্পিত।

দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা কিংবা বৈদেশিক আক্রমণের সময়, ভারতের সামগ্রিক অখণ্ডতা রক্ষার্থে সঙ্ঘ সরকার প্রয়োজনে দেশের যে-কোন অংশে শাসন প্রতিষ্ঠা করিতে পারে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫৬ ও সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ এইরূপ শাসনব্যবস্থার বিধান প্রদান করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপ দমন করিবার জন্য এই সংবিধানপ্রদত্ত ক্ষমতা বলবৎ করিয়াছিলেন, যাহার মাধ্যমে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ ঐক্য সংরক্ষণের প্রয়াস গ্রহণ করেন।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল