সম্পূর্ণ বাল্মীকি রামায়ণ: তন্ময় ভট্টাচার্য অনূদিত এবং সম্পাদিত
শ্রীমদ্বাল্মীকিযরামায়ণে আদিকাব্যে অযোধ্যাকাণ্ডে দ্বিতীয়ঃ সর্গঃ
ततः परिषदं सर्वामामन्त्र्य वसुधाधिपः।
हितमुद्धर्षणं चैवमुवाच प्रथितं वचः॥ १॥
তৎপর রাজসভায় সমস্ত মনীষীবর্গকে আহ্বান করিয়া ভূপতি দশরথ রাজা কল্যাণপ্রদ, উৎসাহবর্ধক, সর্বজনজানিত বাক্য বলিলেন। তাঁহার স্বর ছিল গম্ভীর, মেঘঘন মৃদঙ্গের অনুরণিত নিনাদের সদৃশ; তিনি যেন বারিধর জীমূতের নিনাদ করিলেন।
রাজলক্ষণে সমন্বিত, রসসম্পৃক্ত, প্রীতিজনক, অপরূপ কণ্ঠস্বরে নৃপতি সমাগত রাজগণকে বলিলেন—
“হে সভ্যগণ! তোমরা অবগত আছ, যেরূপে আমার রাজ্য পূর্বতন রাজর্ষিগণ পুত্ররীতি পালন করিয়াছেন।
আমি, ইক্ষ্বাকুবংশীয় সেই সকল নরপতির আদর্শ অনুসরণ করিয়া, সর্বজগতের হিতার্থে শান্তি ও কল্যাণে নিয়োজিত হইতে ইচ্ছুক।
যেরূপে পূর্বপুরুষগণ পথ প্রদর্শন করিয়াছেন, সেইরূপে অনিদ্রাভাবে আমি সর্বদা প্রজাবর্গের রক্ষা করিয়া আসিতেছি।
এই দেহ, ধবল ছাতার নীচে, সমগ্র লোকের কল্যাণার্থে চিরকাল ক্লিষ্ট হইয়াছে।
সহস্রাধিক বৎসর রাজ্যপালন করিয়া, এই কাষ্ঠদেহে বার্ধক্য প্রাপ্ত হইয়া, আমি এখন বিশ্রামের অভিলাষী।
যে রাজ্যশক্তি জয়ী নহে তাহা নিতান্ত দুর্বহ, রাজার প্রভাব দুর্নিবার, আমি ক্লান্ত।
তাহার ফলে, আমি ইচ্ছা করি— আমার পুত্রকে রাজ্যভার প্রদান করিয়া নিজে প্রশান্তি প্রাপ্ত হই। সন্নিকট দ্বিজগণ ও সভাসদগণের অনুমতি লইয়া আমি এই সিদ্ধান্ত করিতেছি।
আমার জ্যেষ্ঠপুত্র রাম— গুণে অনুগত, শক্তিতে ইন্দ্রের সদৃশ, রণে শত্রুনিগ্রাহক।
পুষ্যনক্ষত্রে চন্দ্রের সহিত মিলনের ন্যায়, ধর্মপ্রিয় রামকে আমি রাজ্যের যুবরাজপদে অধিষ্ঠিত করিব।
লক্ষ্মণের অগ্রজ রাম, সৌভাগ্যশালিনী লক্ষ্মীর ধারক, তোমাদের সদর্থে অনুপযুক্ত নহেন।
তাঁহার ন্যায় অধিপতি থাকিলে, তিনলোকেরও কল্যাণপ্রাপ্তি নিশ্চিত।
তাহাকে যুবরাজ করিয়া, আমি রাজ্যের ভার প্রদান করিব, ও স্বস্তির সহিত বিশ্রাম প্রাপ্ত হইব।
যেহেতু আমি এই প্রস্তাব যথার্থ বিবেচনা করিয়াছি, অতএব তোমরা মত প্রকাশ কর— এই সিদ্ধান্ত আমি কিরূপে সম্পন্ন করিব?”
“যদিও রামের প্রতি আমার প্রীতি সর্বাধিক, তথাপি কল্যাণপন্থা যাহা হউক, ভিন্নমতও শ্রবণ করিব। মধ্যস্থ চিন্তা যদ্যপি সর্বোৎকৃষ্ট, তথাপি দ্বন্দ্ববিচার অপেক্ষা উত্তম।” (यद्यप्येषा मम प्रीतिर्हितमन्यद् विचिन्त्यताम्। अन्या मध्यस्थचिन्ता तु विमर्दाभ्यधिकोदया॥)
রাজা এইরূপ বলিলে, সকলে আনন্দভরে সাড়া দিলেন, যেন বৃষ্টিসমেত মেঘনিনাদে ময়ূরগণ নৃত্য করিতেছে।
সেই আনন্দধ্বনিতে গম্ভীর অনুনাদ উঠিল; জনতার উল্লাসে পৃথিবী যেন কাঁপিয়া উঠিল।
তাঁহার ধর্মতত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধি করিয়া, ব্রাহ্মণ, সৈন্যাধ্যক্ষ ও পুরজানপদের প্রতিনিধিগণ সম্মতচিত্তে বলিলেন—
“হে রাজন! আপনি বহু সহস্র বৎসরের বৃদ্ধ, অতএব রঘুকুলশ্রেষ্ঠ রামকে যুবরাজ করিয়া অভিষিক্ত করুন।
আমরা ইচ্ছা করি— বৃহৎ গজে আরোহণ করিয়া, মহারাজপুত্র রাম যেন ছত্রচ্ছায়ায় গমন করেন।”
তাঁহাদের মুখ হইতে এই বাক্য শ্রবণ করিয়া, রাজা, যদ্যপি নিজ সিদ্ধান্ত পূর্বে লইয়াছেন, তথাপি অজ্ঞাতবেশে জিজ্ঞাসা করিলেন—
“ভবন্তগণ কেন যুবরাজরূপে রামকে দেখিতে আগ্রহী, যেহেতু এখনো আমি ধর্মপথে রাজ্য শাসন করিতেছি?”
তখন সেই মহাজনগণ বলিলেন— “হে রাজন! আপনার পুত্র রামের বহু গুণ বর্তমান।
তাঁহার গুণাবলী আজ আমরা কহি, শুনুন— যিনি দেবতুল্য, সদাচারশীল, প্রজ্ঞাসম্পন্ন।
রাম দেবগুণে শ্রীযুক্ত, ইন্দ্রের সদৃশ, সত্যে স্থিত। ইক্ষ্বাকুবংশীয়গণের মধ্যেও তিনি শ্রেষ্ঠ।
রাম সত্যপ্রাণ, সদাচারসম্পন্ন, যাঁহার নিকট ধর্ম স্বয়ং সহশ্রী সহ উত্তীর্ণ।
চন্দ্র যেমন প্রজাদের প্রিয়, ভূমির ন্যায় যাঁহার ক্ষমাশক্তি, বুদ্ধিতে বৃहস্পতি ও বীর্যে ইন্দ্রসদৃশ।
ধর্মজ্ঞ, সত্যনিষ্ঠ, শীলোত্তম, অনসূয়ক, কৃপালু, সংযতেন্দ্রিয়, কৃতজ্ঞ।
মৃদু, স্থিরচেতা, সদা কল্যাণপ্রদ, সত্যপ্রতিশ্রুত, ভগবান বিষ্ণুর ন্যায়।
ব্রাহ্মণগণের সেবা ও সান্নিধ্যপ্রিয়; এইজন্য তাঁহার যশঃ ও কীর্তি অসীম।
সমস্ত অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী, বেদাঙ্গসমেত শাস্ত্রজ্ঞ।
গান্ধর্ববিদ্যায় শ্রেষ্ঠ, ভ্রাতা ভরত হইতে জ্যেষ্ঠ, মহামতি, অধীনহৃদয় নন।
ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে শৈশব হইতেই প্রশিক্ষিত করিয়াছেন (द्विजैरभिविनीतश्च )।
সুমিত্রাপুত্র লক্ষ্মণের সহিত যখন রণক্ষেত্রে যাত্রা করেন, তখন বিজয় ব্যতীত প্রত্যাবর্তন করেন না।
রণ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর, পুরবাসীকে সন্তানসম মনে করিয়া জিজ্ঞাসা করেন— কেমন আছ?
তাঁহার সংলাপ— “তোমরা সন্তানের ন্যায় আমার, ব্রাহ্মণগণ যেন সদা শস্ত্রচর্চায় নিযুক্ত থাকো।”
মানুষের দুঃখে দুঃখভাজন হন, উৎসবে পিতার ন্যায় প্রসন্ন হন।
সত্যবাদী, বৃহৎ ধনুর্ধর, গুরুসেবা পরায়ণ, সংযত।
স্মিতভাষী, ধর্মপন্থী, যুক্তিযুক্ত এবং যুক্তিবাদী বক্তা।
সুন্দর ভ্রুসমূহ, দীর্ঘ লালচোখ; বিষ্ণুর ন্যায়ই যেন স্বরূপ।
রামের শৌর্যবীর্য, প্রজাপালন ও সংযমে বিশ্বমুগ্ধ।
তিনিই ত্রিলোক ভোগ করিতে সক্ষম, তথাপি ক্রোধহীন ও প্রশান্ত।
যাহা দণ্ডযোগ্য নয় তাহা কখনো বধ করেন না, কামনানুযায়ী লোভহীন।
তপস্বীগণের প্রীতিজনক, প্রজাবর্গে গুণবলে দীপ্তিমান্ যেন সূর্য।
এইরূপ গুণে সমন্বিত রাম— সত্যবীর্যবান্, লোকনাথসদৃশ— মর্ত্যে অধিপতিত্ব প্রাপ্ত হউন। হে রাজন! সৌভাগ্যক্রমে এমন সন্তান তোমার জন্মিয়াছে, যেমন মারীচ কশ্যপের পুত্র। রামের বল, আয়ু, স্বাস্থ্যের কথা দেব, অসুর, মানব, গন্ধর্ব, নাগ— সকলেই আশীর্বাদ করিয়া থাকে। পুর ও গ্রামবাসী (सर्वो राष्ट्रे )সকলেই সকালের ও সন্ধ্যায় তাঁহার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেন। স্ত্রী, বৃদ্ধা, কিশোরী সকলেই রামের কল্যাণের জন্য দেবতাকে প্রণত (देवान्नमस्यन्ति) হন।
তাঁহাদের এই প্রার্থনা আপনার কৃপায় পূর্ণতা প্রাপ্ত হউক। আমরা ইচ্ছা করি— শত্রুনাশী, ইন্দীবরবর্ণ, রাজপুত্র রাম যেন যুবরাজরূপে রাজ্য অলংকৃত করেন। এই আত্মজ— যিনি দেবতুল্য, যিনি সর্বজনে হিতনিষ্ঠ, তাহাকে আপনি অতিশীঘ্র অভিষিক্ত করুন।”
तं देवदेवोपममात्मजं ते
सर्वस्य लोकस्य हिते निविष्टम्।
हिताय नः क्षिप्रमुदारजुष्टं
मुदाभिषेक्तुं वरद त्वमर्हसि॥ ५४॥
ইতি শ্রীমদ্রামায়ণে অযোধ্যাকাণ্ডে দ্বিতীয়ঃ সর্গঃ।
