সম্পূর্ণ বাল্মীকি রামায়ণ: তন্ময় ভট্টাচার্য অনূদিত এবং সম্পাদিত
শ্রীমদ্রামায়ণে আদিকাব্যে অযোধ্যাকাণ্ডে প্রথমঃ সর্গঃ
তৎকালে ভরত যখন মাতুলালয়ে যাইতেছিলেন, তখন চিরশত্রুবিজয়ী শত্রুঘ্নও প্রীতিপূর্বক তাঁহার সহগামী হইলেন। তাহারা উভয়ে সেখানে মাতা-কর্তৃক যথোচিত আদরে অভ্যর্থিত হইয়া, মাতুল রাজাশ্বপতি কর্তৃক পুত্রস্নেহে পালিত হইলেন। তাহারা সেইখানেই বাস করিয়া, নানা প্রীতিকর ভোগে পরিতৃপ্ত হইয়া, বৃদ্ধ রাজা দশরথকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করিতে লাগিলেন।
অপরদিকে, মহাতেজস্বী রাজাও কদাচিৎ তাঁহার প্রবাসী দুই পুত্র— ভরত ও শত্রুঘ্নকে স্মরণ করিতেন, যাঁহারা মহেন্দ্র ও বরুণ সদৃশ। রাজার সেই চারিপুত্রই তাঁহার সর্বাধিক প্রিয়, যেন স্বশরীর হইতে উৎপন্ন চারিভুজ।
তাঁহাদের মধ্যেও, রাম পিতার অতি প্রিয় (रामो रतिकरः पितुः), যিনি প্রভু স্বয়ম্ভূর ন্যায় গুণসম্পন্ন ও সকল জীবের শ্রেষ্ঠগুণে ভূষিত। সেই রামই দেবতাদের অনুরোধে রাবণের বিনাশার্থে মানবলোকে জন্মগ্রহণ করিলেন— তিনি চিরন্তন যজ্ঞময় বিষ্ণু। (स हि देवैरुदीर्णस्य रावणस्य वधार्थिभिः। अर्थितो मानुषे लोके जज्ञे विष्णुः सनातनः) তাঁহার অতুল তেজস্বী সেই পুত্র লাভে কৌসাল্যা দেবী অপূর্ব শোভা পাইয়াছিলেন, যেন অদিতি স্বয়ং বজ্রধর ইন্দ্রকে পুত্ররূপে প্রাপ্ত হইয়াছেন।
রাম সুন্দরভাবে গঠিত, বীর্যবান, দোষরহিত, এই ধরণীতলে অতুলনীয় গুণসম্পন্ন সন্তান, যিনি গুণে দশরথের তুল্য। তিনি সর্বদা শান্তপ্রকৃতি, নম্রভাষী, কঠোর বাক্যে প্ররোচিত হইলেও কদাচিৎ প্রতিবাদ করেন না। কোনো এক উপকারেই পরম সন্তুষ্ট হন, কিন্তু শত অপকারও আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিয়া কদাচিৎ স্মরণ করেন না।
তিনি শীল, জ্ঞান ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাধুজনদের সহিত সদা সদ্ব্যবহারী এবং অস্ত্রবিদ্যায়ও বিশারদ। তিনি বুদ্ধিমান, মধুরভাষী, প্রথমে সম্ভাষণকারী, প্রিয়কথক, স্বগুণে বিস্মিত নহয়; বরং বিনম্র। তিনি মিথ্যাভাষী নহেন, বিদ্বান, বয়োজ্যেষ্ঠদের পূজক, প্রজাগণের নিকট প্রিয় ও প্রজারাও তাঁহার নিকট অনুরক্ত। তিনি দয়ালু, ক্রোধজয়ী, ব্রাহ্মণপূজক, দরিদ্রানুকম্পী, ধর্মজ্ঞ, সংযমী, পবিত্র।
তিনি বংশোচিত বুদ্ধিসম্পন্ন, ক্ষত্রধর্ম শ্রদ্ধাপূর্বক পালনকারী, যাহা তিনি স্বর্গলাভের উপায় বলিয়া মানেন। তিনি কদাচিৎ অপথে গমন করেন না, বিরুদ্ধকথা ভালবাসেন না, উচিৎ-উত্তর যুক্তি দ্বারা কহিতে সক্ষম, যেন বাচস্পতি। তিনি রোগমুক্ত, যৌবনদীপ্ত, বাগ্মী, সুদেহী, দেশ-কালজ্ঞানসম্পন্ন, লোকচরিত্রবোধযুক্ত, সদ্গুণসম্ভার। প্রজাগণের হৃদয়ে তিনি যেন বহির্বাসী প্রাণরূপে গুণগতভাবে প্রিয়, রাজপুত্র হইলেও একমাত্র সদ্গুণে শ্রেষ্ঠ।
তাঁহার বিদ্যা ও ব্রতের স্নান সম্পন্ন, যথাযথ ভাবে সংহিতাযুক্ত বেদবিদ্যা অর্জিত (सर्वविद्याव्रतस्नातो यथावत् साङ्गवेदवित्)। তিনি ধনুর্বিদ্যায় পিতার হইতেও শ্রেষ্ঠ, ভরত হইতে জ্যেষ্ঠ।
তিনি কল্যাণকুলজ, সদাচারী, নিরহঙ্কার, সত্যবাদী ও ঋজু। তিনি প্রবীণ দ্বিজগণ কর্তৃক সুপাঠিত, যাহারা ধর্ম ও অর্থতত্ত্বজ্ঞ।
তিনি ধর্ম, কাম, অর্থ (धर्मकामार्थतत्त्वज्ञः)— এই তিন তত্ত্বে পটু, স্মৃতিধর, বুদ্ধিমান ও লোকাচারে দক্ষ। তিনি গম্ভীর, সংযমী, গোপননীতি রক্ষাকারী, সহায়বৎসল, ক্রোধ ও আনন্দ নিরর্থক নহে, দান ও সংযমে পারদর্শী। তাঁহার ভক্তি দৃঢ়, প্রজ্ঞা স্থির, কদাচিৎ অপথগ্রাহী, কখনো কটু বাক্য বলেন না।
তিনি আলস্যহীন, সদা সতর্ক, নিজের ও পরের দোষ জানেন। তিনি শাস্ত্রজ্ঞ, কৃতজ্ঞ ও লোকচরিত বোধকারী।
তিনি দমন ও অনুগ্রহের মধ্যে যথাযথ ন্যায়ে পার্থক্য করিতে সমর্থ। তিনি সজ্জনবর্গে প্রীতিযুক্ত, সহায়কে অনুগ্রহী, উপযুক্ত দমনকারী। রাজকর্মের আয়, ব্যয় ও কৌশল বিষয়ে পারদর্শী (आयकर्मण्युपायज्ञः)।
তিনি অস্ত্রসমূহে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছেন, মিশ্র অস্ত্রেও দক্ষ। তিনি ধর্ম ও অর্থসমূহ আত্মসাৎ করিয়া সুখে জীবনযাপন করেন, আলস্যে লিপ্ত হন না। সকল শিল্পকলার তত্ত্বজ্ঞান, অর্থের বিভাগজ্ঞান (विज्ञातार्थविभागवित्।) তাঁহার আছে।
হস্তী ও অশ্ব-প্রশিক্ষণে সম্যক্ দক্ষ।
তিনি ধনুর্বিদ্যায় শ্রেষ্ঠ, মহারথীদের মধ্যে শ্রদ্ধার্হ, আক্রমণকারী, আঘাতকারী ও সেনানায়ক হিসেবে বিশারদ।
যুদ্ধক্ষেত্রে দানব বা দেবগণ ক্রুদ্ধ হইলেও, তিনি অপরাজেয়। তিনি নিরহঙ্কার, ক্রোধজয়ী, অহংকারী নহেন, ঈর্ষাকাতর নহেন।
সকল জীবের প্রতি আদরণীয়, কালের অধীন নহেন।
এইরূপে শ্রেষ্ঠ গুণে গুণান্বিত রাজপুত্র রাম প্রজাগণের হৃদয়ে শ্রদ্ধাভাজন। তিন ভূলোকে সম্মত, পৃথিবীতে ক্ষমাশীলতায় প্রিয়, বুদ্ধিতে বৃहস্পতি ও বীর্যে ইন্দ্র সদৃশ। সকল প্রজার হৃদয়ে স্থান করিয়া, পিতার প্রীতিজনক গুণে রাম তেজে যেন সূর্যকিরণ।
এইরূপে আচরণযুক্ত, অপরাজেয় বীরত্বসম্পন্ন রাম, যিনি লোকপালের তুল্য, তিনিই ছিল রাজ্যপ্রিয়।
এইরূপ অনুপম বহু গুণযুক্ত পুত্র রূপে দশরথ রাজা, যিনি শত্রুদমনকারী, চিন্তিত হইলেন।
বৃদ্ধ ও দীর্ঘজীবী রাজা ভাবিলেন— “আমার জীবদশায় রাম রাজা হইবে ।” তাঁহার হৃদয়ে রামের প্রতি এই পরম প্রীতি বারংবার আন্দোলিত হইতে লাগিল। তিনি ভাবিলেন— “কবে আমি আমার প্রিয় পুত্রকে রাজ্যাভিষিক্ত অবস্থায় দেখিতে পাইব?”
তিনি প্রজাগণের উন্নতি ও সর্বজীবের প্রতি দয়াবান্, যিনি বর্ষণকারী মেঘের ন্যায় জনহিতপ্রদ। বীর্যে যম ও ইন্দ্রসদৃশ, বুদ্ধিতে বৃहস্পতিসম, স্থৈর্যে পর্বতসম, গুণে নিজপিতার হইতেও শ্রেষ্ঠ।
এই বিশ্বপৃথিবীতে আমার পুত্রকেই রাজ্যে অভিষিক্ত অবস্থায় দেখিয়া যেন আমি স্বর্গ লাভ করি। এইরূপে যে সকল উত্তম গুণ, যাহা অন্য রাজপুত্রের পক্ষে দুর্লভ, তথায় পূর্ণ হইয়াছিলেন রাম। সেই গুণসঙ্কুল রামকে দেখিয়া, রাজা তৎক্ষণাৎ মন্ত্রীগণের সহিত পরামর্শ করিয়া, তাঁহার রাজ্যাভিষেক স্থির করিলেন।
তৎপরে দেবলোক, অন্তরীক্ষ ও পৃথিবীতলে ভয়ংকর অমঙ্গল লক্ষণ প্রকাশ পাইল। মেধাবী রাজা স্বশরীরেও বার্ধক্যের লক্ষণ বোধ করিলেন।
পূর্ণচন্দ্রের মত মুখবিশিষ্ট, হৃদয়বেদনানাশকারী রাম পৃথিবীতে অত্যন্ত প্রিয় হইয়াছিলেন।
আপনার ও প্রজাগণের কল্যাণচিন্তায় সেই ধর্মনিষ্ঠ রাজা যথাসময়ে ভক্তিপূর্ণ চিত্তে ত্বরায় সিদ্ধান্ত লইলেন।
রাজা বিভিন্ন নগরবাসী ও দেশবাসী প্রধানগণকে পৃথক পৃথকভাবে সমবেত করিলেন (नानानगरवास्तव्यान् पृथग्जानपदानपि)।
তাঁহাদিগকে যথাযোগ্য সম্মানে ভূষিত করিয়া, রাজা যেন প্রজাপতি হইয়া নিজগৃহে প্রজাদের অভ্যর্থনা করিলেন।
তবে তিনি কেকয়রাজ ও জনককে (केकयराजानं जनकं) তাড়াতাড়ি ডাকাইলেন না; পরে তাঁহারা সুখবর জানিতে পাইবেন।
এইরূপে রাজা সভায় উপবিষ্ট হইলে, অপর সম্মানীয় রাজাগণ একে একে প্রবেশ করিলেন। রাজাসন বহুলভাবে প্রসারিত থাকিলে, সকল রাজাগণ সম্মানসহ উপবিষ্ট হইলেন। তখন সেই রাজা (দশরথ) জনপদবাসী, নগরবাসী, মনুষ্যরাজ্য অধিবাসীসকল দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া, এক সহস্রনয়নবিশিষ্ট ভগবান্ ইন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিময় হইয়া উঠিলেন।
ইতি আদিকাব্যে অযোধ্যাকাণ্ডে প্রথমঃ সর্গঃ।
