বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
সৌদামিনী দেবী (১৮৪৭–১৯২০)
সৌদামিনী দেবী ছিলেন উনিশ শতকের এক বাঙালি লেখিকা ও অনুবাদিকা, যাঁর নাম বিশেষত অদ্ভুত রামায়ণ অনুবাদের জন্য স্মরণীয়। তিনি ২৮ আগস্ট ১৮৪৭ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ষষ্ঠ সন্তান ও প্রথমা কন্যা সৌদামিনী দেবী, দেবেন্দ্রনাথের কন্যাদের মধ্যে একমাত্র যিনি অল্পদিন হলেও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। বেথুন স্কুলের প্রথম ছাত্রীদের মধ্যে তিনিও একজন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই তাঁর ছিল দক্ষতা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস বউ ঠাকুরাণীর হাট উৎসর্গ করেছিলেন সৌদামিনী দেবীকে। এই তথ্য তাঁর ঠাকুরবাড়ির ভিতরকার মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। যদিও ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বিয়ে সহজে হত না, বিশেষ করে ‘পিরিলি’(পীর + আলি > যারা মুসলিম থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছেন) প্রসঙ্গ থাকায়। সৌদামিনীর বিয়ে হয়েছিল নদিয়া জেলার দিগনগর গ্রামের যাদবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তবে বিয়ের পরও তিনি প্রায়শই পিতৃগৃহে থাকতেন, যা সেই সময়ের সমাজের একটি স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য।
১৮৯০ সালে শিবপুর, হাওড়া থেকে প্রকাশিত সৌদামিনী দেবীর অনূদিত অদ্ভুত রামায়ণ গ্রন্থটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বইটির প্রচ্ছদে উল্লেখ ছিল:
“মহামুনি বাল্মীকি প্রণীত মূলগ্রন্থ হইতে শ্রীমতী সৌদামিনী দেবী, সাকিম শিবপুর—জেলা হাওড়া কর্ত্তৃক বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদ হইয়া পয়ারাদি বিবিধ ছন্দে বিরচিত ও প্রকাশিত।”
অদ্ভুত রামায়ণ গ্রন্থটিকে সংস্কৃত সাহিত্যে বাল্মীকি প্রণীত বলে দাবি করা হলেও, মূলত এটি একটি pseudepigraph, অর্থাৎ প্রকৃত বাল্মীকি রচিত নয়। এই গ্রন্থে রামায়ণের প্রচলিত আখ্যানের সঙ্গে অনেক ভিন্নতা দেখা যায় এবং দেবীরূপী সীতা ও মহাশক্তি ভাবনার প্রসঙ্গ উঠে আসে। সৌদামিনী দেবী কবে এবং কীভাবে সংস্কৃত শিখেছিলেন তা জানা যায় না, তবে অনুমান করা হয় যে তিনি কোনও সংস্কৃত পণ্ডিতের সাহায্যে এই অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন।
সৌদামিনী দেবী ১৯২০ সালে পরলোকগমন করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদান বিশেষভাবে মূল্যবান, বিশেষ করে নারী লেখিকা ও অনুবাদিকার ভূমিকায়।
অদ্ভুত রামায়ণ
উৎসর্গ-পত্র।
ক্রাউন্ অফ্ ইণ্ডিয়া।
মহামহিমার্ণবোপম মাদৃশীসুদীন বিধবাকন্যা পালিকা স্বদেশহিতৈষিণী, কল্পলতিকা-সদৃশী শ্রীশ্রীমতী মহারাণী স্বর্ণময়ী মহাশয়া
মাদৃশ নিরাশ্রয়া বিধবাকন্যাপালিকাসু।
সবিনয় নিবেদন।
মাতঃ! আমি বহু যত্নে এবং বহু চেষ্টায় মহামুনি বাল্মীকির সর্ব্বস্বধন এই অদ্ভুতরামায়ণ গ্রন্থখানি নানাবিধ বাঙ্গালা ছন্দে রচনা করিয়ছি। ইহা ভক্তগণের পরম বস্তু, মুমুক্ষর ভব-সমুদ্র-তরণী, ধার্ম্মিকের পরমবন্ধু, আয্যগণের আদবেব ধন, ভারতের উজ্জ্বল রত্ন। ইহা যেরূপ ভাবে ভাষান্তরিত হওয়া উচিত, আমা দ্বারা তাহার কতদূর হইযাছে, তাহা আমি জানি না, তবে এইমান ভরসা, “রামনাম” মাধুর্য্যবিহীন নহে। এই নামে ভক্তবৃন্দের হৃদয়-বারিধি সহজেই উচ্ছদিত হইযা উঠে। আমি এই ভরসাতে সাহসী হইযা, এই রামনামাত্মক মহাকাব্য ভাষান্তরিত করিয়া একগাছি মালা গ্রন্থন পূর্ব্বক আপনাব গলদেশে ভক্তিভাবে প্রদান করিবার নিমিত্ত নিকটে উপস্থিত হইয়াছি। একবার হৃদয়দেশে ধারণ করিযা আমাকে কৃতার্থ করুনা। মাতঃ! আমি সামান্য জ্ঞানসম্পন্না, ভালরূপ লেখাপড়া শিখিতে পারি নাই। আমি অল্প দিন হইল বিধবা হইয়াছি। এ হতভাগিনীর আর কেহ কোথাও নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয না। কযেকটী বালিকা লইয়া অকূল দুঃখসমুদ্রে ভাসমানা। উদরান্নের অন্য কোন উপায় নাই। বিষয় নাই, বিভব নাই। কাজেই গ্রন্থাদি রচনা অথবা দাসীবৃত্তি ভিন্ন উপায়, কি আছে? দ্বিতীয় পন্থাপেক্ষা প্রথম পন্থাবলম্বনে নিকটে উপস্থিত হইলাম। নব-বিধবা-তরুণী-কুলবালাকে কিঞ্চিৎ কৃপাকটাক্ষ বিতরণে কৃতার্থ করিতে আজ্ঞ হয। আমার ন্যায় কত শত রমণী আপনার কৃপায় প্রতিপালিত হইতেছে, তবে কেন আমি তাহা হইতে বঞ্চিত হইব। পুস্তক উৎসর্গচ্ছলে জীবন উৎসর্গ করিলাম, প্রতিপালন করতে অজ্ঞ হয়। নিবেদন ইতি।
সন ১২৯৭ সাল।
জ্যৈষ্ঠ।
শরণাগত নববিধবা
শ্রীমতী সৌদামিনী দেবী।
শিবপুর-হাওড়া।
এই অদ্ভুত রামায়ণ গ্রন্থখানি মূল সংস্কৃত হইতে ভাষান্তরিত হইয়া নানাবিধ পদ্যচ্ছন্দে বিরচিত হইল। কারণ সংস্কৃত ভাষা সাধারণের বুঝিবার সম্পূর্ণ অসুবিধা বলিয়া পরিত্যক্ত হইয়া থাকে। এক্ষণে ভরসা করি, এই স্বল্পবুদ্ধি কুলবালার রচিত গ্রন্থখানি সকলের আনন্দদায়ক হইলেও হইতে পারে; কিন্তু এই ভাগ্যহীনা বিধবার ভাগ্যে যে কতদূর ঘটিবে, তাহা ভবিষ্যদ্গর্ভে নিহিত।
কত কত মহাশয়-ব্যক্তিদিগের কত শত অর্থ সামান্য কার্য্যে ব্যয়িত হইয়া যাইতেছে। তাঁহারা যদি এই দুর্ভাগিনীর প্রতি একটু কৃপা-কটাক্ষ নিক্ষেপ করেন, তাহা হইলে তাঁহাদিগের মহিমার উন্নতিসাধনের সহিত আমারও অবস্থার উন্নতি সাধন হয়।
এই গ্রন্থখানি ভবার্ণবের তরণীস্বরূপ। সুতরাং ভক্ত মিচ্ছু ব্যক্তিমাত্রেরই এক একখানি গ্রহণ করা উচিত কিন্তু কলিরাজের প্রবল তাড়নায় কতদূর ঘটিবে, বলা যায় না। কিমধিকমিতি।
অদ্ভুত রামায়ণ গ্রন্থের ভূমিকায় সৌদামিনী দেবী নিজের ভাষায় লিখেছিলেন:
“এই অদ্ভুত রামায়ণ গ্রন্থখানি মূল সংস্কৃত হইতে ভাষান্তরিত হইয়া নানাবিধ পদ্যচ্ছন্দে বিরচিত হইল। কারণ সংস্কৃত ভাষা সাধারণের বুঝিবার সম্পূর্ণ অসুবিধা বলিয়া পরিত্যক্ত হইয়া থাকে। এক্ষণে ভরসা করি, এই স্বল্পবুদ্ধি কুলবালার রচিত গ্রন্থখানি সকলের আনন্দদায়ক হইলেও হইতে পারে; কিন্তু এই ভাগ্যহীনা বিধবার ভাগ্যে যে কতদূর ঘটিবে, তাহা ভবিষ্যদ্গর্ভে নিহিত।
কত কত মহাশয়-ব্যক্তিদিগের কত শত অর্থ সামান্য কার্য্যে ব্যয়িত হইয়া যাইতেছে। তাঁহারা যদি এই দুর্ভাগিনীর প্রতি একটু কৃপা-কটাক্ষ নিক্ষেপ করেন, তাহা হইলে তাঁহাদিগের মহিমার উন্নতিসাধনের সহিত আমারও অবস্থার উন্নতি সাধন হয়।
এই গ্রন্থখানি ভবার্ণবের তরণীস্বরূপ। সুতরাং ভক্ত মিচ্ছু ব্যক্তিমাত্রেরই এক একখানি গ্রহণ করা উচিত কিন্তু কলিরাজের প্রবল তাড়নায় কতদূর ঘটিবে, বলা যায় না। কিমধিকমিতি।”
“সর্ব্বসাধারণ জনগণের সুবিধার জন্য এই অদ্ভুত রামায়ণ নামক গ্রন্থ খানি বাঙ্গালা ভাষায় বিরচিত হইল। এই অমূল্য গ্রন্থাবলী ব্রহ্মলোকে অতি গুপ্তভাবে রক্ষিত ছিল। পরে ভারদ্বাজ ঋষি শ্রীমদ্বাল্মীকির নিকট প্রশ্ন করায় বাল্মীকি উক্ত শিষ্যের নিকট শ্লোকচ্ছন্দে সমস্ত বিবৃত করেন। দশহাজার শ্লোকপূর্ণ এই অদ্ভুতোত্তরকাণ্ড রামায়ণ এক্ষণে এই হতভাগিনী সৌদামিনী পয়ারাদি নানাবিধ ছন্দে ভাষায় রচনা করিয়া সর্ব্বসাধারণের বোধগম্য হওন জন্য সংপ্রতি মুদ্রিত ও প্রকাশিত করিতে বাধ্য হইল। এক্ষণে এই দুভাগ্যবতীর রচনা সকলের প্রীতিজনক হইলে সমস্ত দুঃখ ও শ্রম সফল জ্ঞান করিব।
ভয়ঙ্কর কলিরাজের প্রাদুর্ভাব, ধর্ম্মরাজ এক্ষণে একপদে দণ্ডায়মান অধর্ম্ম ত্রিপাদ এবং মহা প্রতাপান্বিত হইয়া কলিরাজের মন্ত্রীকর্ম্ম সমা ধানে তৎপর; এরূপ না হইলে চৌরাশি নরককুণ্ড কি প্রকারে পরিপূর্ণ হইবেক। কারণ এই রামায়ণের শেষাংশের ফলশ্রুতির প্রতি একবার দৃষ্টি করিয়া দেখুন, এই রামায়ণের এক বা অর্দ্ধশ্লোক পাঠে সম্পূর্ণ রামায়ণপাঠের ফললাভের সহিত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়, কিন্তু আমার পক্ষে তাহা সম্পূর্ণ বিপরীত হইয়াছে; যেহেতু আমি এই গ্রন্থখানি লেখা আরম্ভ করা অবধি আমার স্বামীর পীড়া ক্রমশই বৃদ্ধি পাইয়া গ্রন্থ শেষ হওয়ার সাথে সঙ্গে তাহারও জীবন শেষ হইয়া গেল। স্বামীর রক্তপিত্ত পীড়ার উৎপত্তি দেখিয়া, তাহার কল্যাণ জন্য এই গ্রন্থখানি লিখিতে আরম্ভ করিয়া ছিলাম; রিন্তু কলিরাজের মাহাত্ম্যগুণে ও আমার দুর্ভাগ্যক্রমে বিপরীত ফলোৎবত্তি হইল। তথাপি লিখিতে ছাড়ি নাই। কারণ ভগবান্ হরি আপনি বলিয়াছেন;—
“যে করে আমার আশ, করি তার সর্বনাশ।
তবু যদি না ছাড়ে আশ, তবে হই তার দাসের দাস॥”
আমাকে ভজিলে দুঃখ দিব পদে পদে।
সর্ব্বদা রাখিব তারে বিপদের হ্রদে।
রোগশোক দুঃখে তারে করি জর জর।
হায় হায করিয়া কান্দাব নিরন্তর।
দেখিব কেমন ভক্ত সেই মহাজন।
এত কষ্ট সহ্য ক’রে করিবে স্মরণ।
বিনা কষ্টে কেবা সুধা খাইবারে পায়।
যে পায় একান্ত চায় সে পায় আমায়।
দেখ ধ্রুব প্রহ্লাদ নারদ আদি ঋষি।
করিয়া কঠোর তপ হইয়া সন্ন্যাসী।
প্রেমপাশে আমাকে বান্ধিয়া ভক্তগণ।
আমা হৈতে শ্রেষ্ঠ পদ করিল গ্রহণ।
দ্বারেতে বান্ধিল বলি ভকতির জোরে।
ভক্তের নিকটে আমি বান্ধা প্রেম-ডোরে।
আত্মবশ নহি আমি ভক্তের অধীন।
ভক্ত-আজ্ঞাবহ আমি হই রাত্র দিন।
পাণ্ডবেরা যবে বনে করিল স্মরণ।
ফেলিযা মুখের অন্ন করেছি রক্ষণ।
আমা হৈতে শ্রেষ্ঠ হয় নাম সে আমার।
নাম হৈতে ভক্ত শ্রেষ্ঠ করহ বিচার।
ভক্তেরে অদেয় মম কিছুমাত্র নাই।
দেবী কহে ওচরণে স্থান যেন পাই।
হরির এই বাক্যানুসারে আমি সর্ব্বনাশ সহ্য করিয়াও গ্রন্থ রচনায় ক্ষান্ত হই নাই। গত ১২৯৫ সালের ১০ই জ্যৈষ্ঠ আমার স্বামী মানবলীলা সম্বরণ করত ঈশ্বরধামে গমন করিযাছেন। এক্ষণে আমি ৪টা বালিকা লইয়া অনাথা হইয়া পদ্মপত্রের জলের ন্যায় জগতে অবস্থান করিতেছি। আমার ভাই নাই; একমাত্র জন্মদাতা পিতামহাশয়ই এক্ষণে অবলম্বন। অন্যান্য যাঁহারা আত্মীয় আছেন, দুঃসময় দেখিয়া সকলেই পলায়নপর। এক্ষণে এক ঈশ্বরমাত্র ভরসা।
অতঃপর বিদ্যোৎসাহী মহাশযগণ সমীপে এই আনাথা-নববিধবা-কুলবালার নিবেদন এই যে, যদি সকলে আমার উৎসাহ বর্দ্ধনার্থে উচিত মূল্যে রামাযণ গ্রন্থেব এক এক খণ্ড গ্রহণ করেন, তাহা হইলে বিশেষরূপে উপকৃত হই। সামান্যভাবে ভিক্ষা দেওয়াপেক্ষা এইরূপ দানে, দাতা ও গৃহীতা উভয়েই কৃতকৃতার্থ; এজন্য বিনয় বচনে নিবেদন এই এ অনাথা কুলবালার গ্রন্থে কিঞ্চিৎ কৃপা-কটাক্ষ বিতরণ করিলে কৃতার্থ হই। অলমতিবিস্তরেণ।
১২৯৭—জ্যৈষ্ঠ।
আর্য্যধর্ম্মসেবীমহাত্মাগণের চির আশ্রিতা
শ্রীমতী সৌদামিনী দেবী।
শিবপুর—হাওড়া”।
“আমি না চাহি অন্য ধন।
হইয়ে শ্রীরামধনে ধনী যেন যায় জীবন।
পাইলে সামান্য ধন, ভুলিব সে নিত্যধন,
অহঙ্কারে সদা মন, হইবে মগন।
অহল্যা পাষাণী ছিল, পরশে মানবী হল,
যে পদ পরশে কাষ্ঠতরী হইল কাঞ্চন।
কহে দেবী সৌদামিনী, দিয়ে সেই পদ দুখানি,
তার মোরে রঘুমণি, এই চির আকিঞ্চন।”
