হরসুন্দর উপাখ্যান

Harashundar Bhattacharyya, Harasundar Upakhyan

ঐতিহ্যের বংশগাথা: হরসুন্দর উপাখ্যান ও বাংলার প্রাচীন বৈদিক পণ্ডিত পরিবার

হরসুন্দর ভট্টাচার্য (১৯২০-১৯৯০) ছিলেন এক বর্ণনাপটু পুরুষ, যাঁহার জীবন ও পরিবারকথা ‘হরসুন্দর উপাখ্যান’ নামে পরিচিত। যেকালে সুবিধাসাধ্য হইত, সেকালে তিনি তাঁহার পৌত্রকে পূর্বপুরুষদের কথা, নিজ জীবনের কথা বলিতেন: ১৯৩৫ সনে গাইবান্ধা হইতে একেলা কলকাতায় আসিয়াছিলেন, আবার ফিরিয়া যান, কলকাতা প্রান্তর কেন কলকাতা হইলো ! ইত্যাদি, ইত্যাদি।

তাঁহার জন্ম পূর্ববঙ্গের গাইবান্ধা জেলায়। ১৯২০ হইতে ১৯৭০ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে গাইবান্ধা জেলায় বাস করিতেন।সনাতন ধর্মে দৃঢ় বিশ্বাসী, সংস্কৃত পণ্ডিত হরসুন্দর শৈশব হইতে শাস্ত্রচর্চায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে গাইবান্ধার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করিতেন। ১৯৪২ তে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়া দুই বৎসর ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলে কারাবাস করেন । ভাষায় ছিল কোলকাতার প্রভাব, শ্রবণ করিলে বুঝিবার উপায় ছিল না, তিনি গাইবান্ধার, না কোলকাতার।

তাঁহার পত্নী বিরজা দেবী রংপুর জেলার কন্যা, ওনার পিতৃদেব ছিলেন উচ্চশ্রেণীর সংস্কৃত পণ্ডিত ও দৈবজ্ঞ। বিরজা দেবীর কণ্ঠে রংপুরীয় ভাষার সুর ছিল, কিন্তু শব্দচয়নে ছিল জ্ঞানের স্বচ্ছতা, শুভঙ্করী জানিতেন; কড়া-গণ্ডা-পণ, কাঠা-বিঘা, মণ, ইত্যাদি হিসেব-নিকেশের ‘আর্যা’ সূত্র ব্রাহ্মণ মহিলারা তখন মুখে মুখে পড়িতেন।

৩ পাইয়ে ১ পয়সা
৪ পয়সায় ১ আনা
৪ আনায় এক সিকি
২ সিকিতে ১ আধুলি
২ আধুলিতে ১ টাকা
১৬ টাকায় ১ মোহর

চারি কড়ায় এক গণ্ডা
পাঁচ গণ্ডায় এক বুড়ি
চার বুড়িতে এক পণ
ষোল পণে এক কাহন
কুড়ি কাঠায় এক বিঘা
চল্লিশ সেরে এক মণ

বিরজার দাদু চিলমারিতে বসবাস করিতেন। তদানীন্ত চিলমারির ভট্টাচার্যদের খুব হাক ডাক ছিল, কাশীস্থ মারাঠি ও দক্ষিণী পন্ডিতরা পূর্ব বঙ্গের ভট্টাচার্যদের ভয় পাইতেন। মহারাজ চেত্‌সিংহের পিতা মহারাজ বলবন্ত সিংহ, সতেরশত পঞ্চাশ খ্রিষ্টাব্দ (১৭৫০) অনুক্রমে বারাণসীপুরে চতুষ্পাঠী প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে ঢাকা ও চিলমারী হইতে কিয়ৎসংখ্যক ভট্টাচার্য মহাশয়দিগকে আমন্ত্রণ করিয়া আনয়ন করিয়াছিলেন। এই কারণে কাশীস্থ দাক্ষিণাত্য ঘনপাঠীদিগের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ উৎপন্ন হইল। দাক্ষিণাত্য ঘনপাঠীদিগের দোষ এই ছিল যে, তাঁহারা নির্বিচারে একই বেদমন্ত্রকে বিংশতিবার পাঠ করিয়া বিদ্বাতা জাহির করিতেন, কিন্তু শাস্ত্রবিশারতায় তাঁহাদের বিশেষ কোনও প্রতিষ্ঠা ছিল না। এইজন্য রাজসভার উপদেষ্টা কর্মে তাঁহারা তত উপযোগী বলিয়া গণ্য হইতেন না।

ঢাকা ও চিলমারী হইতে আগত ভট্টাচার্যগণ বাঙ্গালিটোলা এলাকায় বসবাস করিতেন এবং চেত্‌সিংহের রক্ষাকবচতুল্য আশ্রয়ে সেখানে নিরাপদে, অর্থশাস্ত্র, নব্য ন্যায় ও বৈদিক গণিত অভ্যাস করিতেন।

হরসুন্দরের পিতৃদেব হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য (১৮৩৬–১৯৩৫) ছিলেন মহাভারতের তাত্ত্বিক ভাষ্যকার ও বিষ্ণুভক্ত। পরিবারে শালগ্রাম শিলা ব্যতীত অন্য দেবতার পূজা হইত না।

হরসুন্দর বলিতেন, তাঁহার পিতামহ হরমোহন ভট্টাচার্য (১৭৬০–১৮৫০) এবং প্রপিতামহ মৃত্যুঞ্জয় ভট্টাচার্য (১৬৭৫–১৭৮০) সকলেই ছিলেন দৈবজ্ঞ। দৈবজ্ঞ বিদ্যা সাধারণ জ্যোতিষচর্চা ছিল না, ইহা ছিল বংশানুক্রমে প্রাপ্ত এক গুপ্তপন্থা, যাহা দ্বারা ভবিষ্যৎ জানিবার ও অদৃশ্য বিষয় অবগত হইবার সামর্থ্য লাভ করা যাইতো।

একদা হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য দ্বিপ্রহরে মধ্যাহ্ন ভোজন করিতেছিলেন। সেই সময় কুড়িগ্রামের প্রতাপশালী জমিদার বহুদূর হইতে উপস্থিত হইয়া অপেক্ষমাণ ছিলেন। কিয়ৎক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়া জমিদার ধৈর্য হারাইয়া গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। গমন করিয়া দেখিলেন, হরপ্রসাদ মধ্যাহ্ন আহার সারিতেছেন, ছোট পোনামৎসের ঝোল সহযোগে। জমিদার ক্রুদ্ধ হইয়া উচ্চস্বরে কহিলেন— “ব্রাহ্মণ হইয়া মৎস্য ভক্ষণ করিতেছেন, ইহা কেমন প্রকার? যিনি নিজে মৎস্য মারিয়া ভক্ষণ করেন, তিনি কেমন করিয়া আমার হারাইয়া যাওয়া পুত্রের গণনাদি সম্পাদন করিবেন?”

এ কথা শুনিয়া হরপ্রসাদ স্থির স্বরে কিছু না বলিয়া, বাটি হইতে মৎস্যটি তুলিয়া, ভূমিতে নিক্ষেপ করিলেন। সেই মৃত মৎস্যখানি ভূমিতে পড়িয়া নড়িতে নড়িতে, সরিয়া গিয়া নিকটবর্তী জলের দিকে চলিয়া গেল, এবং পুনরায় নিঃপ্রাণ হইয়া পড়িয়া রহিল। হরপ্রসাদ শান্ত কণ্ঠে কহিলেন— “যাও, তোমার পুত্র তোমার বাড়ির পশ্চাতে যেই পুকুর, সেখানে জলপানার নীচে মৃত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে।”

জমিদার স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন, চলিয়া গেলেন। কিয়ৎদিবন পরে পুনরায় আসিয়া হরপ্রসাদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করিলেন এবং অর্থ দান করিবার প্রস্তাব করিলেন। হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য তাহা গ্রহণ করিলেন না। এবং সেই দিন হইতে জীবনে আর কখনও মৎস্য ভক্ষণ করেন নাই।

মৃত্যুঞ্জয় ভট্টাচার্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ওনার পূর্বপুরুষ কান্যকুব্জ হইতে আদিশুরের পূর্বে গৌড়-বঙ্গে আসিয়াছিলেন। পূর্বপুরুষরা নামের শেষে ভট্ট লিখিতেন, মৃত্যুঞ্জয়ের পিতা প্রথম ভট্টাচার্য্য লেখেন । মৃত্যুঞ্জয় আরাকান হইতে বারাণসী, লাহোর হইতে মথুরা, বিন্ধ্যাচল হইতে কন্যাকুমারী, ও সিংহল পর্যন্ত বিস্তৃত দেশভ্রমণ করিয়াছিলেন। বারাণসীতে পানিনীয় ব্যাকরণ, নবদ্বীপে কলাপ ব্যাকরণ, দ্বারভাঙ্গায-মিথিলায় নবন্যায়, বেদান্ত এবং কৌলাগমতন্ত্র পর্যন্ত অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। যদিও কৌলতন্ত্র অথবা কুলাচার প্রথায় মৃত্যুঞ্জয় কখনো পূজা করেন নাই।

বৈদিক ব্রাহ্মণেরা তখন কুল-পূজা করিতেন না । কামরূপ হইতে আগত মহেশ নামক এক ব্রহ্মণ কে শ্রীহট্টের ব্রাহ্মণেরা (১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ) নগ্ন কুলমূর্তি পূজা করিবার নিমিত্ত সমাজচ্যুত পূর্বক দেশ হইতে উৎখাত করিয়াছিল ।

শ্রুতি প্রচার, মৃত্যুঞ্জয় দক্ষিণাচার ও বামাচার উভয় ‘আচারে’ সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন। তথাপি, বাহ্য উপাসনায় সর্বদা বিষ্ণু-আরাধনায় নিমগ্ন থাকিতেন। আচারঙ্গ শক্তির মধ্যে তিনি বৈষ্ণবী (সঙ্কর্ষণ) শক্তি বা মহামায়ার রূপ দেখিতেন। তিনি পঞ্চরাত্রাগম শাস্ত্র সম্যক আয়ত্ত করিয়াছিলেন।

তাঁহার উপাসনাবিধি রামানুজ, মধ্বাচার্য, নিম্বার্ক বা বিষ্ণুস্বামী প্রবর্তিত পদ্ধতি ভিন্ন ছিল। তিনি শৌনকীয় অথর্ববেদীয় অঙ্গিরসবিধি অনুসরণ করিতেন। মহাশূন্যে মহাব্যোমে নীলাদিপ্ত বিষ্ণুর সঙ্কর্ষণরূপ মানাস চক্ষে প্রত্যক্ষ করিতেন ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়, পাকিস্তানি সামরিক ও ইসলামপন্থী বাহিনীর অত্যাচারে হরসুন্দর পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জ জেলার দেবীনগর অঞ্চলে স্থানান্তরিত হন (১৯৭১)।

হরসুন্দর বলিতেন, “আমি পিতার নিকট দৈবজ্ঞ বিদ্যা শিক্ষালাভ করিতে পারিলাম না, কারণ দেশভাগ ও পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতা। পিতা হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের চক্রান্ত পূর্বানুমান করিয়াছিলেন; সেই অনুসারে কতক আত্মীয় ১৯৪৫ সনে হাওড়া ও কোলকাতায় গমন করেন। তাহাদের বিষয়ে আর বিশেষ তথ্য জানা যায় না।”

রায়গঞ্জে স্থিত হইলে হরসুন্দর দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন। ১৯৮৩ সনে কমিউনিস্ট শাসনকালে তাঁহার ভারত সরকার প্রদত্ত তিনশত টাকা স্বাধীনতা সংগ্রামি ভাতা বন্ধ হইয়া যায়। সংসার ছিল পুত্রদের উপর নির্ভরশীল। হরসুন্দরের জ্যেষ্ঠ পুত্র পুলিশে উচ্চপদস্ত কর্মচারী ছিলেন । পুত্রদের উপার্জিত ধন লইতে ইতস্তত বোধ করিতেন । বিনয় কোঙারের সহায়তায় সরকার ভুল সংশোধন করিয়া ১৯৮৫ সনে স্বাধীনতা সংগ্রামি ভাতা আবার পুনরায় চালু করিয়া দেন ।

কেহ তাঁহাকে স্থানীয় দুর্গাপূজা, কালীপূজা, দশকর্মাদি করিবার পরামর্শ দিলে, হরসুন্দর তাহা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করিতেন। বলিতেন, “বিষ্ণু ব্যতিরেকে কাহারও উপাসনা করি না, আর অর্থ লইয়া পুজন কর্ম অসিদ্ধ।”

প্রাতঃকাল হইতে দুপুর অবধি শালগ্রাম শিলার সম্মুখে ধ্যান, মানসিক পূজা, গায়ত্রী জপ প্রভৃতি করিয়া কাটাইতেন। পত্নী বিরজা দেবী পঞ্চমবার আহ্বান না করা পর্যন্ত তিনি আসন ত্যাগ করিতেন না।

হরসুন্দর পৌত্রকে বলিতেন, “প্রপিতামহ মৃত্যুঞ্জয়ের সময় হইতে অদ্য অবধি যাহা শুনিয়াছি, তাহা তোমাকে বলিয়া যাই। আমাদের এই উপাখ্যান কল্পগল্প নহে; পারিবারিক সত্য ও ইতিহাস। সকল কথা বংশানুক্রমে চলিয়া আসিয়াছে।”

‘হরসুন্দর উপাখ্যান’ কখনও তাঁহাকে প্রধান নায়ক করিয়া, কখনও মৃত্যুঞ্জয় বা হরমোহনকে নায়ক করিয়া শ্রুত হয়। মূল উৎস মৃত্যুঞ্জয় ভট্টাচার্যের জীবন ও শিক্ষায় নিহিত।

এ উপাখ্যান পারিবারিক বংশপরম্পরায় রক্ষিত, লিখিত দলিলের অভাবে ইহার প্রমাণাদি শুধু মুখে মুখে রক্ষিত থাকিলেও, ইহার সত্যতা অক্ষুণ্ণ।

ইহাই হরসুন্দরের উপাখ্যানের অন্তরকথা।


উপাখ্যান অনুক্রমণী


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল