বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
বাংলায় আবাসন সমস্যার ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা এক দীর্ঘ ও জটিল ধারাবাহিকতা। আজও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক মানুষ ভাড়া করা কক্ষে বসবাস করে, আর এ যেন এক বহমান সামাজিক সত্য। স্বাধীনতার পর থেকে নানা আইন ও নীতি তৈরি হলেও সাধারণ বাঙালির জন্য নিরাপদ, সুলভ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের অভাব আজও বহাল। ১৯৫০ সালে বাংলার সরকার তার নাগরিকদের জন্য শালীন আবাসন প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছিল, এবং ২০২৫ সালেও সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি।
আন্দুল রাজবাড়ির উদাহরণ এই আবাসন সংকটের একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে। হাওড়ার এই রাজবাড়ি একসময় মহারাজার অধীনস্থ দাস-চাকরদের দ্বারা দখল হয়েছিল। আজ সেই দখলদাররাই নিজেদের ভাড়াটিয়া মর্যাদার দাবিদার। ফলে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যও আবাসনের সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে বাংলার মানুষ মূলত তিনভাবে বসবাস করে—রায়তী জমির ওপর নিজস্ব বাড়ি বানিয়ে, ভাড়াটে কক্ষ বা ফ্ল্যাটে থেকে, কিংবা ‘ঠিকা টেন্যান্ট’ হিসেবে। সরকারি আবাসনের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
বাংলার ইতিহাসে ভাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক আইন চালুর প্রয়োজন প্রথম অনুভূত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪২ সালের আগে কোনো ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ছিল না। প্রথমে আসে Bengal House Rent Control Order, 1942 এবং Bengal Hotels and Lodging Houses Control Order, 1942, যা গোটা বাংলাজুড়ে প্রযোজ্য হয়েছিল। ১৯৪৩ সালে Calcutta House Rent Control Order কেবল কলকাতার ভাড়াটেদের জন্য কার্যকর হয়, তবে পূর্বের ১৯৪২ সালের আইন থেকে এটি বাদ দেওয়া হয়। এগুলির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ততদিনে শহরমুখী মানুষের ঢল, কর্মসংস্থানের চাহিদা, এবং বাসস্থানের চরম অভাব আইনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তুলেছিল।
এরপর ভাড়াটেদের স্বার্থরক্ষার জন্য ১৯৪৬ সালের Calcutta Rent Control Ordinance কার্যকর হয়, যা পরে Bengal Ordinance Temporary Enactment Act, 1957 দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। দেশভাগের পর বাংলায় বিশেষত কলকাতা ও শহরতলিতে উদ্বাস্তু প্রবাহে আবাসন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এর মোকাবিলায় ১৯৪৮ সালের West Bengal Premises Rent Control Act প্রণীত হয়, তবে তাতে বহু ত্রুটি ছিল। ১৯৫০ সালে সংশোধনী আইন আনা হলেও, তা সাময়িক ছিল। শেষপর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হিসেবে ১৯৫৬ সালের West Bengal Premises Tenancy Act কার্যকর হয়, যা বারবার সংশোধিত হয়ে চলেছে।
এইসব আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাড়াটেদের শোষণ রোধ করা, বাড়িওয়ালাদের অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা ইচ্ছামতো উচ্ছেদ ঠেকানো, এবং আবাসনকে পণ্যে পরিণত না করা। কারণ খাদ্য ও বস্ত্রের পর বাসস্থানকেও মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও আবাসন সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল। ১৯৭৬ সালে ভ্যাঙ্কুভারে প্রথম UN Habitat Conference এবং ১৯৯৯ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আবাসন ও নগর পরিকল্পনাকে টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। “Adequate Shelter for All” বা সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, এবং “Sustainable Human Settlement” বা টেকসই নগর বসতি গড়ে তোলার লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে গৃহীত হয়।
ভারত এসব আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় আবাসন ও ভাড়া আইন প্রণয়নে সেই প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৯৭ সালের West Bengal Premises Tenancy Act পাস করে, যা ২০০১ সালে কার্যকর হয়। ২০০২ সালের সংশোধনীতে ‘ভাড়াটিয়া’ শব্দটির নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয়, যাতে ভাড়াটিয়ার মৃত্যু হলে তার পরিবার নির্দিষ্ট শর্তে সেই বাসস্থানের অধিকার বজায় রাখতে পারে।
তবে বিচারব্যবস্থার ব্যাখ্যা ও আদালতের রায়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে আদালত প্রায় সবক্ষেত্রেই ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়, যেখানে বাড়িওয়ালার স্বার্থও কিছুটা গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
আজকের দিনে আবাসনের এই দীর্ঘ ইতিহাস দেখায় যে, বাংলার নাগরিকদের জন্য ভাড়ার সমস্যা কেবল আইনগত নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক একটি চিরস্থায়ী সংকট। সরকারি আবাসন কর্মসূচি এখনো অত্যন্ত সীমিত, আর বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আবাসন অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে সাধারণ মানুষকে এখনো নির্ভর করতে হয় ভাড়াটে ঘর বা ঠিকা টেন্যান্সির ওপর। সাত দশক আগে যে সমস্যার সূচনা হয়েছিল, ২০২৫ সালেও তার মৌলিক রূপ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
