বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
গৌড়-বঙ্গীয় ভাষার (বাংলা ) বর্ণমালা ও ব্যাকরণ গঠনে সংস্কৃত ব্যাকরণের গভীর প্রভাব রয়েছে। বিশেষত, পাণিনি রচিত “অষ্টাধ্যায়ী“ (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী) ভারতীয় ভাষাগুলোর ব্যাকরণিক কাঠামোর মূল ভিত্তি স্থাপন করে। গৌড়-বঙ্গীয় ভাষার উচ্চারণ ও শব্দগঠনের অনেক নিয়ম সংস্কৃত ব্যাকরণের সূত্র অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে।
পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ও বর্ণমালা
পাণিনি তাঁর ব্যাকরণে ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics) ও ধ্বনিগত পরিবর্তনের নিয়ম অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলা বর্ণমালার মূল কাঠামো অনেকাংশেই পাণিনির স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের শ্রেণীবিভাগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
अ इ उ ण् । ऋ ऌ क् । ए ओ ङ् । ऐ औ च् । ह य व र ट् । लँ ण् । ञ म ङ ण न म् । झ भ ञ् । घ ढ ध ष् । ज ब ग ड द श् । ख फ छ ठ थ च ट त व् । क प य् । श ष स र् । ह ल् ।
(ক) স্বরবর্ণ ও পাণিনির ধ্বনিতত্ত্ব:
পাণিনি স্বরবর্ণকে (অচ্ বর্ণ) হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত—এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন, যা বাংলা ভাষাতেও বিদ্যমান:
- হ্রস্ব স্বর: অ, ই, উ, ঋ, ঌ (সংস্কৃতের সঙ্গে মিল)
- দীর্ঘ স্বর: আ, ঈ, ঊ, ৠ, ৡ, এ, ঐ, ও, ঔ (পাণিনি অনুসৃত)
- অনুস্বার ও বিসর্গ: সংস্কৃত ভাষায় যেমন ‘অং’ ও ‘অঃ’ গুরুত্বপূর্ণ, বাংলা ভাষাতেও এই ধ্বনিগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে।
(খ) ব্যঞ্জনবর্ণ ও সংস্কৃত ব্যাকরণ
পাণিনি ব্যঞ্জনবর্ণকে (হল্ বর্ণ) স্বরের উপর নির্ভরশীল ধ্বনি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এগুলোর উচ্চারণস্থান নির্ধারণ করেছেন। বাংলা ভাষার ব্যঞ্জনবর্ণের শ্রেণীবিভাগ মূলত পাণিনির অনুসৃত ধ্বনিতত্ত্বের ভিত্তিতেই গঠিত:
| পাণিনি ব্যাকরণ | বাংলা ব্যাকরণ |
|---|---|
| কণ্ঠ্য (ক, খ, গ, ঘ, ঙ) | কণ্ঠ্য (ক, খ, গ, ঘ, ঙ, হ) |
| তালব্য (চ, ছ, জ, ঝ, ঞ) | তালব্য (চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, য, শ) |
| মূর্ধন্য (ট, ঠ, ড, ঢ, ণ) | মূর্ধন্য (ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, র, ষ) |
| দন্ত্য (ত, থ, দ, ধ, ন) | দন্ত্য (ত, থ, দ, ধ, ন, ল, স) |
| ওষ্ঠ্য (প, ফ, ব, ভ, ম) | ওষ্ঠ্য (প, ফ, ব, ভ, ম) |
| অন্তস্থ (য, র, ল, ব) | অন্তস্থ (য, র, ল, ব) |
| উষ্ম (শ, ষ, স, হ) | উষ্ম (শ, ষ, স, হ) |
বাংলা ভাষায় “ক্ষ” ব্যঞ্জনবর্ণটি (ক্ + ষ) ধ্বনি মিলিত হয়ে গঠিত হয়েছে, যা সংস্কৃত ব্যাকরণের “যুগ্ম ধ্বনি” তত্ত্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
সংযুক্ত বর্ণ ও পাণিনির অনুসৃতি
পাণিনি ব্যাকরণে “সন্ধি” (Sandhi) এবং “সমাস” (Samasa) সূত্র বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে দুটি ব্যঞ্জনবর্ণ একত্রিত হয়ে নতুন উচ্চারণ গঠন করতে পারে। বাংলা ভাষার “সংযুক্ত বর্ণ” গঠনও মূলত এই পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গঠিত।
- সংস্কৃত সন্ধি অনুসারে বাংলা সংযুক্ত বর্ণ গঠিত হয়
- ক্ + র → ক্র (পাণিনি অনুসৃত)
- ত্ + র → ত্র (তথ্যসূত্র: অষ্টাধ্যায়ী)
- গ্ + ন → গ্ন
- ষ্ + ন → ষ্ণ
পাণিনির ধ্বনি পরিবর্তন সূত্র অনুযায়ী, সংযুক্ত বর্ণ উচ্চারণের সময় কিছু ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটে, যা বাংলা ভাষায়ও লক্ষ করা যায়।
উচ্চারণস্থান ও পাণিনির ব্যাখ্যা
পাণিনি ধ্বনিবিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণস্থান (Place of Articulation) ও উচ্চারণ রীতি (Manner of Articulation) ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলা ভাষায় উচ্চারণস্থান পাণিনির ব্যাখ্যার সাথে অনেকাংশে মিলে যায়।
বাংলা ভাষায় “ড” ও “ঢ” উচ্চারণের দুই রকম পার্থক্য আছে, যা পাণিনি ব্যাকরণের “মুর্দ্ধন্য ও দন্ত্য বিভাজন” সূত্রের সাথে সম্পর্কিত।
বাংলা উচ্চারণের বিচ্যুতি ও সংস্কৃত ব্যাকরণের সম্পর্ক
- বাংলায় অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃত উচ্চারণ থেকে বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন:
- সংস্কৃত ‘বর্গীয় ব’ (ব) ও অন্তস্থ ‘ব’ (ব) উচ্চারণে পার্থক্য আছে।
- ‘য’ এবং ‘জ’ একইভাবে উচ্চারিত হয়, যা সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে সঠিক নয়।
- ‘ষ’ ও ‘শ’ উচ্চারণে পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা হয় না।
পাণিনির সংযম ও নির্দিষ্ট উচ্চারণ নিয়ম অনুসারে, বাংলা ভাষার এসব উচ্চারণ পার্থক্যের ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে।
বাংলা ব্যাকরণের মূল কাঠামো সংস্কৃত ব্যাকরণের উপর নির্ভরশীল। বিশেষত, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী বাংলা ভাষার স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, সংযুক্ত বর্ণ, উচ্চারণস্থান ও ধ্বনি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাংলা ভাষার উচ্চারণে কিছু বিচ্যুতি থাকলেও মূল কাঠামোতে পাণিনি ব্যাকরণের ছাপ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলা ব্যাকরণ: বর্ণমালা
১. বর্ণ ও অক্ষর
- বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত মৌলিক ধ্বনিগুলিকে বর্ণ বলা হয়।
- প্রতিটি বর্ণকে লেখা চিহ্ন আকারে প্রকাশ করলে সেটি অক্ষর হিসেবে পরিচিত।
- বাংলা বর্ণমালা মোট ৫০টি বর্ণ নিয়ে গঠিত:
- ১৬টি স্বরবর্ণ
- ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ (হল্ বর্ণ)
২. স্বরবর্ণ
বাংলা ভাষায় স্বরবর্ণের সংখ্যা ১৬টি।
(ক) স্বরবর্ণের তালিকা
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, ৠ, ঌ, ৡ, এ, ঐ, ও, ঔ, অং, অঃ।
(খ) স্বরবর্ণের শ্রেণীবিভাগ
| শ্রেণী | বর্ণ |
|---|---|
| হ্রস্ব স্বর | অ, ই, উ, ঋ, ঌ |
| দীর্ঘ স্বর | আ, ঈ, ঊ, ৠ, ৡ, এ, ঐ, ও, ঔ |
| বিশেষ স্বর | অং (অনুস্বার), অঃ (বিসর্গ) |
- অনুস্বার (৹) : এক বিন্দু চিহ্ন, যা স্বরের সাথে মিলিত হয়ে উচ্চারিত হয়।
- বিসর্গ (ঃ) : দুই বিন্দুর চিহ্ন, যা সাধারণত স্বরের পরে উচ্চারিত হয়।
৩. ব্যঞ্জনবর্ণ (হল্ বর্ণ)
বাংলা ভাষায় ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা ৩৪টি।
(ক) ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকা
ক, খ, গ, ঘ, ঙব
চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
ট, ঠ, ড, ঢ, ণ
ত, থ, দ, ধ, ন
প, ফ, ব, ভ, ম
য, র, ল, ব
শ, ষ, স, হ
ক্ষ
(খ) ব্যঞ্জনবর্ণের শ্রেণীবিভাগ
| শ্রেণী | বর্ণ |
|---|---|
| কবর্গ | ক, খ, গ, ঘ, ঙ |
| চবর্গ | চ, ছ, জ, ঝ, ঞ |
| টবর্গ | ট, ঠ, ড, ঢ, ণ |
| তবর্গ | ত, থ, দ, ধ, ন |
| পবর্গ | প, ফ, ব, ভ, ম |
| অন্তস্থ বর্ণ | য, র, ল, ব |
| উষ্ম বর্ণ | শ, ষ, স, হ |
| যুক্তবর্ণ | ক্ষ (ক + ষ) |
ক্ষ (ক্ + ষ) : এটি অনেক সময় পৃথক বর্ণ হিসাবে গণ্য করা হয় না।
৪. ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ নিয়ম
- ব্যঞ্জনবর্ণ উচ্চারণের জন্য স্বরবর্ণের সহায়তা প্রয়োজন।
- ব্যঞ্জনবর্ণের নিচে (্) চিহ্ন থাকলে তা স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারিত হয় না।
- স্বরবর্ণ যুক্ত হলে উচ্চারণ সম্ভব হয়।
- যেমন: ইক্ → ক উচ্চারিত হয় কারণ পূর্বে ‘ই’ আছে।
- কি তেও ‘ক্’ উচ্চারিত হয় কারণ পরে ‘ই’ যুক্ত হয়েছে।
(ক) সংযুক্ত বর্ণ
- যখন দুটি বা ততোধিক ব্যঞ্জনবর্ণ একত্রে যুক্ত হয়, তখন তা সংযুক্ত বর্ণ গঠন করে।
- যেমন: ক্ন, ক্ষ্ম, স্ব, ত্র, গ্ন, দ্ব, স্ত, হ্ন।
৫. বর্ণের উচ্চারণ স্থান:
(ক) কণ্ঠ্য বর্ণ (গলা থেকে উচ্চারিত): অ, আ, ক, খ, গ, ঘ, ঙ, হ
(খ) তালব্য বর্ণ (তালু থেকে উচ্চারিত): ই, ঈ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, য, শ
(গ) মূর্ধন্য বর্ণ (মস্তকের সামনে উচ্চারিত): ঋ, ৠ, ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, র, ষ
(ঘ) দন্ত্য বর্ণ (দাঁতের সাহায্যে উচ্চারিত): ঌ, ৡ, ত, থ, দ, ধ,ব ন, ল, স
(ঙ) ওষ্ঠ্য বর্ণ (ঠোঁটের সাহায্যে উচ্চারিত): উ, ঊ, প, ফ, ব, ভ, ম
(চ) কণ্ঠতালব্য বর্ণ (গলা ও তালু থেকে উচ্চারিত): এ, ঐ
(ছ) কণ্ঠৌষ্ঠ্য বর্ণ (গলা ও ঠোঁট থেকে উচ্চারিত): ও, ঔ
(জ) দন্তৌষ্ঠ্য বর্ণ (দাঁত ও ঠোঁট থেকে উচ্চারিত): অন্তস্থ ব
৬. উচ্চারণ সম্পর্কিত বিশেষ নিয়ম
(ক) বিভ্রান্তিকর উচ্চারণ সংশোধন
- দুইটি ‘ন’ (ণ ও ন), দুইটি ‘ব’ (বর্গীয় ব ও অন্তস্থ ব) ও তিনটি ‘শ’ (শ, ষ, স) ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়।
- অনেক ক্ষেত্রে ভুল উচ্চারণ করা হয়, যা পরিহার করা উচিত।
(খ) ‘য’ ও ‘জ’ এর পার্থক্য
- অন্তস্থ ‘য’ কে ‘জ’ এর মতো উচ্চারণ করা ভুল।
- দ্রুত উচ্চারিত হলে ‘য’ আলাদা স্বরধ্বনি সৃষ্টি করে।
(গ) ‘ক্ষ’ ও ‘খ্ + য’ এর বিভ্রান্তি
- ‘ক্ষ’ শব্দটি ক্ + ষ ধ্বনি মিলিত হয়ে গঠিত হয়।
- এটি অনেক সময় ‘খ্ + য’ এর মতো উচ্চারিত হয়, যা ভুল।
(ঘ) ‘ড’ ও ‘ঢ’ উচ্চারণের ভিন্নতা
- ‘ড’ দুইভাবে উচ্চারিত হয়
- শব্দের শুরুতে বা সংযুক্ত হলে: ডমরু, ডিম্ব, দণ্ড
- শব্দের মধ্যে বা শেষে হলে: দাড়িম, নিবিড়, দেবরাড়্
- ‘ঢ’ দুইভাবে উচ্চারিত হয়
- শব্দের শুরুতে: ঢক্কা
- শব্দের মাঝে বা শেষে: দৃঢ়
বাংলা ভাষার বর্ণমালা মূলত স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে গঠিত। প্রতিটি বর্ণের সুনির্দিষ্ট উচ্চারণ স্থান ও উচ্চারণ পদ্ধতি রয়েছে। বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের জন্য সঠিক উচ্চারণ পদ্ধতি ও ব্যঞ্জনবর্ণের ব্যবহার জানা আবশ্যক।
Date: 11th March 2025
