বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
এ দেশে মুসলমান শাসনের বহু পূর্বে, অর্থাৎ পাল ও সেন যুগেরও আগে, গৌড়ীয় ভাষা (বাঙালির ভাষা) প্রায় বর্তমান বাংলার মতো গঠিত হয়ে উঠেছিল। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার তাঁর ব্যাকরণচর্চায় উল্লেখ করেন যে, অন্যান্য দেশীয় ভাষার তুলনায় গৌড়দেশীয় ভাষা উত্তম। এই গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণগত ভিত্তি নির্মাণের জন্য রাজা রামমোহন রায় ১৮৪১ সালে হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষদের অনুরোধে রচনা করেন ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। তিনি বলেন— “ব্যাকরণ তাহাকে বলা যায় যাহার জ্ঞান দ্বারা উচ্চারণ শুদ্ধি, লিপি শুদ্ধি, অর্থাৎ যথাযোগ্যস্থানে পদবিন্যাসের ক্ষমতা হয়।” ঐ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখা হয়— “সৰ্ব্বদেশীয় ভাষাতে এক২ ব্যাকরণ প্রসিদ্ধ আছে, যদ্দ্বারা শুদ্ধাশুদ্ধি বিবেচনায় ভাষার রচনায় শৃঙ্খলা রক্ষা হয়। কিন্তু গৌড়ীয় ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ না থাকাতে কথনে ও লিখনে যথাযথ রীতির অভাব ঘটে, এবং ছাত্রদের জন্য নিজের ভাষার ব্যাকরণ না জানা থাকলে অন্য ভাষা শেখার সময় অনেক কষ্ট হয়। তাই গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ জানা থাকলে, অল্প পরিশ্রমেই তা আয়ত্ত করা যায় এবং অন্য ভাষাও সহজে শেখা সম্ভব।”
রামমোহন এই ব্যাকরণ লিখলেও ইংল্যান্ডযাত্রার কারণে তিনি শুধু একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে যান, সম্পাদনার সময় পাননি। যাত্রার সময় তিনি স্কুলবুক সোসাইটির অধ্যক্ষকে এই গ্রন্থ সম্পাদনার ভার দেন। এর আগে ১৮২৬ সালে তিনি ইংরেজিতে লেখেন A Grammar of the Bengali Language— এটি বাংলা ভাষার প্রথম ইংরেজি ব্যাকরণ হলেও, গৌড়ীয় ব্যাকরণ-ই ছিল বাংলায় লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ। পরে, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য ১৮৩৩ সালে রচনা করেন গৌরী ব্যাকরণ, যা গৌড়ীয় ভাষার উপর একটি বিশিষ্ট ও মান্য ব্যাকরণ। ১৮৩৫ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লেখেন ব্যাকরণ কৌমুদী, যা বাংলা ভাষার শিক্ষার ইতিহাসে এক বিপ্লব আনে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেন— “গৌড়ীয় ভাষার পাঠক, গৌড়দেশের অধিবাসী, তোমাদিগের আচার, ব্যবহার, ভাষা, রুচি, নীতি ও ধর্মবিশ্বাস গৌড়ীয়ের মত হওয়াই প্রার্থনীয়।” তিনি বলেন (১৯২২), “যাহা কিছু অগৌড়ীয়ের মত আছে, তাহা বর্জন কর, গৌড়ীয় আদর্শকে এমন করে গড়ে তোলো, যাতে অগৌড়ীয়গণ তোমাদের আদর্শ দেখে নিজেদের বদলাতে আগ্রহী হয়।”
এই গৌড়ীয় ভাষাই (ভাষার নাম) ছিল একসময় ‘গৌড়প্রাকৃত’, যা ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দীতে প্রামাণ্য রূপ লাভ করে। পরবর্তীকালে এই ভাষা থেকে জন্ম নেয় ‘গৌড়ীয় অপভ্রংশ’। সমসাময়িক মাগধী প্রাকৃত থেকেও জন্ম হয় ‘মাগধী অপভ্রংশ’-এর। এই দুটি অপভ্রংশ মিলে গঠিত হয় এক নতুন ভাষা— বঙ্গকামরূপী, যেখান থেকে আজকের বাংলা, অসমীয়া, মৈথিলী ও ওড়িয়া ভাষার উৎপত্তি। সাহিত্যের ভাষা ও মুখের ভাষার মাঝে পার্থক্য থেকে যায় বলেই সাধু গৌড়ীয় ভাষা নামে এক ধারা জন্ম নেয়, যা সাহিত্যিক গদ্যরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রামমোহন, মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ‘গৌড়’ শব্দটিকে তাঁরা ‘বঙ্গ’ শব্দের সমার্থক বলেই ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, রামমোহনের গৌড়ীয় ব্যাকরণ, মধুসূদনের ‘গৌড়জন’, রবীন্দ্রনাথের ‘গৌড়ানন্দ কবি’— এই সকল শব্দবন্ধ গৌড়-সম্বন্ধীয় বাঙালি পরিচয়কে সুসংহত করে। নবম শতাব্দীর কবি রাজশেখর ‘গৌড়’ শব্দটি গৌড়দেশের লোক বোঝাতে ব্যবহার করেন। শ্রীচৈতন্যদেব (নবদ্বীপ) ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মুখের ভাষায় গৌড়ীয় ভাষা ব্যবহার করতেন। সেই ভাষাকেই ব্রিটিশরা Bengali Language নামে অভিহিত করে। ১৭৭৮ সালে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাডলি হ্যালহেড হুগলি থেকে প্রকাশ করেন A Grammar of the Bengal Language।
বাঙালির পণ বাঙালির আশা
বাঙালির কাজ বাঙালির ভাষা
সত্য হউক সত্য হউক
সত্য হউক হে ভগবান। (রবীন্দ্রনাথ)
বাংলা ব্যাকরণের আধুনিক চর্চায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচনা করেন ভাষা প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ (১৯২৫), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লেখেন বাঙ্গালা ব্যাকরণ (১৯২৮), এবং জগদীশচন্দ্র ঘোষ আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ (১৯৫০) রচনা করেন। এ সকল ব্যাকরণ বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা, স্বরূপ ও উপযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনার দ্বার উন্মোচন করে।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বাংলা একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করে।
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখা যায়, গৌড়ীয় প্রাকৃত ও মাগধী প্রাকৃত ছিল একই উৎসের দুটি শাখা। উভয়ই একসময় বিকৃত হয়ে অপভ্রংশ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই অপভ্রংশগুলির সমন্বয়ে যে ‘বঙ্গকামরূপী’ ভাষার উদ্ভব হয়, সেখান থেকেই বাংলার জন্ম। পরবর্তীকালে এই ভাষার সাহিত্যিক রূপই ছিল ‘সাধু গৌড়ীয় ভাষা’। তাই ষোড়শ শতাব্দীর কবি মাধব আচার্য বাংলা ভাষাকে বলেছেন ‘লোকভাষা’, রামচন্দ্র খান বলেছেন ‘পরাকৃত’, দৌলতকাজী বলেন ‘দেশীভাষা’, ভারতচন্দ্র বলেন শুধু ‘ভাষা’। রাজেন্দ্রলাল মিত্র ব্যবহার করেন ‘বঙ্গভাষা’, বিদ্যাসাগর বলেন ‘বাঙ্গালাভাষা’, দীনেশচন্দ্র সেন বলেন ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। অর্থাৎ, বাংলা ভাষার নামের ক্ষেত্রে বাঙালি কখনো নির্দিষ্ট কোনো এক শব্দে নিজেকে বাঁধেনি। বঙ্গভাষা, বাঙ্গালা, বাঙলা, বাংলা— সবই ব্যবহার হয়ে এসেছে এবং চলছে আজও।
বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে ‘বঙ্গবাসী’, ‘বঙ্গালী’, ‘বাঙ্গালী’, ‘বাঙালী’, ‘বাঙালি’— এই শব্দগুলি। আবার উপভাষার নাম হিসেবে ‘বাঙ্গালী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, এবং তা এখন অনেকাংশে জাতিগত পরিচয় ও ভাষাগত রূপ—দুই ক্ষেত্রেই একাকার হয়ে গেছে।
‘গৌড়ীয়া’ বলতে সাধারণত বোঝানো হয় গৌড়দেশের অধিবাসী। কেউ কেউ মনে করেন ‘গৌড়’ শব্দটি এসেছে ‘গুড়’ থেকে, কারণ গুড় উৎপাদনে গৌড় অঞ্চল ছিল বিখ্যাত। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত-এ নবদ্বীপকেই গৌড়ের প্রধান স্থান বলা হয়েছে, যদিও কেউ কেউ মালদহকেও গৌড় বলে চিহ্নিত করেন।
বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গার উত্তর ও দক্ষিণ তীরবর্তী অঞ্চলে চাই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে, যাঁরা এখনো চাই ভাষায় কথা বলেন—যা বাংলা নয়, বরং একটি পৃথক ভাষাভাষী গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চিহ্ন।
সবশেষে, গৌড়ীয় ভাষার ক্রমবিকাশ, সাহিত্যরীতি, ব্যাকরণচর্চা এবং গৌড়ীয় পরিচয়ের ভিতর দিয়ে বাংলার ভাষিক ও জাতিগত ইতিহাস এক সুদীর্ঘ ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্যের ধারা হয়ে উঠেছে। পাল যুগ থেকে শুরু করে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ—এই ভাষার ধারক ও বাহকেরা গৌড়ীয় ভাষাকেই বাংলার প্রাণস্বরূপে গড়ে তুলেছেন। ১৮৫০ সালের পর থেকে গৌড়ীয় ভাষাই পরিণত হয়েছে আধুনিক বাংলা ভাষায়।
মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা! ( অতুলপ্রসাদ সেন ১৮৭১ – ১৯৩৪)
