বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলার এক উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর ও হরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতায় অবস্থিত এই সভা মূলত বঙ্গ ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীকালে দেশবাসীর স্বার্থবিরোধী সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। এর সভাপতি ছিলেন গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য (গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্য ১৭৯৯-১৮৫৯) এবং সম্পাদক দুর্গাপ্রসাদ তর্কপঞ্চানন। সভার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও “গৌড়ীয় সমাজ”-এর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ব্যবহারজীবী প্রসন্নকুমার ঠাকুর (১৮০১ – ১৮৬৮)।
১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেশন অ্যাক্ট প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসক যখন নিষ্কর ভূমির উপর কর আরোপ শুরু করে, তখন সভা তার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে বঙ্গ ভাষা যাতে উপেক্ষিত না হয় সে দিকেও তারা সচেতন ছিল এবং এই ভাবনায় রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির প্রয়াসও দেখা যায়। সভার সক্রিয় সদস্য কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এ বিষয়ে তাঁর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লিখে যান, যে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাই ছিল প্রথম এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে রাজকীয় বিষয়ে খোলাখুলি বিতর্ক ও বিচার-বিবেচনা করা হতো। তিনি উল্লেখ করেন, সভার পতনের অন্যতম কারণ ছিল একতার অভাব—ব্রহ্মসভা ও ধর্মসভা পক্ষভেদে বিভক্ত থাকায় সংগঠন টিকতে পারেনি।
সভাপতি গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য ১৭৯৯ সালে বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার ইটার পাঁচগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল জগন্নাথ ভট্টাচার্য। সাহিত্যচর্চা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তায় তিনি তৎকালীন বাঙালি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিলেন।
এই সভা ১৮৩৬ সালে বিলুপ্ত হয়। কিন্তু তার আগেই বঙ্গ ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ও ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অঙ্কুর রোপণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ যোগেশচন্দ্র বাগল বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
