থানা মাকুয়া – মেটিয়া বুরুজ।
ইতিহাসের পাতা থেকে।
অলক ভট্টাচার্য।
হাওড়ার পশ্চিম কূলে থানা মাকুয়া পূর্ব কূলে মেটিয়া বুরুজ,মাঝে বয়ে চলেছে নদী, গঙ্গা কূল কূল করে। এ নদী বহু ঘটনা অঘটনা, বহু যুদ্ধ শান্তি, বহু উত্থান পতন এর সাক্ষী। সেই হারিয়ে যাওয়ার অতীত ইতিহাস যেনো নদী বলে চলেছে, তার নিজের ভাষায় কূল কূল স্বরে। থানা মাকুয়া নামে হাওড়ায় একটি অঞ্চল আছে। কিন্তু এ নামে কোনো থানা বা পুলিশ স্টেশন হাওড়ায় নেই। স্বভাবত প্রশ্ন জাগে এ অঞ্চলের নাম কিভাবে হলো থানা মাকুয়া?
উত্তরের আগে দেখেনিই জায়গাটা ঠিক কথায়। আন্দুল রোড ধরে যেতে যেতে বি গার্ডেনএর প্রবেশ দ্বার পেরিয়ে বকুলতলা স্টপেজে নামলেই দক্ষিণ দিকে দেখবেন একটি স্কুল নাম থানা মাকুয়া মডেল হাই স্কুল। এ অঞ্চল একসময় থানা মাকুয়া নামে বিশেষ পরিচিত ছিলো। হাওড়ার মৌজা ম্যাপ খুললে দেখতে পাবেন সাকরাইল থানার অধীন গঙ্গার লাগোয়া পশ্চিম দিকে একটি মৌজা বা গ্রাম থানা মাকুয়া। এই থানা মাকুয়া কি ছিলো, কেমন ছিলো আর কোথায় ছিলো তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে গেছেন হোজেস সাহেব তার ডাইরিতে। সাহেবের পুরো নাম স্যার উইলিয়াম হোজেস।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওনাকে নিযুক্ত করেছিলো বাণিজ্য অধ্যক্ষ পদে। তবে সাহেবের বাণিজ্য বিস্তারে যতটা মন তার থেকে বেশী মন এ দেশের প্রাচীন স্থাপত্যে, মন্দির মসজিদ গির্জা রাজপ্রাসাদ কেল্লা আর দুর্গে। সর্বদা ইতিহাসের সন্ধ্যান করে বেড়াচ্ছেন। তাই তিনি বার বার ছুটে আসেন এককালের বিখ্যাত বেতড় বন্দর নিকটস্থ দুর্গ থানা মাকুয়ায়। ধ্বংস হয়ে যাওয়া দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে সাহেব সন্ধ্যান করেন কতো যুদ্ধর সাক্ষী সাঁকরাইলের এই দুর্গ থানা মাকুয়া। সাহেবের সঙ্গে সব সময় থাকে একটা মোটা ডাইরি। সরোজমিনে দেখে তথ্য লিপি বদ্ধ করেন। যেমন তিনি এখন লিখছেন তার ডাইরিতে, “Great Tanna was built where now stands the house of the superintendent of the botanical Garden, about 3 miles below calcutta and Distant from Hoogly about 20 miles by land”. সাহেবের কথায় আবার পরে ফিরবো তার আগে একটু চর্চা করি কি ভাবে নাম হলো থানা মাকুয়া।
এতক্ষনে নিশ্চয় পাঠকরা বুঝে গেছেন থানা মাকুয়া আদতে একটি দুর্গ। থানা শব্দ দুর্গ শব্দর প্রতিশব্দ রূপে ব্যবহারিত হয়েছে।থানার প্রধানকে থানাদার বলহোতো। তা নয় হলো কিন্তু মাকুয়া? থানা মাকুয়া নাম কি ভাবে হলো? অচল ভট্টাচার্য এর হাওড়া জেলার ইতিহাস ১ম খন্ড গ্রন্থ থেকে পাচ্ছি, একসময় এই দুর্গ মগের অধীনে এসেছিলো। হ্যাঁ এই সেই মগ, যেখান থেকে এসেছে ‘মগের মুল্লুক ‘ কথা। লোকে বলতো থানা মগের, তা থেকে থানা মাগুয়া, আর তা থেকে থানা মাকুয়া। এবার আসুন দ্বিতীয় প্রশ্নে কে কবে তৈরী করেছিলো এই দুর্গ?
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য পর্তুগীজ সেনাপতি রাডার সাহায্য নিয়ে সুন্দরবন থেকে বেতড় বন্দর পর্যন্ত নদীর তীরে পাঁচটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। সেই পাঁচটির একটি বেতড় বন্দরের কাছে দুর্গ থানা মাকুয়া।অপর ঐতিহাসিকগণ মনে করেন এর নির্মাতা গৌড় এর সুলতান। হুসেন শাহ এই দুর্গ নির্মাণ করে ছিলেন। তবে নির্মাণ নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও, এটি যে মগের অধীনে আসার পর থানা মাকুয়া নাম নিয়েছিল সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরা এক মত। এবার আসি কালানুসারে কারা কারা এই দুর্গ অধিকার করে ছিলো। সেই সঙ্গে এই দুর্গর অধিকার নিয়ে কাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। মানসিংহকে দিল্লির বাদশাহ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেছিলেন, সাল ১৫৮৯ । তার দৃষ্টি পরলো থানা থানা মাকুয়া দুর্গে। নিযুক্ত করলেন থানাদার বা দুর্গপ্রধান। যার প্রধান কাজ ছিলো হুগলি আর সরস্বতী নদী পথে বেতড় বন্দরে বাণিজ্য করতে আসা বণিকদের কাছ থেকে শুল্ক অর্থাৎ ট্যাক্স আদায় করা।
এই কাজে সুবিধার জন্য ঠিক গঙ্গার ওপর পারে নির্মিত হলো আরেকটি কেল্লা, মাটির কেল্লা, নাম হলো মেটিয়া বুরুজ। এপারে বড় কেল্লা থানা মাকুয়া ওপারে ছোটো কেল্লা মেটিয়া বুরুজ। আর গঙ্গার এপার ওপার লোহার শেকল দিয়ে বাঁধা। শুল্ক দাও, শেকল উঠবে। ভাবুন ট্যাক্স আদায় করার কি বুদ্ধি! ঠিক এই কারণেই থানা মাকুয়া দুর্গ সকল সাম্রাজ্যবাদীর কাছে ছিলো লোভনীয় কেল্লা। তাই কেল্লার দখল নিয়ে হাওড়ার বুকে একের পর এক যুদ্ধ। এবার আসি সেই যুদ্ধর কথায়। ইংরেজরা তখন ব্যবসাদার। মোগল সুবেদারএর সাথে গন্ডগোল লাগলো। স্টেনশ্যাম মাষ্টারকে পাঠানো হলো গন্ডগোল মেটানোর জন্য। তিনি নিজে দেখে রিপোর্টে লিখেছিলেন থানা দুর্গ অত্যন্ত শক্ত পোক্ত দুর্গ। যা আরাকান দের প্রতিহত করার জন্য নির্মিত হয়েছিল। শোভা সিংহএর মৃত্যু হয়েছে। তার ভাই হিম্মত সিংহ। তিনি পাঠান সেনাপতি রহিম খাঁর সাহায্য নিয়ে মোগল দের তাড়িয়ে থানা দুর্গ সহ বেতড় অধিকার করে নিলো। দুর্গ পুনরুধার এর জন্য মোগল সাহায্য নিলো ইংরেজের।
হুগলীর ফৌজদার কে সাহায্য করতে এলো ইংরেজ রণতরী “ টমাস “। যুদ্ধে হিম্মত সিংহ ও তার সহযোগী পাঠানদের পরাজয় হলো। মোগল রা দুর্গ পুনরায় দখল করলো। ইতিহাসের কি পরিহাস! এই ইংরেজরা পরবর্তী কালে দুর্গ দখল করে ছিলো সেই সঙ্গে এই দুর্গ ধ্বংস করেছিলো। জবচার্ণক মোগল তারা খেয়ে সুতানটি থেকে পালাবার সময় সাময়িক আশ্রয় নিলো থানা দুর্গে, আর যাবার সময় দুর্গের কিছু অংশ ধ্বংস করে দিলো। হোজেস সাহেব তার ডাইরিতে লিখছেন “In February charnock stormed the Fort Thana” . তখন বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ। বাংলাকে তছনছ করে দিচ্ছে মারাঠা দস্যু বর্গী। দিকে দিকে রব উঠছে পালাও পালাও, বর্গী এলো দেশে। রঘুজী ভোঁসলের সেনাপতি কুখ্যাত ভাস্কর পন্ডিত। মোগল দের তাড়িয়ে দখল করে নিলো থানা দুর্গ।। ইংরেজ তো সাহায্যের হাত বাড়িয়েই আছে।
সাল ১৭৫০। ইংরেজ রণতরী এগিয়ে আসছে সাঁকরাইল গঙ্গায়। জাহাজ থেকে কামনা তাক করা আছে দুর্গ থানা মাকুয়ার দিকে। তোপ দাগতে আর হলো না,ইংরেজ কোম্পানীর সৈন্য দেখে পালিয়ে গেলো বীর বর্গী। দুর্গ আবার মোগল দের দখলে। সাঁকরাইলের গঙ্গা দিয়ে বয়ে চলেছে জল তির তির করে। আপাতত যুদ্ধ বিগ্রহ নেই। থানাদার আর তার সৈন্যরা ব্যাস্ত শুল্ক আদায় করতে। বাকি সময় ব্যাস্ত পান ভোজন আমোদ আহ্লাদে। অস্ত্র সস্ত্রে ব্যবভারের অভাবে মরচে পড়তে শুরু করলো। ততদিনে মুর্শিদাবাদের মসনদে সিরাজ।
সিরাজের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরোধ চরমে উঠল। ইংরেজদের জব্দ করতে সিরাজ আক্রমণ করলো কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম। কোম্পানীর সৈন্য কলকাতা থেকে পালতে বাধ্য হলো। কলকাতা থেকে পালিয়ে তারা ঘাঁটি গাঁড়লো থানা মাকুয়া দুর্গে। তার আগে আচমকা আক্রমণে পরাস্ত করলো মোগল থানাদার কে। ইংরেজদের দুর্গ অধিকার নিয়ে কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙ্গালার ইতিহাস গ্রন্থে লিখে গেছেন, ইংরেজরা ১৩ জুন দুর্গ আক্রমণ করে। যুদ্ধে অনভস্থ নববী সৈন্য হুগলীতে পলয়ন করে।।এ খবর পেতে সিরাজের বেশী সময় লাগলো না। তার নির্দেশে হুগলীর ফৌজদার দেশী ২০০০ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করলো ইংরেজদের। আবার বেজে উঠল যুদ্ধের রণ দামামা থানা মাকুয়া দুর্গে। ইংরেজরা দুর্গ থেকে তোপ দাগতে লাগলো। কিন্তু হুগলীর ফৌজদার কে প্রতিহত করতে পারলো না। ফৌজদার ইংরেজদের তাড়িয়ে দিলো। যাবার আগে ইংরেজরা রাগে দুর্গের ব্যাপক ক্ষতি করলো। দুর্গ আবার নবাবের দখলে।
সিরাজ নন্দকুমারকে আদেশ দিলেন দুর্গ সংস্কার করতে। নন্দকুমারের মাথায় এলো এক অবাস্তব বুদ্ধি। এপারে থানা মাকুয়া ওপারে মেটিয়া বুরুজ। উনি পরিকল্পনা করলেন মাঝের গঙ্গা ইঁট দিয়ে বুজিয়ে দেওয়া হবে। দু জাহাজ ইঁট সংগ্রহ হলো। কিন্তু সে ইঁট আর গঙ্গায় ফেলা হলো না। এবার আসরে নেমে পরেছে অতি ধুরন্ধর রবার্ট ক্লাইভ। ক্লাইভ নবাবের সৈন্যকে পরাজিত করে থানা দুর্গ অধিকার করে নিলো। থানা মাকুয়ার ওপর থেকে মোগল অধিকার চিরতরে লোপ পেলো। কোম্পানীর সৈন্যরা দুর্গর ব্যাপক ক্ষতি করলো। সাল ১৭৫৭। রবার্ট ক্লাইভ খুব ভালো বুঝেগেছেন যে সিরাজকে মসনদচ্যুত করতে না পারলে বাংলায় কোম্পানি ব্যবসা করতে পারবে না। যে ভাবেই হোক সিরাজকে সরাতে হবে। শুরুহলো এক গভীর ষড়যন্ত্র। পালাশীর যুদ্ধ নামে এক যুদ্ধ প্রহশনের। সেই ষড়যন্ত্রের বীজ কি বোনা হয়েছিল হাওড়ার সাঁকরাইলের বিখ্যাত থানা মাকুয়া দুর্গে বসে? এর উত্তর দেওয়া শক্ত। তবে হোজেস সাহেব তার বিখ্যাত ডাইরিতে তার ইঙ্গিত কিন্তু দিয়ে গেছেন। Tanna fort destroyed by Clive and Watson 1st January 1757 ( Hedges Dairy vol 111 page XV) থানা মাকুয়া থেকে মোগল অধিকার চিরকালের মতো বিদায় নিলো। পলাশীর যুদ্ধ শেষ। সিরাজের মসনদে মীরজাফর । পুতুল নবাব। কোম্পানীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ। স্বপ্ন দেখছে স্বাধীন নবাব হবার। যোগাযোগ করলেন ডাচ সৈন্যদের সঙ্গে।
সাল ১৭৫৯ । যবদ্বীপ থেকে সাঁকরাইল এলো ডাচ নৌবহর। লক্ষ থানা দুর্গ ও বেতড় বন্দর দখল করা। ক্লাইভ পাঠালেন কর্নেল কোর্ডকে থানা দুর্গে। কোম্পানি সৈন্য ডাচ নৌবহর ধ্বংস করে দিলো। মীরজাফরের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো। এ ভাবেই শেষ হলো থানা মাকুয়ার শেষ যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষ । পরাজিত হুগলীর ফৌজদার এর কিছু সৈন্য বেতাই মন্দিরের কিছুটা পূর্বে গঙ্গার কাছে তবু ফেলে বেশ কিছুদিন ছিলো। লোকে বলতো সেনা পল্লী। তা থেকে সেনা পাড়া তা থেকে সানা পাড়া। সে নাম আজও বর্তমান। থানা দুর্গ কি হলো? কোম্পানি কেল্লার অধীন ৩৪ বিঘা জমি চাষের কাজে লাগিয়ে দিলো। কেল্লার ভাঙা ইঁট যে যেমন পারলো নিয়ে যেতে লাগলো। কিড সাহেব সেই দুর্গের ভিতের ওপর দুর্গর ইঁট দিয়ে ৮ কোনা দুটি বাড়ী নির্মাণ করেন। যারমধ্যে একটি এখনও টিকে আছে। । বোটানিকাল গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট এর কোয়াটার।
গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে থানা থানা মাকুয়া দুর্গ আর নেই। পূর্ব পাড়ে মাটির কেল্লা মেটিয়া বুরুজ আর নেই। রয়ে গেছে শুধু নাম। আর বয়ে চলেছে গঙ্গা, সেই একই ভাবে কূল কূল করে। কান পাতলে শোনা যাবে, ফিস ফিস করে বলছে ইতিহাসের কথা।
———————-
ঋণ স্বীকার :– তথ্য সংগ্রহ ও চিত্র মানচিত্র সংগ্রহ, হাওড়া জেলার ইতিহাস।। অচল ভট্টাচার্য। ১ ম খন্ড। এবং বিদেশীদের দৃষ্টিতে হাওড়া।

Read More
- বাবু অলক ভট্টাচার্য্যের “বাছাই বাইশ”: এক সাহিত্যিক সমালোচনা
- ভূরিশ্রেষ্টির (ভুরশুট ) বাংলাভাষা ৭০০ খ্রিস্টাব্দ
