ভূরিশ্রেষ্টি এবং গৌড়বঙ্গ
মোগল শাসনকালে মিলিত গৌড়বঙ্গকে ‘বাঙ্গাল’ নামে অভিহিত করা হতো। পৌরাণিক (Vishnu Puran) কাহিনিতে উল্লেখিত দীর্ঘতম ঋষির পুত্র অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, ওড় এবং পুণ্ড—এই পাঁচজন স্ব স্ব নামে রাজ্য স্থাপন করেন। তন্মধ্যে বঙ্গ এবং পুণ্ডের রাজ্য বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মালদহ জেলার অন্তর্গত পাণ্ডুয়া নগরের চারিপাশের অঞ্চল পুণ্ডের অধিকারে ছিল। পরে বরেন্দ্র নামে পরিচিত এক ক্ষত্রিয় পুণ্ড রাজ্য জয় করলে এই সমগ্র ভূভাগ ‘বরেন্দ্রভূমি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
মুসলমান আমলের সময় বঙ্গদেশের ভৌগোলিক সীমানা উত্তর দিকে নেপাল ও ভুটান, দক্ষিণে গঞ্জাম ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ব্রহ্মদেশ এবং পশ্চিমে মধ্যপ্রদেশ, সম্বলপুর, রিধী রাজ্য, বারাণসী, মির্জাপুর, গাজীপুর ও গোরক্ষপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড তখনকার বঙ্গদেশের পরিমাপ নির্দেশ করে।
ভূরিশ্রেষ্টি (বর্ত্তমানে হাওড়া জেলায় ভুরশুট) গ্রামনিবাসী পণ্ডিত ভট্ট শ্রীধর ৯১৩ শকাব্দে অর্থাৎ ৯৯১-৯২ খ্রীষ্টাব্দে ন্যায়কন্দলী (Naya Knadali) নামে বৈশেষিক দর্শনের প্রশস্তপাদ-ভাষ্যের একটি অসাধারণ মূল্যবান টীকা রচনা করেন। ইনি স্বীয় পৃষ্ঠপোষক দক্ষিণরাঢ়ের অধিপতি “গুণরত্নাভরণ কায়স্থকুলতিলক” পাণ্ডুদাসের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। এই পাণ্ডুদাসই বিখ্যাত পাণ্ডুভূমি বিহার প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন।
ন্যায়কন্দলীতে (Naya Kandali) শ্রীধর নিজেই এই পরিচয় দিয়াছেন—
আসীদ্দক্ষিণরাঢ়ায়াং দ্বিজানাং ভূরিকর্ম্মণাম্।
ভূরিসৃষ্টিরিতি গ্রামো ভূরিশ্রেষ্টিজনাশ্রয়ঃ।।
অম্ভোরাশেরিবৈতস্মাদ্ বভূব ক্ষিতিচন্দ্রমাঃ।
জগদানন্দনাদ্ বন্দ্যো বৃহস্পতিরিব দ্বিজঃ।।
তস্মাদ্ বিশুদ্ধগুণরত্নমহাসমুদ্রো বিদ্যালতাসমবলম্বনভূরুহোহভূৎ।
স্বচ্ছেশয়ো বিবিধকীর্ত্তিনদীপ্রবাহপ্রস্পন্দনোত্তমবলো বলদেবনামা।।
তস্যাভূদ্ ভূরিযশসো বিশুদ্ধকুলসম্ভবা।
অব্বোকেত্যচ্চিতগুণা গুণিনো গৃহমেধিনী।।
সচ্ছায়ঃ স্থূলফলদো বহুশাখো দ্বিজাশ্রয়ঃ।
তাভ্যাং শ্রীধর ইত্যুচ্চৈরর্থিকল্পদ্রুমোহভবৎ।।
অসৌ বিদ্যাবিদগ্ধানামসূত শ্রবণোচিতাম্।
যট্পদার্থহিতামেতাং রুচিরাং ন্যাকন্দলীম্।।
কৃষ্ণ মিশ্র (Krishna Mishra) তাঁর বিখ্যাত ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ নাটকে (৯৫০ খ্রিস্টাব্দ):
“গৌড়ং রাষ্টমনুত্তমং নিরুপমা তত্রাপি রাঢ়াপুরী।
ভূরিশ্রেষ্ঠিকনাম-ধাম পরমং তত্রোত্তমো নঃ পিতা॥
তৎপুত্রাশ্চ মহাকুলা ন বিদিতাঃ কস্যত্র তেষামপি৷
প্রজ্ঞাশীলবিবেকধৈর্যবিনয়াচারৈরহং চোত্তমঃ॥”
অর্থাৎ ‘অহঙ্কার’ বলেছিলেন, শ্রেষ্ঠ রাজ্য গৌড়দেশ, তার মধ্যে নিরুপম প্রদেশ রাঢ়াপুরী। সেখানে পরমসুন্দর ভূরিশ্রেষ্ঠ নগরে (Bhurshut) আমার বাস। আমার পিতা সেখানকার একজন মুখ্যব্যক্তি।
এই নাটকটি সম্ভবত গৌড় (Gouda) দেশের (বর্তমান মালদা-নদীয়া জেলা) শাসক রাজা দ্বিতীয় গোপাল (৯৫০ খ্রিস্টাব্দ) সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল, যিনি চলমান যুদ্ধ এবং সংঘাতে মগ্ন ছিলেন। কৃষ্ণ মিশ্র তাকে তার রাজ্যের ভয়াবহ অবস্থা, বিশেষ করে সমাজের আধ্যাত্মিক কাঠামোর অবক্ষয় এবং অনেকের দ্বারা প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রের অপব্যবহার সম্পর্কে আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন।
ললিতবিস্তারে (৪০০ খ্রি.) শাক্যমুনি গৌতম বিশ্বামিত্রের কাছ থেকে বাংলা অঙ্গ লিপি শিখেছিলেন:
“এরপর বোধিসত্ত্ব উরাগসার চন্দনকাঠ দিয়ে তৈরি একটি লিপিফলক গ্রহণ করে, যা অলৌকিক সুবর্ণ ও মূল্যবান মণিরত্ন দ্বারা সজ্জিত ছিল। তিনি আচার্য বিশ্বামিত্রের নিকট জিজ্ঞাসা করলেন —
‘হে উপাধ্যায়, আপনি আমাকে কোন লিপিটি শেখাবেন?
ব্রাহ্মণী (বেদিক লিপি), খরোষ্ঠী, পুষ্করসারী, অঙ্গলিপি (বাংলা লিপি), মগধলিপি, মঙ্গললিপি, শকারিলিপি, ব্রাহ্মবলী (ব্রাহ্মী লিপি), পারুষ্যালিপি, দ্রাবিড়লিপি, ইণ্যালিপি, উগ্রলিপি, সংখ্যা লিপি (সংখ্যা লিপি), অনুলোমালিপি (হিব্রু-আরামাইক), অবমূর্ধলিপি (চীনা লিপি), দারাদলিপি (রাশিয়া-বুলগেরিয়ান), খশ্যলিপি এবং লুনালিপি, হূণালিপি, মধ্যাক্ষরবিস্তারলিপি,
পুষ্পলিপি, দেবলিপি (দেবনাগরী), নাগলিপি, যক্ষলিপি, গন্ধর্বলিপি, কিন্নরলিপি, মহোরগলিপি, অসুরলিপি, গরুড়লিপি, মৃগচক্রলিপি, বায়সরুতালিপি, ভৌমদেবলিপি, অনন্তরিক্ষদেবলিপি, উত্তরকুরুলিপি, ইপলিপি, অপরগোডানীলিপি, পূর্ববিদেহলিপি, উৎক্ষেপালিপি, নিক্ষেপালিপি, বিক্ষেপালিপি, সাগরলিপি, বজ্রলিপি, লেখপ্রতিলেখালিপি,
অনুদ্রুতালিপি, শত্রাবর্তা, গণনাবর্তালিপি, উক্ষেপাবর্তালিপি, পাদলিখিতালিপি, দ্বিরুত্তরপদসন্ধিলিপি, যাবদ্দোত্তরাপাদসংঘ্ন, মধ্যহারিণীলিপি, সংগ্রহণীলিপি, বিদ্যানুলোমাবিমিশ্রিতালিপি, ঋষিতপতাপত, রোমান লিপির মতো দীপ্তিমান, ধরণীপ্রেক্ষিণীলিপি, গগণপ্রেক্ষিণীলিপি, সর্বঔষধনিষ্যন্দা, সর্বঋষিগ্রহী, সর্বভূতরুতগ্রহণী।
হে উপাধ্যায়, এই চৌষষ্টি লিপির মধ্যে কোন লিপিটি আপনি আমাকে শেখাবেন?’ (চ-১০)”
অতএব ৭০০ খ্রিস্টাব্দে এক ধরণের বাংলা লিপি ছিল এবং বাংলা লিপির মাধ্যমে লেখার জন্য উপাদানও ছিল। প্রবোধ চন্দ্রোদয়ে, মহিলা এবং জৈনরা আঞ্চলিক প্রাকৃত ভাষায় কথা বলছিলেন। তখন বাংলা ছিল পূর্ব প্রাকৃতের একটি উপভাষা (Dialect)। এখনো আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না কেন প্রাকৃতের মৃত্যু হয়েছিল এবং বাংলা ভাষা প্রাধান্য পেয়েছিল এবং সেন রাজবংশের সময়, বাংলা ভাষা সংস্কৃতের সাথে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা আমাদের অন্য একটি প্রবন্ধে বলেছি যে চর্যাপদের ভাষা বাংলা বা খাঁটি প্রাকৃত ছিল না বরং এটি ধর্মীয় বিকৃতদের দূষিত ভাষা ছিল, যাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিনোদনের জন্য গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ভারতচন্দ্রের সময়ে ভূরিশ্রেষ্ঠের বাংলাভাষা
ভারতচন্দ্র জন্মের আগে ভূরশুতে একটি উন্নত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। ভূরিশ্রেষ্ঠের বন্দ্যঘটিয়া (সপ্তগ্রাম) বাঙালি সর্বানন্দ তাঁর টীকাসর্বশ্যে (অমরকোষের টীকা ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ) সংস্কৃত শব্দের বাংলা পরিভাষা প্রদান করেন। চৈতন্য এবং তাঁর শিষ্যদের কারণে একীভূত গৌড়ীয় সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল। মালদা (পৌণ্ডবৰ্দ্ধন) থেকে বর্তমান ২৪ পরগনা পর্যন্ত বাংলা ভাষা ছিল মানসম্মত। চৈতন্য এবং অদ্বৈত ভট্টাচার্য ব্যবহৃত বাংলা ছিল স্বর্ণমান। তাঁর চতুষ্পাঠীতে, চৈতন্য (গৌরাঙ্গ মিশ্র) শিক্ষার জন্য বাংলা এবং সংস্কৃত উভয় ভাষাতেই কথা বলতেন। শ্রীনিবাস ভট্টাচার্যের শ্রীমদ ভাগবতের বাংলা বক্তৃতা ছিল অতুলনীয়, এমনকি চৈতন্যও এর প্রশংসা করতেন।
রাজা গণেশ (১৪১৫) বাংলাকে (গৌড় ও বঙ্গের মিলিত) তাঁর রাষ্ট্রভাষা করেছিলেন। লক্ষণ সেন তাঁর রাজধানী নদীয়াতে (Nadia District) সংস্কৃত-প্রাকৃত ভাষা বাতিল করেছিলেন এবং তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলা ব্যবহার করতে প্রভাবিত করেছিলেন। নবদ্বীপে বাংলা ভাষার ‘গুড়তত্ত্ব’ চালু হয়েছিল। গুড় (স্থানীয় চিনি-মিছরি), গৌড় থেকে এসেছিল। গুড়ভাষা (Sweet Language) ছিল মালদা থেকে ২৪ পরগনা পর্যন্ত অভিজাত বাঙালিদের ভাষা।
নদীয়ায় তুর্কি লুটেরাদের আগ্রাসনের পর, লক্ষ্মণ সেন বিক্রম পুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) তার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নদীয়ার বাংলা ভাষা এভাবে বঙ্গভূমি পর্যন্ত পৌঁছে। চৈতন্য (Chaitanya Mahaprabhu) যখন ঢাকা এবং বাংলাদেশ সফর করেন, তখন তিনি দেখেন যে মানুষ ভিন্ন উচ্চারণে বাংলায় কথা বলে, তখন তিনি বাঙালিদের “অয়, অয়” বলে ঠাট্টা করেন।
ভারতচন্দ্র নিজেই অন্নপূর্ণার মুখে তাঁর পড়াশুনার খবর জনিয়েছেন:
ব্যাকরণ অভিধান সাহিত্য নাটক।
অলঙ্কার সঙ্গীতশাস্ত্রের অধ্যাপক।।
পুরাণ আগমবেত্তা নাগরী পারসী।
(রাজার অন্নদার সহিত কথা)
ভারতচন্দ্র ভূরশুতে (হাওড়া বাগনান গ্রাম < আগে বাগোয়ান পরগণার) বাংলা ও ফার্সি অধ্যয়ন করেন। হাওর এবং হোগলা (Hoogly) ছিল পরবর্তীকালের প্রাচীন ভূরিশ্রেষ্ঠের প্রতিনিধি।
গাজিপুর-নওয়াপাড়ার মাতুলালয়ে অবস্থানকালে তাজপুরের টোলে সংস্কৃত শিক্ষা সমাপ্ত করার পর যৌবনকালে দেবানন্দপুরে রামচন্দ্র মুন্সী ও তাঁর পুত্র হীরারামের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন ভারতচন্দ্র। এখানেই তিনি তৎকালীন পশ্চিমা হিন্দিতে অসামান্য পারদর্শিতা অর্জন করেন।
তিনি সত্যনারায়ণ ব্রতকথায় উল্লেখ করেছেন:
“দেবের আনন্দধাম দেবানন্দপুর নাম
তাহে অধিকারী রাম রামচন্দ্র মুনশী।
ভারে নরেন্দ্র রায় দেশে যার যশ গায়
হয়ে মোর কৃপা দায় পড়াইল পারসী।।”
এছাড়াও, ভারতচন্দ্র আরবি ও পারসীর (ফার্সি) পাশাপাশি ‘নাগরী’, অর্থাৎ হিন্দি ভাষা শিক্ষালাভ করেন। তিনি পশ্চিমা হিন্দি ও ব্রজবুলি লক্ষণাক্রান্ত হিন্দিতেও সাহিত্য রচনা করেছিলেন। তার বিদ্যাসুন্দর কাব্যে বর্ধমান রাজসভায় গঙ্গাভাট এবং রাজা বীরসিংহের মধ্যকার সংলাপে এই ভাষার ব্যবহারের উৎকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়:
রাজা:
“জো সব ভেদ বুঝায় কহা কি ধোঁ নহি তঁহা
সমুঝায় শুনায়া।
কামলিয়ে তুঝে ভেজ দিয়া সুধি ভুল গয়া
অরু মোহি ভুলায়া।।”
ভাট:
“ভূপ মইঁ তিহারি ভট্ট কাঞ্চিপুর যায়কে।
ভূপকো সমাজ মাঝ রাজপুত্র পায়কে।।
হাত জোরি পত্র দীহ্ন শীষ ভূমি নায়কে।
রাজপুত্রিকী কথা বিশেষ মইঁ শুনায়কে।।”
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতচন্দ্রের হিন্দি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও বিস্মিত করেছিল। এই অনুপ্রেরণাতেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর খ্যাতনামা কবিতা নাসিক হইতে খুড়ার পত্র। এই কবিতায় হিন্দুস্তানি ভাষার প্রভাব সুস্পষ্ট:
“কলকাত্তামে চলা গয়ো রে সুরেন বাবু মেরা,
সুরেনবাবু আসল বাবু, সকল বাবুকো সেরা।
ঘরকো যাকে কায়কো বাবা, তুমসে হমসে ফরখৎ।
দো-চার কলম লীখ্ দেওঙ্গে ইসমে ক্যা হয় হরকৎ!
মনকা দুঃখে হুহু করকে নিকলে হিন্দুস্থানী –
অসম্পূর্ণ ঠেকতা কানে বাঙ্গলাকো জবানী…”
(প্রহাসিনী, সংযোজন)
ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গলে আরবি এবং ফার্সি অপসারণ করে চৈতন্যের বাংলা স্বর্ণমান ফিরিয়ে আনেন। তাঁর সময়ের আরবি-ফার্সি মিশ্র বাংলা থেকে একটি উদাহরণ:
চারি যে কলেমা শাহা আপনি পড়িল।
উঠিয়া উজিরজাদী শ্ছালাম করিল।।
হাস্য পরিহাস কথা কহে দুই জনে।
রচিল আরিপ কবি সত্যার চরণে।।
মরদানা পোসাগ করি বান্ধিব কোম্বর।
রাহা-খরচ নিব কিছু আশ্ছরপি মোহর।।
এতেক বলিয়া দুহে ঘোড়া হেকে যায়।
ভুলিল আজমের রাহা দিশা নাই পাই।।
(সত্যপীরের পাঁচালি)
পাঁচালি এসেছে প্যাচাল থেকে, পেঁচা হু হু চিৎকার করে, তাই “প্যাচাল পড়া”, মূল পাঠের পর “হু হু কোরাস” গাওয়া ।
ভূরিশ্রেষ্ঠের জগৎবল্লভপুর পরগনা
দক্ষিণরাঢ়ের অন্তর্গত ভূরিশ্রেষ্ঠ বা ভুরশুট
জগত্বল্লভপুর জনপদে “গোপো মালী তথা তৈলী তন্ত্রী মোদক বারুজী।
কুলালঃ কর্মকারশ্চ নাপিতো নবশায়কা ।”
অর্থাৎ সদ্গোপ, মালাকার, তিলি, তাতী, ময়রা, বারুই, কুন্তকার, কর্মকার এবং নাপিত-এই নয়টি শ্রেণীভুক্ত জাতি-শ্রোন্ঠী নবশাখ বা নবশাক নামে সুপরিচিত।
প্রাচীন গ্রন্থাদিতে উল্লিখিত স্থান-নাম এবং বিবিধ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নীহাররঞ্জন রায় তার “বাঙ্গালীর ইতিহাস” গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে, “গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী দক্ষিণতম ভূখণ্ড, অর্থাৎ বর্তমান বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলীর বেশ কিছু এলাকা এবং হাওড়া জেলাই প্রাচীন সুন্ধা, যা পরবর্তীকালে মোটামুটিভাবে দক্ষিণ রাঢ় নামে চিহ্নিত হয়েছে।” (দে’জ সংস্করণ, ১৪০২ সাল, পৃঃ ১১৭)। সুন্দরবনের মানুষ দক্ষিণ রায়ের পূজা পর্যন্ত করে।
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন প্রবোধচন্দ্র সেন, শশিভূষণ চৌধুরী প্রমুখ। প্রবোধচন্দ্র সেনের বক্তব্য হচ্ছে, হাওড়া জেলার বৃহৎ অংশ প্রাচীনকালের সুক্ত/সুন্ধাভূমি। অপরদিকে রাজেন্দ্র চোলের বিজয়গাথা সমন্বিত এগারো শতকের তিরুমালাই শিলালিপি সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রাচীনকালের দণ্ডভুক্তি (বর্তমান মেদিনীপুর এলাকা) এবং বঙ্গের (পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ) মধ্যবর্তী এলাকা হচ্ছে দক্ষিণ রাঢ়।
এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের “বাগেশ্বরী অধ্যাপক” ডঃ কল্যাণ কুমার গাঙ্গুলী তার “হাওড়া ইন পারসপেকটিভ” গ্রন্থে। ডঃ গাঙ্গুলীর অভিমত সংক্ষেপে হচ্ছে, মহাভারতের কালেই সুক্তভূমি এবং রাঢ়ভূমির ভৌগোলিক ধারণার সূচনা হয়েছে। মহাভারতের টীকাকার নীলকণ্ঠও একই কথা বলেছেন। এছাড়া, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘আচারাঙ্গ সূত্র’ গ্রন্থে লাঢ় অর্থাৎ রাঢ়দেশের দুটি বিভাগ বজ্জভূমি ও সুব্বভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান, হুগলী এবং হাওড়া জেলা সুবিস্তীর্ণ রাঢ়ভূমির অন্তর্গত।
প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্তি বন্দর, দণ্ডভুক্তি ও দক্ষিণ রাঢ়ভূমি এবং ত্রিবেণী (হুগলী)-র কিছু উত্তরদিকে দামোদর-ভাগীরথীর সঙ্গমস্থল, উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়ভূমির সীমা নির্দেশক বলে বিবেচিত হত। রাজা গোপচন্দ্রের মল্লসারুল লিপি এবং রাজা লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর লিপিতে যথাক্রমে সুন্ধা বা দক্ষিণরাঢ় এবং বর্ধমানভুক্তি, সরস্বতী নদী তীরবর্তী প্রাচীন নৌ-বন্দর বেতড্ড চতুরক (আধুনিক বেতড়) ইত্যাদির নামোল্লেখ রয়েছে।
প্রাচীনকালের ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের অধীনস্থ ছিল একালের জগত্বল্লভপুর। সেকালে এই রাজ্য আধুনিক বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া এবং মেদিনীপুর জেলার কতক অংশ নিয়ে সংগঠিত ছিল বলে অনুমান। ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ্য, মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক বঙ্গদেশ বিজিত হবার ফলে, পরগণায় রূপান্তরিত হয়ে যায়।
সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে পণ্ডিত জগমোহন কর্তৃক রচিত “দেশাবলী বিবৃতি” গ্রন্থে দক্ষিণ রাঢ়ের ভৌগোলিক সীমা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
“কংসাবত্যাহি সরিতঃ শিলাবত্যা হি ভূমিপ। উভয়োর্ধ্বত্তা চ ভানকো বিশ্রুতো ভূবি।। বকদ্বীপাৎ পূর্বভাগে মণ্ডলঘাটস্য পশ্চিমে । ত্রয়োদশ যোজানৈশ্চ নিতো হিঃ ভানদেশক !।”
কংসাবতী, শিলাবতী, বকদ্বীপ ও মণ্ডলঘাট—এই চতুষসীমাবর্তী দেশটির নাম হচ্ছে ‘ভানদেশ’। ভানদেশের প্রধান তিনটি এলাকার নাম হচ্ছে চন্দ্রকোণা, ভূরিশ্রেষ্ঠ এবং বালিয়া।
১লা জুন, ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে আনন্দবাজার পত্রিকায় জগত্বল্লভপুর সম্পর্কে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল এইভাবে—“হাওড়া জেলার জগত্বল্লভপুর থানার অন্তর্গত তেলিহাটি গ্রামে কানা দামোদরের পরিত্যক্ত অববাহিকার মাটির তলা থেকে পালযুগের সমসাময়িক কালের কিছু নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।”
সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর (১৫৫৬-১৬০৫) সুবা বাংলায় রাজস্ব হার পরিবর্তন, পরগণা সমূহের ভৌগোলিক সীমার পুনর্বিন্যাস, চাকলা বিভাগের সৃষ্টি প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংঘটনের নেতৃত্ব দেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ (১৬৬০ –১৭২৭) ওরফে জাফর খাঁ (১৭০০-১৭২৭)। জাফর খাঁর আমলে পূর্বেকার আকবরশাহী ১৩৫০টি পরগণার পরিবর্তে ১৬৬৯টি পরগণার সৃষ্টি হয়।
১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলার কিয়দংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল হুগলী জেলা। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে হুগলী জেলার কতক অংশ নিয়ে গঠিত হয় হাওড়া জেলা। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দের ১ মে হাওড়া-হুগলীর জন্য স্বতন্ত্র কালেক্টরেট এবং ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১লা মার্চ স্বতন্ত্র জেলাশাসক নিযুক্ত করা হয় হাওড়ার জন্য। হাওড়ার প্রথম জেলা শাসক ছিলেন উইলিয়ম টেলর।
ষোড়শ শতকে কবি মুকুন্দ মিশ্র রচিত ‘বাশুলী মঙ্গল’ বা ‘বিশাল লোচনীর গীত’ কাব্যে বর্ধমান কাঞ্চননগর নিবাসী ধুস দত্ত প্রাচীন কৌশিকী নদীপথে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বন্দর-নগরী তাম্রলিপ্তে গমনাগমন করেছিলেন। মুকুন্দ মিশ্রের বর্ণনার দুটি ক্ষেত্রে জগত্বল্লভপুর থানাধীন প্রাচীন মৌজা ‘নাঞ্জিকুলি’র (বর্তমান নাজির গঞ্জ) উল্লেখ আছে।
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মাজু পাবলিক লাইব্রেরির উদ্যোগে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের স্মৃতিতে অষ্টাদশ বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসেবে মাজুর কৃতী সন্তান ডঃ সুবোধ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, এম. এ., ডি. লিট (প্যারিস), সমাগত সুধীবৃন্দকে স্বাগত জানান। এই অধিবেশনের মূল সভাপতি ছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন।
রায়বাঘিনী ভবশঙ্করী
দামোদর নদের দুই তীরে যখন ভূরশ্রেষ্ঠ রাজ্যের প্রভাব ও প্রতাপ বিদ্যমান ছিল, তখন দামোদরের বিস্তীর্ণ বক্ষে সমুদ্রগামী জাহাজগুলি তাম্রলিপ্তের পথে স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করত। ভূরশুটের শ্রেষ্ঠীগণ বাণিজ্যপণ্য নিয়ে দেশ-দেশান্তরে গমন করতেন। তবে কালের প্রবাহে দামোদর নদীর প্রবাহপথ পরিবর্তিত হওয়ায় নদী যেমন ‘কানা দামোদর’-এ পরিণত হয়েছে, তেমনি ভূরশ্রেষ্ঠ বাণিজ্যনগরীও আজ কেবলমাত্র একটি প্রাচীন রাজ্যের বিবর্ণ ঐতিহাসিক স্মৃতিবাহী স্থানে পরিণত হয়েছে।
গড়ভবানীপুর, পেখরো, বসন্তপুর, ভিহিভূরশুট, পারভূরশুটে এবং দোগাছিয়া প্রভৃতি দামোদরের পশ্চিম তীরবর্তী গ্রামগুলি বর্তমানে হাওড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে, আটপুর, রাজবলহাট এবং গদলতা প্রভৃতি দামোদরের পূর্ব তীরবর্তী গ্রামগুলি ভুরশুট রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ভূরশুট রাজ্যের অন্যতম অধিপতি ছিলেন কায়স্থ রাজা পাণ্ডুদাস। তিনি ছিলেন শ্রীধর আচার্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা পাণ্ডুদাসের পূর্বে একজন ধীবর (মৎস্যজীবী) রাজা এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন।
নবাব হুসেন শাহের শাসনামলে চতুরানন নিয়োগী নামে এক ব্রাহ্মণ ভূরশুটে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। চতুরাননের পুত্র ফুলিয়া মুখোপাধ্যায়ের বংশধর কৃষ্ণ রায় ভূরশুটের প্রথম ব্রাহ্মণ রাজা হিসেবে পরিচিত। তিনি মহাকবি কৃত্তিবাসের বংশধর এবং তার তৃতীয় পুরুষ। আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮৩-৮৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা কৃষ্ণ রায় ভূরশুট রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।
রাজা কৃষ্ণ রায়ের বংশধর রাজা প্রতাপনারায়ণ (১৬৫২-১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দ) ভূরশুটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। রামদাস আদকের আনাদি মঙ্গল কাব্যে তাঁর নাম উল্লেখিত হয়েছে।
রামদাসের রাজ-বন্দনা :
ভূরসুটে রাজা রায় প্রতাপনারায়ণ।
দানদাতা কম্পতরু কর্ণের সমান ॥
রাজা প্রতাপনারায়ণের একমাত্র পুনের নাম নরনারায়ণ। তাঁহার মত্যুর পর বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্র বলপূর্বক ভুরশুট পরগণা দখল করেন।
ভবশঙ্করী, যিনি এক গ্রাম্য জমিদারের কন্যা ছিলেন, শৈশব থেকে অসি-খেলা, ঘোড়ায় চড়া এবং তীরন্দাজিতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কেবল তা-ই নয়, তিনি অসাধারণ বক্তৃতা ক্ষমতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। ভূরশুটের রাজা রুদ্রনারায়ণ তাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করেন। রুদ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর রাজ্যের শাসনভার ভবশঙ্করীর ওপর অর্পিত হয়। তিনি রাজ্য পরিচালনায় বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন।
এই সময়ে ভূরশুটের পাঠান সর্দার ওসমান খাঁ মোগল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং ভবশঙ্করীর সাহায্য প্রার্থনা করেন। তবে ভবশঙ্করী তার অনৈতিক উদ্দেশ্যে সহায়তা করতে অস্বীকার করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওসমান খাঁ ভূরশুট আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। পাণ্ডুয়ার নিকটে গড় ভবানীপুর ছিল ভূরশুটের রাজধানী। সেখান থেকে ১৪ মাইল দূরে বাসডিঙা গড়ের কালীমন্দিরে ভবশঙ্করী পূজা দিতে গেলে ওসমান খাঁ অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সামান্য কিছু দেহরক্ষী নিয়ে ভবশঙ্করী প্রবল সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং তাঁর বীরত্বের কাছে ওসমান খাঁ পরাজিত ও নিহত হন।
এই বীরত্বের জন্য মোগল সম্রাট আকবর (১৬০০ খ্রিস্টাব্দ) ভবশঙ্করীকে ‘রায়বাঘিনী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ভূরশুটের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজও স্থানীয় ঐতিহ্য ও লোকসাহিত্যে জীবন্ত হয়ে রয়েছে।
ভুরশুটি বাংলা ৭০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত
ভূরিশ্রেষ্ঠের প্রধান বন্দর ছিল সপ্তগ্রাম। বঙ্গোপসাগর থেকে গঙ্গা এবং সরস্বতী নদীপথে বাণিজ্যপথটি হাওড়া জেলার মধ্য দিয়ে সপ্তগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সময়ে সপ্তগ্রাম একটি সমৃদ্ধশালী বন্দরনগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে পরবর্তীকালে সরস্বতী নদীর নাব্যতা হ্রাস পেলে, ভাগীরথী এবং সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত হাওড়ার বেতড় সপ্তগ্রামের বিকল্প বন্দর হিসেবে উন্নতি লাভ করে। বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মঙ্গলচণ্ডী কাব্যে (১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দ) বেতড় এবং বেতাই চণ্ডীর (হাওড়া শিবপুর) উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৭১৩ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি ফররুখসিয়ারের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল কাউন্সিল তাঁর কাছে একটি ডেপুটেশন পাঠায়। তারা হুগলি নদীর পূর্ব তীরে ৩৩টি এবং পশ্চিম তীরে ৫টি গ্রামে বসতি স্থাপনের অনুমতি চায়। ১৭১৪ সালের ৪ মে তারিখে কাউন্সিলের কনসালটেশন বুক অনুযায়ী এই ৫টি গ্রাম হল: সালিকা (সালকিয়া), হাড়িড়া, কাসুন্দিয়া, রামকৃষ্ণপুর এবং বেতড়। এই এলাকাগুলি বর্তমানে হাওড়া শহরের অন্তর্গত।
ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি ছিল ব্রাহ্মণ ও বণিক শ্রেণি। মেধা এবং বাণিজ্যের এই সংযোগ রাজ্যকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত এই গোষ্ঠী রাজনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে এবং দুর্বল-অত্যাচারী শাসক সিরাজউদ্দৌলার পতনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ব্রাহ্মণ-বণিক সম্প্রদায় অর্থায়নের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কলকাতায় (Calcutta) তাদের বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
কলকাতার প্রতিষ্ঠা এবং মুঘল শাসনের পতনের পেছনে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, জগৎ শেঠ ভ্রাতৃদ্বয়, উমিচাঁদ, মানিক চাঁদ এবং রায় দুর্লভ। তাঁরা কৌশল ও কূটনীতির মাধ্যমে বাংলা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এবং বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে অবদান রাখেন।
ভূরিশ্রেষ্ঠের বাংলা ভাষা ছিল এতটাই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী যে ব্রিটিশরাও এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা বাংলা শেখার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, এমনকি কখনো কখনো বাঙালিরা ইংরেজি শেখার চেয়ে ব্রিটিশরা বাংলা শেখায় বেশি উৎসাহী ছিলেন। বাংলার সাহিত্য, প্রশাসনিক ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে তা ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। এই ভাষা শুধুমাত্র সংযোগের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
উড়িষ্যায় এখন আর বাঙ্গালা ভাষা প্রচলিত নাই; কি বিদ্যালয়, কি আদালত সর্ব্বত্র উৎকল ভাষা লিখিত ও কথিত হয়। গবর্ণমেণ্ট বিদ্যালয় সকলের সংস্থাপন অবধি ঐ সমস্তে বাঙ্গালা ভাষাই প্রচলিত ছিল। সম্প্রতি মান্যবর কমিসনর সাহেবের বিজ্ঞাপণী অনুসারে বাঙ্গালা উঠিয়া গিয়া উড়িয়া ভাষা প্রচলিত হইয়াছে। শ্রীযুক্ত কমিসনর ও কতকগুলি মিসনরী সাহেবদের মনে উড়িয়াকে স্বতন্ত্র ভাষা বলিয়া প্রতীতি জম্মিয়াছে। যখন তাঁহারা এরূপ স্থির করিয়াছেন যে উড়িয়া এক স্বতন্ত্র ভাষা, এবং যখন বাঙ্গালা পুস্তক সকল উড়িষ্যার পাঠশালা হইতে নির্ব্বাসিত হইতেছে, তখন অনেকেই সন্দেহ করিতেছেন, উড়িয়াই বুঝি উড়িষ্যায় প্রচলিত থাকিল। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে উড়িয়াকে স্বতন্ত্র ভাষা বলিয়া প্রতীতি হয় না; এবং যতই অনুসন্ধান করিতেছি ততই ঐ সংস্কারের দৃঢ়ীকরণই হইতেছে। (উড়িয়া স্বতন্ত্র ভাষা নহে। শ্রীযুক্ত কান্তিচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, ইং ১৮৭৮। জ্যানুয়ারি )
March 31, 2025

