বাল্মীকি রামায়ণ বালকাণ্ড (সর্গ ৪)

বাল্মীকি রামায়ণ

সম্পূর্ণ বাল্মীকি রামায়ণ: তন্ময় ভট্টাচার্য অনূদিত

বালকাণ্ড

শ্রীমদ্বাল্মীকীয়ে আদিকাব্যে বালকাণ্ডে চতুর্থঃ সর্গঃ

प्राप्तराज्यस्य रामस्य वाल्मीकिर्भगवानृषिः ।
चकार चरितं कृत्स्नं विचित्रपदमर्थवत् ॥१-४-१॥

রামের রাজ্যপ্রাপ্তি হইলে, মহামুনি ভগবান্‌ বাল্মীকি রাম চরিত সমগ্ররূপে বিচিত্র ভাষা ও অর্থপূর্ণ পদে রচনা করিলেন। তিনি চব্বিশ সহস্র শ্লোক, পাঁচ শত সর্গ, ছয় কাণ্ড উত্তরোত্তর রচয়িত করিলেন।

এইরূপে ভবিষ্যৎসহ কাব্য রচনা করিয়া, মহাপ্রাজ্ঞ মুনি চিন্তা করিলেন— কে এই কাব্য প্রচার করিবে? তাঁহার ভাবনা চলাকালে, ধ্যাননিষ্ঠ ঋষির চরণ ধরিলেন দুইজন মুনিবেশধারী কুশ ও লব।

ধর্মজ্ঞ, যশস্বী, রাজপুত্র, সুস্বরযুক্ত, ভ্রাতৃদ্বয় সেই আশ্রমে বাস করিতেছিলেন। সেই দুই মেধাবান, বেদে সুপ্রতিষ্ঠিত, মুনি তাহাদের বেদোত্তর প্রচারের নিমিত্ত কাব্য পাঠ করিতে শিক্ষাদান করিলেন। রচনাকার, ধর্মে প্রতিষ্ঠিত, সেই মহৎ রামায়ণ, সীতার মহাচরিত ও পৌলস্ত্য বধ (पौलस्त्यवधमित्येवं) নামে পরিচিত কাব্য শিক্ষা দিলেন।

পাঠ্য ও গীত, উভয়রূপে মধুর, ত্রিবিধ প্রমাণযুক্ত, সপ্তবিধ জাতিযুক্ত, তন্ত্রী ও লয়সহ এই কাব্য তিনি রচিলেন। শৃঙ্গার, করুণ, হাস্য, রৌদ্র, ভয়ানক, বীর প্রভৃতি রসবিশিষ্ট এই কাব্য গাইবার উপযোগী হইল। তাহারা গন্ধর্বতত্ত্বজ্ঞ, স্থান ও মূর্চ্ছনা বিশারদ, সুস্বরযুক্ত, গন্ধর্বসদৃশ রূপসম্পন্ন ভ্রাতা। রূপলক্ষণে সমন্বিত, মধুরস্বরে কথা বলা, যেন রামের শরীর (बिम्बौ रामदेहात्) হইতে বাহির হইয়া আসিল দুই প্রতিচ্ছবি।

তাহারা ধর্মময় শ্রেষ্ঠ কাহিনি, কাব্যরূপে অলঙ্কৃতরূপে উচ্চারণ করিয়া সমস্ত শ্রোতৃবর্গকে মোহিত করিল। ঋষি, ব্রাহ্মণ ও সাধুগণের সভায়, যথাযথ উপদেশ অনুসরণে, তাহারা সংগীত পরিবেশন করিত। মহাত্মা, মহাভাগ্যবান, সর্বলক্ষণসম্পন্ন সেই দুইজন একদা পুণ্যবান্‌ ঋষিদের মাঝে উপস্থিত হইয়া গীত করিলেন। সেই কাব্য শ্রবণ করিয়া সমস্ত ঋষির চোখ অশ্রুপূর্ণ হইয়া উঠিল।

তাহারা বিস্ময়াকুল হইয়া “সাধু! সাধু!” বলিয়া স্তব করিলেন (साधु साध्विति तावूचुः )। ধর্মপ্রেমী সেই ঋষিগণ পরম তৃপ্তি লাভ করিলেন। তাহারা কুশ ও লবকে গীতগুণে প্রশংসা করিলেন, কহিলেন— “অহো, গান ও শ্লোকের মাধুর্য অপূর্ব!”

যদিও বহু পূর্বে ঘটনাগুলি ঘটিয়াছে, তথাপি এই দুইজন এমনভাবে গাইলেন যেন উপস্থিত ঘটমান বস্তুর অভিজ্ঞতা। তাহারা সেইরূপে ভিতর দিয়া প্রবেশ করিয়া, হৃদয়স্বর সহকারে সেই ভাবনাভাবে গান গাইলেন।

তাহারা পরস্পরে সহযোগী হইয়া, মধুর, রক্তিম ও স্বর-সুষমাসম্পন্ন গান গাহিয়া, মহান্‌ ঋষিগণ হইতে প্রশংসা লাভ করিলেন। তাহারা অতিশয় আরক্তভাবে, মধুরভাবে গাহিতে লাগিলেন। এক মুনি প্রসন্ন হইয়া তাহাদিগকে কলশ দিলেন। আরেকজন বিখ্যাত মুনি ভল্লী দিলেন, অপরজন কৃষ্ণাজিন, আরও একজন উপনয়নের জন্য ঋতুবন্ধ দিলেন। আরেকজন কামণ্ডলু দিলেন, কেউ মৌঞ্জীবন্ধ, কেউ বৃষী, অপর মুনি কৌপীন দিলেন। আরেকজন কুঠার, কেউ কাষায়বস্ত্র, কেউ অংশুকবস্ত্র (चीरमन्यो ददौ मुनिः), অপরজন জটাবাঁধার রজ্জু দিলেন। একজন যজ্ঞপাত্র দিলেন, অপরজন কাঠের বোঝা, অন্য কেউ ঔদুম্বরী যজ্ঞ কাষ্ঠ দিলেন (औदुम्बरीं ब्रुसीमन्यः)।

কেহ কেহ বলিলেন— “স্বস্তি!”, অপরেরা আনন্দে বলিলেন— “আয়ুষ্মান্‌ ভব।” এইভাবে সমস্ত সত্যবাক্‌ ঋষিগণ, আশ্চর্য এই কাব্য অবলোকন করিয়া, দুই বালককে আর্শীবাদ ও উপহার প্রদান করিলেন। এই কাব্যই সকল কবিদের আশ্রয়স্বরূপ, যথাযথভাবে সম্পূর্ণ ও সমাপ্ত। তাহারা সমগ্র সংগীতে পারদর্শী, এই গান সর্বত্র গাহিয়া প্রশংসা লাভ করিলেন।

আয়ুর বৃদ্ধিকারী, পুষ্টিদায়ক, শ্রোতাদের মন মোহিতকারী— এই গান সর্বত্র শ্রুত ও প্রশংসিত হইল (गीतं सर्वगीतेषु कोविदौ )।

একদিন রাজপথ ও রাজবাটদিগে চলিতে চলিতে, রাজারাজেশ্বর ভরতাগ্রজ রাম তাহাদিগকে দর্শন করিলেন। তৎপর তিনি কুশ ও লবকে নিজগৃহে আনাইলেন।
সমাদর যোগ্য সেই দুইজনকে রাম সমাদর করিলেন। রাম তখন স্বর্ণময় সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। সেই সময় তাঁহার চারি দিক ঘেরিয়া ছিলেন মন্ত্রীমণ্ডলী ও ভ্রাতৃদ্বয় (सचिवैर्भ्रातृभिश्च समन्वितः)। সেই দুই রূপবান, নম্র, ভ্রাতৃদ্বয়কে দেখিয়া রাম লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন ও ভরতকে বলিলেন—
“এই দুইজন দেবতুল্য কণ্ঠস্বরসম্পন্ন কিশোরের মুখ হইতে এই কাহিনি শ্রবণ করা যাউক।”

তৎপর তিনি সেই দুইজন গায়ককে সুন্দর অর্থযুক্ত ও চমৎকার পদযুক্ত কাব্য পরিবেশনে অনুরোধ করিলেন।
তাহারা মধুর, মনোহারিণী, হৃদয়প্রবেশী স্বরে গান করিতে লাগিল।
তন্ত্রী ও লয় অনুযায়ী, শ্রুতার্থ বিশিষ্ট সেই গীত সর্বাঙ্গ ও হৃদয় প্রফুল্ল করিল।
এই গান শ্রবণ সুখকর হইয়া, লোকসমাজে দীপ্তি ছড়াইতে লাগিল।

“এই দুই মুনি পার্থিব লক্ষণবিশিষ্ট (इमौ मुनी पार्थिवलक्षणान्वितौ ), কুশ ও লব দুই মহাতপস্বী, যাঁহারা আমার মহান চরিত গাইতেছেন— তাহা সত্যই সকলের মঙ্গলকর।”

এইভাবে রামের বাক্য অনুসারে, তাহার পথ-নির্দেশানুসারে গান গাহিতে লাগিল। রাম সভাসদগণে পরিবেষ্টিত হইয়া ধীরে ধীরে সেই গান শুনিতে লাগিলেন, এবং হৃদয় হইতে বিস্মিত হইলেন।

ततस्तु तौ रामवचः प्रचोदिता-
वगायतां मार्गविधानसम्पदा ।
स चापि रामः परिषद्गतः शनै-
र्बुभूषयासक्तमना बभूव ह ॥१-४-३६॥

ইতি শ্রীমদ্রামায়ণে বাল্মীকীয় আদিকাব্যে বালকাণ্ডে চতুর্থঃ সর্গঃ।

বালকাণ্ড


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল