সাহিত্যে অশ্লীলতা ও অশ্লীল সাহিত্য

সাহিত্যে অশ্লীলতা ও অশ্লীল সাহিত্য

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

সাহিত্যে অশ্লীলতা মানে যখন যৌনতার প্রকাশ শিল্প ও রসের ঊর্ধ্বে উঠে নিছক লালসা উদ্রেককারী হয়ে ওঠে, তখনই তা অশ্লীল। ভারতীয় সাহিত্যে শৃঙ্গার রস চিরকাল শিল্প ও কাব্যের শ্রেষ্ঠ রস হিসেবে স্বীকৃত, এবং এটি অশ্লীল নয়, বরং মাধুর্য ও সৌন্দর্যের প্রকাশ। এখন সাহিত্যে অশ্লীলতা আর অশ্লীল সাহিত্য দুটি ভিন্ন জিনিস। অশ্লীলতা সেই প্রকাশ যা শিল্প ও সাহিত্যের ছদ্মবেশে লালসা উদ্রেক করে এবং জনসমাজের নৈতিকতাকে বিপন্ন করে, আর যেখানে শিল্প বা রসের প্রাধান্য আছে সেখানে অশ্লীলতা ঢাকা পড়ে যায়।

সাহিত্যে অশ্লীলতা বিষয়টি একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রশ্ন, যা আইন, সাহিত্য, শিল্প এবং সমাজনৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় ‘অশ্লীল’ শব্দটির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ করেছে।

আদালত প্রথমে উল্লেখ করেছে যে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় ব্যবহৃত ‘অশ্লীল’ শব্দটি ইংরেজি আইনের ধারা থেকে ধার করা হয়েছে। ইংল্যান্ডে তিনশো বছর আগে চার্লস সেডলি যখন এক পানশালার বারান্দায় নিজেকে প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করেন, তখন obscenity একটি সাধারণ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হয়। তবে বইয়ের অশ্লীলতার বিচার দীর্ঘকাল চার্চ আদালতের অধীনে ছিল। ১৭০৮ সালে Queen v. Read মামলায় প্রথমবার বইয়ের অশ্লীলতা আইনগতভাবে আলোচিত হয়। ১৭১৭ সালে Curl মামলায় প্রথম এটিকে Common Law Offence বলা হয়। ১৮৫৭ সালে লর্ড ক্যাম্পবেল প্রথম আইন প্রণয়ন করেন অশ্লীল বইয়ের বিরুদ্ধে এবং Hicklin মামলায় (১৮৬৮) সেই আইনের ব্যাখ্যা দেন।

Cockburn, C.J. Hicklin মামলায় অশ্লীলতার মানদণ্ড স্থির করেন এভাবে— “কোনো রচনার প্রবণতা যদি সেই পাঠকদের মনে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে, যারা এমন প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীল, তবে সেটিই অশ্লীল। বিশেষত যদি তা তরুণ-তরুণী বা প্রাপ্তবয়স্কদের মনে অশুচি ও লালসামূলক চিন্তার জন্ম দেয়।” এই পরীক্ষাই দীর্ঘদিন ভারতীয় আদালতে গৃহীত হয়েছে।

পরে আদালত বলেন— “সাহিত্য ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সঙ্গে বদলেছে। একসময় Pamela, Moll Flanders, Mill on the Floss কিংবা Mrs. Warren’s Profession অশ্লীল মনে হতো, আজ আর তা হয় না। আবার Caldwell-এর God’s Little Acre বা André Gide-এর If It Die বর্তমান সময়ে সহজেই গ্রহণযোগ্য। তাই অশ্লীলতার মানদণ্ড যুগে যুগে ভিন্ন। তবে Hicklin টেস্ট পুরোপুরি বাতিল করা যায় না, কারণ আদালতের দায়িত্ব প্রতিটি বই বা রচনাকে সমাজের নৈতিকতার প্রেক্ষাপটে বিচার করা।”

আদালত এ-ও মন্তব্য করেন— “অশ্লীল অংশকে অবশ্যই পুরো রচনার প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে, কিন্তু সেটিকে আলাদাও পরীক্ষা করতে হবে। যদি তা এতটাই প্রবল হয় যে পাঠকের নৈতিকতা বিনষ্ট করে, তবে তা অশ্লীল। তবে যৌনতার সব প্রকাশ অশ্লীল নয়। সাহিত্য ও শিল্পে যৌনতার প্রকাশ থাকতে পারে, যা শিল্পমূল্য দ্বারা আচ্ছন্ন হলে অশ্লীল হয় না। খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্য কিংবা জগন্নাথ মন্দিরের প্রাচীরচিত্র শৃঙ্গার রস-এর প্রকাশ, কিন্তু সেগুলো পর্নোগ্রাফি নয়।”

এখানে আদালত স্পষ্ট করেন যে— চটি পুস্তক মানে পর্নোগ্রাফি, যা অশ্লীল সাহিত্য । আবার শৃঙ্গার রসের সাহিত্য অশ্লীল নয়। কারণ ‘অশ্লীল’ মানে হলো শালীনতা বা সভ্যতার অভাব। পশুপাখি নগ্ন, কিন্তু তারা অশ্লীল নয়, কারণ তাদের ক্ষেত্রে মানবসমাজের নৈতিক মানদণ্ড প্রযোজ্য নয়।

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বে শৃঙ্গার রস-কে শ্রেষ্ঠ রস হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ভারতীয় কাব্যশাস্ত্রে এর অসংখ্য উদাহরণ আছে। সাহিত্য দর্পণ-এ বলা হয়েছে—

रसप्रधानाः शब्दार्था गुणालङ्कारवृत्तयः ।
रीतयश्चेयती शास्त्रप्रमेयं काव्यपद्धतिः ॥

অর্থাৎ, কাব্যের মূল লক্ষ্যই হলো রস প্রকাশ। শৃঙ্গার রস মানুষের হৃদয়ে মাধুর্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে। উজ্জ্বলনীলমণি-তে রূপ গোস্বামী (১৪৮৯-১৫৬৪ খ্রি.) বলেছেন—

शृङ्गाररससर्वस्वं शिखिपिच्छविभूषणम् ।
अङ्गीकृतनराकारमाश्रये भुवनाश्रयम् ॥

অর্থাৎ, শৃঙ্গার রসকে ভগবান নিজেই অলঙ্কার হিসেবে ধারণ করেছেন। তাই নগ্নতা বা শরীরচর্চা কখনো শিল্পের অংশ হতে পারে, কখনো ভক্তিরসেও রূপ নিতে পারে। যৌনতার সব প্রকাশ অশ্লীল নয়। শিল্প, সাহিত্য বা ধর্মীয় রসে যৌনতার স্থান আছে। খাজুরাহো মন্দিরের (৭০০-৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) ভাস্কর্য, জগন্নাথ মন্দিরের (১১০০- খ্রি) প্রাচীরচিত্র—এসব শৃঙ্গার রস-এর প্রকাশ, কিন্তু অশ্লীল নয়।”

আইনগত অশ্লীলতা আর সাহিত্যিক অশ্লীলতা ভিন্ন। যে বিষয় সাহিত্যতত্ত্বে গ্রহণযোগ্য, তা আইনের দৃষ্টিতে নাও হতে পারে। আবার সমাজের মানদণ্ড দেশভেদে ভিন্ন। ফ্রান্সে যা সাহিত্য, ইংল্যান্ডে তা অশ্লীল ধরা হতে পারে, আবার উভয় দেশেই গ্রহণযোগ্য কোনো লেখা ভারতে অশ্লীল মনে হতে পারে। লেখকের কাছ থেকে এই প্রত্যাশা করা যায় না যে তিনি কেবল কিশোরদের কথা ভেবে লিখবেন; সাহিত্য মূলত প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের জন্য। তাই আদালতের কাজ হলো দেখা, কোনো রচনার পাঠে সমাজের একটি শ্রেণি নৈতিকভাবে বিপথগামী হচ্ছে কি না।

চন্দ্রকান্ত কল্যাণদাস কাকোড়া বনাম মহারাষ্ট্র (১৯৭০) মামলায়ও একই প্রশ্ন ওঠে। আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে অশ্লীলতার বিচার আদালতের নিজস্ব দায়িত্ব, তবে প্রয়োজনে সাহিত্যবিশারদদের মতামত নেওয়া যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের।

শেষে আদালত বলেন— “অশ্লীলতা সেই প্রকাশ যা শিল্প ও সাহিত্যের ছদ্মবেশে লালসা উদ্রেক করে এবং জনসমাজের নৈতিকতাকে বিপন্ন করে। কিন্তু যেখানে শিল্পের ওজন অশ্লীলতার চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে অশ্লীলতা ঢাকা পড়ে যায়। তাই সাহিত্যে যৌনতার উপস্থাপন তখনই অশ্লীল হয় যখন তা নিছক কুপ্রবৃত্তিকে পুষ্ট করে, আর শিল্প ও রসের সুষমা সেখানে অনুপস্থিত।”

চৈতন্য মহাপ্রভু (গৌড়-উৎকল) প্রেম ও কামকে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন—যেখানে ভোগপ্রবৃত্তির তাড়না আছে, যেখানে নিজের দেহসুখ ও লালসা পূরণের ইচ্ছা আছে, সেটি হলো কাম; আর যেখানে ভক্ত হৃদয়, মন ও দেহের সমস্ত অভিব্যক্তি কেবল ভগবানের সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত, সেটিই হলো প্রেম। কাম সর্বদা প্রত্যাখ্যানযোগ্য, কিন্তু প্রেমই হলো শৃঙ্গার রসের মজ্জা, শুদ্ধ, মাধুর্য। সংস্কৃত সাহিত্যে এই প্রেমকে বলা হয়েছে ‘শ্রীল’ (Śrīl)—যেখানে শুদ্ধতা, নিবেদন ও দেহাতীত আনন্দের সমাবেশ ঘটে।

সাহিত্য হলো এক সভ্যতার প্রকাশ ও পরিচয়। বৈদিক সাহিত্যকে বলা হয় বৈদিক সভ্যতার বহিঃপ্রকাশ। সেই সভ্যতা চিরন্তন, তাই তাকে বলা হয় সনাতনঈশাবাশ্য উপনিষদ ঘোষণা করেছে—
ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।
অর্থাৎ, জগতে যা কিছু আছে, সবই বিষ্ণুর অচিন্ত্য শক্তি দ্বারা আচ্ছাদিত।

বিষ্ণু এক এবং একইসঙ্গে বহু। তাঁর যে আনন্দশক্তি, তাকে বলা হয় হ্লাদিনীবজ্রজাল তন্ত্রে এই শক্তির নাম দেওয়া হয়েছে চিত্‌বিলাস (Chid Vilāsa)—চৈতন্যের অনন্ত লীলা।

যজুর্বেদে পুরুষমেধ যজ্ঞ অধ্যায়ে বলা হয়েছে—
সমস্ত কিছুই যজ্ঞপুরুষ বিষ্ণুর অন্তর্গত—
শুভ, অশুভ, জঘন্য, সর্বপ্রকার বস্তুই তাঁকে নিবেদিত। যজ্ঞে যখন সবকিছু অর্পিত হয়, তখন সেই অর্পণ থেকে জন্ম নেয় অদ্বয় প্রেম—যা ভক্তকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত করে।

এখানেই সাহিত্য ও তত্ত্ব এক হয়ে যায়, আবার ভিন্নও হয়। চিত্‌বিলাস দ্বারা জড় দেহে সেই ঐক্য প্রকাশিত হয়। মানুষের প্রতিটি কোষকে যদি উপলব্ধি করা যায়, তবে দেখা যাবে তা নিজেই এক একটি ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড। আবার সমগ্র দেহকে দেখা যাবে বহুধা বহু-বিশ্ব (multi-multiverse) হিসেবে—যেখানে বিষ্ণু ও তাঁর হ্লাদিনীশক্তি একইসঙ্গে একত্রীভূত এবং বিভক্ত।

কবি বা সাহিত্যিকেরা এই চিরসত্যের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আভাস পান। কেউ হয়তো কোটি কোটি অংশের এক অণুমাত্র উপলব্ধি করেন, আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁরা রচনা করেন শৃঙ্গার কাব্য। কারও সেই উপলব্ধিই থাকে না, তাই তাঁদের লেখনী হয়ে ওঠে কেবল অশ্লীল পাঠ্যসামগ্রী। আবার কেউ কেউ দূর থেকে দেখে তৎস্থ ভাব অবলম্বন করেন।

অতএব, কাম যখন কেবল ইন্দ্রিয়সুখের প্রকাশ, তখন তা অশ্লীলতার জন্ম দেয়। আর প্রেম যখন ভগবানকে নিবেদন, তখন তা সাহিত্যে পরিণত হয় শ্রীল শৃঙ্গার রসে—যেখানে নগ্নতাও হতে পারে শিল্প, যৌনতাও হতে পারে ভক্তি, আর দেহময় জীবনও হতে পারে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিফলন।

ছাড়িয়া দিলাম নৌকা খানি, রূপমতীর জলে,
ভাটির টানে নৌকা চলে মাঝ দরিয়ার জলে-

নৌকা হেলে, নৌকা দোলে, রূপমতীর জলে,
সবাই বলে নৌকা আমার বাণিজ্যেতে চলে।

উজান নগর নৌকা এলো, ব্যবসা হলো ভালো,
নৌকা আবার ছাড়িয়া দিলাম নৌকা চলে ভালো ।

হঠাৎ ঝড়ে নৌকা ডোবে রূপমতীর জলে,
আশা ভাসে স্বপ্ন ডোবে অন্তহীন ঢলে।

রূপমতী, রূপমতী, তোমায় পেলাম এবার,
রূপমতী পায় না মোরে, ভেসে চলে আবার-

রূপমতী, রূপমতী, শুকাইও না যেন,
আবার যদি নৌকা আসে ভাসিয়ে নিও যেন ।।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল