কুমারহট্ট

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

কুমারহট্ট (হালিশহর)

কুমারহট্ট, যা আধুনিককালে হালিশহর নামে পরিচিত, বাংলার প্রাচীন হট্টনগরসমূহের অন্যতম; নবহট্ট (নৈহাটি-নবদ্বীপ) ও শ্রীহট্ট (সিলেট)-এর পাশাপাশি একে মধ্যযুগীয় বঙ্গের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্ররূপে গণ্য করা হয়। ‘হট্ট’ শব্দটি বোঝায় বাণিজ্যকেন্দ্র বা বাজার, এবং কিংবদন্তি অনুযায়ী কুমার পাল (১১৩০ খ্রিষ্টাব্দে) নামে এক রাজা এই বন্দরের উদ্বোধন করেন ও নিয়মিত এখানে আসতেন। হালিশহর নামটির উৎপত্তি ‘হাল’ (নতুন) ও ‘শহর’ (নগর) শব্দযুগলের সংযোগে—নতুন গড়ে ওঠা বসতিকে বোঝায়।

মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চণ্ডীমঙ্গলে বলছেন—

“বাম দিকে হালিশহর দক্ষিণে ত্রিবেণী/
যাত্রীদের কোলাহলে কিছুই না শুনি।”

এই পঙ্‌ক্তিগুলি কুমারহট্ট বা হালিশহরের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস আলোচনায় মূল্যবান, কারণ এটি প্রমাণ করে যে হালিশহর তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে সুপরিচিত স্থান ছিল এবং চন্দ্রকেতুগড়, ত্রিবেণী, নবদ্বীপ, নৈহাটি প্রভৃতি এলাকার সঙ্গে এক অভিন্ন সংস্কৃতি-প্রবাহে অবগাহন করছিল।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু:

“…ঈশ্বরপুরীর সঙ্গে প্রভুর ভোজন।

ইহার শ্রবণে মিলে কৃষ্ণপ্রেমধন।।

তবে প্রভু ঈশ্বরপুরীর সর্ব অঙ্গে।

আপনে শ্রীহস্তে লেপিলেন দিব্যগন্ধে।।

যত প্রীত ঈশ্বরের ঈশ্বরপুরীরে।

তাহা বর্ণিবারে কোন জন শক্তি ধরে।।

আপনে ঈশ্বর শ্রীচৈতন্য ভগবান।

দেখিলেন ঈশ্বরপুরীর জন্মস্থান।।

প্রভু বোলে কুমারহট্টেরে নমস্কার।

শ্রীঈশ্বরপুরী যে গ্রামে অবতার…।।

( “শ্রীচৈতন্যভাগবত”- পঞ্চদশ অধ্যায়)

“…প্রভু বোলে ঈশ্বরপুরীর জন্মস্থান।

এ মৃত্তিকা আমার জীবন ধন প্রাণ।।

হেন ঈশ্বরের প্রীতি ঈশ্বরপুরীরে।

ভক্তেরে রাড়াতে প্রভু সেইশক্তি ধরে।।

প্রভু বোলে গয়া করিবারে আইলাম।

সার্থক হইল ঈশ্বরপুরী দেখিলাম।।

আর দিনে নিভৃতে ঈশ্বরপুরী স্থানে।

মন্ত্রদীক্ষা চাহিলেন মধুর বচনে।।

পুরী বোলে মন্ত্র বা বলিয়া কোন কথা।

প্রাণ আমি দিতে পারি তোমারে সর্বথা।।

তবে তান স্থানে শিক্ষাগুরু নারায়ণ।

করিলেন দশাক্ষর মন্ত্রের গ্রহণ।।

তবে প্রভু প্রদক্ষিণ করিয়া পুরীরে।

প্রভু বোলে দেহ আমি দিলাম তোমারে..।।”

১৫১৩ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন বৃন্দাবন যাত্রার উদ্দেশ্যে পুরীধাম থেকে গঙ্গাপথে বঙ্গদেশ অতিক্রম করেন, তখন কুমারহট্টে অবস্থান করেন এবং এখান থেকে পানিহাটিতে রাঘব পণ্ডিতের গৃহে যান। রাঘব ছিলেন মধ্যযুগীয় বাঙালি পণ্ডিতদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তাঁর পিতামহ গঙ্গাপ্রসাদ চতুর্ব্বেদী প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রী রাধামদনমোহন বিগ্রহের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন রাঘব। শ্রীচৈতন্য তাঁর আকুল আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হন এবং সেই ঐতিহাসিক মিলন চৈতন্যভাগবতে লিপিবদ্ধ:

“কতদিন থাকি প্রভু শ্রীবাসের ঘরে।
তবে গেলা পানিহাটি রাঘব মন্দিরে।।
কৃষ্ণ-কার্যে আছেন শ্রীরাঘব পণ্ডিত।
সম্মুখে শ্রীগৌরচন্দ্র হইলা বিদিত।।
প্রাণনাথ দেখিয়া শ্রীরাঘব পণ্ডিত।
দণ্ডবৎ হইয়া পড়িলা পৃথিবীত।।” (চৈতন্য ভাগবত, ৫/৭৫–৭৭)

কুমারহট্টে তৎকালীন পণ্ডিত সমাজের খ্যাতি এতই ছিল যে, একসময়ে নবদ্বীপের বিদ্যাচর্চার সমতুল্য মর্যাদা লাভ করে। এখানে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের চতুষ্পাঠী ছিল, এবং পুঁথিচর্চা, কাব্যতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যাপনার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিল। এমনই এক মহান পণ্ডিত ছিলেন মাধবেন্দ্র ভট্ট। সিলেট (শ্রীহট্ট) থেকে আগত এই ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ বিষ্ণুগ্রামে চতুষ্পাঠী স্থাপন করেন, যা অল্প সময়েই কুমারহট্ট ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রসিদ্ধ হয়। তিনি পরবর্তীকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করে ‘মাধবেন্দ্র পুরী’ নাম ধারণ করেন এবং বৈষ্ণব ধর্মধারায় এক ঐতিহাসিক সাঁকো স্থাপন করেন।

অষ্টাদশ শতকে কুমারহট্ট-হালিশহরে জন্মগ্রহণ করেন শাক্তপন্থী কবি রামপ্রসাদ সেন (১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দ)। সম্ভ্রান্ত বৈদ্যবংশে জন্মগ্রহণকারী রামপ্রসাদের গীতিকবিতা ও ভক্তিমূলক সংগীত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কানে পৌঁছালে তিনি রামপ্রসাদের সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর কবিত্বশক্তি ও ঈশ্বরভক্তিতে মোহিত হয়ে পড়েন। রামপ্রসাদের প্রভাবে কুমারহট্ট রাজাধিরাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নিকট প্রিয় স্থান হয়ে ওঠে এবং তিনি প্রায়শই এখানে আসতেন। এই ঘটনাও মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্য-সংস্কৃতির প্রবাহে কুমারহট্টকে এক গৌরবময় অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কুমারহট্ট হালিশহরের সঙ্গে চট্টগ্রামের ‘হালিশহর’ মেট্রোপলিটন থানাকে গুলিয়ে ফেলা অনুচিত। বর্তমান কুমারহট্টের উত্তরাংশে কাঁচড়াপাড়া (কাঞ্চনপল্লী) অবস্থিত, যেখানে রাণী রাসমণির জন্মস্থান বলে স্বীকৃত ‘কোনা’ গ্রাম অবস্থিত। রাসমণি ১৭৯৩ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর এক মহিষ্য কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং কলকাতার জনবাজারের জমিদার রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।

লোকজ ইতিহাসে বারুইপাড়ার ‘শুভচণ্ডীতলা’ও গুরুত্বপূর্ণ; সেখানে আজও সেনযুগীয় গণেশমূর্তি পূজিত হয়। পাশের পুকুর খননের সময় আবিষ্কৃত, পালিশযুক্ত পাথরের সেই গণেশমূর্তির উচ্চতা প্রায় দুই ফুট এবং তা পদ্মাসনে আসীন। এখানকার পানের বরোজ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ‘পবনদেব’-এর পূজাও প্রচলিত।

তথ্যসূত্র:

  • চৈতন্য ভাগবত, মধ্যখণ্ড, রচয়িতা: বৃন্দাবন দাস।
  • মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, চণ্ডীমঙ্গল
  • ভবানী রায়চৌধুরী, বঙ্গীয় সাবর্ণ কথা, কালীক্ষেত্র কলিকাতা : একটি ইতিবৃত্ত, মান্না পাবলিকেশন, ২০০৬, পৃঃ ১৭।
  • আইন-ই-আকবরী
  • মুখ্য ইতিহাস ঐতিহাসিক অভিজ্ঞান ও লোকপ্রবাদ, স্থানীয় সংরক্ষিত গাথা
  • মৌখিক ইতিহাস ও স্থানীয় পূজা-পার্বণের রীতি
  • ভট্টাচার্য, তন্ময় (সম্পা.), বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশ্বকোষ

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল