বুদ্ধভূমি নয়, ভারত যুদ্ধভূমি: অশান্তির মাঝেই শান্তির সাধনা

India is not a land of Buddha, but a land of war: The pursuit of peace amidst unrest. Sahitya Samrat

যুদ্ধই মোক্ষের পথ, সংঘর্ষেই মোক্ষের মাধুর্য

ভারতবর্ষ কখনোই নিছক এক অহিংসার ভূমি ছিল না, বরং এটি ছিল এক যুদ্ধভূমি— যেখানে যুদ্ধের মধ্য দিয়েই মোক্ষলাভ সম্ভব। ঋগ্বেদের যুগ থেকে মহাভারত এবং মহাকাব্যিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে যুদ্ধকে কখনোই ঘৃণ্য বা নীচ কার্য বলে বিবেচনা করা হয়নি, বরং তা ছিল ধর্মের এক অপরিহার্য অঙ্গ। এই ভারত যুদ্ধের দ্বারা শাসিত, যুদ্ধের দ্বারা গঠিত, এবং যুদ্ধের দ্বারাই রক্ষা পায়—তবে তা নিছক রাজ্যবিস্তার বা ভোগের জন্য নয়, বরং ঋত, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য। ঋগ্বেদের মন্ত্রে প্রতিপাদিত হয়েছে যে, অগ্নি যে যজ্ঞে পরিব্যাপ্ত হয়, সেই যজ্ঞই দেবতাদের প্রীতির বস্তু। এই যজ্ঞ একটি লৌকিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং এক উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন বেদোক্ত রাষ্ট্র-গঠনমূলক যুদ্ধপদ্ধতি। অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ, সোম, এবং বায়ু—এই সকল ঋগ্বেদীয় দেবতা হলেন যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে রাজা এবং ঋষির মিলিত প্রয়াসেই সমাজ সংগঠিত হয়।

ভারতবর্ষের ইতিহাস কোনও কল্পনার উপাখ্যান নয়—এ এক লৌকিক, পৌরাণিক ও চেতনার্থ ঐতিহ্য যেখানে যুদ্ধে নিহিত সত্য, ধর্ম, কর্ম ও মোক্ষ। এই ভারত কোনও অহিংসা-মোহগ্রস্ত ভূমি নয়, বরং এক অনবদ্য যুদ্ধভূমি, যেখানে ‘যুদ্ধ’ মানেই ‘ধর্মযুদ্ধ’, এবং ‘ধর্ম’ মানেই সর্বজনের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘শক্তির ব্যবহার’।

ঋগ্বেদে মিত্র, বরুণ ও ইন্দ্রের মতো দেবতাগণ, যাঁরা আসলে প্রাচীন ঋষি-কুলের প্রতীকী রূপ, তাঁরা সংঘর্ষের মাধ্যমে ‘ঋত’ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট ছিলেন—ঋত, অর্থাৎ মহাজাগতিক শৃঙ্খলা, সত্য ও ন্যায়ের সমাহার। রথচালিত ইন্দ্রের বজ্র, অসুর-বিনাশী অগ্নির প্রভা, যজ্ঞের উত্তাপ ও “যাতুধান”দের হত্যাই সে কালের মোক্ষের পথ। ঋষি অঙ্গিরা অগ্নির শক্তিকে ব্যবহার করে উচ্চ প্রযুক্তির সাহায্যে সমাজ পুনর্গঠন করেন। এই ‘যজ্ঞ হবির’ অন্তরালে ছিল রাষ্ট্রগঠনের মহা-উদ্দেশ্য।

ঋগ্বেদের ইন্দ্র বজ্র দিয়ে অসুর বিনাশ করেন, অগ্নি যাতুধান ধ্বংস করেন, এবং বরুণ শৃঙ্খলা রক্ষা করেন। এই দেবগণ সকলেই মর্ত্যে যুদ্ধ পরিচালনার রূপকে বহন করেন, এবং তাদের বর্ণনা একেবারে সামরিক শাস্ত্রের মতই বিশদ ও কৌশলী। এই যজ্ঞ যুদ্ধে দেবতারা অস্ত্র ধারণ করেন, শত্রুনাশ করেন, এবং পুরোহিতগণ সামরিক পরিকল্পনার নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধই ধর্ম, এই যজ্ঞই মুক্তি।

এই ভারত সংঘর্ষের মাধ্যমে ধৃত সত্য ও ঋতের দেশ। বেদ বলে, “ঋতম্ চ সত্যং চ অভীদ্ধাৎ তপসো অধ্যজায়েত”—অর্থাৎ ঋত ও সত্য সংঘর্ষের, তপস্যার, যুদ্ধেরই ফসল। ঋগ্বেদে ইন্দ্র, বরুণ ও মিত্র দেবতা কেবলমাত্র প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক নন; তাঁরা রাষ্ট্রগঠনের দেবতা, যুদ্ধবিনায়ক, এবং ঋত-প্রতিষ্ঠার সাধক।

ঋগ্বেদে বলা হয়েছে—
“अग्ने यं यज्ञं अध्वरं विश्वतः परिभूः असि । स इद देवेषु गच्छति॥”
অর্থাৎ—”হে অগ্নি! তুমি যে যজ্ঞকে সর্বদিক থেকে পরিব্যাপ্ত কর, সেই যজ্ঞই দেবতাদের মধ্যে গমন করে।”

এই যজ্ঞ আসলে যুদ্ধ; কারণ যজ্ঞের সময় দেবতারা অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করেন অন্যায়, অসুর ও মিথ্যার বিরুদ্ধে। মন্ত্রে মন্ত্রে উচ্চারিত হয়েছে এই যুদ্ধের বন্দনা—যজ্ঞই রণক্ষেত্র, ঘৃতহুতাশনই অস্ত্র, এবং বেদ-উচ্চারিত শব্দই প্রলয়ের বজ্র। ইন্দ্র শত্রু বিনাশ করেন ‘বজ্রেণ’—শক্তির সর্বোচ্চ প্রতীক দিয়ে। যুদ্ধ এখানে ধ্বংস নয়, বরং ন্যায়ের উপাসনা

বিষ্ণু, যিনি মহা-যোদ্ধা, তিনি ত্রিক্রমণ করে মর্ত্যভূমি, অন্তরিক্ষ ও স্বর্গভূমিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। অশ্বমেধ, রাজসূয়, বজপেয়, ও নবরাত্রির মতো বেদোক্ত অনুষ্ঠানগুলি ছিল অত্যাচারী শাসকের বিনাশের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকর্ম।

পঞ্চম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বে মহাভারত নামক মহাকাব্যটি “জয়” নামে পরিচিত ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। “ভগবদ্গীতা” এই মহাকাব্যের অন্তর্ভুক্ত, এক অনন্য ধর্মগ্রন্থ যা যুদ্ধ-নীতি ও আত্মবোধের সমন্বয়ে নির্মিত। মহাভারতে যুদ্ধকে ভয় বা ঘৃণার বস্তু বলা হয়নি। সেখানে কৃষ্ণ বলেন, যুদ্ধ হতে বিমুখ হওয়া ক্লীবত্বের লক্ষণ (২.৩)। অতএব হৃদয়ের দুর্বলতা বর্জন করে, ধর্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করাই উত্তম।

মহাভারত, কোনও প্রেমোপাখ্যান বা রূপকথা নয়। এটি সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত সর্বোচ্চ রণগাথা। অর্জুন যখন ক্লান্ত, ভীত, এবং মানসিকভাবে অপারগ, তখন কৃষ্ণ বলেন—

“ক্লৈব্যম্ মা স্ম গমঃ পার্থ, নৈতত্ত্বয়্য্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ॥”
(২.৩)

এই যে দুর্বলতা, এই যে বিষণ্ন বুদ্ধিগ্রস্ততা—এইই হল প্রকৃত অসামর্থ্য। কৃষ্ণ তাঁকে শুধুমাত্র যুদ্ধ করতে বলেননি, বলেছিলেন ‘ধ্যানময় যুদ্ধ’ করতে, যুদ্ধ যেখানে সত্তার অভিষেক, ধ্যান যেখানে কৌশলের মাপকাঠি। যুদ্ধ না করলে অর্জুন নরাধম হতেন, কারণ যুদ্ধের ক্ষেত্রেই ধর্মের প্রকৃত বিচার সম্ভব।

—হে পার্থ, ক্লৈব্যতায় পতিত হয়ো না। এ তোমার জন্য অনুচিত। হৃদয়ের ক্ষুদ্র দুর্বলতা পরিত্যাগ করে যুদ্ধের জন্য উঠে দাঁড়াও।

অর্জুনের দ্বিধা ও করুণামিশ্রিত মনের সমালোচনা করে কৃষ্ণ তাঁকে এক যোগ-যোদ্ধায় পরিণত করেন—যার মন প্রশান্ত, দক্ষতা নিখুঁত, এবং সাহস দুর্নিবার। অর্জুনকে কৃষ্ণ দৃঢ়ভাবে শিক্ষা দেন যে, মোক্ষলাভের একমাত্র পথ কর্ম এবং যুদ্ধের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব, কারণ অধিকার কেবল কর্মে, ফলভোগে নয়। এই বক্তব্য ভারতীয় রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে অবস্থান করে। ধর্ম এখানে নিষ্ক্রিয় সন্ন্যাস নয়, কর্মযোগ; যুদ্ধই এখানে সাধনার পন্থা। জীবনযুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে কেউ ধর্ম উপলব্ধি করতে পারে না। কুরুক্ষেত্র ধ্যানভূমি নয়, কর্মভূমি, রণক্ষেত্র, এবং সেই রণক্ষেত্রেই ধর্ম, বোধ, ও আত্মজয়ের প্রকৃত উপলব্ধি ঘটে। এই রণ, এই সংঘর্ষই ভারতীয় আত্মার মূল প্রকৃতি।

কৃষ্ণের যুদ্ধ শুধুমাত্র ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং যুদ্ধই ধর্ম। এই ‘ধর্ম’ কোনও মলিন, নির্জীব, পন্থা নয়—এ হল চৈতন্য ও চেতনার সামগ্রিক বিস্ফারণ। কালের আবর্তে সমাজের শৃঙ্খলা হ্রাস পায়—যাকে বলা হয় ‘গ্লানি’। তখনই ঈশ্বরের অবতার আবির্ভূত হন। দশাবতারের প্রতিটি কাহিনী এক-একটি ‘রিস্টোরেশন অফ অর্ডার’। এই শক্তিপাত প্রক্রিয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আত্ম-উপশমকর।

আবার বলছি, শ্রীকৃষ্ণের ধর্মযুদ্ধ ছিল শুধু ধর্মের জন্য যুদ্ধ নয়, যুদ্ধকেই ধর্ম বলে স্বীকৃতি দেওয়া। যুদ্ধ একেবারে বেদান্তিক স্তরে উন্নীত হয়—‘যোগঃ কর্মসু কৌশलম্’ (2.50)। যে যোদ্ধা ধ্যানমগ্ন, যার অস্ত্র নিশ্ছল রাগে অনল বর্ষায়, যার কৌশল স্পন্দিত হয় আত্মস্মরণে—তাকে কেউ পরাস্ত করতে পারে না। কৃষ্ণ তাই অর্জুনকে বলেন—

“তস্মাদ্যুধ্যস্ব ভারত।”
(তাই তুমি যুদ্ধ করো, হে ভারতবংশীয়)

মহাভারতের পরশুরাম ক্ষমতালিপ্সু কার্তবীর্য অর্জুনকে বধ করে তাঁর সাম্রাজ্য বৈদিক রক্ষণভাণ্ডারে রাখেন এবং তারপর তা ন্যায্যতার সাথে বন্টন করেন। বামন অবতার বলিকে পাতালে নির্বাসিত করে সমান সম্পদ বণ্টনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই বলি, প্রহ্লাদের বংশধর।

শিব ত্রিশূলধারী, বিষ্ণু চক্রধারী, কালী রক্তবর্ণা মুদ্রিত মুখে রক্তাক্ত খড়্গ হাতে, সকলেই যুদ্ধরত অথচ ধ্যানমগ্ন—এই হল ভারতের যোগ-ধর্ম-যুদ্ধ ঐতিহ্য। যোগ মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়, এটি একাগ্রচিত্তে কর্ম সাধনা।

এই ধারা বয়ে গিয়েছে ভারতের শিল্পে, সাহিত্যে, দেবসংস্কৃতিতে। শিব ধ্যানমগ্ন। বিষ্ণু যোগনিদ্রায়। কালী উন্মত্ত, কিন্তু চোখ তার গভীর ধ্যানের—এই হল ভারতের দ্বৈতভাবনা, যেখানে যুদ্ধ এবং ধ্যান একে অপরের সহোদর। দেবতারা কেবল হব্য গ্রহণ করেন না, যদি না তা কার্মিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়।

এমনকি গৌতম মুনির পূর্বসূরি কশ্যপ বুদ্ধ— যিনি ধ্যান, জ্ঞান এবং যুদ্ধের সমন্বয় করলেন, তিনিই আসল ‘আদি বুদ্ধ’। তাঁর বৌদ্ধ ধারা ছিল রণমুখী, করুণার সঙ্গে কৌশলের, ধ্যানের সঙ্গে অস্ত্রের সংশ্লেষণ—সেই ধারা হারিয়ে গেল বৌদ্ধ বিহারের নির্জীব প্রার্থনায়। শাক্য গৌতম মুনি ‘কর্ম’-বর্জিত, অনাশ্রমভিত্তিক এক নিষ্ক্রিয় অহিংস পথ গ্রহণ করেন। তাঁর অনুগতগণ ক্রমে এক প্রভাবহীন ‘ভিক্ষুক’ সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। ফলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের যুদ্ধবিমুখ জনপদগুলি ইসলামি আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সাহসহীন ভিক্ষা-নির্ভরতা, কর্মবিমুখতা, এবং সংঘর্ষের প্রতি অবজ্ঞা আমাদের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে দুর্বল করে তোলে। তুর্কি ও ইসলামী আগ্রাসনের সময়, এই বুদ্ধপন্থী নিষ্ক্রিয়তা জাতিকে আত্মরক্ষাহীন করে ফেলে।

কৌটিল্য, চন্দ্রগুপ্তের গুরুরূপে, পুনরায় স্মরণ করান যুদ্ধকৌশল, রাষ্ট্রনীতি ও সামরিক শক্তির অপরিহার্যতা। বোধিধর্ম, দক্ষিণ ভারতের ধনুর্বেদের কলারি (কালারিপায়াত্তু) ও ধ্যানকে একত্রিত করে, চীনে নিয়ে গিয়ে তৈরি করলেন শাওলিন মার্শাল আর্ট। সেই কৌশলই রক্ষা করল চীনের সমাজকে বিক্ষিপ্ত দস্যুদের হাত থেকে। এই ধর্ম যুদ্ধময়, অথচ ধ্যাননির্ভর।

রাম, বিশ্বামিত্রের নিকট ধ্যানযুদ্ধে প্রশিক্ষিত। রাবণ এই বিদ্যার জ্ঞান না থাকায় পরাজিত হয়। কৃষ্ণ, সান্দীপনির শিষ্যরূপে ধনুর্বেদ শিখে আধ্যাত্মিক অস্ত্র-বিদ্যার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটান। দ্রোণাচার্য যুদ্ধকে দেখেন বাহ্যিক রণরীতি হিসেবে, কৃষ্ণ দেখেন তা ধ্যান, কর্ম, এবং তপস্যার অন্তর্গত সমন্বয়রূপে।

এই যুদ্ধের মন্ত্র রাম শিখেছিলেন বিশ্বামিত্র থেকে, বিশ্বামিত্র যিনি ছিলেন এক রাজর্ষি; যুদ্ধ ও ধ্যানের এক অনুপম সম্মিলন। তিনি রামকে শিখিয়েছিলেন, কীভাবে ধ্যানের ভেতরেই বৃত্তিবিনাশী প্রহারের জন্ম হয়। রাম শুধু যুদ্ধ জয় করেননি, ধ্যানের মাধ্যমে যুদ্ধকে পূর্ণতা দিয়েছেন। রাবণ, পরাশক্তিমান হয়েও, এই ধ্যানযুদ্ধ জানতেন না, তাই হারলেন।

ঋগ্বেদ বলছে—

“न रिणाति यः कर्मणा स हव्यं नाश्नोति॥”
—যে কর্মে নিযুক্ত নয়, সে হব্যের ভাগী হতে পারে না। বসে থেকে আহার চাওয়া ঋষিদেরও বর্জনীয়।

ঋষি পরশুরাম অস্ত্র নিয়ে ধ্বংস করেছেন অপধর্মের কেন্দ্র কার্তবীর্য অর্জুনকে। বামন, ছিলেন এক ঋষিসন্তান, তাঁর শাস্ত্র ছিল পদক্ষেপে—এক পা পৃথ্বী, এক পা স্বর্গ, আর এক পা পাতাল; বলিকে অধস্তনে প্রেরণ করে কেরলপুত্র অঞ্চলে তিনি এক ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ নির্মাণ করেন।

ভারত সর্বদা যুদ্ধনিষ্ঠ, এবং সেই যুদ্ধ কোনও স্বেচ্ছাচারী দখলদারির জন্য নয়, বরং আত্ম-প্রতিষ্ঠা ও ধর্মের রক্ষার্থে। রামের অগ্রযাত্রা, কৃষ্ণের মহাযুদ্ধ, পরশুরামের নির্বিচার অপধর্ম বিনাশ, চক্রধারী বিষ্ণুর দশাবতার—সবই যুদ্ধনিষ্ঠ ধর্মচর্চার দৃষ্টান্ত। কল্কি অবতার তো ভবিষ্যতের ধর্মযোদ্ধা, যিনি তলোয়ার হাতে অপধর্ম বিনাশ করবেন। এই ধারাই ভারতীয় ঐতিহ্যের মূলস্রোত। শ্রীকৃষ্ণ যখন ধ্যান, কর্ম, এবং যুদ্ধ—এই তিনকে একত্র করেন, তখনই ধর্ম সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

চোল রাজারা শিবের শিষ্য হিসেবে যুদ্ধবিদ্যায় ছিলেন নিপুণ, পরশুরামের উত্তরসূরি হিসেবে নৌবাহিনীতে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। তাম্রলিপ্ত (বর্তমান মেদিনীপুর) থেকে সিন্ধু, সিন্ধু থেকে আরব—ভারত তখন বিদ্যা, বাণিজ্য ও যুদ্ধবিদ্যার তীর্থ। সারা বিশ্বের রাজন্যবর্গ আসত এই যুদ্ধধর্ম শিক্ষা নিতে। এমনকি মহাভারতে, একজন রাজা অপর রাজার সারথি হন—এই সমতা, এই আত্মোত্সর্গ, এই শ্রদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রেই সম্ভব। বিক্রমাদিত্য (ভোজা বংশের) উজ্জয়িন থেকে আরব বিশ্ব শাসন করেন, চোল রাজারা পর্শুরামের নিকট যুদ্ধ শিক্ষা নেন। তাঁদের রুদ্রোপাসনা যুদ্ধবিদ্যার মূল কেন্দ্র ছিল। চোলেরা সমুদ্রযুদ্ধে ছিল অদ্বিতীয়।

ভারতের সমসাময়িক সামরিক ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক কাঠামো ও ইংরেজি ভাষানির্ভর। নেতৃত্বের ভাষা জনসাধারণের থেকে বিচ্ছিন্ন। সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে অহিংসার প্রচার যুদ্ধনীতি ও ধর্ম-যুদ্ধ চেতনার বিপরীতমুখী। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে ভারত ট্রাম্পের নির্দেশিত যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়—এ এক পরাক্রমহীন জাতির লক্ষণ।

আজকের ভারত, ঔপনিবেশিক ধোঁয়ায়, এক প্যাসিভ নৈতিকতার আস্তাকুঁড়ে দাঁড়িয়ে ভুলে গিয়েছে তার মূল রণধর্ম। ব্রিটিশরা যুদ্ধ শিখিয়ে গেল ইংরেজিতে, পরিণামে ভারতীয় সেনা দাঁড়াল ইংরেজি আদেশ ও প্রোটোকলের উপর। গান্ধী ও আধুনিক অহিংস চিন্তা আসলে এক ব্রিটিশ-অনুমোদিত, শস্তা, আত্মবিরোধী বর্ণবাদের মোড়ক, যা ভারতকে কেবল ভিক্ষার রাজনীতি এবং দাসত্বের পথে ঠেলে দিয়েছে। 

ভারতবর্ষ বুদ্ধভূমি নয়, ভারতবর্ষ যুদ্ধভূমি। এই ভারত—যার প্রতিটি তীর্থযাত্রা, প্রতিটি পুজো, প্রতিটি দেবমূর্তি—রক্ত, আগুন, ত্যাগ, শস্ত্র, এবং ধ্যানের এক অপূর্ব ঐক্য। শরৎকালের দুর্গাপূজা কেবল মাতৃপূজা নয়, রামের রাবণবিজয়ের প্রস্তুতি; এটি যুদ্ধের মহোৎসব। এই ভারত কেবল চেতনার দেশ নয়, করণের দেশ; কেবল দার্শনিকতার নয়, প্রকৃত অভিজ্ঞতার।

পূর্ব বাংলার শারদীয়া দুর্গোৎসব আসলে রামের যুদ্ধ প্রস্তুতির চেতনাপর্ব। ভারতভূমি ধর্মক্ষেত্র, ভারতভূমি কুরুক্ষেত্র।

ভারতভূমি ধ্যানমগ্ন রণক্ষেত্র—এই কুরুক্ষেত্রই আমাদের প্রকৃত স্বরূপ, কুরুক্ষেত্রই আমাদের পরিচয়। যুদ্ধ এখানে ঘৃণার নয়, আত্মজাগরণের মাধ্যম; যুদ্ধ হল যোগ, যুদ্ধ হল ধর্ম। আর ধর্ম মানে—ক্লীবত্ব নয়, সক্রিয়তা; নিঃশব্দতা নয়, বজ্রনিনাদ। যুদ্ধ যেখানে ধ্যান, সেখানেই সত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ। এই হল ভারত। এই হল চিরন্তন ঋত-ধর্ম, সনাতন মার্গ।

সাহিত্য সম্রাট: 12th May 2025


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল