বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
চৈতন্য-পূর্ব পদাবলির ভাষাবিন্যাস: বিশ্লেষণাত্মক ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা
চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের (১৪৮৬ খ্রিঃ) পূর্বে যে পদাবলি কাব্যধারা বাংলা সাহিত্যে প্রবাহিত হয়েছিল, তা সাধারণভাবে “চৈতন্য-পূর্ব পদাবলি” নামে পরিচিত। এই পদাবলির ভাষা রচনাকাল, অঞ্চল, রচয়িতার সামাজিক অবস্থান ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে বৈচিত্র্যপূর্ণ হলেও কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যে তা চিহ্নিত হয়। এই ভাষা একদিকে চৈতন্য-পূর্ব বাংলার বিকাশমান রূপ, অন্যদিকে প্রাক-বৈষ্ণব বাউল-সহজিয়া ও নাথ-যোগী প্রভাবিত আঞ্চলিক ধ্বনিগত স্বাতন্ত্র্য। এই পর্যায়ের ভাষাকে একটি সজীব, মুখ্য ও জনজীবনের ঘনিষ্ঠ কাব্যভাষা বলা যায়।
১. ভাষার উৎস ও গঠন
চৈতন্য-পূর্ব পদাবলির ভাষা গঠিত হয়েছে মধ্য-প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের সহাবস্থানে। এর গঠনমূলক বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে:
- তৎসম শব্দের পরিমাণ কম, দেশজ ও তদ্ভব শব্দপ্রবাহ প্রধান।
- ধ্বনিসংক্ষেপ (Apocope, Syncope) ও অন্ত্য-ধ্বনিবিনাশ প্রচলিত।
- ক্রিয়ারূপে স্বরবর্ণসংকোচন, যেমন “করিলা” → “করল”, “বলিলা” → “বলল”
- উচ্চারণভেদে ‘ব’, ‘ম’, ‘ও’, ‘অ’ ধ্বনির অদলবদল।
- ব্যাকরণিক পরিবর্তনে অপপ্রয়োগ—যেমন “সে কর” (সে করে), “তুমি জাই” (তুমি যাও)
২. ভাষার স্বরূপ: মধ্যবাংলার বৈশিষ্ট্য
চৈতন্য-পূর্ব পদাবলি প্রধানত মধ্যবাংলা ভাষায় রচিত, যার বৈশিষ্ট্য—
- ধ্বনিপরিবর্তনে অগ্রসর: যেমন, “ভজ” → “বজ”, “রাধা” → “রাঁধা”
- স্বরধ্বনি সংকোচন: “করিয়া” → “কর”, “হইয়া” → “হই”
- প্রাচীন বিশেষ্য-পদান্ত ‘এ’ বা ‘ই’ নিঃশেষিত: “তাহাঁর” → “তার”, “তিনিতে” → “তিনি”
উদাহরণ (চণ্ডীদাস):
“আমার এ দেহ রসিক পিরিতের বাসা”
— এখানে “রসিক পিরিত” অর্থে “প্রেমিকের প্রেম”— এটি দেশজ রূপ, যেখানে তৎসম শব্দপ্রয়োগ পরিহার করা হয়েছে।
৩. প্রচলিত রূপান্তর ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যাকরণ
| প্রাচীন রূপ | চৈতন্য-পূর্ব রূপ | আধুনিক রূপ |
|---|---|---|
| বলিয়া | বলি, বালি | বলে |
| করিয়া | করি, কই | করে |
| তাহাঁর | তার | তার |
| সেও | সে | সে |
| নাইকো | নাহি | নেই |
| করিলা | করল | করেছিল |
৪. লিঙ্গ ও বিভক্তির ব্যবহার
চৈতন্য-পূর্ব পদাবলির ভাষায় অনেক সময় স্ত্রীলিঙ্গ-বাচক শব্দ পুরুষলিঙ্গে, এবং পুরুষলিঙ্গ-বাচক শব্দ স্ত্রীলিঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে, যা লোকভাষার প্রবণতা নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ—
“রাধা তোহে না জানে বঁধু কেমনে ভজন কর”
— এখানে “তোহে” শব্দটি হিন্দি প্রভাবযুক্ত লোকভাষা, এবং “বঁধু” পুরুষ-বাচক হলেও রাধা কর্তৃক ব্যবহার হয়েছে।
৫. উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গীয় ধ্বনিস্বভাবের প্রভাব
চৈতন্য-পূর্ব পদগুলির মধ্যে ময়মনসিংহ, যশোর, রাঢ় অঞ্চল ও বীরভূম প্রভৃতি এলাকার ধ্বনিগত স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। যেমন,
- “যায়” → “জাই”,
- “বলো” → “বল”,
- “হরিরে” → “হরিরে”,
- “কইল” → “করল”,
- “পড়িল” → “পরল”
৬. শব্দচয়নে দেশজতা ও সাধারণতা
এই পদাবলিগুলিতে সাধারণত রাধা-কৃষ্ণের দৈনন্দিন প্রেমলীলা, মান-অভিমান, লজ্জা, অনুরাগ ইত্যাদি বিষয়গুলি লোকজ ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে।
“রাধা তুই যাস নারে যমুনার জলে,
কালিয়া নাগের কনো ভয় তোর নাহি?”
এখানে “তুই”, “নারে”, “জাস”, “নাহি”—সবই চলিত দেশজ রূপ।
৭. সংলাপভিত্তিক ভাষা ও নাট্যপ্রকৃতি
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ ভাষা প্রায় সর্বাংশে সংলাপভিত্তিক। এর ফলে কথ্য রীতির প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়, এবং উপসর্গহীন ক্রিয়াপদ ও যৌগিক বাক্যরূপ প্রকাশ পায়।
তোর মুখে রাধিকার রূপকথা শুনি।
ধরিবাক না পারোঁ পরাণী।।
বড়াইকে কৃষ্ণ বলেছে-
সব লোকেঁ হাসে যেহ্ন দিআঁ করতালী।
তেহ্ন তারে করায়িবোঁ বিকলী।।
আহ্মার মনত জাগে অতি বড় রোষ।
তোহ্মে মোক নাহিঁ দিহ দোষ।।
শতকী না কর বড়ায়ি বোলোঁমো তোহ্মারে।
জাঁয়িতে না ফুরে মন নাম শুনীতারে।।
যত দুখ দিল মোরে তোহ্মার গোচরে।
হেন মন কৈলোঁ আর না দেখিব তারে।।
“তুই না বললে গো, কেমনে যাই হরি ধানে?”
— রাধার উক্তিতে অলংকার, সমাস ও তৎসমরীতি বর্জন করে কথ্যভাষার স্বাভাবিকতা রক্ষা করা হয়েছে।
৮. চিহ্নিত রচয়িতাদের ব্যবহারভঙ্গি
(ক) বড়ু চণ্ডীদাস (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন)
- ভাষা: মধ্যবাংলা, নাট্যপ্রকৃত, সংকুচিত রূপ
- উদাহরণ:
“আর বচনকে বোলোঁ সুণ ল বড়ায়ি
ধরিঞাঁ তোর করে।
তাক রাখিহ যতনে আপন অন্তরে
যাইব আহ্মে মথুরা নগরে।”
(খ) দ্বিজ চণ্ডীদাস
- ভাষা: ধ্রুপদী ভাবসম্পন্ন, রসময়
- উদাহরণ:
“সখি হে, এমনি প্রেম আমি কাহারে দেই?”
(গ) দীন চণ্ডীদাস
- ভাষা: সরল, সহজিয়া প্রবণ
- উদাহরণ:
“রাই গো, কেন গো কৃষ্ণে দিলে হৃদয়?”
৯. প্রভাবিত উপভাষা ও নিকটবর্তী ভাষাসমূহ
- অর্ধমাগধী অপভ্রংশ
- গৌড়ীয় প্রাকৃত
- ওড়িয়া ও মৈথিলী প্রভাব
- কিছু ক্ষেত্রে হিন্দি/ব্রজভাষার ধ্বনিতরঙ্গ
১০. সাহিত্যিক গুরুত্ব ও ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহাসিকতা
চৈতন্য-পূর্ব পদাবলির ভাষা বাংলা ভাষার ইতিহাসে মধ্যবাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। এর মাধ্যমে আমরা চর্যাপদের পরবর্তী ধাপ এবং চৈতন্য-পরবর্তী বৈষ্ণব পদাবলির উৎস অনুসন্ধান করতে পারি। ভাষার ভাঙন, মিলন ও রূপান্তরের এক অনবদ্য নথি এই পদাবলি।
গ্রন্থপঞ্জি ও গবেষণা-সূত্র
- বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ (সম্পা.): শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯১৬
- দীনেশচন্দ্র সেন: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯২০
- সুকুমার সেন: বাংলা ভাষার ইতিহাস, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, প্রথম খণ্ড
- Edward C. Dimock: The Place of the Hidden Moon, University of Chicago Press
- Mohitlal Majumdar: Bangla Padavali Sahitya, University of Calcutta
- Haraprasad Shastri: Buddhist Siddhacharyas and Charyapadas, 1921
- Amiya Dev (ed.): History of Indian Literature: Bengali Literature, Sahitya Akademi
