চটি পুস্তক

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

চটি পুস্তক: একটি আধুনিক অশ্লীলতা প্রবণতা

চটি পুস্তকের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য

বাংলা ভাষায় “চটি পুস্তক” বলতে মূলত এমন কিছু অল্পদামী, ছোট আকৃতির বই বোঝানো হয় যেগুলির মূল উপজীব্য যৌনতা বা যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী উপাদান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব লেখার রচয়িতারা অর্ধশিক্ষিত বা সাহিত্যিক প্রশিক্ষণহীন, এবং এসব রচনার ভাষা হয় অশ্লীল, কৃত্রিম ও অনেক সময় অপরিষ্কৃত। এগুলির লক্ষ্য থাকে দ্রুত বাজারে উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে বিক্রয় করা, কোনো প্রকৃত সাহিত্যসাধনার মাধ্যমে শিল্প নির্মাণ নয়।

চটি সাহিত্যের বিষয়বস্তু প্রায়শই পাশ্চাত্য পর্নো সাহিত্যের অনুকরণে গঠিত। এতে দেখা যায়:

  • যৌন অনাচার বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক,
  • আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক (incest),
  • নারীর অবমাননাকর চিত্রায়ন,
  • কল্পিত যৌন ফ্যান্টাসি, যা সমাজের বাস্তবতা বা নৈতিকতাবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন।

চটি বনাম কামশাস্ত্র বা শৃঙ্গার সাহিত্য

চটি সাহিত্যকে কখনোই কামশাস্ত্র বা শৃঙ্গার রসের সাহিত্য যেমন— গীতগোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বা কামসূত্রর সঙ্গে এক কাতারে রাখা যায় না। কারণ:

  1. গীতগোবিন্দ (জয়দেব, ১২শ শতক): দেবতা শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার মিলনকথা শৃঙ্গার রসে নির্মিত হলেও তাতে সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক প্রতিফলন থাকে। এটি ভক্তিমূলক এবং ভারতীয় নৃত্য, সংগীত ও নাট্যশিল্পে ব্যবহারযোগ্য কাব্য।
  2. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (বড়ু চণ্ডীদাস): যদিও এতে রাধাকৃষ্ণের পারস্পরিক প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক স্পষ্টভাবে বর্ণিত, কিন্তু তা আখ্যানধর্মী, লোকসাংস্কৃতিক এবং ‘ভক্তি’র সঙ্গে সংযুক্ত। এটি নাটগীতি কাব্য, যেখানে শৃঙ্গার রস আধ্যাত্মিকতার সেতু হয়ে উঠে এসেছে।
  3. কামসূত্র (বাত্সায়ন): এটি একটি শাস্ত্র, যার লক্ষ্য ছিল যৌনজীবনের নানান দিক ও নৈতিকতা বোঝানো — বিবাহ, প্রেম, স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্ক ইত্যাদি। এটি সংস্কৃত সাহিত্যে কাব্য বা উপদেশমূলক নীতিশাস্ত্রের মর্যাদাপ্রাপ্ত।

অন্যদিকে চটি পুস্তক এই সমস্ত কিছুর ঠিক বিপরীত:

  • কোনও শিল্পমূল্য নেই,
  • যৌনতা একমাত্র উপজীব্য,
  • সমাজের নৈতিক কাঠামোকে ভাঙার ইচ্ছাতেই রচিত হয়। শুধুমাত্র শারীরিক উত্তেজনা কেন্দ্র করে, এবং এগুলোর উদ্দেশ্য থাকে বাজারজাত বিক্রি বা তীব্র বোধোচ্চার — কিন্তু সাহিত্য বা সংস্কৃতির সঙ্গে এদের কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক নেই।

আইনি দিক

চটি পুস্তক বা এই ধরণের লেখালেখির বেশিরভাগই ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ও ২৯৩ ধারার আওতায় আসে, যা অশ্লীল প্রকাশনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান দেয়। যদিও বর্তমানে এগুলো অনেক বেশি অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তথাপি ছাপা বই আকারে প্রকাশ করলে তা আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে, বিশেষ করে যদি এতে যৌন অবমাননা, নাবালক বা নারীর অবমাননাকর উপস্থাপনা থাকে।

উল্লেখযোগ্য আইনি মামলার প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য:

  • Ranjit D. Udeshi vs State of Maharashtra (১৯৬৪): ইংরেজি “Lady Chatterley’s Lover” কনটেন্টে কিছু অংশ অশ্লীল বলে আইনি নিষেধাজ্ঞা
  • Samaresh Basu’s Prajapati (১৯৬৮): বাংলা উপন্যাসে অশ্লীলতা সন্দেহে মামলা হয়, পরে বিচারপতি সাহিত্যিক মূল্য বিবেচনায় মুক্তি দেন

বাংলা চটি একটি অশ্লীল উদ্ভট লেখা প্রবণতা, যা শৃঙ্গারকাব্য বা শাস্ত্রীয় যৌনচর্চার তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এগুলোতে মোক্ষম সাহিত্যিক, শিল্পমূলক বা দার্শনিক গুণ নেই, বরং থাকে পাশ্চাত্য প্রভাবিত শারীরিক উত্তেজনা কেন্দ্রিক লেখা, যা আইনসম্মত দৃষ্টিতে অপরাধ, এবং সমাজে নিন্দিত ও অবৈধ বিবেচিত হয়।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল