হাওড়া বার অ্যাসোসিয়েশনে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, দর্শন ও জাতীয় অবদান নিয়ে বৌদ্ধিক সম্মেলন
২০২৬ সালের ২৯ জুলাই হাওড়া জেলা আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থিত দ্য বার অ্যাসোসিয়েশন, হাওড়া-র রুম নং–১-এ অনুষ্ঠিত হয় “ভারতীয় ইউনিয়নের প্রেক্ষাপটে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গির সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা” শীর্ষক এক ব্যতিক্রমী সিম্পোজিয়াম। হাওড়া জেলা আদালতের ইতিহাসে এই অনুষ্ঠান ছিল এক অনন্য বৌদ্ধিক উদ্যোগ, কারণ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, রাষ্ট্রচিন্তা, সাংবিধানিক দর্শন এবং জাতীয় অবদানকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সুবিন্যস্ত আলোচনা এর আগে আদালত চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়নি। বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক আইনজীবী, প্রবীণ বার-সদস্য, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সভাকক্ষ সম্পূর্ণ পূর্ণ ছিল এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত শ্রোতাদের আগ্রহ ও মনোযোগ অনুষ্ঠানটিকে একটি স্মরণীয় মর্যাদা প্রদান করে।
অনুষ্ঠানের সভা-পরিচালক ছিলেন অ্যাডভোকেট তন্ময় ভট্টাচার্য। স্বাগত ভাষণে তিনি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যে, স্বাধীনতার আট দশক পরেও ভারতের সাংবিধানিক বিকাশ, জাতীয় সংহতি, শিক্ষা, সীমান্ত-নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় সম্পর্কিত বহু প্রশ্নে ড. মুখোপাধ্যায়ের চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক। এই সিম্পোজিয়ামের মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তন্ময় ভট্টাচার্যের পাশাপাশি অম্লান রায়, কৌশিক বসু, বাপ্পাদিত্য দাস এবং শৈবাল চট্টোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে সমগ্র অনুষ্ঠানকে সফল করে তুলতে দ্য বার অ্যাসোসিয়েশন, হাওড়া-র কার্যনির্বাহী সমিতির আন্তরিক সহযোগিতা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের সৌজন্যে ঐতিহাসিক বার-ভবনের সম্মেলন কক্ষটি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং অনুষ্ঠানটি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করে।
অনুষ্ঠানের সূচনায় বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সম্পাদক যৌথভাবে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করেন। এই শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর হাওড়া কোর্ট ইয়ুথ কয়ার দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের মাধ্যমে পরিবেশকে গম্ভীর ও অনুপ্রেরণাময় করে তোলে। কয়ারটির নেতৃত্ব দেন শ্রীমতী কাজল আদক ও অচেনা রায়। তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন মৌ সরকার, করবী রায়, পরমিতা লাহিড়ী, প্রাপ্তি চট্টোপাধ্যায়, মৌমিতা দত্ত, মনীষা বাড়ুই, সুদেষ্ণা সাহা, অনন্যা সেন, সোমদেব মাইতি, কৌশিক মাইতি, রোহিত দে, মিঠু ভট্টাচার্য এবং তন্দ্রা ঘটক। অনুষ্ঠানে মোট তিনটি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়, যার মধ্যে ‘বন্দে মাতরম্’ বিশেষ আবেগের সৃষ্টি করে। কাজল আদকের উদ্যোগে মহিলা আইনজীবীদের জাতীয় পতাকার রঙের অনুপ্রেরণায় শাড়ি পরিধানের আহ্বান অনুষ্ঠানটিকে এক স্বতন্ত্র নান্দনিক ও দেশাত্মবোধক মাত্রা প্রদান করে।
সিম্পোজিয়ামের মূল বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করেন অনিন্দিতা সাঁতরা। তিনি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শনকে স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক বিকাশ, জাতীয় ঐক্য এবং ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করে আলোচনা করেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মৌমিতা সাঁতরা, যিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি পর্বকে সুসংহতভাবে পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী অরবিন্দ নস্কর, যিনি ড. মুখোপাধ্যায়ের জীবনের একাধিক কম-আলোচিত দিক তুলে ধরেন। এছাড়াও প্রবীণ আইনজীবী প্রদীপ আদক এবং শৈবাল চট্টোপাধ্যায়-এর উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করে।
আলোচনাপর্বে বক্তৃতা প্রদান করেন অলক ভট্টাচার্য, অম্লান রায়, তনয়া মিত্র, সন্তনা বাগ, স্বরূপ কুমার সেন এবং রজত চক্রবর্তী। প্রত্যেক বক্তাই ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও চিন্তার ভিন্ন ভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন। অলক ভট্টাচার্য তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে দেখান কীভাবে একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ থেকে তিনি স্বাধীন ভারতের অন্যতম জাতীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে বিকল্প জাতীয় রাজনৈতিক শক্তির নির্মাতা হিসেবে তাঁর অবদান বিশদভাবে আলোচিত হয়।
সন্তনা বাগ অত্যন্ত সংযত ও তথ্যনির্ভর আলোচনায় দেশভাগ-পরবর্তী হিন্দু উদ্বাস্তু সমস্যা, পূর্ববঙ্গের পরিস্থিতি এবং ড. মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন যে, দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিল। অম্লান রায় ড. মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শনকে দশটি ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নের আলোকে বিশ্লেষণ করেন। জাতীয় সংহতি, সাংবিধানিক কাঠামো, শিক্ষা, শিল্পোন্নয়ন, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, সংসদীয় বিরোধী রাজনীতির বিকাশ এবং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্ন তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

অ্যাডভোকেট তনয়া মিত্র ড. মুখোপাধ্যায়ের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি তাঁকে একাধারে শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ, সংসদীয় নেতা, প্রশাসক এবং জাতীয় চিন্তাবিদ হিসেবে মূল্যায়ন করেন। বিশেষভাবে আলোচিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং উচ্চশিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান। স্বরূপ কুমার সেন জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক অবস্থান, ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং ড. মুখোপাধ্যায়ের অবস্থানকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন। তিনি সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
শেষ বক্তা রজত চক্রবর্তী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ২৩ জুন ১৯৫৩-এর মৃত্যুকে ঘিরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, চিঠিপত্র এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে, এই ঘটনা স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আজও গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বিদ্যমান।
সমগ্র সিম্পোজিয়াম থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বক্তাদের মতে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এক নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক, যিনি স্বাধীন ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দেশভাগ-পরবর্তী হিন্দু উদ্বাস্তুদের সুরক্ষা, জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত হয়। একই সঙ্গে বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি কেবল রাজনীতিবিদ নন; একজন অসাধারণ শিক্ষাবিদ, ব্যারিস্টার, প্রশাসক এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাতাও ছিলেন। তাঁর জীবন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
অনুষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে বহু মানুষের আন্তরিক শ্রম ছিল। কৌশিক বসু আতিথেয়তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। উপস্থিত অতিথিদের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত কফি ও সমোসা পরিবেশনের ব্যবস্থা ছিল প্রশংসনীয়। বাপ্পাদিত্য দাস ফ্লোর ম্যানেজার হিসেবে সভাকক্ষের প্রতিটি ব্যবস্থাপনা সুচারুভাবে পরিচালনা করেন এবং সিদ্ধার্থ নিশ্চিত করেন যে প্রত্যেক অতিথি যথাযথ আপ্যায়ন লাভ করেন। এই স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টা অনুষ্ঠানটিকে আরও সুশৃঙ্খল ও আন্তরিক করে তোলে।

হাওড়া বার অ্যাসোসিয়েশনের ইতিহাসে এই সিম্পোজিয়াম নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করেছে যে আদালত ও আইনজীবী সমাজ কেবল বিচারব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জাতীয় ইতিহাস, সাংবিধানিক চেতনা, বৌদ্ধিক আলোচনা এবং নাগরিক সমাজের শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও আদর্শকে নতুন প্রজন্মের আইনজীবী এবং শিক্ষিত সমাজের সামনে তথ্যনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভরভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই সিম্পোজিয়াম এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে হাওড়া বার অ্যাসোসিয়েশনের ইতিহাস রচিত হলে ২০২৬ সালের ২৯ জুলাইয়ের এই সিম্পোজিয়াম নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় ও গৌরবময় মাইলফলক হিসেবে স্থান লাভ করবে।
