নিত্যানন্দ চরিত্র

নিত্যানন্দ চরিত্র

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

নিত্যানন্দ প্রভুর (১৪৭৪ -১৫৪৫) জন্ম ১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দের মাঘ মাসে শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে বীরভূম জেলার একচক্রা গ্রামে, কৈবর্ত কায়স্থ হাড়াই পণ্ডিত ও পদ্মাবতী দেবীর গৃহে। তাঁর জন্মনাম ছিল কুবের। শৈশবেই তিনি ভ্রাতৃগণের সঙ্গে রামলীলা কীর্তনে অংশগ্রহণ করতেন এবং বিশেষত লক্ষ্মণের ভূমিকায় অভিনয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। রামলীলা পালাকীর্তন তিনি মুখে মুখে আয়ত্ত করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ঢোল বাজানোয় দক্ষ হয়ে ওঠেন। সেই সময়ে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়নি; গৌড়ীয় ভাষায় পড়া-লেখা জানতেন না, সংস্কৃতেরও কোনো পাঠ নেননি। চৈতন্য মহাপ্রভুর (বিশ্বম্ভর গৌরাঙ্গ মিশ্র) সঙ্গে সাক্ষাতের আগে কৃষ্ণভজনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি পরিচয় ঘটেনি। বারো বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাসী লক্ষ্মীপতি তীর্থের সেবক হন ও তার সাথে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান, লক্ষ্মীপতিই তাকে নিত্যানন্দ (Nityananda) নাম দেন।

পরে নিত্যানন্দ লক্ষ্মীপতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন এবং পরে তিনি নদীয়াতে (১৫০৬ খ্রি.) এসে বসতি স্থাপন করেন।

হেনমতে দ্বাদশ বৎসর থাকি ঘরে।
নিত্যানন্দ চলিলেন তীর্থ করিবারে॥
তীর্থযাত্রা করিলেন বিংশতি বৎসর।
তবে শেষে আইলেন চৈতন্যগোচর ॥ (চৈতন্যভাগবত)

তাঁর কয়েকজন ভাই ছিল, যদিও তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় অজানা। হালিশহর নতীগ্রামের বৃন্দাবনদাস (১৫০৭–১৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁরই অনুপ্রেরণায় ‘চৈতন্যভাগবত’ রচনা করেন। বৃন্দাবনদাস জানাচ্ছেন, চৈতন্যদেব তাঁকে বহুবার পুরীযাত্রা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। নিত্যানন্দ প্রভু খড়দহে দুর্গাপূজার (১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দ) প্রচলন করেন এবং কাত্যায়নী রূপে দুর্গার আরাধনা করতেন, চালকুমড়া বলি দিতেন। রাজা কংসনারায়ণ ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে শরৎকালে বাংলাদেশে আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে একই সময়ে ছিলেন আরও একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব—অদ্বৈতাচার্য বা কমলাক্ষ ভট্টাচার্য (১৪৩৪–১৫৫৮), যিনি সিলেটের লৌরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতালৌরের রাজার মন্ত্রী। যৌবনে অদ্বৈতাচার্য শান্তিপুরে স্থায়ী হন। লৌরের রাজা পরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ‘কৃষ্ণদাস’ নাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর জীবনী রচনা করেন। ঈশান নাগর (জন্ম ১৪৯২ খ্রীঃ শ্রীহট্টের সুনামগঞ্জ মহকুমার লাউড় পরগণার নবগ্রামে) ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে অদ্বৈতাচার্যের একটি জীবনী অদ্বৈত-প্রকাশ লেখেন। অদ্বৈত ১২৪ বছর বেঁচে ছিলেন এবং তাঁর দুই স্ত্রী এবং ছয় পুত্র ছিল। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দের দিকে বা তার কাছাকাছি সময়ে নিত্যানন্দ তাকে হতাশ করেন এবং তিনি চৈতন্যের কাছে অভিযোগ করেন। অদ্বৈতপুত্ররা কখনও নিত্যানন্দকে কোনও ভালো উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেনি। তারা অদ্বৈতকে শিব-অবতার বলে প্রচার করে । “শান্তিপুরে গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজ অদ্বৈতপুত্র অচ্যুতানন্দ এবং কৃষ্ণদাস দেখভাল করতেন”।

চৈতন্যদেবের জন্ম হয় (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি) নবদ্বীপে । তাঁর পিতামহ ও পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। বিশুদ্ধ গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত মূলত তাঁরই প্রচারিত। প্রথমবার চৈতন্যদেব ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে যান এবং রামানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বৃন্দাবন গমন করেন। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি মহামন্ত্র জপ ত্যাগ করে ‘রাগানুগ ভক্তি’র দিব্যভাব প্রকাশ করেন। রাজা প্রতাপরুদ্র রামানন্দের পরামর্শে তাঁকে ‘প্রভু’ উপাধি দেন। চৈতন্যদেবের মৃত্যু হয় অক্ষয় তৃতীয়া, ২৭ এপ্রিল ১৫৩৩ খ্রি রবিবার, এবং রামানন্দ তাঁর দেহ কুহেলি বৈকুণ্ঠে সমাধিস্থ করেন। রাজা প্রতাপরুদ্র ঘোষণা করেন, চৈতন্যদেব জগন্নাথদেবের মূর্তির সঙ্গে ঐক্যলাভ করেছেন। রামানন্দের শিষ্য মাধব পট্টনায়ক ‘বৈষ্ণব লীলামৃত’ (১৫৩৫) গ্রন্থে ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর বাঙালিরা অন্তত ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পুরীতে আসা বন্ধ করে দেয়।

হুসেনশাহী বংশ (১৪৯৪–১৫৩৮) বাংলায় রাজত্ব করে, পরে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ সূরির হাতে পরাভূত হয়। এই সময়ে বসুদেব সার্বভৌম তাঁর পিতা বিশারদ ও ভ্রাতা বাচস্পতির সঙ্গে নদীয়া থেকে পুরীতে স্থানান্তরিত হন হুসেন শাহের অত্যাচারের কারণে। পরে রাজা প্রতাপরুদ্র তাঁকে সম্মানিত করেন।

১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলার সূর্যদাস সরখেলের দুই কন্যা—বসুধা (১৬ বছর) ও জাহ্নবা (১৪ বছর)—কে উত্তরোত্তর বিবাহ করেন নিত্যানন্দ। বসুধাকে বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিল ছাপ্পান্ন বছর, তার এক বৎসর পারে তিনি পুনরায় জাহ্নবা কে বিবাহ করেন। এই বিবাহ নিয়ে গৌড়ীয় সমাজে নানা সমালোচনা হয়, এমনকি নিত্যানন্দবিরোধীরা কটু মন্তব্য করে। বৃন্দাবন দাসকে লিখতে হয়েছিল—“এত পরিহারেও যে পাপী নিন্দা করে, তবে লাথি মারোঁ তার শিরের উপরে।”

নিত্যানন্দ প্রভুর জীবনযাত্রা নিয়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে একসময় প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। অদ্বৈতাচার্য সহ একাধিক প্রধান ভক্ত অভিযোগ তুলেছিলেন যে, নিত্যানন্দের ধনাঢ্য পরিবারের সঙ্গে বিবাহ এবং পরবর্তী জীবনে জমিদারি ধাঁচের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন বৈষ্ণব আদর্শের সঙ্গে বেমানান। বসূর্যদাস সরখেলের মতো ধনসম্পন্ন পরিবারের কন্যাকে বিবাহের পর খড়দহে নিত্যানন্দের গৃহে প্রচুর ভক্ত ও অনুগামী সমবেত হতে থাকে, কিন্তু সেই আড়ম্বর ও প্রভুত্বের ভঙ্গিমা অনেকের চোখে ছিল গৌরীয় ভক্তিসাধনার সংযমশীল ও নির্লোভ ধারা থেকে এক প্রকার বিচ্যুতি।

চৈতন্য মহাপ্রভুও এ নিয়ে অখুশি হয়েছিলেন বলে সমসাময়িক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশেষত নদীয়া ও কৃষ্ণনগর অঞ্চলে নিত্যানন্দের দলবল কখনো কখনো এমন আচরণ করত, যা স্থানীয় জনতার মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। মহাপ্রভুর ভক্তি-আন্দোলনের ভাবমূর্তিতে এই ঘটনাগুলি আঘাত করেছিল। অদ্বৈতাচার্য এক চিঠিতে (১৫৩০-১৫৩৩) চৈতন্যদেবকে সরাসরি লিখে জানান যে, এই পরিস্থিতিতে কেউই আর মহাপ্রভুর প্রেমভক্তি গ্রহণে প্রস্তুত নয়। তাঁর বক্তব্যে ছিল একপ্রকার হতাশার সুর—যে প্রেমভক্তি গৌড়ীয় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য, তা নিত্যানন্দের বিতর্কিত আচরণ ও জীবনযাত্রার কারণে জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।

নিত্যানন্দ প্রভুর প্রথম পক্ষের পত্নী বসুধার গর্ভে জন্ম নেয় পুত্র বীরভদ্র ( ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে ) যিনি ‘বীরচন্দ্র প্রভু’ নামে প্রসিদ্ধ হন ও কন্যা গঙ্গা । তাঁকে তাঁর সৎ মা জাহ্নবা দেবী বৈষ্ণব আচারে দীক্ষা দেন। পরবর্তীকালে বীরভদ্রের বিয়ে হয় ঝামটপুরের যদুনন্দন আচার্যের কন্যা শ্রীমতী ও নারায়ণীর সঙ্গে; তাঁদেরও দীক্ষা দেন জাহ্নবা দেবী। জাহ্নবাশিষ্য নিত্যানন্দ দাসের ‘প্রেমবিলাস’-এ জাহ্নবার প্রভাব ও কর্তৃত্বের উল্লেখ আছে। এমনকি একটি কিংবদন্তিতে বলা হয়েছে, বৃন্দাবনের গোপীনাথ স্বয়ং জাহ্নবার বস্ত্র আকর্ষণ করে তাঁকে বামপার্শ্বে আসন দিয়েছিলেন। প্রেমবিলাস অনুসারে, জাহ্নবাই মদনমোহনের পাশে রাধাবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন।

নিত্যানন্দ প্রভুর আরও কয়েক পুত্র জন্মের পরপরই মৃত্যুবরণ করে। তাঁর পুত্র বীরচন্দ্রের দ্বিতীয় স্ত্রী শ্রীমতী বিষ্ণুপ্রিয়া জন্ম দেন তিন পুত্রকে—শ্রী গোপীজনবল্লভ, শ্রী রামকৃষ্ণ ও শ্রী রামচন্দ্র।

চৈতন্যচরিতামৃত, যা কৃষ্ণদাস কবিরাজ বৃন্দাবনে ১৫৩৭ শকাব্দে (১৬১৫ খ্রিস্টাব্দ), জ্যৈষ্ঠ মাসে, কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী তিথি, রবিবার রচনা সম্পন্ন করেন, সেখানে নিত্যানন্দ প্রভুর প্রসঙ্গ (তত্ত্ব অংশ বাদে) প্রায় নেই বললেই চলে। নিত্যানন্দ ছিলেন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর চেয়ে বারো বছর বয়সে জ্যেষ্ঠ এবং মহাপ্রভুর মৃত্যুর বহু বছর পরও জীবিত ছিলেন। তিনি বৃন্দাবনদাস (১৫০৭–১৫৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) কৃত ‘চৈতন্যভাগবত’ সম্বন্ধে জানতেন ।

চৈতন্যদেবের শেষ জীবনে(১৫৩০-১৫৩৩) নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য অপ্রতুল হলেও অনুধাবন যোগ্য। তবে পানিহাটি, আড়িয়াদহ ও খড়দহ থেকে নিত্যানন্দ পূজা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর স্ত্রী জাহ্নবা দেবী ও পুত্র বীরচন্দ্র প্রভুও পূজিত হন।

১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে ৭৬ বছর বয়সে, খড়দহে নিত্যানন্দ প্রভু ভগ্ন হৃদয়ে গঙ্গায় ডুবে প্রাণ ত্যাগ করেন।

নিত্যানন্দ প্রভুর মৃত্যুর পূর্ববর্তী সময়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী জাহ্নবা দেবী বাস্তবে তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না। নিত্যানন্দের জীবনকালে তিনি স্বাধীনভাবে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। কিন্তু নিত্যানন্দের বার্ধক্য ও অবসানের প্রাক্কালে এবং বিশেষত মৃত্যুর পরে তিনি দ্রুত নিজের অবস্থান মজবুত করার পথে অগ্রসর হন। নিত্যানন্দ প্রভুর মৃত্যুর কিছু আগে তিনি বৃন্দাবনে যান, সেখানে জীব গোস্বামীর (১৫১৩ – ১৫৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ও তাঁর নিকট থেকে নির্দেশ গ্রহণ করেন। এই সাক্ষাতের পর থেকেই তিনি নিজেকে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে একটি কেন্দ্রস্থ কর্তৃত্বে রূপান্তরিত করতে সচেষ্ট হন।

জাহ্নবা দেবীর ব্যক্তিগত আচরণ ও সম্পর্ক বহু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ছিল। তিনি একাধিকবার চৈতন্য মহাপ্রভুর পত্নী শ্রীমতী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীকে অপমান ও বিরক্ত করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া স্বয়ংক্ষেত্রসন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন—অর্থাৎ সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসিণীর মতো একা ও কঠোর তপস্যাময় জীবনযাপন করতেন। তিনি নিঃসঙ্গ, রক্ষাহীন ও আশ্রয়হীন ছিলেন; প্রতিদিন সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ির আশ্রয়ে যেতেন, কিন্তু জীবনে কখনো পুরী বা বৃন্দাবনে যাননি।

তাঁর আজ্ঞা বিনা তানে নিষেধ দর্শনে।
অত্যন্ত কঠোর ব্রত করিলা আপনে।

প্রত্যুষেতে স্নান করি কৃতাহ্নিক রঞা।
হরিনাম করি কিছু তণ্ডুল লইয়া।।
নাম প্রতি এক তণ্ডুল মৃৎপাত্রে রাখয়।
হেন মতে তৃতীয় প্রহর নাম লয়।।
জপান্তে সেই সংখ্যার তণ্ডুলমাত্র লঞা।
যত্নে পাক করে মুখ বস্ত্রেতে বান্ধিয়া।।

যে কষ্ট সহেন মাতা কি কহিমু আর।
অলৌকিক শক্তি বিনা ঐছে সাধ্য কার।। (অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর)

নিত্যানন্দের জীবদ্দশায় এবং পরে জাহ্নবা দেবীর অন্যতম বড় পরিবর্তন ছিল রাধার মূর্তি কৃষ্ণমূর্তির পাশে প্রতিস্থাপন করা—যা চৈতন্য মহাপ্রভুর ‘শুদ্ধ ভক্তি’র ধারা থেকে ভিন্ন এক রীতি প্রবর্তন করেছিল। নিত্যানন্দের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে জাহ্নবা দেবী সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সর্বময় কর্তৃত্বশালী হয়ে ওঠেন। তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে দীক্ষা দিতে শুরু করেন। এদিকে নিত্যানন্দ নিজে জীবনে কারো কাছ থেকে কোনো দীক্ষা নেননি; তবুও নিজেকে ‘প্রভু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—যা কার্যত কৃষ্ণ ও চৈতন্য মহাপ্রভুর সমান মর্যাদা দাবি করত। নদীয়া ও কৃষ্ণনগর অঞ্চলে এমনও প্রচলিত হয়েছিল যে, “শ্রীকৃষ্ণের কাছে পৌঁছোতে হলে আগে নিত্যানন্দের কাছে যেতে হবে।” এই স্লোগান ও কীর্তনসুর বিশেষত খড়দহ ও ক্ষেতুরি অঞ্চলে জনপ্রিয় ছিল।

বিষয়টি লক্ষণীয় যে, জীবা গোস্বামী নদীয়া বা কৃষ্ণনগর অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান রাখতেন না। ফলে জাহ্নবা দেবী তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বৃন্দাবনীয় মহন্তদের নাম ব্যবহার করতে সক্ষম হন।

অনেক সমালোচকের মতে, গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মে চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রচারিত ‘শুদ্ধ ভক্তি’ জাহ্নবা দেবীর হাতে বিকৃত হয়ে যায়। এই ধনাঢ্য অথচ অশিক্ষিতা নারী চৈতন্য মহাপ্রভুর ‘রাগানুগ ভক্তি’র মূল দর্শনকে বিকৃত করে তথাকথিত ‘সহজিয়া সখী-ভেকী’ ধারার কৃষ্ণভক্তি প্রবর্তন করেন। ফলে শ্রীচৈতন্যের সমবায়ভিত্তিক, দার্শনিকভাবে অদ্বিতীয় ও বৈদান্তিক অচিন্ত্য তত্ত্ব ক্রমে অবনমিত হয়ে মানবীয় কাম-সম্পর্ককেন্দ্রিক এক প্রকার ভোগবাদী ধর্মরূপে অবতীর্ণ হয়, যা চৈতন্যের সাধন-আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

‘সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে নবদ্বীপের বৈষ্ণবসমাজের ইতিহাস অজ্ঞাত। এমন কী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র (১৭২৮ – ৮২) ও মহারাজ গিরীশচন্দ্রের আমলে (১৭৮২-১৮৪২) নবদ্বীপে চৈতন্য উপাসনা কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’

তোতারাম দাস বাবাজী নামে এক দক্ষিণী সাধকের নামে প্রচারিত একটি গান প্রসঙ্গত উল্লেখ্য :

‘আউল বাউল কর্তাভজা নেড়া দরবেশ সাঁই।
সহজিয়া সখীভাবুকী স্মার্ত জাতগোঁসাই।।
অতিবড়ী চূড়াধারী গৌরাঙ্গ নাগরী।
তোতা কহে এই তেরোর সঙ্গ নাহি করি।।’ বাণীপ্রসন্ন।। ৮৭


গ্রন্থসূত্র

  • ঈশান নাগর, অদ্বৈতপ্রকাশ, সম্পাদনা, কিশোরীদাসবাজী, ঈশ্বরপুরী হালিশহর
  • ঈশান নাগর, অদ্বৈতপ্রকাশ, সম্পাদনা-সতীশচন্দ্ৰ মিত্ৰ
  • ঐ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম-২য় খণ্ড), আনন্দ, কলিকাতা, ২০০৭।
  • ঐ, যুগাবতার, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, ফার্মা, কে.এল.এম.কলি, ১৯৮৪।
  • কবিকর্ণপুর, গৌরগণোদ্দেশ দীপিকা
  • কবিরাজ, কৃষ্ণদাস, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, বেণীমাধব শীলস লাইব্রেরী, কলকাতা-২০১৫।
  • কর, সুবীর। অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি : জীবন ও সাহিত্য (১২৭২-১৩৬০), করিমগঞ্জ, আসাম, যুগশক্তি প্রকাশনালয়, ১৯৯১
  • কর্ণপুর, কবি : গৌরগণোদ্দেশদীপিকা। কলকাতা : সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, ১৯৮৭
  • কৃষ্ণদাস (লাউড়িয়া), বাল্যলীলা সূত্রম
  • কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস, শ্রীমদ্ভাগবত, গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর, ২০১৫।
  • গিরি, সত্যবতী ও সনৎকুমার নস্কর, (সম্পাদিত) বৈষ্ণব সাহিত্য : পুনরালোচনা ও নবমূল্যায়ণ, প্রজ্ঞাবিকাশ, কলিকাতা, ৯
  • গোবিন্দদাস কর্মকার, গোবিন্দদাসের কড়চা, গোবিন্দদাস সেবা সংঘ, কাঞ্চননগর, বর্ধমান – ‘শ্রীভূমি’ (পত্রিকা), করিমগঞ্জ, শ্রীহট্ট
  • গোস্বামী, কাননবিহারী, প্রথম বাংলা চৈতন্যচরিত কাব্য, সাহিত্য পতিষৎ পত্রিকা, ১০৮ বৰ্ষ।
  • ঘোষ, মৃণালকান্তি : (সম্পা.) ঈশাননাগরের অদ্বৈতপ্রকাশ, ৩য় সং. কলকাতা, বিশ্বকোষ প্রেস, ১৯৩৩
  • চক্রবর্তী মুকুন্দরাম, চণ্ডীমঙ্গল (সম্পাদিত সুকুমার সেন) সাহিত্য অ্যাকাদেমি, নতুন দিল্লি, ১৯৯৩।
  • চক্রবর্তী, রমাকান্ত, বঙ্গে বৈষ্ণবধর্ম : একটি ঐতিহাসিক ও সমাজতান্ত্রিক অধ্যয়ন, আনন্দ, কলকাতা, ২০০৭।
  • চট্টোপাধ্যায়, সুধীররঞ্জন। ভারতীয় দর্শন প্রস্থানে বৈষ্ণবসাধনার ধারা, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮২, মুদ্রিত।
  • চণ্ডীদাস, পদাবলী, বসুমতী, কলিকাতা, ১৯৯৬।
  • চুড়ামণিদাস, গৌরাঙ্গবিজয়, (সম্পাদিত সুকুমার সেন), এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৫৭।
  • চৌধুরী, অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি। ঈশাননাগরের অদ্বৈতপ্রকাশ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, ১৩০৩
  • চৌধুরী, অচ্যুতচরণ, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উত্তরাংশ) উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৫।
  • চৌধুরী, যজ্ঞেশ্বর, যুগস্রষ্টা শ্রীচৈতন্য, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষৎ, নবদ্বীপ, ২০০৪।
  • চৌধুরী, সুজিত, শ্রীহট্ট-কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস, দিনকাল প্রেস, শিলচর, ২০০৬।
  • জয়দেব গোস্বামী, গীতগোবিন্দ, বসুমতী, কলিকাতা,
  • জয়ানন্দ, চৈতন্যমঙ্গল, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলিকাতা, ১৯৭১।
  • ঠাকুর, সৌরেশচন্দ্র, বৈষ্ণবতীর্থ পাহাড়পুর, পুস্তকালয়, লাভপুর, বীরভূম, ১৯৯৩।
  • দাশগুপ্ত, শশীভূষণ, শ্রী রাধার ক্রমবিকাশ; দর্শনে ও সাহিত্যে, এ.মুখার্জী, কলিকাতা, ১৯৫২।
  • দাস, নিত্যানন্দ। প্রেমবিলাস। কলকাতা, প্রতীক, ১৯১৩
  • নিত্যানন্দ দাস, প্রেমবিলাস (সম্পাদিত রাসবিহারী সাংখ্যতীর্থ), মুর্শিদাবাদ, ১৯২১।
  • পাল, প্রশান্তকুমার, রবিজীবনী, (১-৯), আনন্দ, কলিকাতা, ২০০২।
  • বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিতকুমার, বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত, মডার্ণ বুক এজেন্সি, কলিকাতা, ১৩১৫।
  • বসু, শঙ্করীপ্রসাদ, মধ্যযুগের কবি ও কাব্য, জেনারেল প্রিন্টার্স এ্যাণ্ড পাবলিসার্স, কলকাতা, ২০০০।
  • বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, (সম্পাদিত, উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়), বসুমতী সাহিত্য, কলিকাতা,
  • ভট্টাচার্য, উপেন্দ্রনাথ : বাংলার বাউল ও বাউল গান; ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, কলকাতা, ১৩৬৪
  • ভট্টাচার্য, কালীকৃষ্ণ। শান্তিপুর পরিচয়, কলকাতা : গ্রন্থকার, ১৯৩৭
  • ভট্টাচার্য, কুমুদরঞ্জন, সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধান, ফার্মা .এল.এম.কলিকাতা, ১৯৭৮।
  • ভট্টাচার্য, হংসনারায়ণ, বঙ্গ সাহিত্য অভিধান, ফার্মা কে.এল.এম.প্রা.লি., কলি, ১৯১২।
  • ভট্টাচাৰ্য্য, যতীন্দ্রমোহন। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি (১২৭২-১৩৬০) সাত্যিসাধক চরিতমালা, কলকাতা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ
  • মজুমদার, বিমানবিহারী, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান, ঐ পাঁচশত বৎসরের পদাবলী, জিজ্ঞাসা, পাবলিকেশন, কলিকাতা, ১৩৯৮।
  • মজুমদার, রমেশচন্দ্র, বাংলাদেশের ইতিহাস (১ম খণ্ড), জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যাণ্ড পাবলিশার্স, কলিকাতা, ১৯৭৪।
  • মিত্র, সুবল চন্দ্র, সরল বাঙ্গালা অধিকার (৭ম সংস্করণ), কলিকাতা, ১৯৩৬।
  • মিশ্র, বাণীপ্রসন্ন, উন্মোচিত ঢাকা দক্ষিণ, সৃজন, শিলচর, আসাম, ২০১১।
  • মুখোপাধ্যায়, যোগনাথ, বঙ্গ অভিধান, এম.সি.সরকার এ্যাণ্ড সনস্, কলি, ১৯৯৯।
  • মুখোপাধ্যায়, সুখময়, চৈতন্যদেব : ইতিহাস ও অবদান, সারস্বত লাইব্রেরি, কলিকাতা, ২০০২।
  • মুখোপাধ্যায়, সুখময়, চৈতন্যদেব : জীবনী, কালক্রম পরিমণ্ডল, প্রিয়মণ্ডল, ডি.এম. লাইব্রেরী, কলকাতা, ১৯৮৪।
  • মুখোপাধ্যায়, হরেকৃষ্ণ, পদাবলী পরিচয়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯১৮।
  • রায়, কার্তিকেয়চন্দ্র, ক্ষিতীশবংশাবলী-চরিত, (সম্পাদিত, মোহিত রায়) শৈব্যা পুস্তকালয়, কলিকাতা, ১৯৮৬।
  • লোচনদাস, চৈতন্যমঙ্গল (সম্পাদিত কিশোরীদাস বাবাজী) ঈশ্বরপুরীর পাট হালিশহর, ২০০৬।
  • শ্রীশ্রীগৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্য
  • সান্যাল, হিতেশরঞ্জন, ‘বাংলার কীর্তন’, চৈতন্যদেব : ইতিহাস ও অবদান, সারস্বত লাইব্রেরি, ২০০২।
  • সিনহা, গোপালচন্দ্র, ভারতবর্ষের ইতিহাস, (প্রাচীন-মধ্যযুগ), প্রগ্রেসিভ, কলিকাতা, ২০১৩।
  • সেন, সুকুমার, চৈতন্যবদান, আনন্দ, কলকাতা, ১৯৮৬।
  • সেনগুপ্ত, সুবোধচন্দ্র, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯১৮।
  • –বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (২য় খণ্ড), মডার্ণ বুক এজেন্সি, ১৯৯৫।
  • —শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ), উৎস প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৪।

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল