বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ফ
রাত্রিকালীন বাজার ও অদ্ভুত ভাষাভাষীদের অস্তিত্ব
চীনদেশীয় পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (Faxian, 法显; ৪র্থ শতক> গুপ্ত শাসন) এবং হিউয়েন-সাং (Xuanzang, 玄奘) ৬৩৮-৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ (পাল রাজবংশের অধীনে), তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্তে প্রাচীন বঙ্গভূমি ও এর উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহ সম্পর্কে বহুপ্রধান তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। তাঁদের লেখা—A Record of Buddhist Kingdoms (佛國記) এবং Great Tang Records on the Western Regions (大唐西域記)—বাংলার ধর্ম, সমাজ, ও অর্থনীতির এক লঘু চিত্র তুলে ধরে।
ফা-হিয়েন তাঁর রচনায় তাম্রলিপ্তি (多摩梨帝) সম্বন্ধে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন: “চং থুং তং নান শিং উ য়ু ইয়ান। চি তো মো লি তি কুও। চি শি হাই কোউ। ছি কুও ইউ য়োর শি সা সেং ছিয়া লান। চিন ইউ সেং চু। ফো ফা শিং শেং।” অর্থাৎ, “এখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় পঞ্চাশ যোজন অতিক্রম করে আমরা তাম্রলিপ্তি রাজ্যে উপনীত হই। এটি একটি সমুদ্রবন্দর। এখানে চব্বিশটি বিহার রয়েছে, প্রত্যেকটিতে ভিক্ষুগণ বাস করেন। বৌদ্ধধর্ম এখানে সমৃদ্ধ।” এই তাম্রলিপ্তিতে তিনি দুই বছর অবস্থান করেন, শাস্ত্রলিপি প্রস্তুত করেন এবং বুদ্ধচিত্র অঙ্কনে নিযুক্ত ছিলেন। তাম্রলিপ্তির উল্লেখ গুপ্তদের সময়ে বঙ্গের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে এক গৌরবজনক ঐতিহ্যের দিক নির্দেশ করে।
ফা-হিয়েন তাম্রলিপ্তি থেকে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার জন্য এক বিশাল বণিক জাহাজে যাত্রা করেছিলেন। বঙ্গোপসাগরে বিষাক্ত নাগ (Smakes) ও জলদস্যুদের উপস্থিতির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখেছেন, বিভিন্ন বিহারে ভিক্ষুদের সমস্বরে সূত্রপাঠের রীতি প্রচলিত, মৌর্য যুগীয় স্তূপ-পূজা। প্রতিদিন ভোরে সাধারণ মানুষ ভিক্ষুদের অন্নদানের আচার পালন করত। বাজারে কড়িকে মুদ্রা (cowrie shells as currency) হিসেবে ব্যবহারের কথাও তিনি লিখেছেন।
হিউয়েন-সাং, যিনি তাং রাজবংশের প্রতিনিধি ও বৌদ্ধ দার্শনিক ছিলেন, সপ্তম শতকে ভারত পরিভ্রমণকালে বঙ্গভূমিকে তিনটি পৃথক ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন: পুণ্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ এবং সমতট। তাঁর বিবরণে দেখা যায়, পুণ্ড্রবর্ধন (奔那伐弹那) ছিল প্রায় ৪,০০০ লি পরিসীমাবিশিষ্ট, যার রাজধানী শহরের পরিধি ছিল ৩০ লি-র অধিক। তিনি লিখেছেন: “বেন না ফা তান না কুও চৌ সি ছিয়ান ইয়ু লি। কুও তা তু চেং চৌ সান শি ইয়ু লি। চু রেন ইয়িন শেং। ছি কুয়ান হুয়া লিন ওয়াং ওয়াং সিয়াং ছিয়ান।” এই অনুচ্ছেদের অর্থ: “জনবসতি ঘন এবং সমৃদ্ধ, দিঘি, অট্টালিকা ও পুষ্পবন স্থানবিশেষে পরস্পর বিন্যস্ত।” এখানে কুড়িটিরও বেশি বিহার ছিল এবং প্রায় ৩,০০০ ভিক্ষু উভয় যানের (মহাযান ও হীনযান) অধ্যয়নে নিযুক্ত ছিলেন। পুন্ড্রবর্ধনে শিব ও বিষ্ণুর মন্দির বিহারের তুলনায় সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। হিউয়েন সাঙ দুঃখ করে লিখেছেন, “এই অঞ্চলে দেবতাদের পূজায় রক্তবলির প্রচলন রয়েছে, যা বৌদ্ধ করুণার পরিপন্থী।”
কর্ণসুবর্ণ (羯罗拏苏伐剌那) সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: “চিয়ে লো না সু ফা লা না কুও। রেন শাও সিন ফো। তো শি থিয়েন শেন। ছিয়া লান শি ইয়ু সুও। সেং তু এর ছিয়ান ইয়ু রেন।” এর অর্থ: “এই রাজ্যে বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী লোক স্বল্পসংখ্যক। অধিকাংশ মানুষ দেবতাদের পূজা করেন। এখানে দশটিরও বেশি বিহার ও প্রায় ২,০০০ ভিক্ষু রয়েছেন।” হিউয়েন-সাং এই রাজ্যের রাজাকে ব্রাহ্মণবংশীয় বলে চিহ্নিত করেন।
সমতট (三摩呾吒) সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: “সান মো তা চা কুও চৌ সান ছিয়ান ইয়ু লি। পিন চিন তা হাই। থু তি পি শি। ছিয়া সে তজ়ে চি।” যার অর্থ: “এই রাজ্য প্রায় ৩,০০০ লি পরিসীমাবিশিষ্ট এবং সমুদ্রের নিকটবর্তী। ভূমি নিচু ও আর্দ্র, আর ফসল অত্যন্ত উর্বর।” মানুষ ছিল “লম্বা এবং কালো চামড়ার”, তারা গ্রীষ্মমন্ডলীয়, ধান চাষকারী অঞ্চলে বাস করত। এখানে ত্রিশটিরও বেশি বিহার ও দুই হাজারাধিক ভিক্ষু বিদ্যমান ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বহু স্তূপ তখনও এই অঞ্চলে অবশিষ্ট ছিল। সমতট তখন স্বাধীন রাজ্য ছিল, যা গুপ্ত ও হর্ষবর্ধনের শাসনকে প্রতিরোধ করেছিল। সমতটের ভিক্ষুরা বজ্রযান সাধনা ও মন্ত্রোচ্চারণে নিযুক্ত ছিলেন।
বাংলার কৃষিক্ষেত্রে সমৃদ্ধি ছিল। উর্বর মাটি ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে বছরে তিনবার ধান ফলত। আখ, সুপারি ও আমও প্রধান ফসল ছিল। রেশম ও সুতির বস্ত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি হত। বাংলার জঙ্গলে ধরা হাতিগুলো যুদ্ধ ও শ্রমের কাজে ব্যবহৃত হত।
পুন্ড্রনগরে বহু তলাবিশিষ্ট অট্টালিকা ও জনসাধারণের জন্য স্নানাগার ছিল, যা গুপ্ত যুগের পাটলিপুত্রের সঙ্গে তুলনীয়। তাম্রলিপ্তি ও সমতট বন্দরনগরীগুলিতে মসলা, মুক্তো ও দাঁতের গুদাম ছিল।
ফা-হিয়েনের বিবরণে একটি অদ্ভুত অঞ্চলের কথা পাওয়া যায়, যেখানে লোকেরা কাপড় পরত না।
হিউয়েন সাঙ ‘ভূতের বাজার’-এর বর্ণনা দেন, যেখানে সমতটে রাতে আলো ও ঢাকঢোল সহযোগে বেচাকেনা চলত—একটি রহস্যময় পরিবেশ তৈরি হত। হিউয়েন সাঙ ‘সমতট’ অঞ্চলের (সম্ভবত বর্তমান কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম সংলগ্ন উপকূল ও নদীবন্দর অঞ্চল)কথা বলছেন। এই বাজারকে তিনি “ভূতের বাজার” বলে চিহ্নিত করেছেন । এই অঞ্চলের মানুষরা যে পিশাচ প্রাকৃত এবং ভূত ভাষা-রূপী স্থানীয় জনগণভাষায় কথা বলত, তা ভাষাতাত্ত্বিক ও লোকাচারিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য। সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের মধ্যে, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলে কথিত ভাষাসমূহ সংস্কৃত থেকে বহুদূরে সরে আসা স্থানীয় উপজাতীয় ধ্বনি-পদ্ধতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বাংলাদেশের সব ভাষাই চট্টগ্রামের মানুষ বোঝে , কিন্তুু চট্টগ্রামের ভাষাটা বোঝা দেশের মানুষের বেশ মুশকিল । চট্টগ্রামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চল ছিল মালয়, আরব ও দাক্ষিণাত্য বণিকদের বাণিজ্যপথে অবস্থিত। এই অঞ্চলগুলোতে এমন রাত্রিকালীন বাজার ও অদ্ভুত ভাষাভাষীদের অস্তিত্ব হিউয়েন সাঙ যেমন লেখেন, তেমনই আরব ভ্রমণকারীদের বিবরণেও মেলে। (read more)
এই দুই পর্যটক বাংলার আর একটি অঞ্চলও উল্লেখ করেছেন, যেখানে মাছ ধরা ও শিকার নিষিদ্ধ ছিল, সম্ভবত এই এলাকাটি বর্তমান নদিয়া এবং শান্তিপুর ছিল । টলেমি তাঁর দ্বিতীয় শতকের ভূগোলবিদ্যার গ্রন্থে বঙ্গকে ‘গঙ্গারিডি’ নামে উল্লেখ করেছেন।
(দ্রষ্টব্য: ১ যোজন ≈ ১২-১৫ কিমি; ১ লি ≈ ৫০০ মিটার; ফ্যাক্সিয়ানের (ফা-হিয়েন ) শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের জন্য তাম্রলিপ্তি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। )
তথ্যসূত্র
- Faxian. A Record of Buddhist Kingdoms. Tr. James Legge, 1886.
- Xuanzang. Si-Yu-Ki: Buddhist Records of the Western World. Tr. Samuel Beal, 1884.
১. পুণ্ড্রবর্ধন (Pànchūbǎnguó> 奔那伐弹那)
奔那伐弹那国周四千余里。国大都城周三十余里。居人殷盛。池馆花林往往相间。
বেন না ফা তান না কুও চৌ সি ছিয়ান ইয়ু লি। কুও তা তু চেং চৌ সান শি ইয়ু লি। চু রেন ইয়িন শেং। ছি কুয়ান হুয়া লিন ওয়াং ওয়াং সিয়াং ছিয়ান।
“পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্য প্রায় ৪,০০০ লি পরিসীমাবিশিষ্ট। রাজধানী শহরের পরিধি ত্রিশ লি। জনসংখ্যা ঘন ও সমৃদ্ধ। দিঘি, অট্টালিকা ও পুষ্পবন পরস্পর বিন্যস্ত।”
— 大唐西域记, গ্রন্থ ১০
হিউয়েন-সাং উল্লেখ করেন যে এখানে কুড়িটিরও অধিক বিহারে ৩,০০০ এরও বেশি ভিক্ষু বসবাস করেন এবং মহাযান ও হীনযান উভয় মতের অধ্যয়ন প্রচলিত। হিন্দু দেবমন্দিরের সংখ্যাও শতাধিক।
২. কর্ণসুবর্ণ (Jiēnáshūbīnà > 羯罗拏苏伐剌那)
羯罗拏苏伐剌那国。人少信佛。多事天神。伽蓝十余所。僧徒二千余人。
চিয়ে লো না সু ফা লা না কুও। রেন শাও সিন ফো। তো শি থিয়েন শেন। ছিয়া লান শি ইয়ু সুও। সেং তু এর ছিয়ান ইয়ু রেন।
“কর্ণসুবর্ণ রাজ্যে বৌদ্ধবিশ্বাসী লোক অল্প। অধিকাংশ লোক দেবপূজায় নিবিষ্ট। এখানে দশের অধিক বিহার ও দুই হাজারাধিক ভিক্ষু রয়েছেন।”
— 大唐西域记, গ্রন্থ ১০
৩. সমতট (Shāmòdáluó > 三摩呾吒)
三摩呾吒国周三千余里。滨近大海。土地卑湿。稼穑滋植。
সান মো তা চা কুও চৌ সান ছিয়ান ইয়ু লি। পিন চিন তা হাই। থু তি পি শি। ছিয়া সে তজ়ে চি।
“সমতট রাজ্য প্রায় ৩,০০০ লি বিস্তৃত। ইহা সমুদ্র-নিকটবর্তী, ভূমি নিচু ও স্যাঁতসেঁতে। ধান্য ও উদ্ভিদে উর্বর।”
— 大唐西域记, গ্রন্থ ১০
