ভাষার উৎপত্তি

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ভাষার উদ্ভব এক গূঢ় অথচ মৌলিক রূপান্তর। আধুনিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে Homo sapiens প্রজাতির মানুষ অন্তত ১,৩৫,০০০ বছর আগে থেকেই ভাষা ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু এরও বহুকাল পূর্বে, প্রায় ৫,৩০,০০০ বছর আগে মানুষের স্বরযন্ত্রে গান গাওয়ার উপযোগী শারীরবৃত্তীয় ক্ষমতা গঠিত হয়েছিল। এই অনুমানকে সমর্থন করে প্রাচীনতম সংগীতযন্ত্রসমূহ—যেমন হাড় ও ম্যামথ দাঁত দিয়ে তৈরি বাঁশি—যেগুলির বয়স ৪০,০০০ বছরেরও বেশি। এতে প্রতীয়মান হয়, ভাষার উদ্ভব সংগীতের পরেই নয়, বরং সংগীত থেকেই। ভগবদ্গীতার বচনে “বেদসমূহের মধ্যে আমিই সামবেদ”—এই উক্তি সেই ধারনাকে শক্তি জোগায়। সামবেদ সংগীত, ছন্দ ও মন্ত্রের সংহত রূপ; প্রতিশাখ্য সূত্রেও বলা হয়েছে, সামগান ঋক্ ও যজুঃ-গদ্যের তুলনায় প্রাচীনতর ও মুখ্য।

মানবভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল যৌগিকতা বা compositionality। সীমিত শব্দভান্ডার থেকেও অসীম সংখ্যক বাক্য গঠন সম্ভব, কারণ শব্দগুলি কর্তা, ক্রিয়া, কর্ম প্রভৃতি ব্যাকরণিক ভূমিকার সঙ্গে পুনঃসংযোজিত হয়ে নতুন অর্থ সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি মাত্র ২৫টি শব্দ থাকে প্রতিটি ব্যাকরণিক ভূমিকার জন্য, তাহলে তা দিয়েই তৈরি হতে পারে অন্তত ১৫,৬২৫টি স্বতন্ত্র বাক্য। এরূপ ক্ষমতা প্রাণিজগতের অন্য কোন সঙ্কেত-ব্যবস্থার নেই। মানবভাষা একই সঙ্গে রেফারেনশিয়াল, অর্থাৎ বস্তু, ব্যক্তি, স্থান, কার্য ও সম্পর্ক নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য বিনিময় করতে সক্ষম।

আন্দামানের সেন্টিনেল জনগোষ্ঠী প্রায় ৫০,০০০ বছর ধরে তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে আসছে, যার উৎস ও কাঠামো এখনও অজানা। বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৭,০০০টি স্বতন্ত্র মানবভাষা চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু এই ভাষাগুলির অনেকগুলি ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত, বিশেষত ঔপনিবেশিক বলপূর্ব আধিপত্যের ফলে। আমেরিকায় ইউরোপীয়দের আগমন (প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে) এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তারা স্থানীয় ভাষা গ্রহণ না করে নিজেদের ভাষাই চাপিয়ে দেয়; ফলত, স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তবে ভাষার বিবর্তন সর্বত্র একইভাবে ঘটে না। অনুরূপ পরিবেশেও কোন ভাষা স্থিতিশীল থাকে, যদি তা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সাহিত্যের মাধ্যমে চর্চিত হয়। বাংলাভাষা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাভাষী জনগণ মূলত একই ভাষায় কথা বলছে। কলকাতার ভাষা উচ্চারণ, ভঙ্গিমা ও ধ্বনিগত বিন্যাসে আজও শান্তিপুর ও নবদ্বীপ অঞ্চলের চৈতন্য-অদ্বৈত পরম্পরার ভাষার সঙ্গে অভিন্ন।

ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে পাণিনির ধাতু-তত্ত্ব মানবভাষার এক বৈপ্লবিক পর্যায়। বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় প্রতিটি শব্দের মূল ছিল একটি ধাতু, যা নিজে ক্ষুদ্রতম অর্থবোধক একক, এবং তা থেকেই ক্রিয়াপদ ও নামপদ গঠিত হতো। পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ীতে প্রায় ২০০০ ধাতুর তালিকা দেন, যার উপর ভিত্তি করে ভাষা হয়ে ওঠে এক অনুশাসনীয় ব্যাকরণতন্ত্র।

পাণিনির পূর্ববর্তী কালে, ভারতে প্রচলিত ছিল বহু আঞ্চলিক ও শ্রেণিভিত্তিক ভাষা। সাহিত্যদর্পণ, ভাষার্ণব এবং প্রাকৃতলঙ্কেশ্বর প্রভৃতি শাস্ত্রে উল্লিখিত আঠারোটি শাস্ত্রীয় ভাষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল সংস্কৃত, প্রাকৃত, মাগধী, মহারাষ্ট্রী, দ্রাবিড়ী (চেরা), ওড়্রীয়া, পৈশাচী, শৌরসেনী, বাহ্লিকী (আফগানিস্তানের সন্নিহিত আধুনিক বালখ), দক্ষিণাত্য, প্রাচ্য ইত্যাদি। প্রতিটি ভাষার ব্যবহার নির্ধারিত ছিল শ্রেণি, লিঙ্গ, পেশা এবং স্থানভেদে—যেমন নারীর জন্য শৌরসেনী, রাজপুরোহিতের জন্য মাগধী, বিদূষকের জন্য প্রাচ্য ভাষা, শ্রমজীবী বা অনার্য শ্রেণির জন্য পৈশাচী। এই ধারা থেকেই পরে পালি, অপভ্রংশ ও আঞ্চলিক ভাষাসমূহ জন্ম নেয়।

বাংলাভাষা মূলত মাগধী প্রাকৃতের উত্তরাধিকারভুক্ত, তবে তা শুধুমাত্র কথ্যভাষার একটি রূপ নয়; তা সংগীত, দর্শন ও ব্যাকরণে সমৃদ্ধ। সামবেদের মন্ত্রগাথা, ঋক্‌-ছন্দ, এবং বৈদিক ধ্বনিবিজ্ঞান বাংলাভাষার অন্তঃস্থ সংগীতময়তা ও শৃঙ্খলাকে এখনও গোপনে প্রভাবিত করে। বাংলা কাব্যে ছন্দ, অলংকার ও ধ্বনিগত কাঠামোর যে সংবেদনশীলতা তা এই প্রাচীন সংগীত-বাচিক ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।

তামিল ভাষার স্বরধ্বনিগুলি—அ, ஆ, இ, ஈ, உ, ஊ, எ, ஏ, ஐ, ஒ, ஓ—বাংলা স্বরধ্বনি অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ-র সঙ্গে ধ্বনিগতভাবে অভিন্ন নয়, কিন্তু পরম্পরাগতভাবে মিল রয়েছে। এই মিলের উল্লেখ আমরা পাই ঔপনিষদিক ঐতরেয় আরণ্যকে, যেখানে দ্রাবিড় ও বঙ্গ জাতির এক অভিন্ন সংস্কৃতিক ও ধ্বনিগত উৎসের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে সংস্কৃত ও দ্রাবিড়—উভয় ধারাই একটি পুরাতন আর্য সংস্কৃতির শাখা, যেখানে ভাষা, সংগীত ও মন্ত্র একত্রে রূপ পেয়েছিল।

নিচে বাংলা ও তামিল ভাষার মধ্যে ধ্বনিগত ও অর্থগত মিলযুক্ত কিছু শব্দের একটি তালিকা দেওয়া হল। এই শব্দগুলি প্রমাণ করে যে বাংলাভাষা ও তামিল ভাষার মধ্যে একটি গভীর ঐতিহাসিক-ভাষাতাত্ত্বিক সংযোগ রয়েছে।

Bengali WordTamil WordMeaning in English
মা (ma)மா (maa)Mother
না (na)நான் (naan)I / Me
মা (ma)மா (mā)Mango (colloquial in some Tamil dialects)
রাম (Ram)ராம் (Raam)Ram (a name)
তোর (tor)தோர் (thor) Your (possessive)
Bengali WordTamil WordMeaning in English
রান (raan)ரான் (raan)Run (verb, colloquial usage)
দিন (din)தினம் (dhinam)Day
লাল (lal)லால் (laal)Red
কাল (kaal)கால (kaal)Time / Leg
ফল (phal)பழ (pazha)Fruit
বাগ (bag)பக (pag)Sin / Evil
রাত (raat)இரவு (iravu)Night
Bengali WordTamil WordMeaning in English
হাত (haat)கைகள் (kaigal)Hand (plural in Tamil)
মন (mon)மன (mana)Mind / Heart
জল (jal)தண்ணீர் (thanneer)Water (less similar in Tamil, but phonetically close ‘ja’ ‘ta’ sounds)
গান (gaan)கான் (kaan)Song
মাটি (mati)மண் (man)Soil / Earth

সার্বিকভাবে বলা যায়, ভাষা কেবল বাহ্যিক ভাববিনিময়ের মাধ্যম নয়, তা মানুষের আত্মিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক আত্মপরিচয়ের বাহক। সামবেদ ও বৈদিক ধাতুর ঐতিহ্য, সংগীত ও ব্যাকরণের সংযুক্ত প্রকাশ, এবং আর্ষ ভাষার অন্তর্নিহিত ছন্দ আজও বাংলাভাষায় ধ্বনিত হয়।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল