বঙ্গ প্রজাতি

Bengali girls 1900

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

বঙ্গ জাতি, মগধী জাতি ও চেরা জাতি

ঐতরেয় আরণ্যক, যা ঋগ্বেদের অংশবিশেষ হিসেবে বিবেচিত, তার দ্বিতীয় আরণ্যকের প্রথম অধ্যায়ে একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রাপ্ত হয়, যেখানে বলা হয়েছে যে বঙ্গ, অবগধ (অর্থাৎ অঙ্গ ও মগধ), এবং চেরপাদ জাতি বেদসংগত ধর্ম ও আচরণ লঙ্ঘন করেছিল এবং পূর্ব দিকে গমন করেছিল। এই বিবরণ ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। তারা “অতিক্রম” (অত্যয়ন) করেছিল, অর্থাৎ স্বীকৃত বৈদিক সীমানা বা অনুশাসন লঙ্ঘন করে। আমরা আজও এই তিনটি জাতিগোষ্ঠীকে আলাদা করে চিনতে পারি—বঙ্গ জাতি, মগধী জাতি ও চেরা জাতি (দক্ষিণ চেরা রাজবংশের রেকর্ড ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পাওয়া যায়)।

“এটাই পথই—এটাই কর্ম—এটাই ব্রহ্ম—এই সত্যই, এইরূপে (উপলব্ধ)। অতএব, এ বিষয়ে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়; কখনও অতিক্রম করা উচিত নয়। কেননা, পূর্বে যারা এই সীমা অতিক্রম করেছিল, তারা অতীত হয়েই গেছে—তারা আর রয়ে যায়নি। এই বিষয়েই ঋষি বলেছেন—

“তিন প্রকার প্রজা সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল এবং পরে তারা সূর্যকে (অর্থাৎ অগ্নিকে) ত্যাগ করেছিল।
যদিও ‘বৃহৎ’ সেই সত্তা সমস্ত লোকসমূহে অন্তর্নিহিতভাবে প্রতিষ্ঠিত রইল; পবিত্রীকরণশীল পবমান বায়ু সবুজ (দিগ্বলয়) পরিব্যাপ্ত করিয়া প্রবেশিত থাকলো।।”

এই যে বলা হয়েছে “প্রজারা তিনটি সীমা অতিক্রম করিয়া গমন করিল”,—এই তিন প্রকার প্রজাতি হ’ল এই তিনটি মানবগোষ্ঠী: “তারা বঙ্গ, অবগধ (অঙ্গ-মগধ), এবং চেরপাদ (দ্রাবিড় দক্ষিণ ভারতের জনগোষ্ঠী)”

ঋষিদের মতে, তারা বৈদিক ধর্মশৃঙ্খলা, বিশেষত অগ্নিকর্ম তথা যজ্ঞ-আচারকে প্রত্যাখ্যান করে বৈদিক নৈতিকতা-বহির্ভূত নানা প্রথা ও আচরণে লিপ্ত হয়েছিল

“বৃহৎ তিনি সমস্ত লোকসমূহে অন্তর্নিহিতরূপে অবস্থান করেন — সেই বৃহৎ, যিনি সমস্ত জগতের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত, তিনিই আদিত্য।” “ তিনি পবমান সবুজ (দিগ্বলয়) পরিব্যাপ্ত করিয়া প্রবেশ করিল”—এখানে পবমান মানে বায়ু; সেই বায়ুই এই দিকসমূহে প্রবেশ করিয়া পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে।

एष पन्था एतत्कर्मैतद्ब्रह्मैतत्सत्यम्, इति । तस्मान्न प्रमाद्येत्तन्नातीयात्, इति । न ह्यत्यायन्पूर्वे येऽत्यायंस्ते परा बभूवुः, इति ।
तदुक्तमृषिणा — प्रजा ह तिस्रो अत्यायमीयुर्न्य१न्या अर्कमभितो विविश्रे । बृहद्ध तस्थौ भुवनेष्वन्तः पवमानो हरित आ विवेशेति, इति ।
प्रजा ह तिस्रो अत्यायमीयुरिति — या वै ता इमाः प्रजास्तिस्रो अत्यायमायंस्तानीमानि वयांसि वङ्गा वगधाश्चेरपादाः, इति ।
न्य१न्या अर्कमभितो विविश्र इति — ता इमाः प्रजा अर्कमभितो निविष्टा इममेवाग्निम्, इति ।
बृहद्ध तस्थौ भुवनेष्वन्तरिति — अद् उ एव बृहद्भुवनेष्वन्तरः, स एवाऽदित्यः, इति ।
पवमानो हरित आ विवेशेति — वायुरेव पवमानो दिशो हरित आ विवेशे, इति ।।।। (ऐतरेय आरण्यकम् 2.1.1)

তথাপি, বৃহৎ সেই আত্মা—যিনি সমস্ত ভুবনে অন্তর্নিহিত—তিনিই তাদের জীবনের রক্ষক রূপে অন্তরস্থ থেকে কর্মসন্ধান ও জাগরণের পথ প্রদর্শন করেন। “बृहद्ध तस्थौ भुवनेष्वन्तरः स एव आदित्यः। पवमानो हरित आ विवेशे।”
— “সেই বৃহৎ সত্তা সমস্ত লোকসমূহে অন্তর্নিহিত রইলেন—তিনিই আদিত্য। পবমান বায়ু সবুজ দিকগুলিকে পরিব্যাপ্ত করে প্রবেশ করল।”

বঙ্গ জাতি, মগধী জাতি ও চেরা জাতি

এই বিবরণ থেকে অনুমান করা যায়, বঙ্গ, মগধ ও চেরা জাতিগণ সম্ভবত একক উৎস বা জাতিতত্ত্ব থেকে উদ্ভূত। ঐতরেয় আরণ্যকে বর্ণিত এই অংশ একটি “অতিপ্রাচীন” উক্তি উদ্ধৃত করেছে, যার কাল নির্ধারণ ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা তারও পূর্বে, এমনকি ৭০০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত ধরা যেতে পারে। কারণ এই আরণ্যকে একটি সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, “প্রজাঃ তিস্রো অত্যায়মীয়ুঃ”— তিনটি জনগোষ্ঠী বৈদিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করে সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

যদি আমরা ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সময়সীমা ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব ধরি, তাহলে এই পূর্বগমন সম্ভবত ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। সুতরাং, বঙ্গ, মগধ ও দক্ষিণের চেরা জাতিসমূহের অস্তিত্বের লিখিত প্রমাণ প্রাপ্ত হচ্ছে এই আরণ্যক থেকে, যা মহাভারতের ঘটনার পূর্বেও বৈদিক জাতির জীবনে প্রভাব ফেলেছিল বলে বোঝা যায়।

আরণ্যকে বলা হয়েছে:

“এষ পন্থা, এতৎ কর্ম, এতৎ ব্রহ্ম, এতৎ সত্যম্। তস্মান্ন প্রমাদ্যেত্, তন্নাতীয়াত্।”
— অর্থাৎ, “এটাই পথ, এটাই কর্ম, এটাই ব্রহ্ম, এটাই সত্য। অতএব, তা থেকে বিচ্যুতি করা অনুচিত; অতিক্রম করা অনুচিত।”

এমনকি এই ঘটনা এতটাই কুখ্যাত ছিল যে, পুরো বৈদিক জাতীয় জীবনে এর একটা প্রবল অভিঘাত পড়েছিল—এমনকি মহাভারতের ঘটনাপ্রবাহেরও আগে। যেমন ঐতরেয় আরণ্যকে বলা হয়েছে—

“এটাই পথই—এটাই কর্ম—এটাই ব্রহ্ম—এই সত্যই, এইরূপে (উপলব্ধ)। অতএব, এ বিষয়ে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়; কখনও অতিক্রম করা উচিত নয়। কেননা, পূর্বে যারা এই সীমা অতিক্রম করেছিল, তারা অতীত হয়েই গেছে—তারা আর রয়ে যায়নি।”

এই কথাগুলো ভবিষ্যতের বৈদিক প্রজন্মের জন্য একটা কঠোর সতর্কবাণী ও শিক্ষা। এই মানুষগুলো যখন বৈদিক ধর্মশৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছিল, তখন তারা সাংস্কৃতিক ও জাতীয়ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তারা তাদের উচ্চ বৈদিক ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছিল

তবে এই পতনের মধ্যেও বৃহৎ ব্রহ্মসত্তা তাদের জীবন ও শরীরের মধ্যে উপস্থিত থেকে তাদের রক্ষা করেছে। এই কারণে আজকের বাংলা বা বঙ্গভূমি-র নাম এসেছে সেই প্রাচীন বৈদিক ‘বঙ্গ’ উপজাতি থেকে। তবে এই জাতি ‘পবিত্র’ থাকেনি, বরং সাধারণ ও নিম্নস্তরের জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়েছে

তবুও, এই পতিত মানুষগুলো আবার ফিরে আসবে—এই আশাতেই বলা হয়েছিল:

যদিও ‘বৃহৎ’ সেই সত্তা সমস্ত লোকসমূহে অন্তর্নিহিতভাবে প্রতিষ্ঠিত রইল; পবিত্রীকরণশীল পবমান বায়ু সবুজ (দিগ্বলয়) পরিব্যাপ্ত করিয়া প্রবেশিত থাকলো।

এই পবিত্রীকরণশীল ‘পবমান’, যিনি পতিত মানুষগুলোর ভিতরে লুকিয়ে ছিলেন, তিনি আবার বৈদিক ধারায় ফিরিয়ে আনবেন—এটাই সেই প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণী

এই বিবরণ থেকে এটি অনুমান করা যায় যে, বঙ্গ ও মগধ অঞ্চলে যারা ছিল, তারা আদিতে বৈদিক শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী জাতি হিসেবেই চিহ্নিত ছিল।

আমরা বারবার ঘুরে একই প্রশ্নে যেতে পারি না—এই অঞ্চলে বঙ্গ ও মগধদের আগেও যারা বাস করত তারা কারা?

পুরাণ ও ঐতিহাসিক কথার ভেতরে আমরা পাই যে রাজা ভগীরথ হিমালয় থেকে গঙ্গা নদীকে মহোঃদধি (আজকের বঙ্গোপসাগর) পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন, এবং সেই ভূমিকে আবার উর্বর করেছিলেন—যেটা রাজা সগরের পুত্রেরা আগে নষ্ট করেছিল

গঙ্গা আজ যে রূপে প্রবাহিত হচ্ছে, সেই নদীসৃষ্টি বা অভিযোজনের ঘটনাও সম্ভবত ৩০,০০০ বছর আগের। তাহলে বুঝতে পারি, ঐতরেয় আরণ্যকের এই কাহিনি তারও আগের

পুরনো বঙ্গ, মগধ ও চেরা (বঙ্গ প্রজাতি) জাতি তখন রাক্ষস, পিশাচ ও বৈদিক বিরোধী জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ৩০,০০০ বছর আগে রাজা সগর, ঋষি কপিল ও অগস্ত্য মুনির মাধ্যমে এদের একাংশ পুনরায় বৈদিক ধর্মে ফিরিয়ে আনা হয়। যারা তখন ফিরতে পারেনি, তারা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে—এই আশাতেই সেই আখ্যান লেখা হয়েছিল।

পূর্বে বঙ্গের পূর্বাঞ্চলকে হরিকেল বা হরিকোল নামে অভিহিত করা হতো, যেখান থেকে ‘কোল’ শব্দটির উৎপত্তি (২০০ খ্রিস্টাব্দ)। বঙ্গ, মগধ এবং চেরপাদ কালের প্রবাহে ‘কোল’ পরিগ্রহ করে। ‘কেল’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কিলিত’ শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রত্যাখ্যান বা নিষেধের অবস্থা। ‘হরিকেল’ অর্থ সেই সকল মানুষ (বঙ্গ প্রজাতি) যারা আদিত্য (বিষ্ণু) এবং যজ্ঞকে অস্বীকার করেছিল। এই হরিকেল অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু রৌপ্য মুদ্রা বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, সিলেট এবং ত্রিপুরা অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে।

‘হরিকেল’ শব্দের একটি অর্থ ‘জঙ্গলের মানুষ’; আবার এর আরেকটি অর্থ জলাভূমি বা পাঁস্তর। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে আজ ‘হাওর’ বলা হয়, যেটি ‘হরিকেল’ শব্দ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। পাঞ্জাব অঞ্চলেও ‘হরিকে-পট্টন’ নামক স্থানের নাম ‘হরিকেল’ শব্দের জলাভূমি-সংক্রান্ত ভাবার্থকে বহন করে। বঙ্গের লোকেরা প্রাচীন কালে অবহেলিত বনভূমি ও জলাভূমি অঞ্চলে বাস করতো, এবং তারা বৈদিক জনগোষ্ঠীর থেকে এক পৃথক উপজাতিতে পরিণত হয়। কোল, মুন্ডা, সাঁতালদের উপাস্য বুঙ্গা/ ‘বুঙ্গ’ হল “बृहद्ध तस्थौ भुवनेष्वन्तः पवमानो हरित आ विवेशेति, इति”—এটি দৈনন্দিন ভাষায় জঙ্গলের পবিত্র বায়ু, আর বৈদিক ভাষায় এটি ‘পবমান বায়ু’, অর্থাৎ ‘অন্তঃপ্রাণ’।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল