শূদ্রমুনি সরলা দাসের ওড়িয়া সরলা মহাভারত (১৪৩৬-১৪৬৬)

শূদ্রমুনি সরলা দাসের ওড়িয়া সরলা মহাভারত

সরলা দাস

সরলা দাস ওড়িয়া ভাষার ‘আদিকবি’ হিসেবে সুপরিচিত। আদি পর্ব মহাভারতের সূচনায় তিনি পুরী জিলা জগন্নাথদেবকে লক্ষ্য করে এক দীর্ঘ ও ভক্তিসংলগ্ন স্তব পাঠ করেন, যেখান থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, তিনি গজপতি রাজা কপিলেশ্বরের (অর্থাৎ কপিলেন্দ্র দেব; রাজত্বকাল ১৪৩৩ খ্রি.–১৪৬৭ খ্রি.) শাসনামলে মহাভারতের অনুবাদকর্ম শুরু করেন।

সরলা দাস এই স্তবের মাধ্যমে আমাদের জানান যে, রাজা কপিলেশ্বর ছিলেন এক বিশিষ্ট বৈষ্ণব রাজা, যিনি ভগবান জগন্নাথের নিত্য সেবায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি অগণিত নৈবেদ্য নিবেদন এবং অসংখ্য অভিবাদনের মাধ্যমে ভগবানকে সন্তুষ্ট করতেন। সরলার মতে, এই ভক্তিমূলক উপাসনার দ্বারা রাজা কলিযুগের পাপকর্মকে দগ্ধ করেন এবং এক শুভ ধর্মযুগের প্রবর্তন করেন। এই ধর্মপ্রবণ রাজত্বকালে সরলা দাসের মতো একজন শূদ্রভূক্ত জ্ঞানী মহাভারতের বিশাল রচনায় হাত দিতে পেরেছিলেন, যা ওড়িয়া সাহিত্যে এক ঐতিহাসিক পর্বের সূচনা করে।

কেন এটিকে মহাভারত বলা হয়, লা দাস ব্যাখ্যা করেছিলেন যে এর ভারী ওজনের কারণে, ভারত মানে ভর:

ঋষি অগস্ত্য বৈবস্বত মনুকে বলেন—“হে রাজন, তুমি প্রশ্ন করেছো এই মহাভারতের মাহাত্ম্য কী এবং কেন একে ‘মহাভারত’ বলা হয়। আমি সেই কথা এখন তোমাকে বিশদে বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো।”

ঋষি বলেন, একদিন দেবতারা সমস্ত ধর্মগ্রন্থকে একত্র করে তুলাদণ্ডে মাপতে শুরু করেন। বারো যোজন দৈর্ঘ্যের একটি কাঠি তৈরি করে তারা ধর্মগ্রন্থগুলির ওজন তুলনা করতে থাকেন। তিনটি যোজন উচ্চতায় দুইদিকে কান-সমেত বিশাল এক পাল্লা বানিয়ে তুলাদণ্ড তৈরি হয়।

তারা প্রথমে বিষ্ণুপুরাণ, ব্রহ্মাপুরাণ, শিবপুরাণ, নারদপুরাণ ইত্যাদি সমস্ত পুরাণ একদিকে রাখলেন। তাতে ছিল অষ্টাদশ পুরাণ, ২৫ লক্ষ শ্লোক, রামায়ণ, চণ্ডীযুদ্ধ ও আরও অসংখ্য গ্রন্থ। সবকিছু মিলিয়ে বিশাল ভার।

অন্যদিকে রাখলেন কেবল একটিমাত্র গ্রন্থ— মহাভারত। কিন্তু দেখা গেল, সমস্ত পুরাণ, উপপুরাণ, এমনকি চণ্ডীপাঠ মিলিয়েও মহাভারতের সমতুল্য ওজন হয়নি। তুলাদণ্ডে মহাভারত একাই ভারী হয়ে উঠল।

এই অতুল ভার ও ব্যাপকতার জন্যই তখন কশ্যপ এবং অঙ্গিরা মুনিরা এই কাব্যকে ‘মহাভারত’ নাম দেন। অর্থাৎ, এই কাব্য শুধু বৃহৎ নয়, মহৎও বটে—এই গ্রন্থে ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, নীতিশিক্ষা, যুদ্ধ, সংসার ও মুক্তির উপায়—সবই আছে। তাই এর নামকরণ হয় “মহাভারত”।

জয়তু দধি-মঙ্গল বিঘ্নরাজ
যাহার প্রসন্নে সিদ্ধ হুয়ৈ সর্বকাৰ্য্য ॥১॥
সকল বিঘ্নবিনাশন জয়তু গজানন
মঙ্গল যোগেশ্বর পরমানন্দ পার্ব্বতীনন্দন ॥২॥
মঙ্গল শঙ্খচক্র সরোজ দধিমুখ
মঙ্গল বরদায়ক নাথ সদয় প্রত্যক্ষ ॥৩॥
মহাব্রহ্ম যোগেশ্বর সিন্দূরে গজমুখ মণ্ডি
যম দর্প গঞ্জি সর্ব অপরাধ দুঃখ খণ্ডি ॥৪॥
জয়তু জয়তু দেব চন্দ্র যে শেখর
জয়তু জয়তু দেব সিদ্ধ লম্বোদর ॥৫॥
জয়তু জয়তু দেব সুরগণ রাখন্তা
জয়তু জয়তু দেব পরম গতি দ্যন্তা ॥৬॥

স্বামী সাংগ্রামে বধ যহুঁ নোহিলা ত্রিপুরা
তোহোর বুদ্ধিবলে নাশ গলাটি মহাবীরা ॥৭॥
হেলেণ তু নাশকলু ষাঠিয়ে সহস্র বরষে
আকাশরে সাধু সাধু কলে তোতেটি ত্রিদশে ॥৮॥
তোষেণ বর তোতে দিলেক দেবরাজা
সকল ভূবনে স্বামী আগে তোতে পূজা ॥৯॥
যেবণ বেলে সাহসরকু অনকূল কলে বেদব্যাসে
বিধি গাঁঢে আজ্ঞাং তোতে দিলে নিরালসে ॥১০॥
গ্রন্থকু কবিত্ব হইব ব্যাস মহামুনি
তু লেখন কর শুভ অনকূল ঘেনি ॥১১॥
গঙ্গা যমুনা সরস্বতী তিন নদী
রামঘাট তীর্থে সঙ্গম হইলে ভেদি ॥১২॥
পশ্চিম পারুশে বাঞ্চাকল্পবট
পশ্চিমমুখী ধবলাঙ্গী সরস্বতী নদী তট ॥১৩॥
সেহু সিদ্ধ দেবতায়ে বিজয়ে সেহু থানে
ত্রিবেণী স্নান করিসে माधব দর্শনে ॥১৪॥
বটর তলে সে বসিলে যোগধ্যানে
শ্রীভুজে লেখন স্বামী তলয়ে একমনে ॥১৫॥
ব্যাসে কহন্তি তু লেখন কর স্বামী
আদি সিদ্ধ গ্রন্থ তু কহিলু মহাব্রহ্মি ॥১৬॥
স্বামী যেবণ সাহাস্র লেখন কলু যেবণ যোগে
সে অমৃত দৃস্টিরে প্রসন্ন হোঅ বেগে ॥১৭॥

শ্রীকরে লেখন ঘেনি বসিলে একমনে ॥୧୮॥
যোগেণ যোগেশ্বর সদানন্দর তনয়ে
মনচৈতন একত্ব কলু অজপা যোগ লয়ে ॥୧୯॥
করুণাময়ে নাথ শরণ পঞ্জর বীরধু
সংসার বারানিধি নাথ বরদাতা দেব সাধু ॥୨୦॥
বিস্তর উদর যাহার জ্ঞান সচ্চা
পৃথুল শরীর নাথ অভয়ে কালবঞ্চা ॥୨୧॥
যে ঘোর সংসার সাহের তরিবাকু বলাইলি মণীষা
দুস্তরু তারাঅ নাথ পুরাঅ মনবাঞ্ছা ॥୨୨॥
শিখিপুচ্ছমৌলি বতিশগুণে কলা
ভর হরষ নাথ নৃত্য রঙেণ ভোলা ॥୨୩॥
দিবারাত্র ন জানই যেবণ মহাতমা
অনন্তকাল বঞ্চাইলা সে পুরুষোত্তমা ॥୨୪॥
পুরুষঙ্কর সিদ্ধ তু দেবঙ্কর আদি
দর্শনে দুরিত হরঈ প্রসন্নে কার্য্য সিদ্ধি ॥୨୫॥
শ্রী বিঘ্ননাথ চরণে মোর সেবা
যে শ্রীমহাভারথ কহিবি মোতে প্রসন্ন হোইবা ॥୨୬॥
তব পদ্মপাদে মোর বিনয় ভগতি
পরশুধর নাথ তু সদয়ে গণপতি ॥୨୭॥
আদি অন্ত মধ্য তু অটু সর্বথানে
গ্রন্থ ভিআইলু তু ভুত ভবিষ্য বর্ত্তমানে ॥୨୮॥

শ্রিয়ামাত বল্লভ চরণে মোর আশ
বদন্তি গ্রন্থিক শূদ্রমুনি সরলা দাস

সরলাদাস ওড়িয়া মহাভারত–এর আদি পর্বে জগন্নাথ, উপলেশ্বর, যমেশ্বর, নীলাচল গিরি এবং রাজা কপিলেশ্বরকে সম্বোধন করে ধর্মীয় ও ভৌগোলিক তাৎপর্যপূর্ণ স্থানসমূহের বর্ণনা দিচ্ছেন।

সরলাদেবীর বন্দনা

জম্বুদ্বীপ ভ্রথখণ্ড ওড়রাষ্ট্রমণ্ডলে
উপলেশ্বর লিঙ্গ চিত্রউপলাশ দক্ষিণ কূলে ॥୧॥

জয়ন্তার নিজ ভূমি, যাজনগ্র নিকটে দক্ষিণ বাণারসী (যাজপুর)
কুশস্থলী ভূমি, দ্বারকা যে ক্ষেত্র পুণ্যবাসী ॥୨॥

শ্রী যমেশ্বর মহালিঙ্গ, মৌদ্ধির উত্তর তটে,
নীল সুন্দর পর্বত, নীল কল্পবটে ॥୩॥

বিজয়ে রামকৃষ্ণ, সুবদ্রা নামে ব্রহ্মা,
চারিশত বত্রিশ সহস্র বর্ষক যোগলয়ে মহাতমা ॥୪॥

কলিকাল ধ্বংসী, ভোগেন কোটিপূজা,
প্রলম্বিতে খটইং শ্রী কপিলেশ্বর মহারাজা ॥୫॥

সে নীল সুন্দর গিরি উত্তর কচ্ছাড়ে,
সার ভূমি ভ্রথখণ্ড পূর্বদিগ ইশান্যের আড়ে ॥୬॥

চন্দ্রভাগা নামেন যে এক নদী গটি,
বৃদ্ধমাতা’র পার্শ্বে মৌদ্ধিতে যায় ফুঁটি ॥୭॥

সরলা দাস তাঁর মহাভারত-এর আদি পর্বে প্রথমেই নিজ ভৌগোলিক অবস্থান, পারিবারিক পরিচয় ও আত্মপরিচয় দিয়ে শুরু করেন। তিনি জানান, ওড়িশার ভৃগুক্ষেত্রভুক্ত ভূখণ্ড, অর্থাৎ উড়িষ্যার মণ্ডলের মধ্যে, উপলেশ্বর লিঙ্গ যেখানে অবস্থিত, তার দক্ষিণ কূলে এক পবিত্র ভূমি আছে। এই অঞ্চল ‘যাজনগর’-এর কাছে দক্ষিণ বারাণসী নামে পরিচিত। এটি কুশস্থলীর মতোই এক পুণ্যভূমি, যেখানে তিনি নিজে জন্মগ্রহণ করেছেন। এই ভূমিকে তিনি দ্বারিকা বলে উল্লেখ করেন।

সেই স্থানে অবস্থিত নীলগিরি—নীল পর্বতের উপরেই দেবতা রামকৃষ্ণ ও সুবদ্রা ব্রহ্মা নামে বিখ্যাত। তিনি বলেন, এই মহাত্মারা প্রায় চার শত বত্রিশ সহস্র বছর ধরে ধ্যানস্থ অবস্থায় ছিলেন। কালচক্রে কলির প্রভাবে মানুষ যখন ভ্রষ্ট হয়, তখন রাজা কপিলেশ্বর বা কপিলেন্দ্র মহারাজ নীলগিরির উত্তরে অবস্থিত পবিত্র ভূমিতে মহাদেবের আরাধনা করেন এবং কোটি কোটি ভোগ নিবেদন করে কলির পাপ ধ্বংস করেন।

এই নীলগিরির কচ্ছাড়ে, অর্থাৎ পাদদেশে, এক পবিত্র নদী প্রবাহিত হয়, যার নাম চন্দ্রভাগা। বৃদ্ধমাতা গঙ্গারূপে সেই নদী সমুদ্র থেকে ফেটে বেরিয়ে এসেছে। সেই নদীর তীরে প্রশুরামের ঘাট রয়েছে, এবং সেখানে এক পটন নগরী গড়ে উঠেছে, যার নাম কনকাবতী।

এই স্থানেই ‘সারোলা’ নামের এক গ্রামে দেবী সারোলা চণ্ডীর মন্দির। দেবী মহাযোগেশ্বরী এবং পরম বৈষ্ণবী রূপে সেখানে বিরাজমান। সরলাদাস তাঁর কাব্যে জানান, দেবী পরম সাধবী, যিনি তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করেন। তিনি স্বরূপে প্রকাশিত হন এবং কবিকে আশীর্বাদ করেন।

সরলাদাস নিজেকে দেবীর পুত্র বলে পরিচয় দেন—”আমি সরলা চণ্ডীর পুত্র, সরলা দাস কবি”। তিনি বলেন, শাকাম্ভরী দেবী তাঁকে আদেশ দিয়েছেন মহাভারত রচনার জন্য। তিনি কবিতার মাধ্যমে জানান যে, তিনি কোনো পণ্ডিত নন, জন্ম থেকেই মূর্খ। তাই যারা এই গ্রন্থ পাঠ করবেন, তারা যেন গভীর মনোযোগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেন—এই মহাভারতের মাধ্যমে সমস্ত পাপ ধুয়ে যাবে।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল