বাঙ্গালা ভাষা
আমাদের দেশে প্রাচীন কাল থেকে সংস্কৃতর সমস্ত বিদ্যা থাকার দরুণ, বিদ্বান্ এবং সাধারণের মধ্যে একটা অপার সমুদ্র দাঁড়িয়ে গেছে। বুদ্ধ থেকে চৈতন্য রামকৃষ্ণ পর্য্যন্ত যাঁরা “লোক-হিতায়” এসেছেন, তাঁরা সকলেই সাধারণ লোকের ভাষায় সাধারণকে শিক্ষা দিয়াছেন। পাণ্ডিত্য অবশ্য উৎকৃষ্ট; কিন্তু কটমট ভাষা, যা অপ্রাকৃতিক, কল্পিত মাত্র, তাতে ছাড়া কি আর পাণ্ডিত্য হয় না? চলিত ভাষায় কি আর শিল্পনৈপুণ্য হয় না?
স্বাভাবিক ভাষা ছেড়ে একটা অস্বাভাবিক ভাষা তৈয়ার ক’রে কি হবে? যে ভাষায় ঘরে কথা কও, তাহাতেই ত সমস্ত পাণ্ডিত্য গবেষণা মনে মনে কর; তবে লেখবার বেলা ও একটা কি কিম্ভূতকিমাকার উপস্থিত কর? যে ভাষায় নিজের মনে দর্শন বিজ্ঞান চিন্তা কর, দশজনে বিচার কর—সে ভাষা কি দর্শন বিজ্ঞান লেখ্বার ভাষা নয়? যদি না হয়, ত নিজের মনে এবং পাঁচজনে, ও সকল তত্ত্ব-বিচার কেমন ক’রে কর? স্বাভাবিক ষে ভাষায় মনের ভাব আমরা প্রকাশ করি, যে ভাষায় ক্রোধ দুঃখ ভালবাসা ইত্যাদি জানাই,— তার চেয়ে উপযুক্ত ভাষা হ’তে পারেই না; সেই ভাব, সেই ভঙ্গি, সেই সমস্ত ব্যবহার ক’রে যেতে হবে।
ও ভাষার যেমন জোর, যেমন অল্পের মধ্যে অনেক, যেমন যেদিকে ফেরাও সেদিকে ফেরে, তেমন কোন তৈয়ারি ভাষা কোনও কালে হবে না। ভাষাকে কর্তে হবে—যেন সাফ্, ইস্পাৎ, মুচ্ড়ে মুচ্ড়ে যা ইচ্ছে কর— আবার যে-কে-সেই, এক চোটে পাথর কেটে দেয়, দাঁত পড়ে না। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতর গদাই-লস্করি চাল— ঐ এক-চাল—নকল ক’রে অস্বাভাবিক হ’য়ে যাচ্ছে। ভাষা হচ্ছে উন্নতির প্রধান উপায়, লক্ষণ।
যদি বল ও কথা বেশ; তবে বাঙ্গালা দেশের স্থানে স্থানে রকমারি ভাষা, কোন্টি গ্রহণ ক’রবো? প্রাকৃতিক নিয়মে যেটি বলবান্ হচ্ছে এবং ছড়িয়ে প’ড়্ছে, সেইটিই নিতে হবে। অর্থাৎ এক কল্কেতার ভাষা। পূর্ব্বপশ্চিম, যে দিক্ হ’তেই আসুক না, একবার কল্কেতার হাওয়া খেলেই দেখ্ছি, সেই ভাষাই লোকে কয়। তখন প্রকৃতি আপনিই দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, কোন্ ভাষা লিখ্তে হবে। যত রেল এবং গতাগতির সুবিধা হবে, তত পূর্ব্ব পশ্চিমি ভেদ উঠে যাবে এবং চট্টগ্রাম হ’তে বৈদ্যনাথ পর্য্যন্ত ঐ কল্কেতার ভাষাই চ’ল্বে। কোন্ জেলার ভাষা সংস্কৃতর বেশী নিকট, সে কথা হচ্ছে না—কোন্ ভাষা জিত্ছে সেইটি দেখ।
যখন দেখ্তে পাচ্ছি যে, কল্কেতার ভাষাই অল্প দিনে সমস্ত বাঙ্গলা দেশের ভাষা হয়ে যাবে, তখন যদি পুস্তকের ভাষা এবং ঘরে কথা কওয়া ভাষা এক ক’র্তে হয়, ত বুদ্ধিমান অবশ্যই কলকেতার ভাষাকে ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ ক’র্বেন। এথায় গ্রাম্য ঈর্ষ্যাটিকেও জলে ভাসান দিতে হবে। সমস্ত দেশের যাতে কল্যাণ, সেথা তোমার জেলা বা গ্রামের প্রাধান্যটি ভুলে যেতে হবে।
ভাষা— ভাবের বাহক। ভাবই প্রধান; ভাষা পরে। হীরে মতির সাজ পরানো ঘোড়ার উপর, বাঁদর বসালে কি ভাল দেখায়? সংস্কৃতর দিকে দেখ দিকি। ব্রাহ্মণের সংস্কৃত দেখ, শবর স্বামীর মীমাংসাভাষ্য দেখ, পতঞ্জলির মহাভাষ্য দেখ, শেষ—আচার্য্য শঙ্করের মহাভাষ্য দেখ; আর অর্ব্বাচীন কালের সংস্কৃত দেখ।—এখুনি বুঝ্তে পার্বে যে, যখন মানুষ বেঁচে থাকে, তখন জেন্ত-কথা কয়; ম’রে গেলে, মরা–ভাষা কয়। যত মরণ নিকট হয়, নূতন চিন্তাশক্তির যত ক্ষয় হয়, ততই দু একটা পচাভাব রাশীকৃত ফুল চন্দন দিয়ে ছাপাবার চেষ্টা হয়। বাপ্রে, সে কি ধূম্—দশ পাতা লম্বা লম্বা বিশেষণের পর দুম্ ক’রে—“রাজা আসীৎ”!!! আহাহা! কি প্যাঁচওয়া বিশেষণ, কি বাহাদুর সমাস, কি শ্লেষ!!— ও সব মড়ার লক্ষণ। যখন দেশটা উৎসন্ন যেতে আরম্ভ হ’ল তখন এই সব চিহ্ন উদয় হ’ল। ওটি শুধু ভাষার নয়, সকল শিল্পতেই এল। বাড়ীটার না আছে ভাব, না ভঙ্গি; থাম্গুলোকে কুঁদে কুঁদে সারা ক’রে দিলে। গয়নাটা নাক ফুঁড়ে ঘাড় ফুঁড়ে ব্রহ্মরাক্ষুসী সাজিয়ে দিলে, কিন্তু সে গয়নায় লতা পাতা চিত্র বিচিত্রর কি ধূম্!!
গান হচ্ছে, কি কান্না হচ্ছে, কি ঝগড়া হচ্ছে,—তার কি কি ভাব, কি উদ্দেশ্য, তা ভরত ঋষিও বুঝ্তে পারেন না; আবার সে গানের মধ্যে প্যাঁচের কি ধূম্! সে কি আঁকা বাকা ডামা ডোল্—ছত্রিশ নাড়ীর টান তায় রে বাপ্। তার উপর মুসলমান ওস্তাদের নকলে দাঁতে দাঁত চেপে, নাকের মধ্য দিয়ে আওয়াজে সে গানের আবির্ভাব! এ গুলো শোধরাবার লক্ষণ এখন হচ্ছে, এখন ক্রমে বুঝ্বে যে, যেটা ভাবহীন, প্রাণহীন— সে ভাষা সে শিল্প, সে সঙ্গীতকোনও কাযের নয়। এখন বুঝ্বে যে, জাতীয় জীবনে যেমন বল আস্বে, তেমনভাষা শিল্প সঙ্গীত প্রভৃতি আপনা আপনি ভাবময় প্রাণপুর্ণ হ’য়ে দাঁড়াবে।
দুটো চলিত কথায় যে ভাবরাশি আস্বে, তা দু হাজার ছাঁদি বিশেষণেও নাই। তখন দেবতার মূর্ত্তি দেখ্লেই ভক্তি হবে, গহনা পরা মেয়েমাত্রই দেবী ব’লে বোধ হবে, আর বাড়ী ঘর দোর সব প্রাণস্পন্দনে ডগ্ মগ্ ক’র্বে।
উৎস: ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ২০ শে ফেব্রুয়ারী তারিখে রামকৃষ্ণ মঠপরিচালিত উদ্বোধন পত্রের সম্পাদককে বিবেকানন্দ (নরেন্দ্র নাথ দত্ত) যে পত্র লিখেন, তাহা হইতে উদ্ধৃত।
Read More:
- ভারতীয় সাহিত্যচেতনার ভিত রচনায় বৈদিক সভ্যতার অনিঃশেষ প্রতিধ্বনি
- বাংলার ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস এবং বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি
