চতুর্থ অংশ সমন্বয় অধিকারণ
১৬. অধ্যায় ১৭.অধ্যায় ১৮. অধ্যায়
যুদ্ধগীতা সমন্বয় অধিকরণ মূলত ১৬তম, ১৭তম ও ১৮তম অধ্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এই অধিকরণের উদ্দেশ্য হল—“শাস্ত্র” কী, তা নির্ধারণ করা এবং শাস্ত্র অনুসরণ করলে ও না করলে কী ফলাফল হয়, তা স্থির করা।
যুদ্ধগীতার শুরুতে যে জিজ্ঞাসা অধিকরণ রয়েছে, সেখানে প্রশ্ন করার মূল্য ও তাৎপর্য নিয়ে রাজর্ষি কৃষ্ণ বিশেষভাবে বলেছিলেন। প্রশ্ন শুধুই একটি শব্দগুচ্ছ নয়—প্রশ্ন হল এক সাধনা, এক আত্মপ্রয়াস। যিনি সত্যসন্ধানী, তাঁহার জীবনের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকবেই। যুদ্ধগীতায় প্রশ্ন করা মানে শুধু উত্তর চাওয়া নয়, বরং সেই প্রশ্নকে হৃদয়ে ধারণ করে তা সাধনার পথে প্রতিষ্ঠা করা।
এইজন্যই অভ্যাস অধিকরণ, যা দ্বিতীয় অধিকারণ হিসেবে উপস্থিত, অনুসন্ধানীর কাঁধে একটি গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে—প্রশ্নকে প্রতিনিয়ত অনুশীলন করার। প্রশ্ন যখন অন্তর থেকে জন্ম নেয়, এবং অনুসন্ধানী যখন সেই প্রশ্নকে নিয়ে ক্রমাগত সাধনা করেন, তখন সেই প্রশ্ন নিজেই এক দর্শন প্রসব করে। একটি সিদ্ধ প্রশ্নের উত্তর বহিরাগত কেউ দিতে পারে না—উত্তর আসে আত্মস্বরূপ থেকে। সেই আত্মা তখন ঈশ্বরতুল্য হয়ে প্রশ্নের অন্তর্নিহিত দর্শন দর্শনীয় করে তোলে।
এই দর্শনই প্রশ্নের প্রাথমিক ফল। বৈদিক দর্শনে এবং যুদ্ধগীতার বিন্যাসে তাই প্রশ্নের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উত্তর আসে পরিস্থিতির ও বাস্তবতার সমন্বয়ের ভিতর দিয়ে। প্রশ্নের সমাপ্তি হয় উত্তরে নয়, সমন্বয়ে।
এই জন্যই যুদ্ধগীতার শেষ অধ্যায় হল সমন্বয় অধিকরণ। প্রশ্নের যথাযথ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ ও তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের সমন্বয়ের মাধ্যমেই অনুসন্ধানী উপলব্ধি করেন—“নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লভ্ধা।”
এই “স্মৃতি” আসে শ্রুতির আলোচনার মাধ্যমে। শ্রুতি মানেই শাস্ত্র। যুদ্ধগীতা স্পষ্টভাবে বলে—“তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং” (১৬.২৪)। প্রশ্ন তখনই বৈধ যখন তা শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী করা হয়।
যদি কোনও প্রশ্ন শাস্ত্রবিধি না মেনে করা হয় (১৬.২৩), তবে তা প্রকৃত প্রশ্ন নয়। কেবলমাত্র শাস্ত্রবিধিপূর্ণ প্রশ্নই দর্শন উদ্ভব করতে সক্ষম। এই দর্শন হল সেই বিশ্বমানবিক বোধ, যেটা প্রশ্নের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত।
সমন্বয় অধিকরণ সেই প্রশ্নের বাস্তবতা, যুক্তি ও প্রেক্ষাপটকে একসূত্রে বাঁধে। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীতে কেউই এমন নেই যাঁর কাছে কোনও চূড়ান্ত প্রশ্ন করা যায়, আবার এমন কেউও নেই যিনি সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর দিতে পারেন।
যুদ্ধগীতার অনন্য শৈল্পিকতা এখানেই—গীতার প্রতিটি চরিত্রের নিজের নিজস্ব জিজ্ঞাসা আছে, নিজস্ব অভ্যাস আছে, নিজস্ব দর্শন আছে এবং সেই সবকিছুর মধ্যকার একটি অন্তর্নিহিত সমন্বয় আছে।
ধৃতরাষ্ট্র প্রতীকীভাবে জিজ্ঞাসা অধিকারণ-এর প্রতিনিধি। ওঁর প্রশ্ন করার পূর্ণ অধিকার আছে, কারণ উনি সেই অনুসন্ধানী, যিনি নিজের জীবনটা একটাই প্রশ্ন করার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। একজন অন্ধ মানুষ যখন প্রশ্ন করেন, তখন সেটা বাইরের জগতের প্রভাবে গঠিত হয় না—সেই প্রশ্ন আসে অন্তর থেকে। এই প্রশ্ন কোনও অস্তিত্ব-সঙ্কট নয়, বরং গভীর আত্মজিজ্ঞাসার ফল।
তাঁর প্রশ্ন—“মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়?”—এটা শুধু যুদ্ধ নিয়ে নয়, এটা তাঁর নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব নিয়ে। “আমার” আর “অপর” এই দুই সত্তার টানাপোড়েনই হলো তাঁর যন্ত্রণার মূল। সেই দ্বৈততা থেকেই আসল যুদ্ধ শুরু হয়।
অর্জুন হচ্ছেন অভ্যাস অধিকারণ-এর রূপ। তিনি প্রশ্ন করছেন না—তিনি সেই প্রশ্নেরই সাধক। তাঁর বিষাদ, তাঁর মানসিক দ্বিধা—সবই হলো সেই প্রশ্নের উপর ক্রমাগত চর্চা করার ফল। তিনি অন্ধভাবে নিজেকে প্রশ্নে নিযুক্ত রাখেন, যেন আলো খুঁজছেন, যেন একদিন সেই প্রশ্ন নিজেই তাঁকে উত্তর দেবে।
দর্শন অধিকারণ-এর চরিত্র হলেন সঞ্জয়। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একসঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র, অর্জুন আর কৃষ্ণ—এই তিনটি স্তর দেখতে পান। সঞ্জয় দেখতে পান প্রশ্নটিকে, প্রশ্ন অনুশীলনের প্রক্রিয়াকে, আর সেই অনুশীলন থেকে তৈরি হওয়া সমন্বয়কেও। সঞ্জয়ের এই দর্শনই মানবজীবনের আসল প্রাপ্তি, যা মানব সমাজকে স্থিতধী করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
কৃষ্ণ হচ্ছেন সমন্বয় অধিকারণ । ‘অধিকারণ’ মানে যেখানে সব প্রশ্ন বিশ্রাম পায়, সেই চূড়ান্ত আশ্রয়। কৃষ্ণ সেই জায়গা, যেখানে প্রশ্ন, অভ্যাস, দর্শন—সব মিলেমিশে এক হয়ে যায়। রাজর্ষি কৃষ্ণ সমন্বয় বুদ্ধিতে বলেন, “দেখ, হে অর্জুন, আমার রূপ শত শত, তারপর সহস্র সহস্র” (১১.৫ গীতা), যেমন রাজর্ষি জনক এবং ভগবান বামদেব উপনিষদে বলেছেন । যে জ্ঞান এবং অজ্ঞতা উভয়ই জানে, সেই সমন্বয়ই জানে। সে অজ্ঞতার দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করে জ্ঞানের অমৃত উপভোগ করে (ঈশাবাস্যোপনিষৎ-১১) । সমন্বয় দেখার মধ্যে কোন ভ্রম বা দুঃখ নেই (ঈশাবাস্যোপনিষৎ-৭) ।
এই চারটি অধিকারণ—জিজ্ঞাসা, অভ্যাস, দর্শন ও সমন্বয়—এই চারটি স্তম্ভ মিলে যুদ্ধগীতাকে একটি পূর্ণ দার্শনিক পথনির্দেশ করে তোলে। ব্রহ্মর্ষিণী বাদরী পুত্র বদরায়ণ তার বদরিকা আশ্রমে থাকাকালীন ব্রহ্মসূত্রে ‘ব্রহ্ম’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সময় জিজ্ঞাসাটি নীচের মতো প্রসারিত করেছিলেন:
১. অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা (ব্রসূ–১.১.১)
২. জন্মাদ্যাস্য যতঃ (ব্রসূ–১.১.২)
৩. শাস্ত্রযোনিত্বাত্ (ব্রসূ–১.১.৩)
৪. তৎ তু সমন্বয়াত্ (ব্রসূ–১.১.৪)
শাস্ত্রে শ্রুতিবাক্যসমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা হয়, আর জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি হয় সমন্বয়ের কারণে ।
সমন্বয়ই নারায়ণ, কারণ সমস্ত শাস্ত্রের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব ও অর্থ তার মধ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়; এই সমন্বয়তত্ত্বই বেদান্তের মর্মস্থল, যা “তৎ তু সমন্বয়াত্” সূত্রে প্রকাশ পায়। এই নারায়ণতত্ত্বকে দর্শন করেছিলেন ব্রহ্মর্ষিণী বাদরী, যাঁর যোগতপস্যার আলোকে নারায়ণ আত্মবোধ হয়েছিলেন একটি সর্বময় ঐক্যের রূপে। ব্রহ্মর্ষিণী বাদরীর এই অন্তর্জ্ঞানের পথেই প্রবেশ করেন বাদরায়ণ, যিনি সেই সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক রূপে ব্রহ্মসূত্র রচনা করেন। বদরীকাশ্রম, যাকে আজ বদ্রীনাথ নামে জানি, সেই ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতার তীর্থস্থান — যেখানে শাস্ত্র, যোগ, তপস্যা, জ্ঞান ও ভক্তি একত্র হয়ে নারায়ণের একত্বে সমাপতিত হয়েছে। এই বদরীক্ষেত্রই সেই স্থান, যেখানে বাদরায়ণ নারায়ণতত্ত্বে প্রবিষ্ট হন।
