সাঁওতালি বা সান্তালি ভাষা

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

সাঁওতালি পার্সি

সাঁওতালি বা সান্তালি ভাষা ভারতের প্রাচীন ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। এর মূল শাখা মুন্ডা ভাষা। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মুখ্য ভাষা হিসেবে এটি মূলত ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বিহার, অসম এবং বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে প্রচলিত।

সাঁওতালি ভাষার ব্যাকরণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি একটি ঋজু ধ্বনিসমৃদ্ধ ভাষা যেখানে ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাঁওতালি ভাষায় মোটামুটি ছয় ধরনের স্বরবর্ণ এবং অনেকগুলি ব্যঞ্জনবর্ণ ব্যবহৃত হয়। বিশেষ লক্ষণ হলো এর ক্রিয়া-পদগুলিতে প্রযোজ্য বিশেষ প্রত্যয়। সাঁওতালি ভাষায় লিঙ্গ, সংখ্যা এবং পুরুষ নির্ধারণের জন্য বিশেষ ধাতুগত পরিবর্তন ঘটে। সাঁওতাল ভাষায় ‘ইনক্লুসিভ’ এবং ‘এক্সক্লুসিভ’ বিভক্তি দেখা যায়, যা আর্য ভাষায় নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—‘আমরা’ বলতে দুই রকম শব্দ হয়, একটি শ্রোতা সহ এবং একটি শ্রোতা বাদ দিয়ে। বিশেষ্যপদের সাথে নির্দেশক এবং সম্বন্ধসূচক প্রত্যয় যোগ হয়, যেমন: ‘hor’ অর্থে মানুষ, ‘hor-ko’ অর্থে সেই মানুষকে ইত্যাদি।

লিখিত সাঁওতালি ভাষার ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও, মৌখিক সাহিত্য প্রাচীন। সাঁওতালি ভাষায় ‘কাল্পনিক’ আদর্শ লিপি হিসেবে অলচিকি (Ol Chiki) ব্যবহৃত হয়, যা ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুর্মু দ্বারা প্রবর্তিত। অলচিকির আগে সাঁওতালি বিভিন্ন রোমান, বাংলা, ওড়িয়া বা দেবনাগরী লিপিতে লিখিত হতো, কিন্তু তা ছিল অস্থায়ী ও অপরিচিত কাঠামো। অলচিকি লিপির মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষা স্বতন্ত্র রূপ পায়।

সাঁওতালি মৌখিকভাবে অনেক পুরনো গান, বিশেষত বীরকাহিনী ও ধর্মগান সাঁওতালি ভাষায় প্রচলিত ছিল, যেগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি। অলচিকি লিপির প্রচলনের আগে সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব লিপি ছিল না, ফলে প্রাচীনতম লেখনী মূলত রূপান্তরকৃত লিপিতে সংরক্ষিত হয়েছে।

সাঁওতালি ও মুন্ডারি ভাষা সম্পর্কে প্রচলিত একটি ধারণা হলো সাঁওতালি ভাষা মুন্ডারি ভাষা থেকে বিকশিত (১৩০০ খ্রিস্টাব্দ)। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, সাঁওতালি এবং মুন্ডারি উভয় ভাষার উৎপত্তি (৫০০ খ্রিস্টাব্দ) এক আদিম ভাষা থেকে, যা ঐতিহাসিকভাবে “কোল ভাষা” নামে পরিচিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নথিতে কোল শব্দটি বিভিন্ন মুন্ডা জাতিগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি মূলত একটি আদি ভাষার নির্দেশক। সাঁওতালি এবং মুন্ডারি ভাষার শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ এবং ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দুটির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের উৎস অভিন্ন। সাঁওতালি মুন্ডারি থেকে পৃথক হয়ে নয়, বরং উভয়ই কোল ভাষার দুটি শাখা হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

বাংলা ভাষার সঙ্গে কোল ভাষার একটি ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। বিশেষত, বাংলা ভাষায় যে সব শব্দ প্রকৃতি, কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত, তার অনেকগুলোর মূল উৎস মুন্ডা বা কোল ভাষা। এই শব্দগুলিকে ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় “Munda substratum” বলা হয়।

সাঁওতালি এবং সংস্কৃত উভয় ভাষায় ধ্বনিগত দিক থেকে কিছু সাধারণতা রয়েছে, যেমন স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ উচ্চারণে স্পষ্টতা এবং নির্দিষ্ট ধ্বনি বিন্যাস। তবে ব্যাকরণগত দিক থেকে সংস্কৃতে যেখানে বিভক্তি, লিঙ্গ, কারক, কাল, সংখ্যা প্রভৃতি জটিল নিয়ম আছে, সাঁওতালি ভাষায় সেগুলি অপেক্ষাকৃত সহজ এবং ভিন্ন কাঠামোর।

১. মরাং বুরু — প্রধান দেবতা / সৃষ্টিকর্তা
২. জাহের আয়ো — বন দেবী
৩. থান — পূজার স্থান
৪. বৌঙা — আগুন (পবিত্র আগুন, যজ্ঞে ব্যবহৃত)
৫. হাড়ে — উৎসব / ধর্মীয় অনুষ্ঠান
৬. সোরেন — দেবতার নাম (যোদ্ধা দেবতা হিসেবে)
৭. দারু হোর — পুরোহিত / ধর্মগুরু
৮. বী — জল (পবিত্রতা প্রতীক)
৯. বুরো বুড়ী — পূর্বপুরুষ ও পূর্বমাতৃক আত্মা
১০. গীত — ভক্তিমূলক গান
১১. সেকো — পবিত্র বা ভালো
১২. পুজা — পূজা (অনেক সময় বাংলা শব্দটিই গ্রহণ করা হয়)
১৩. সিলোর — আত্মা বা প্রাণ
১৪. উল — উপবাস বা নিয়ম পালন
১৫. সিদু — চালের মদ (ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী উৎসবে ব্যবহৃত)
১৬. হুডি — জল (শুদ্ধিকরণে ব্যবহৃত)
১৭. সোনা দারু — সোনালি গাছ (পবিত্র বৃক্ষ)
১৮. জুম পেন — ভূমি দেবতা

সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব সাহিত্যভাণ্ডার বিশেষভাবে গড়ে উঠেছে বিংশ শতাব্দীতে অলচিকি লিপির আবির্ভাবের পর। এর ফলে সাঁওতালি ভাষা কেবল মুখের ভাষা নয়, লিখিত ও সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে এক স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করে।

ভারত সংবিধান: প্রস্তাবনা (সাঁওতালি ভাষায়, বাংলা লিপি)

আঁর ভারত লাকা, সিধা মন কনা, হেত কানায়:

ভারত হপ সুভেরেন সোশেলিস্ট সেকুলার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কনা, আঁর লাকা হেত হেন কানায়:

ন্যায় হপ — সমাজিক, আর্থিক, রাজনিতিক;
মুক্তি হপ — ভাবনা, কথা, বিশ্বাস, ধার্মিকতা, পুজা;
সমতা হপ — মর্যাদা আর সুযোগ;
ভাতৃত্ব হপ — সবার মাজে, লাকা জন মর্যাদা, জাতি একতা, জাতি অখণ্ডতা রাখায়।

আঁর নিধির সভা, উনিশ শ উনচল্লিশ বরস, নভেম্বর মাস, ছাই থিক দিন মারে, আঁর হপ এই সংবিধান গুদু, আইন কনা, আঁর আঁর হেত গানা।

বাহা পারব সাঁওতালি উৎসবগান

বাহা বাহা হেত্‌ এলেম,
জাহের থান সেজে গেলেম।
মরাং বুরু ডাকে রে ভাই,
পেন হোরে ফুল দেউ চাই।

সাল পাতায় গাই গান,
সিদু সোনা রাখে মান।
ধান গুদু, হুডি বী,
বাহা পেন খুশি থিক হী।

কুরুকু বন বাজে ঢোল,
লাকা হপ নাচে গোল গোল।
হায় বাহা, হায় বাহা,
আঁর মন থিক সেকো ছা।

একটা হোর (শিয়াল) উক্ উম (উচ্চ) আঙ্গুর দেখলা। উক্ উম আঙ্গুর লহুৎ, তেনা হোর উল হাপ্ করলা, লাফ্ লাফ্। কিন্ত্ত হোর হাপ্ নাপারলা, আঙ্গুর নাপেলকা। শেষে হোর বললা—
“ইতা আঙ্গুর টক্! আংর চাই নাকর।”
হোর ওনা ফেরা গেল।


সাঁওতালির উদাহরণ

বিশ্লেষণ: সাঁওতালি ভাষায় রচিত রামায়ণের এই অংশটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে এটি মূলত একটি ভাষিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে যেখানে স্থানীয় মুণ্ডা ভাষার কাঠামোর মধ্যে প্রাকৃত ও সংস্কৃত শব্দের সুষম মিশ্রণ (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ঘটেছে। ভাষাটির শব্দভাণ্ডারে প্রাকৃতের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেমন ‘ধরম’ শব্দটি সরাসরি প্রাকৃত ‘ধম্ম’ থেকে এসেছে, যা সংস্কৃত ‘ধর্ম’-এর প্রাকৃত রূপ। একইভাবে ‘নেয়াও’ শব্দটি প্রাকৃত ‘ণিআও’ (সংস্কৃত ‘ন্যায়’) থেকে গৃহীত হয়েছে। ক্রিয়া পদের ক্ষেত্রে ‘আকানা’ (হয়েছিল) প্রাকৃত ‘অক্কই’ বা ‘অক্কন্তি’র সাথে সম্পর্কিত বলে মনে হয়।

বাক্য গঠনের দিক থেকে সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব কাঠামো বজায় থাকলেও এখানে প্রাকৃতের প্রভাব লক্ষ্য করা করা যায়। বিশেষত বিশেষ্য-বিশেষণের সম্পর্ক বোঝাতে ‘রেনাঃ’ (এর) এর ব্যবহার প্রাকৃত ‘রস্স’ (সংস্কৃত ‘রস্য’) এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে মজার বিষয় হলো, সাঁওতালি ভাষায় বিভক্তির পরিবর্তে পোস্টপজিশনের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। যেমন ‘ভারত সাহিত্য রেনাঃ’ বাক্যাংশে ‘রেনাঃ’ একটি পোস্টপজিশন হিসেবে কাজ করছে।

প্রাকৃত ভাষার সাথে সাদৃশ্য:

  • ধ্বনি পরিবর্তন:
    • সংস্কৃত “গ্রন্থ” → প্রাকৃত “গন্থ” → সাঁওতালি “পুথি”
    • সংস্কৃত “কথা” → প্রাকৃত “কহ” → সাঁওতালি “কৗহনি”
  • শব্দভাণ্ডার:
    • “বনবাস” (সংস্কৃত/প্রাকৃত) → সাঁওতালিতে অপরিবর্তিত।
    • “অবতার” (সংস্কৃত) → সাঁওতালিতে ঋণকৃত শব্দ।

ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আমরা দেখি সাঁওতালি ভাষায় সংস্কৃত/প্রাকৃত শব্দের সরলীকরণ ঘটেছে (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। ‘মহাকাব্য’ শব্দটি অপরিবর্তিত থাকলেও ‘পুথি’ (গ্রন্থ) শব্দটি প্রাকৃত ‘গন্থ’ থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ‘কৗহনি’ (কাহিনী) শব্দটি প্রাকৃত ‘কহণ’ বা ‘কথন’-এর সাথে সম্পর্কিত। এই সমস্ত ভাষিক প্রক্রিয়াই নির্দেশ করে যে সাঁওতালি ভাষায় রামায়ণের এই বিবরণটি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন ভাষিক আদান-প্রদানের ফল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমরা জানি যে প্রাকৃত ভাষাগুলি ছিল জনপ্রিয় মাধ্যম, আর সংস্কৃত ছিল পণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষা। সাঁওতালি ভাষায় রামায়ণের এই বিবরণে দেখা যায় যে ধর্মীয় ও দার্শনিক পরিভাষাগুলি (যেমন ‘অবতার’, ‘ধরম’) সংস্কৃত/প্রাকৃত থেকে সরাসরি গৃহীত হয়েছে, কিন্তু দৈনন্দিন শব্দগুলো স্থানীয় মুণ্ডা ভাষার।

Read More

Santhal Santhali and Ol Chiki


Leave a Reply