“শুন বিবি আমি প্রাচীন হইলাম অনেক দেখিয়াছি তাহাতেই বৃদ্ধ বয়সেও এমত চমৎকার বাহার দেখাইতে পারি যে কেহ বয়স
ঠাওরাইতে না পারিয়া অবাক হইয়া থাকে এ কেবল পোষাকের গুণেতেই হয় অতএব সেই গুণ শিক্ষা করা তোমার কর্তব্য, পশ্চাতেও কাজে আসিবেক, বিশেষতঃ এক্ষণে সেগুণ তোমার নবযৌবনে সোনার উপর নগিনার কাজ হইবেক। দেখ কলিকাতার রাঁড় মহলে হিন্দু বিবিরা মুছলমানীর চলন বলন সকল ধরিয়াছে, তাহারা আপন২ পসন্দ মত চুল কাটিয়া জুল্পী বাহির করেন এবং মেশী দাঁতে দিয়া দোফের করিয়া কাপড় পরিয়া পাছার বাহার দেখান এবং আপন২ পসন্দ মত পোষাক বিবিধ প্রকার প্রস্তুত করে, যথা পাজামা, আঙ্গিয়া, কুতি, দোপাট্টা, আস্তিন, জালি, কুরতি জালি, কাটোয়া জালি,
এবং আন্নিদার জোড়া ইত্যাদি। তদ্ভিন্ন রং সাফ হইবার জন্য সাবান ও বটান মাখিয়া টিপ টাপ করিয়া ফিটফাট মারিয়া ছাতের উপরে ডিল ডৌল দেখাইয়া বেড়ান। প্রতিবাসিনী কেহ অন্য ছাত হইতে বিবিকে দেখিয়া কোন কথা কহিলে চোটপাট দেন (ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৮৩০খ্রিস্টাব্দ)।
বাঙ্গালির বাহুবল নাই, ইহা সত্য কথা। কখন হইবে কি না, এ কথার মীমাংসা প্রবন্ধান্তরে করা গিয়াছে। থাক্ বা না থাক্, ইহা জানা আছে যে, মৌর্য্যবংশীয় ও গুপ্তবংশীয় সম্রাটেরা হিমাচল হইতে নর্ম্মদা পর্য্যন্ত একচ্ছত্রে শাসিত করিয়াছিলেন; জানা আছে, দিগ্বিজয়ী গ্রীক জাতি শতদ্রু অতিক্রম করিতে সক্ষম হয় নাই; জানা আছে, সেই বীরেরা আসিয়ার মধ্যে ভারতবাসীরই বীরত্বের প্রশংসা করিয়াছিলেন; জানা আছে যে তাহারা চন্দ্রগুপ্ত দ্বারা ভারতভূমি হইতে উন্মুলিত হইয়াছিলেন; জানা আছে, হর্ষবর্দ্ধনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ বহুশত করপ্রদ রাজা অনুসরণ করিতেন; জানা আছে, দিগ্বিজয়ী আরবেরা তিন শত বৎসরে পশ্চিমভারতবর্ষ অধিকার করিতে পারে নাই। এইরূপ আরও অনেক কথা জানা গিয়াছে। পশ্চিমভারতবর্ষীয় দিগের বীর্য্যবত্তার অনেক চিহ্ন অদ্যাপি ভারতভূমে আছে। (বঙ্গদর্শন, ১৮৭২ খ্রী বঙ্কিমচন্দ্র)
“বাঙ্গালার লিখিত এবং কথিত ভাষায় যতটা প্রভেদ দেখা যায়, অন্যত্র তত নহে। বলিতে গেলে, কিছু কাল পূর্ব্বে দুইটি পৃথক্ ভাষা বাঙ্গালায় প্রচলিত ছিল। একটির নাম সাধুভাষা; অপরটির নাম অপর ভাষা। একটি লিখিবার ভাষা, দ্বিতীয়টি কহিবার ভাষা। পুস্তকে প্রথম ভাষাটি ভিন্ন, দ্বিতীয়টির কোন চিহ্ন পাওয়া যাইত না। সাধুভাষায় অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দসকল বাঙ্গালা ক্রিয়াপদের আদিম রূপের সঙ্গে সংযুক্ত হইত। যে শব্দ আভাঙ্গা সংস্কৃত নহে, সাধুভাষায় প্রবেশ করিবার তাহার কোন অধিকার ছিল না। লোকে বুঝুক বা না বুঝুক, আভাঙ্গা সংস্কৃত চাহি। অপর ভাষা সে দিকে না গিয়া, যাহা সকলের বোধগম্য, তাহাই ব্যবহার করে। গদ্য গ্রন্থাদিতে সাধুভাষা ভিন্ন আর কিছু ব্যবহার হইত না। তখন পুস্তক প্রণয়ন সংস্কৃত ব্যবসায়ীদিগের হাতে ছিল। অন্যের বোধ ছিল যে, যে সংস্কৃত না জানে, বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণয়নে তাহার কোন অধিকার নাই, সে বাঙ্গালা লিখিতে পারেই না। যাঁহারা ইংরেজিতে পণ্ডিত, তাঁহারা বাঙ্গালা লিখিতে পড়িতে না জানা গৌরবের মধ্যে গণ্য করিতেন। সুতরাং বাঙ্গালায় রচনা ফোঁটা-কাটা অনুস্বারবাদীদিগের একচেটিয়া মহল ছিল। সংস্কৃতেই তাঁহাদিগের গৌরব। তাঁহারা ভাবিতেন, সংস্কৃতেই তবে বুঝি বাঙ্গালা ভাষার গৌরব; যেমন গ্রাম্য বাঙ্গালী স্ত্রীলোক মনে করে যে, শোভা বাড়ুক না বাড়ুক, ওজনে ভারি সোনা অঙ্গে পরিলেই অলঙ্কার পরার গৌরব হইল, এই গ্রন্থকর্ত্তারা তেমনি জানিতেন, ভাষা সুন্দর হউক বা না হউক, দুর্ব্বোধ্য সংস্কৃত বাহুল্য থাকিলেই রচনার গৌরব হইল। এইরূপ সংস্কৃতপ্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্ব্বল, এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল। টেকচাঁদ ঠাকুর প্রথমে এই বিষবৃক্ষের মূলে কুঠারাঘাত করিলেন। তিনি ইংরেজিতে সুশিক্ষিত। ইংরেজিতে প্রচলিত ভাষার মহিমা দেখিয়াছিলেন এবং বুঝিয়াছিলেন। তিনি ভাবিলেন, বাঙ্গালার প্রচলিত ভাষাতেই বা কেন গদ্যগ্রন্থ রচিত হইবে না? যে ভাষায় সকলে কথোপকথন করে, তিনি সেই ভাষায় “আলালের ঘরের দুলাল” প্রণয়ন করিলেন। সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি। সেই দিন হইতে শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল। সেই দিন হইতে সাধুভাষা, এবং অপর ভাষা, দুই প্রকার ভাষাতেই বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণয়ন হইতে লাগিল”…….”সেই দিন হইতে সাধুভাষা, এবং অপর ভাষা, দুই প্রকার ভাষাতেই বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণয়ন হইতে লাগিল, ইহা দেখিয়া সংস্কৃতব্যবসায়ীরা জ্বালাতন হইয়া উঠিলেন; অপর ভাষা, তাঁহাদিগের বড় ঘৃণ্য। মদ্য, মুরগী, এবং টেকচাঁদি বাঙ্গালা এককালে প্রচলিত হইয়া ভট্টাচার্য্যগোষ্ঠীকে আকুল করিয়া তুলিল”। (বঙ্গদর্শন, 1879 খ্রী বঙ্কিমচন্দ্র)
“১৬৩৫ খৃষ্টাব্দে ইষ্টার পর্ব্বোপলক্ষে পারিস নগরের এক ধর্ম্মমন্দিরে বহুলোকের সমাগম হইয়াছিল, তন্মধ্যে অনুমান দ্বাদশ ত্রয়োদশ বৎসরের একটী বালিকা কোথা হইতে আসিয়াছে দৃষ্ট হইল। তাহার রূপ অতি সুন্দর, আবার মুখশ্রী এমনি শান্ত ও প্রফুল্ল, যে তাহাকে দেখিয়া না ভাল বাসিয়া থাকা যায় না। কন্যাটীর বেশ দীন হীনের ন্যায়, শতছিন্ন বস্ত্রে শরীর আচ্ছাদন হওয়া ভার, তথাপি তাহার স্বাভাবিক এমনি লজ্জা ও শীলতা, যে সেই ছিন্নবস্ত্রে যত্ন পূর্ব্বক দেহখানি আবৃত করিয়া উপাসনায় মগ্ন রহিয়াছে। উপাসনা শেষ হইয়া গেলেও বালিকা মন্দির পরিত্যাগ করিল না। ইতিমধ্যে তাহার ন্যায় মলিনবেশধারিণী তদপেক্ষা কিঞ্চিৎ অধিকবয়ঙ্কা আর একটা বালিকা দ্বারদেশে উপস্থিত হইল। সে পদাঙ্গুলির উপর ভর দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে আস্তে আস্তে অগ্রসর হইতেছিল, বোধ হইল যেন পবিত্র স্থানে সাহস করিয়া অগ্রসর হইতে পারিতেছে। কিন্তু পূর্ব্বোক্ত বালিকাকে হঠাৎ দেখিবামাত্র সে তাহার নিকট দৌড়িয়া গেল এবং ব্যগ্রতা সহকারে তাহার স্কন্ধ ধারণ করিয়া বলিল, “আলিস্! তুমি এতক্ষণ ধরিয়া কি করিতেছিলে?” ( উমেশচন্দ্র দত্ত, বেদিয়া বালিকা, ১৮৮৪)
“অবশ্য একথা স্বীকার করিতেই হইবে বাংলা ভাষার যে একটি নিজত্ব আছে অন্য দেশবাসীর পক্ষে বাংলা ভাষা বুঝিবার সেইটেই প্রধান বাধা। অথচ বাংলা ভাষার যাহা কিছু শক্তি যাহা কিছু সৌন্দর্য্য সমস্তই তাহার সেই নিজত্ব লইয়া। আজ ভারতের পশ্চিমতম প্রান্তবাসী গুজরাটি বাংলা পড়িয়া বাংলা সাহিত্য নিজের ভাষায় অনুবাদ করিতেছে। ইহার কারণ এ নয় যে বাংলা ভাষাটা সংস্কৃতের কৃত্রিম ছাঁচে ঢালা সর্ব্বপ্রকার বিশেষত্ব বর্জ্জিত সহজ ভাষা। সাঁওতাল যদি বাঙালী পাঠকের কাছে তাহার লেখা চলিত হইবে আশা করিয়া নিজের ভাষা হইতে সমস্ত সাঁওতালিত্ব বর্জ্জন করে তবেই কি তাহার সাহিত্য আমাদের কাছে আদর পাইবে? কেবল ঐ বাধাটুকু দূর করার পথ চাহিয়াই কি আমাদের মিলন প্রতীক্ষা করিয়া বসিয়া আছে?” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরিচয়, হিন্দু-বিশ্ব-বিদ্যালয়,১৯১৬)
