ঋগ্বেদের ‘বায়বা যাহি দর্শতে’ সূক্তে কাব্যিক ও দার্শনিক ভাবনা (ঋগ্বেদ ১.২)

ঋগ্বেদের 'বায়বা যাহি দর্শতে' সূক্তে কাব্যিক ও দার্শনিক ভাবনা . Sahitya Samrat

বায়বা যাহি দর্শতে

শাস্ত্র (যজ্ঞমন্ত্রপাঠ) কি কেবল দেবতার স্মরণরূপ সংস্কারকর্ম, না কি এটি অদৃষ্টফলযুক্ত মূল কর্ম?

ঋগ্বেদ ১.২ (সুক্ত ২)-এর প্রথম নয়টি মন্ত্র মূলত দেবতা বায়ু, ইন্দ্র, মিত্র ও বরুণ-এর প্রতি প্রশস্তিগাথা এবং আহ্বান; যেখানে বিশ্বামিত্র কন্যা মধুছন্দা তাঁদের গুণাবলীর স্বীকৃতি দিয়ে যজ্ঞে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রার্থনা করেন। প্রথম তিনটি মন্ত্রে বায়ুকে আহ্বান করা হয়েছে—তিনি যেন সমুচ্চারিত সোমযজ্ঞে উপস্থিত হন, কারণ যজ্ঞীরা তাঁকে বারংবার আহ্বান করে; বায়ু সুগমা ধেনুর মত যজ্ঞে গমন করেন, যা যজ্ঞফল সমৃদ্ধ করে। চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্রে বায়ু ও ইন্দ্রকে যুগলরূপে আহ্বান করা হয়েছে, কারণ তারা একত্রে সোমপান করেন এবং ইন্দ্রবায়ু রূপে অতি প্রশংসিত। ষষ্ঠ মন্ত্রে যজ্ঞকারীরা বলেন, “সুন্বৎ” অর্থাৎ যাঁরা সোম দোহন করেন, তাঁদের গৃহে ইন্দ্র-বায়ু যেন যাত্রা করেন, যা দেবযজ্ঞের ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে। সপ্তম থেকে নবম মন্ত্রে মিত্র ও বরুণের প্রতি সম্বোধন করা হয়েছে—তাঁরা পূতদক্ষ, ঋতজ্ঞ, বৃহৎ ক্রতুসম্পন্ন এবং কবিস্বরূপ; তাঁরাই ঋতর ধারক, মানুষের মধ্যে প্রজ্ঞা ও শৃঙ্খলা স্থাপন করেন। তাঁদের সর্বজ্ঞতা এবং মহাগৃহে অধিষ্ঠান একটি ঈশ্বরীয় নৈতিক বিশ্ববিচারব্যবস্থার প্রতীক, যা মানুষের কর্মফল ও ধর্মবোধকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই মন্ত্রগুলি ঋগ্বৈদিক দেবতাদের ঋত, क्रतु (ক্রতু), दक्ष (দক্ষ) ও कवित्व (কবিত্ত) নামক গুণগুলিকে উদ্‌ঘাটন করে—যা বৈদিক ধর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি।


বায়বা যাহি দর্শতে-মে সোমা অরংকৃতাঃ ।
তেষাঁ পাহি শ্রুধী হবম্ ॥ ১।

বায় উক্তেক্ষভির্ জরন্তে ত্বামচ্ছা জরিতারঃ ।
সুতসোমা অহৰ্বিদঃ ॥২।

বায়ো তব প্রপৃঞ্চতী ধেনা জিগাতি দাশুষে ।
উরূচী সোমপীতয়ে ॥৩।

ইন্দ্রবায়ূ ইমে সুতা উপ প্রয়োভিরা গতম্ ।
ইন্দবোবামুশন্তি হি ॥ ৪।

বায়ৱিন্দ্রশ্চ চেতথঃ সুতানাং বাজিনীবসূ ।
তাবা যাতম্ উপ দ্রবত্ ॥ ৫।

বায়ৱিন্দ্রশ্চ সুন্বত আ যাতম্ উপ নিষ্কৃতম্ ।
মক্ষ্বিত্থা ধিয়া নরা ॥৬।

মিত্রং হুবে পুতদক্ষং বরুণং চ ঋশাদসম্ ।
ধিয়ং ঘৃতাচীং সাধন্তা ॥ ৭।

ঋতেন মিত্রাবরুণাবৃতাবৃধাবৃতস্পৃশা ।
ক্রতুং বৃহন্তমাশাথে ॥ ৮।

কবী নো মিত্রাবরুণা তুবিজাতা উরুক্ষয়া ।
দক্ষং দধাতে অপসম্ ॥৯।

ঋগ্বেদের কাব্যিক ও দার্শনিক ভাবনা

১। वायवा याहि दर्शते मे सोमा अरंकृताः ।
तेषां पाहि श्रुधी हवम् ॥
অনুবাদ: হে বায়ু! তুমি আসো, এই সজ্জিত সোম রসগুলি তোমার দর্শনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে।
তুমি তাদের রক্ষা করো এবং আমাদের আহ্বান শ্রবণ করো।

২। वाय उक्थेभिर्जरन्ते त्वामच्छा जरितारः ।
सुतसोमा अहर्विदः ॥
অনুবাদ: হে বায়ু! গায়করা স্তোত্র পাঠ করে তোমার দিকে আকৃষ্ট হয়।
তারা দিনে দিনে নিঃসৃত সোমরস নিয়ে তোমার বন্দনায় রত হয়।

৩। वायो तव प्रपृञ्चती धेना जिगाति दाशुषे ।
उरूची सोमपीतये ॥
অনুবাদ: হে বায়ু! তোমার প্রাচুর্যময় ধেনুরূপা সম্পদ ভক্তদের জন্য গমন করে,
বিশালতায় তা (দুধ) সোমপানের জন্য প্রবাহিত হয়।

৪। इन्द्रवायू इमे सुता उप प्रयोभिरा गतम् ।
इन्दवो वामुशन्ति हि ॥
অনুবাদ: হে ইন্দ্র ও বায়ু! এই নিঃসৃত সোমরসগুলি তোমাদের জন্য প্রস্তুত।
এই ইন্দ্র-বায়ু (সোমরস) তোমাদের আকাঙ্ক্ষা করে।

৫। वायविन्द्रश्च चेतथः सुतानां वाजिनीवसू ।
तावा यातमुप द्रवत् ॥
অনুবাদ: চৈতন্য দায়ক হে বায়ু ও ইন্দ্র! তোমরা শক্তি ও ঐশ্বর্যের ধারক।
তোমরা এখানে এসো, দ্রুত এগিয়ে এসো।

৬। वायविन्द्रश्च सुन्वत आ यातमुप निष्कृतम् ।
मक्ष्वित्था धिया नरा ॥
অনুবাদ: হে বায়ু ও ইন্দ্র! যিনি (সুধা) নিঃসরণ করছেন তাঁর কাছে, এই পবিত্র স্থানে এসে উপবিষ্ট হও।
তোমরা জ্ঞানী ও শক্তিমান, বুদ্ধিসহকারে আসো।

৭। मित्रं हुवे पूतदक्षं वरुणं च रिशादसम् ।
धियं घृताचीं साधन्ता ॥
অনুবাদ: আমি আহ্বান জানাই পবিত্র কর্মসম্পন্ন মিত্র ও নিষ্কলুষ বিচারক বরুণকে,
যারা সুস্নিগ্ধ প্রজ্ঞা দ্বারা আমাদের বুদ্ধিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।

৮। ऋतेन मित्रावरुणावृतावृधावृतस्पृशा ।
क्रतुं बृहन्तमाशाथे ॥
অনুবাদ: হে মিত্র ও বরুণ! তোমরা ঋতের (সত্যর) মাধ্যমে মহত্ব লাভ করেছ, এবং ঋত-স্পর্শী হয়ে
বিশাল কর্মের অধিকারী হয়েছ, সেই শক্তিকে (আমাদের জন্যে) আহরণ কর।

৯। कवी नो मित्रावरुणा तुविजाता उरुक्षया ।
दक्षं दधाते अपसम् ॥
অনুবাদ: হে মিত্র ও বরুণ! তোমরা রহস্যবিদ (জ্ঞানী), মহাশক্তিধর ও বৃহৎ বাসস্থানের অধিকারী।
তোমরা আমাদের জন্য নিপুণতা ও দূরদর্শিতা প্রদান করো।

মন্ত্রের ব্রাহ্মণ্য ব্যাখ্যা:

প্রথম মন্ত্রে (ঋগ্বেদ) বায়ু দেবতাকে আহ্বান করে রচিত। এটি একটি সোমযাগ বা সোমসুতি প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়, যেখানে যজ্ঞকারী সোমরস নিঃসরণ করে দেবতাকে আহ্বান করেন।

  • “वायवा याहि दर्शते मे सोमा अरंकृताः” — অর্থাৎ যজ্ঞকর্তা বলেন: “হে বায়ু, এই সোমরসগুলি তোমার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। তুমি এসো ও দর্শন দাও।”
    এটি द्रष्टव्य देवता দর্শনীয় বস্তু-র একটি ব্রাহ্মণ্য অর্থ বহন করে, অর্থাৎ দেবতা যেন দর্শনে আসেন, এটা কামনা করা হচ্ছে।
  • “तेषां पाहि श्रुधी हवम्” — তুমি সেই প্রস্তুত সোমরসদের রক্ষা করো এবং আমাদের যজ্ঞীয় আহ্বান শ্রবণ করো।
    এটি श्रवणीय ब्रह्म—যজ্ঞের মাধ্যমে মুখনিঃসৃত বাণীর মহিমা প্রতিপাদন করে।

এখানে পঞ্চমহাযজ্ঞ-এর একটি উপাদান অর্থাৎ “देवयज्ञ” প্রাধান্য পায়।

দ্বিতীয় মন্ত্রটি সোমযাগে বায়ু দেবতাকে আহ্বান করে গীত হয়। এখানে তিনটি মুখ্য উপাদান রয়েছে:

  1. উক্তি বা উক্থ — ঋষিদের স্তোত্রপাঠ, যা বায়ুকে আহ্বান করে।
    → এই স্তোত্রকে ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বলা হয় ब्राह्मणम् ब्रह्म — শব্দবেদ বা যজ্ঞবাক্য, যা দ্বারা দেবতা সঞ্চারিত হন।
  2. जरन्ते त्वामच्छा — অর্থাৎ, ঋষিগণ প্রেরণা সহকারে তোমার দিকে আকৃষ্ট হন।
    → এখানে “জর” ধাতুর ব্যবহার দেখে মনে হয় এটি দেবতাকে আনন্দ দান বা উৎসাহিত করার ক্রিয়া।
    → ব্রাহ্মণ্য দৃষ্টিতে, এটি হচ্ছে मनसा यज्ञक्रिया, মানসিকভাবে দেবতাকে আকর্ষণ করা।
  3. सुतसोमा अहर्विदः — তারা হলেন যারা সোম নিঃসরণ করে এবং দিনের কর্ম জানেন।
    → এখানে दिवाह यज्ञः বা দিবসকালে করা যজ্ঞের কথা বলা হয়েছে, যাকে বৈদিক ব্রাহ্মণ সাহিত্যে दिव्यकर्म বলা হয়।

দ্বিতীয় মন্ত্রটি মূলতঃ বায়ু দেবতাকে আহ্বান করে, যিনি সোমরসের প্রধান পানকারী বলে গৃহীত। বেদে বায়ুর জন্য সর্বপ্রথম সোম নিঃসৃত হয়, পরে ইন্দ্রের জন্য। এই মন্ত্রে স্তোত্রপাঠ, যজ্ঞকার্যের প্রাতঃকালে সম্পাদন এবং সোম নিঃসরণের মাধ্যমে দেবতাকে আহ্বান করার ব্রাহ্মণিক নিগূঢ়তাকে প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যাকরণ দৃষ্টিতে এটি বিশেষ্য, ধাতু ও যৌগিক পদবিন্যাসে ঋদ্ধ এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে এটি “শব্দব্রহ্ম” ও “সোমব্রহ্ম”-এর মিলন বিন্দু (শব্দরস)।

তৃতীয় মন্ত্রের গভীর আচারিক ও তত্ত্বীয় তাৎপর্য রয়েছে।

धेनाः — ধেনু (গাভী), ঋগ্বেদের “ধেনা” শব্দটি বহু অর্থে ব্যবহৃত। একদিকে এটি দুধ দানকারী গাভী বোঝায়, কিন্তু এখানে তা অন্ন ও সম্পদের ঐশ্বর্যপূর্ণ প্রবাহ বোঝাতে ব্যবহৃত। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে ধেনুকে বলা হয় “सर्वेषां कामधेनुः”, যা যজ্ঞের মাধ্যমে মনোবাঞ্ছা পূরণ করে।

प्रपृञ्चती — প্রাচুর্যপূর্ণতা, এটি সেই ধেনুর গুণ – “প্রসারিত”, “প্রচুর দানশীল”, অর্থাৎ দেবতাদের কাছ থেকে যা আসে, তা প্রাচুর্যপূর্ণ। এটি स्रवणीय स्तोत्र ও धनदायिनी ब्रह्मशक्ति-র প্রতীক।

जिगाति दाशुषे — যিনি যজ্ঞ করেন, তাঁর উদ্দেশে তা গমন করে, এখানে বলা হচ্ছে, এই সম্পদ (বা গাভীধর্মা ধারা) ভক্তের কাছে যেতে চায়। এটি यज्ञकर्मफल — যজ্ঞের ফলস্বরূপ ঈশ্বরীয় শক্তির আগমন।

उरूची सोमपीतये — সোমপানের উদ্দেশ্যে বিশাল পথ ধরে, এটি একটি অত্যন্ত ব্রাহ্মণ্য চিন্তা।

  • উরুচি = যজ্ঞের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া বিস্তীর্ণ দেবপথ।
  • সোমপান = পবিত্রতার মূল ও অমৃতানন্দের প্রতীক।
  • অর্থাৎ, এই ধেনু বা ঐশ্বর্যপূর্ণ প্রবাহটি দেবতাদের বিস্তীর্ণ পথে যাত্রা করে যজ্ঞকারীর হাতে সোমপানের জন্য পৌঁছে।

এই মন্ত্রে বায়ু দেবতাকে বোঝানো হয়েছে এক ধরণের ঐশ্বর্যপূর্ণ শক্তির আধার হিসেবে, যার প্রবাহ গাভীর মত, যিনি প্রচুর ধন ও সোম-রসের আকাঙ্ক্ষায় যজ্ঞকারীর উদ্দেশে ছুটে আসেন। এটি यज्ञफलनिष्पत्ति सूत्र — ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সেই মূল ভাব, যেখানে বলা হয় দেবতা তখনই প্রাপ্ত হন যখন শ্রদ্ধা, সোম, এবং প্রজ্ঞা দিয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন হয়।

চতুর্থ মন্ত্রে ইন্দ্র ও বায়ুকে যৌথভাবে আহ্বান করা হচ্ছে, যা ঋগ্বেদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

 इन्द्रवायू — যুগ্ম দেবতা:

  • ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে ইন্দ্র-বায়ু যুগ্মতা হল শক্তি ও প্রেরণার মেলবন্ধন।
  • ইন্দ্র হল बल, আর বায়ু হল प्राण (প্রানবল)। এই দুই শক্তি যজ্ঞকে সফল করে।

सुता इमे इन्दवः — প্রস্তুত সোমরস:

  • সোমরস প্রস্তুত হয়ে গেছে, এখন তারা আহ্বান করছে দেবতাদের।
  • ব্রাহ্মণ্য মতে, “इन्दवः” মানে দেবতাদের আহ্বানকারী প্রফুল্ল রস, যা ऋत्विज् দ্বারা নিঃসৃত হয়েছে।

उप प्रयोभिरा गतम् — যজ্ঞক্রিয়ার দ্বারা আহ্বান

  • “উপ গতম্” মানে একান্ত প্রার্থনায় “আসুন”। “প্রয়োভিঃ” নির্দেশ করে যজ্ঞীয় আচার, আহুতি, স্তোত্র, যা দেবতাকে টানে।
  • এটি श्रौत कर्म-এর অংশ — শাস্ত্রীয় যজ্ঞপদ্ধতি।

इन्दवः वामुशन्ति — সোমরস আকাঙ্ক্ষা করে

এখানে সোমরসও একটি देवतास्वरूप (সাধনার মাধ্যম ও ঈশ্বরের রূপ একত্র)। এটা ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যের personification বা রূপকভাষা — সোম যেন জীবন্ত সত্ত্বা হয়ে ইন্দ্র-বায়ুকে আহ্বান করছে।

এই মন্ত্রটি নির্দেশ করে কীভাবে প্রস্তুত সোমরস দেবতাদের আহ্বান করে। যজ্ঞপদ্ধতির প্রতিটি ধাপ —
সোম নিঃসরণ, দেবতার অভিমুখে আহ্বান, স্তোত্র ও প্রয়োগ (प्रयोभिः), সবকিছু মিলেই গঠিত হয় একটি पूर्ण ब्रह्मयज्ञ। “इन्द्रवायू इमे सुता” — সোমরস প্রস্তুত, আসুন ইন্দ্র ও বায়ু, কারণ এই (ভক্তি) রস আপনাদেরই কামনা করছে। এটি হল श्रद्धा-युक्त अन्वाहार्य यज्ञ, যেখানে रसेन देवता गृहीतः — রস (সোম) দিয়ে দেবতা আহ্বান করা হয়।

পঞ্চম মন্ত্রে সোমরস প্রস্তুত হয়ে গেছে — এখন ইন্দ্র ও বায়ুকে আহ্বান জানানো হচ্ছে, যেন তারা উৎসাহ ও দ্রুতি সহকারে উপস্থিত হন।

चेतथः सुतानां — তোমরা সোমরসের উপলব্ধি করো

  • ব্রাহ্মণ্য মতে, দেবতা “চিত্ত” দ্বারা সোমের গুণ উপলব্ধি করেন।
  • এটি मनसि संवेदन — ব্রাহ্মণ সাহিত্যে বলা হয়েছে, দেবতা মনেই (Mind) প্রথম যজ্ঞরস অনুভব করেন।

वाजिनीवसू — রথধারী ও ধনবান

  • ঋগ্বেদে ইন্দ্র ও বায়ুকে “রথে যাত্রাকারী” এবং “ধনবতী শক্তি” হিসেবে চিত্রিত করা হয়। “वाजिन्” = সামরিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির চিহ্ন, রথে চলমান প্রভু
  • “वसु” = ঐশ্বর্য, যা যজ্ঞের ফলে ভক্তকে প্রদান করা হয়।

 उप द्रवत् — দ্রুতপদে নিকটে এসো

  • ঋগ্বেদের এক বিশিষ্ট আহ্বানরীতি।
  • যজ্ঞকারীর আকুল প্রার্থনা — “দ্রুত এসো”, যা यज्ञीय भावना (ভাব) প্রকাশ করে।

तावा यातम् — তোমরা দুজনে এসো

  • ইন্দ্র ও বায়ু সর্বদা যুগ্ম আহ্বানে আসেন।
  • ইন্দ্র क्रियाशक्ति, বায়ু प्राणशक्ति — এই দুই শক্তি মিলেই (প্রাণক্রিয়া) যজ্ঞ সফল হয়।

এই মন্ত্রটি হল সহস্রस्पর্শী यज्ञबोधन — অর্থাৎ, যজ্ঞ যখন প্রস্তুত হয়, তখন দেবতাকে শুধু ডাকলেই হয় না, তাঁদের চিত্ত ও রথে আহ্বান করতে হয়। যজ্ঞ-দ্রব্য (সুতানাং), যজ্ঞ-প্রণালী (প্রয়োবিঃ), এবং আহ্বান — এই তিন মিলেই ব্রাহ্মণ্যপন্থী আহুতি সম্পূর্ণ হয়।

“वायविन्द्रश्च चेतथः सुतानां वाजिनीवसू” — হে বায়ু ও ইন্দ্র, তোমরা উপলব্ধি করো সোমরসের গুণ, কারণ তোমরাই রথধারী ও ধনসম্পদপ্রদায়ক। “तावा यातमुप द्रवत्” — তোমরা দুজনে দ্রুত এসো, আমাদের যজ্ঞস্থলে (চিত্তভূমি)।

ষষ্ঠ মন্ত্রে আবারও ইন্দ্র ও বায়ুকে যুগ্মভাবে আহ্বান করা হয়েছে, যজ্ঞের নিষ্কৃত (পূর্ণ প্রস্তুত) রসের জন্য।

 सुन्वत आ यातम् — সোম নিঃসরণকারীর দিকে এগিয়ে এসো

  • ব্রাহ্মণ্য মতে, सुन्वन् হল সেই ঋত্বিজ যিনি সোম নিঃসরণ করেন।
  • যেহেতু সোম একটি দেবতাত্মক তত্ত্ব, তাই “নিষ্কৃত” সোম অর্থ দেবতাগ্রহণে প্রস্তুত প্রমাণভূত রস

उप निष्कृतम् — প্রস্তুত কৃত্যর দিকে এগিয়ে এসো

  • এটি বিশুদ্ধ शास्त्रीय कर्मकाण्ड। নিষ্কৃতি মানে, যজ্ঞের পূর্ণ পদ্ধতিতে প্রস্তুত কর্ম বা রস।
  • ব্রাহ্মণ্য মতে, এই “নিষ্কৃতি” হল যখন সমস্ত संपद् (সম্পূর্ণতা) তৈরি হয়েছে।

मक्ष्वित्था धिया नरा — হে নর, তোমরা বুদ্ধিসহ এগিয়ে এসো

  • “মক্ষ্” মানে গমন, কিন্তু এটা শুধু পদগত নয়, मनसा गमनं বোঝায় — চিত্তসহ আগমন।
  • “धिया” মানে চিন্তা, মনন, উপলব্ধি। ইন্দ্র ও বায়ুকে বলা হচ্ছে: তুমি শুধু শরীর নয়, চিত্ত ও বুদ্ধির সঙ্গে আগমন করো।

এই মন্ত্রটি আহ্বান করছে এমন এক যজ্ঞ-পরিস্থিতিকে, যেখানে সব কিছু প্রস্তুত —
সোম নিঃসরণ হয়েছে, যজ্ঞীর মন স্থির, উপাচারও পূর্ণ। এখন দরকার কেবল দেবতার আগমন, তা যেন হয় চিত্তসম্ভারসহ।

“वायविन्द्रश्च सुन्वत आ यातमुप निष्कृतम्” — হে বায়ু ও ইন্দ্র, তোমরা সোম নিঃসরণকারী যজ্ঞকারীর নিকট এসো, কারণ প্রস্তুতি সম্পূর্ণ।
“मक्ष्वित्था धिया नरा” — হে দেবগণ, তোমরা চিত্ত ও প্রজ্ঞা সহকারে, দ্রুত এসে অধিষ্ঠান করো।

সপ্তম মন্ত্রে ঋত্বিজ মিত্র ও বরুণ — এই দুই ঋত-দেবতাকে আহ্বান করছেন। এখানে আহ্বান একান্তভাবে বুদ্ধির শুদ্ধতা ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে।

मित्रं… वरुणं च हुवे — মিত্র ও বরুণকে আহ্বান করছি

  • মিত্র — সখ্য, সামাজিক শৃঙ্খলা, চুক্তিবদ্ধতা এবং ন্যায় রক্ষা করেন। বরুণ — ঋত (সার্বজনীন ধর্ম/শৃঙ্খলা) বজায় রাখেন, গোপন পাপের বিধাতা।
  • ঋগ্বেদের বহু মন্ত্রে মিত্র ও বরুণ যুগ্মভাবে ঋতরক্ষার দেবতা হিসেবে সম্মানিত।

पूतदक्षं… रिशादसम् — যাঁরা পবিত্র, কার্যক্ষম ও পাপনাশী

  • “पूतदक्ष” — কর্ম করায় সক্ষম, কিন্তু সেই কর্ম পবিত্র ও ঋতময়। “ऋषादस” — বরুণ দেবতার গুরুত্বপূর্ণ গুণ, অন্তরস্থ পাপও যিনি দমন করেন।

 धियं घृताचीं साधन्ता — তাঁরা যেন আমাদের বুদ্ধিকে উজ্জ্বল ও শুভ করেন

  • “धियं” = চিন্তা, বিচার, মননের শক্তি
  • “घृताचीं” = ঘৃতের মতো মসৃণ, শুভ্র, উদাত্ত বুদ্ধি
  • “साधन्ता” — তাঁরা যেন প্রতিষ্ঠা করেন, বা সিদ্ধ করে দেন।

ব্রাহ্মণ্য মতে, যজ্ঞে শুধু বাহ্য কর্ম নয়, অন্তর্বেদনার বুদ্ধি ও মন ও শুদ্ধ থাকা আবশ্যক। এই শুদ্ধ “घृताची बुद्धि” হল যজ্ঞের প্রকৃত ফললাভের পূর্বশর্ত।

এই মন্ত্রে ঋত্বিজের আহ্বান দ্বি-প্রান্তিক:
১. মিত্র ও বরুণ যেন উপস্থিত হন,
২. তাঁরা যেন আমাদের অন্তরচিন্তা (ধি) কে শুদ্ধ ও স্থাপন করেন।

“मित्रं हुवे पूतदक्षं वरुणं च रिशादसम्” — আমি আহ্বান করছি সেই মিত্র ও বরুণকে, যাঁরা পবিত্র কর্মশক্তিসম্পন্ন ও পাপ নাশক।
“धियं घृताचीं साधन्ता” — তাঁরা যেন আমাদের মসৃণ, পবিত্র চিন্তাশক্তিকে স্থাপন করেন।

অষ্টম মন্ত্র, যেখানে “ঋত” তথা ঋগ্বেদের এক মৌলিক তত্ত্ব — সার্বজনীন ধর্ম ও শৃঙ্খলা — স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এই মন্ত্রে বলা হচ্ছে — মিত্র ও বরুণ ঋতের দ্বারা বর্ধিত, এবং ঋতের স্পর্শে তারা বৃহৎ কর্মশক্তি লাভ করেন। এখানে “ঋত” কেবল এক দর্শন নয়, বরং সার্বজনীন শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে দেবতাত্মার পূর্ণতা ও কর্মক্ষমতা লাভ বোঝানো হচ্ছে।

ऋतेन…अवृतावृधौ — ঋতের দ্বারা আচ্ছন্ন ও বর্ধিত

  • “ऋतेन” অর্থাৎ বিশ্বধর্ম, সত্য ও ধর্মময় নিয়মে তাঁরা আবৃত (নিয়ন্ত্রিত), এবং
  • “वृधौ” — তাঁরা এই ঋতশৃঙ্খলায় বৃদ্ধি পান, শক্তি লাভ করেন

ব্রাহ্মণ্য মতে, কোনো দেবতাও ঋতের বাইরে নয়। ঋত এমন এক ঋগ্বৈদিক ন্যায়তত্ত্ব, যা দেবতাকেও নিয়ন্ত্রিত রাখে।
এখানে বলা হচ্ছে, মিত্র ও বরুণের দেবত্ব বা প্রভাব আসছে ঋতের সান্নিধ্য থেকেই।

ऋतस्पृशा — ঋতের স্পর্শযুক্ত

  • ব্রাহ্মণ্য তত্ত্বে “স্পর্শ” মানে শুধু ছোঁয়া নয়, বরং অনুপ্রবেশ বা অধিকার।
  • এখানে বোঝানো হচ্ছে, মিত্র ও বরুণ ঋতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ তাদের প্রকৃতিই ঋতময়।

क्रतुं बृहन्तम् आशाथे — তাঁরা বৃহৎ কর্মশক্তি লাভ করেন

  • “क्रतु” মানে শুধু ইচ্ছা নয়, বরং সচেতন কর্মসংক্রান্ত সিদ্ধান্তশক্তি
  • “बृहन्तम्” — যা অশেষ, অর্থাৎ divine will বা cosmic intelligence
  • তারা এই বৃহৎ কর্ম বা ইচ্ছাশক্তি ঋতের মাধ্যমেই লাভ করেন।

এই বক্তব্য আচারসংহিতার মূলে:
কর্ম কখনো ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, বরং ঋত / ধর্ম / ন্যায়-এর উপর নির্ভর করে।

এই মন্ত্রে দেখা যাচ্ছে,

ঋত = দেবতাদের কার্যকারিতার মূল উপাদান।
মিত্র ও বরুণ = ঋতের সান্নিধ্যে বৃদ্ধি পায়, এবং বৃহৎ কর্মশক্তি লাভ করেন।

“ऋतेन मित्रावरुणावृतावृधावृतस्पृशा । क्रतुं बृहन्तमाशाथे ॥” হে মিত্র ও বরুণ (বরণীয় মিত্র), তোমরা ঋতের দ্বারা আচ্ছাদিত ও বর্ধিত, ঋতের স্পর্শযুক্ত; এবং তোমরা বৃহৎ কর্মশক্তি লাভ করো।

নবম মন্ত্র, যেখানে দেবতা মিত্র ও বরুণের ‌”কবিত্ব”, মহৎ গৃহ, এবং দক্ষতা সম্পর্কিত উপাসনা-ভাবনা প্রকাশ পায়। ঋত্বিজরা মিত্র ও বরুণকে “कवि” বলে সম্বোধন করছেন — মানে তারা শুধু দেবতা নন, সর্বজ্ঞ। তারা জ্ঞানের পরম আধার, দূরদর্শী ও ব্রহ্মজ্ঞ।

कवी…तुविजाता उरुक्षया — মিত্র ও বরুণ, দূরদর্শী ও বিশাল গৃহে অধিষ্ঠিত

  • “कवी” — তারা শুধু জ্ঞানী নয়, ঋতজ্ঞ। তারা কেবল ঋগ্বৈদিক বুদ্ধিতে দক্ষ নয়,
    তারা যজ্ঞের অন্তর্নিহিত সত্য জানেন।
  • “तुविजाता” — তাদের আত্মপ্রকাশ তীব্র ও শক্তিময়। শক্তিশালী দৈব শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
  • “उरुक्षया” — তারা এমন এক গৃহে অধিষ্ঠান করেন যা বিশ্বব্যাপী, অসীম। এটি দিব্য অধিবাস বা cosmic domain নির্দেশ করে।

ব্রাহ্মণ্য মতে, দেবতাদের গৃহ মানে আধ্যাত্মিক অধিবাস বা তত্ত্বগত ক্ষেত্র। মিত্র-বরুণ আছেন বিশ্বসত্যে প্রতিষ্ঠিত, ঋত-সংরক্ষণের কেন্দ্রে।

दक्षं दधाते अपसम् — তারা দূরের মধ্যেও কর্মশক্তি স্থাপন করেন

  • “दक्षं” = ঐশ্বরিক পরিকল্পনা বা কর্মক্ষমতা
  • “अपसम्” = দূরের দিকে — অর্থাৎ তারা এমন জায়গাতেও প্রভাব ফেলেন, যেখান থেকে তারা দৃষ্টিগোচর নন
  • “दधाते” = স্থাপন করেন, ধরে রাখেন
    → অর্থ: তাদের ঐশ্বরিক কর্মক্ষমতা সব জায়গায় পৌঁছে যায়

এটি ব্রাহ্মণ্য কল্পনায় সর্বব্যাপী দেবতাসত্তার ধারণা — যাঁরা অন্তর্মনেও কর্মক্ষমতা স্থাপন করেন। এই ভাবনার সঙ্গে “अन्तर्यामि ब्रह्म” ধারণা যুক্ত।

এই মন্ত্রে বলা হচ্ছে,

মিত্র ও বরুণ হচ্ছেন দূরদর্শী, শক্তিময়, অসীম গৃহে অধিষ্ঠিত দেবতা, যাঁরা সর্বত্র কর্মশক্তি ও দক্ষতা স্থাপন করেন — এমনকি যারা দূরে আছে, তাদের মধ্যেও।

“कवी नो मित्रावरुणा तुविजाता उरुक्षया । दक्षं दधाते अपसम् ॥” হে মিত্র ও বরুণ, তোমরা জ্ঞানী, মহাশক্তিধর ও বিস্তৃত গৃহে অধিষ্ঠিত; আমাদের জন্য তোমরা দক্ষতা স্থাপন করো, এমনকি দূরবর্তী ক্ষেত্রেও।

Read more: ঋগ্বেদের ‘অগ্নিমীঢ়ে’ সূক্ত ও তার বৈদিক প্রয়োগ

ऋग्वेदः – मण्डल १
सूक्तं १.२
मधुच्छन्दा वैश्वामित्रः

दे. १-३ वायुः, ४-६ इन्द्र-वायू, ७-९ मित्रा-वरुणौ। गायत्री

वायवा याहि दर्शतेमे सोमा अरंकृताः ।
तेषां पाहि श्रुधी हवम् ॥१॥
वाय उक्थेभिर्जरन्ते त्वामच्छा जरितारः ।
सुतसोमा अहर्विदः ॥२॥
वायो तव प्रपृञ्चती धेना जिगाति दाशुषे ।
उरूची सोमपीतये ॥३॥
इन्द्रवायू इमे सुता उप प्रयोभिरा गतम् ।
इन्दवो वामुशन्ति हि ॥४॥
वायविन्द्रश्च चेतथः सुतानां वाजिनीवसू ।
तावा यातमुप द्रवत् ॥५॥
वायविन्द्रश्च सुन्वत आ यातमुप निष्कृतम् ।
मक्ष्वित्था धिया नरा ॥६॥
मित्रं हुवे पूतदक्षं वरुणं च रिशादसम् ।
धियं घृताचीं साधन्ता ॥७॥
ऋतेन मित्रावरुणावृतावृधावृतस्पृशा ।
क्रतुं बृहन्तमाशाथे ॥८॥
कवी नो मित्रावरुणा तुविजाता उरुक्षया ।
दक्षं दधाते अपसम् ॥९॥

Date: 8th April 2025


Rigveda, Shastra, Indra, Varuna, Maitra, Madhuchhanda, Rita


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল