কোলকাতার সম্ভ্রান্ত পরিবার (১৭৬০–১৮৬০)

Kolkata

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি (১৭৬৫) পাওয়ার পর বাঙালি সম্ভ্রান্ত সমাজের (১৭৬০–১৮৬০) এক নতুন রূপ তৈরি হয়। এই সমাজের ভিত দাঁড়িয়েছিল দেওয়ানি চাকরি আর ইংরেজি শিক্ষার উপর। ইংরেজি ভাষা তখন বিদেশি শাসকের মাতৃভাষা, তাই সামান্য ইংরেজি জানলেই বেনিয়ানি করা যায়, সাহেবদের দপ্তরে চাকরি পাওয়া যায়, ফলে অর্থোপার্জনের সুযোগও বেড়ে যায়। কলকাতার ফিরিঙ্গি স্কুলগুলোতে তখন ইংরেজি পড়ানো শুরু হয়—শেরবোর্নের স্কুল, অ্যারাটুন পিক্রুসের স্কুল, ড্রামন্ড সাহেবের স্কুল—এইগুলো প্রথম দিককার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিছু মিশনারি পাদরিও পড়ানো শুরু করেছিলেন।কোলকাতা

তবে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইংরেজরা নয়, বরং ধনী বাঙালি সম্ভ্রান্তরা। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় এডোয়ার্ড হাইড ঈস্ট (ফোর্ট উইলিয়াম সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ১৮১৩ থেকে ১৮২২) আর ঘড়িব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ারের ভূমিকা যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল বাঙালি সমাজের ধনী পরিবারের সহায়তা। প্রথম হিন্দু কলেজ গড়ে ওঠে চিৎপুরে, তন্তুবণিক সমাজের গোরাচাঁদ বসাকের বাড়িতে। কলেজের দেশীয় সম্পাদক হন বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়। ম্যানেজিং কমিটিতে ছিলেন গোপীমোহন দেব, জয়কৃষ্ণ সিংহ, রাধামাধব বন্দ্যোপাধ্যায়, গঙ্গানারায়ণ দাস ও হরিমোহন ঠাকুর। গভর্নর ছিলেন গোপীমোহন দেব আর বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র (১৭৭৯খৃঃ রাজ্যভার গ্রহণ করেন)। এঁরা সকলে ধনী ও সনাতনি হিন্দু সমাজের অগ্রগণ্য প্রতিনিধি। হিন্দু কলেজই পরে নব্যবঙ্গের পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

১৮৩৫ সালে ম্যাকলের প্রস্তাব উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক শিক্ষানীতি হিসেবে গ্রহণ করলে আর সরকারিভাবে ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে সিদ্ধান্ত হলে হিন্দু কলেজের বয়স তখন আঠারো। এরই মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বাঙালি যুবসমাজে নতুন চিন্তার ধারা তৈরি হচ্ছিল। এর আগে ১৮৩০ সালে প্রেসবাইটেরিয়ান আলেকজান্ডার ডাফ কলকাতায় এসে শিক্ষা উন্নত করার চেয়ে বেশি আশান্বিত ছিলেন এই ভেবে যে তরুণ শিক্ষিতদের খ্রিস্টধর্মে আকৃষ্ট করা সহজ হবে। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা লেকচার দিয়ে তখন শিক্ষিত সমাজে আলোড়ন তুলেছিলেন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, লালবিহারী দের মতো শিক্ষিত বাঙালিরা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। কিন্তু একই সঙ্গে হিন্দু সমাজের মধ্যে মানবতা, উদারতা আর সংস্কার আন্দোলনের চেতনা জেগে ওঠে, যা ধীরে ধীরে সনাতনধর্মের নবচেতণে পরিণত হয়।

এই সময়ে কলকাতার নানা সম্ভ্রান্ত পরিবার অর্থ, বিদ্যা আর সমাজে প্রতিপত্তি অর্জন করে। ঠাকুর পরিবার ছিল সবচেয়ে বিস্তৃত ও সমৃদ্ধিশালী। প্রধান শাখার আদিপুরুষ দর্পনারায়ণ ঠাকুর (১৭৩১-১৭৯৩) ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হুইলার সাহেবের দেওয়ানি করে প্রচুর ধন সঞ্চয় করেন। তাঁর বংশধর গোপীমোহন ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখ ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পদ বাড়ান। বিত্ত ও বিদ্যা উভয়ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতিপত্তি ছিল অতুলনীয়।

শোভাবাজারের রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব (১৭৩৩ – ১৭৯৭) ছিলেন ক্লাইভের দেওয়ান। গোপীমোহন দেব, রাধাকান্ত দেব প্রমুখ এই পরিবারের প্রতিনিধি ছিলেন বিদ্বৎসমাজে প্রভাবশালী।

পাথুরিয়াঘাটায় ঠাকুর পরিবারের পাশাপাশি আরও ধনী পরিবার বাস করত। ঘোষ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা রামলোচন ঘোষ ছিলেন হেস্টিংসের দেওয়ান সরকার। রাজা সুখময় রায়ের পূর্বপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত ক্লাইভ ও অন্য গভর্নরের দেওয়ান ছিলেন। সুখময় নিজে ফোর্ট উইলিয়ামের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার ইলাইজি ইম্পের (১৭৩২ – ১৮০৯) দেওয়ানি করে বিপুল ধনসম্পদ অর্জন করেন। বৈদ্যনাথ রায়, শিবচন্দ্র রায়, নরসিংহ রায় বিদ্বৎসমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। দেওয়ান বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরিবারও প্রতিপত্তিশালী ছিল। এছাড়া মল্লিক শেঠ ও বসাক পরিবারের অনেকে এখানে বাস করতেন।

হাটখোলার দত্ত পরিবারেও ধনসম্পদের প্রভাব ছিল। রামচন্দ্র দত্ত, জগৎরাম দত্ত প্রমুখ কোম্পানির দেওয়ানি ও বেনিয়ানি করেন। মদনমোহন দত্ত ছিলেন শিপওনার, ব্যবসায় প্রচুর ধন সঞ্চয় করেন। এই পরিবারের কলকাতার বিদ্বৎসমাজে যথেষ্ট প্রভাব ছিল।

কুমোরটুলির মিত্র পরিবারও একসময় প্রভাবশালী ছিল। প্রতিষ্ঠাতা গোবিন্দরাম সমাজে প্রায় শাসকের মতো প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। প্রচলিত ছিল—“গোবিন্দরামের ছড়ি, বনমালী সরকারের বাড়ি, অঁমিচাঁদের দাড়ি, জগৎশেঠের কড়ি।” তিনি পরিচিত ছিলেন Black Deputy ও Native Zamindar নামে। তাঁর বংশধর শম্ভুচন্দ্র মিত্র, কাশীশ্বর মিত্র প্রমুখ বিদ্বৎসমাজে সম্মানিত ছিলেন।

জোড়াসাঁকোর ঘোষ পরিবারে দেওয়ান অভয়চরণ ঘোষের পুত্র হরচন্দ্র ঘোষ বিশেষ খ্যাতি পান। তাঁর মতো উদ্যোগী পুরুষ তখন বিরল ছিলেন।

জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবার গড়ে তোলেন শান্তিরাম সিংহ, যিনি টমাস রামবোল্ডের দেওয়ানি করে ধনী হন। তাঁর দুই ছেলে প্রাণকৃষ্ণ ও জয়কৃষ্ণ সিংহ। তাঁদের বংশধর রাজকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণ আর কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন বিদ্বৎসমাজে অগ্রগণ্য।

পাইকপাড়ার সিংহ পরিবারে প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ হেস্টিংস আমলে কৌন্সিল ও বোর্ড অফ রেভিনিউয়ের দেওয়ান ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ (লালবাবু), প্রতাপচন্দ্র সিংহ, ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ প্রমুখ এই পরিবারের গৌরব।

সিমলার দে পরিবারও তৎকালীন সমাজে খ্যাতি পেয়েছিল। রামদুলাল দে ফেরারলি কোম্পানির দেওয়ান ছিলেন এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন করতেন। কলকাতার ধনকুবেরদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তাঁর ছেলে আশুতোষ দে ছিলেন রক্ষণশীল বিদ্বৎসমাজের প্রভাবশালী নেতা।

কলুটোলার শীল পরিবারের মতিলাল শীল ছিলেন খ্যাতনামা ব্যবসায়ী। শিক্ষা আর সমাজসংস্কারের কাজে তিনি প্রচুর দান করেছিলেন।

কলুটোলার সেন পরিবারে রামকমল সেন 1784 সালে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল ব্যাঙ্কের দেওয়ান ছিলেন। তাঁর বংশধর হরিমোহন সেন, কেশবচন্দ্র সেন, মাধবচন্দ্র সেন বাংলার বিদ্বৎসমাজে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।

রামবাগানের দত্ত পরিবার সরকারি চাকরির মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করে। রসময় দত্ত, গোবিন্দচন্দ্র দত্ত এবং তাঁদের বংশধর তরু দত্ত ও অরু দত্ত সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নাম করেন।

বহুবাজারের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা হিদারাম বন্দ্যোপাধ্যায় সাহেবদের বেনিয়ানি করে ধনসম্পদ অর্জন করেন। তাঁর বংশধর অভয়চরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাসাগরের অন্তরঙ্গ ছিলেন।

মলাঙ্গার দত্ত পরিবারের অক্রুর দত্ত বেনিয়ানি ও ব্যবসায়ে ধনী হন। তাঁর বংশধর রাজেন্দ্র দত্ত বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এই পরিবারের বধূ কবি গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী (১৮৫৮ – ১৯২৪) সাহিত্যক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেন।

অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার এই সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারগুলো ধনসম্পদ ও বিদ্যায় সমানতালে সাফল্য অর্জন করে। তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও বিদ্বজ্জনোচিত প্রতিপত্তির উপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে কলকাতার নতুন সমাজব্যবস্থা।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল