অত্যাধুনিক বাংলা সম্পাদকীয় (১০ এপ্রিল ২০২৫)

অত্যাধুনিক বাংলা সম্পাদকীয়

নীচে আমরা অত্যাধুনিক বা মেটামর্টার বাংলা (1993-2021) এর প্যাটার্ন প্রদর্শনের জন্য দুটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছি। আমরা পাঠ্যের সাহিত্যিক প্যাটার্ন সম্পর্কে মন্তব্য করব না বরং আমরা কেবল পাঠ্যগুলিকে উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করব। এমনকি আমরা মন্তব্য করব না যে তারা বাংলা ভাষার মেটা-মর্দানবাদের লক্ষণগুলি উপস্থাপন করে কিনা।

আশ্বাস ও বিশ্বাস

আশ্বাসের পাশাপাশি নির্দেশ, চাকরিহারা শিক্ষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে শিক্ষাদান করুন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে অতি স্বাভাবিক নির্দেশ। আবারও তিনি পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ করছেন, ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।

 ১০ এপ্রিল ২০২৫

মিথ্যা কথা আর ভুল কথার মধ্যে একটি গুণগত তফাত আছে। তবে মিথ্যা ও ভুল দুই-ই যখন এক মোড়কে পরিবেশিত হয়, তার একটি অন্যতর, বৃহত্তর অভিধা তৈরি হতে পারে: প্রতারণা। সম্প্রতি এসএসসি-কাণ্ড নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বার্তা দিলেন, তার জন্য এই শব্দটিই হয়তো সবচেয়ে প্রযোজ্য। এত বড় সরকারি দুর্নীতির পর সরকারের প্রধান হিসাবে তিনি এতটুকু লজ্জিত বা বিড়ম্বিত বলে মনে হল না, বরং স্পর্ধিত উচ্চারণে আবারও তাঁকে অবিরত আশ্বাস দিতে দেখা গেল, যে আশ্বাসের বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। তিনি যখন বললেন যে তিনি বেঁচে থাকতে কারও চাকরি যেতে পারে না, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার বুদবুদ মুহূর্তে ফেটে গেল। সত্যিই যদি তাঁর হাতে ‘এ বি সি ডি’ ইত্যাকার ‘প্ল্যান’ প্রস্তুত থাকত, তা হলে তিনি হয়তো স্পষ্টাক্ষরে তা বলতেও পারতেন। বলতে যে পারলেন না তার কারণ সে কাজ সহজ তো নয়ই, সম্ভব কি না তাতেও ঘোর সন্দেহ। শিক্ষা-প্রশাসনের দুর্নীতি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে প্রায় ছাব্বিশ হাজার মানুষের চাকরি এক ধাক্কায় চলে গিয়েছে, যাদের এক বিরাট অংশ নির্দোষ, অর্থাৎ ‘যোগ্য’। কী পদ্ধতিতে তাদের প্রকৃত দোষী অর্থাৎ ‘অযোগ্য’দের থেকে আলাদা করা যাবে, তার কোনও দিশা কারও কাছে নেই, থাকলে তা আগেই করা যেত। এমন কোনও বিকল্প কল্পনা করাই মুশকিল যাতে ‘যোগ্য’দের প্রতি সুবিচার ও ‘অযোগ্য’দের শাস্তি একই সঙ্গে সম্ভব হতে পারে। প্রকৃত অপরাধী— অর্থাৎ যে রাজনৈতিক নেতা কর্তা কর্মীদের সীমাহীন অর্থলোলুপতায় এমন ঘটল— তাঁদের বিচারের আঙিনায় টেনে আনা প্রায় অসম্ভব। এই বিপুল আয়তনের দুর্নীতি সম্বন্ধে রাজ্যের শীর্ষ নেত্রী ও নেতারা অনবহিত ছিলেন, এও ভাবা অসম্ভব। অথচ নিজেরই সরকারের এই ঘোর অপরাধ জনসমক্ষে উন্মোচিত হওয়ার পরও স্টেডিয়াম-ভাষণের পর মুখ্যমন্ত্রীর ‘মানবিক মুখ’ নিয়ে খোদ শিক্ষামন্ত্রী থেকে দলীয় তাঁবেদারসমূহ উদ্বেলিত গদগদ। এবং সেই নেত্রীস্তবের আবহে ধ্বনিত হল— আশ্বাস।

আশ্বাসের পাশাপাশি নির্দেশ, চাকরিহারা শিক্ষকরা স্বেচ্ছাশ্রমে শিক্ষাদান করুন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে অতি স্বাভাবিক নির্দেশ। আবারও তিনি পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ করছেন, ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। তিনি ও তাঁর সরকার ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছেন যে পশ্চিমবঙ্গে এখন প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে, পাশাপাশি সমান্তরাল ব্যবস্থা চালু করাই হল প্রশাসনিক ‘ম্যানেজ’ কর্মকাণ্ডের ধারা। পুরকর্মী থেকে স্বাস্থ্যকর্মী, সকলকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে এবং দলীয় সংগঠনের উপর নির্ভরতার ভিত্তিতে নিয়োগ করলে এক ঢিলে অনেকগুলি ফললাভ। তাতে যোগ্যতা বিচার অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া যায়, নিয়মবহির্ভূত অর্থাগমের ব্যবস্থা করা যায়, বিপুল সমর্থক সমাজের মধ্যে ‘সিস্টেম’-এর বদলে, ‘সিস্টেম’-এর বাইরে, পার্টি মুখাপেক্ষিতার পাকাপাকি বন্দোবস্ত সম্ভব হয়। তাই সিভিক ভলান্টিয়ার, পার্শ্বশিক্ষকের পর এখন হয়তো ‘সিভিক শিক্ষক’ তৈরির পালা। এই সিস্টেম-ধ্বংসকারী সমান্তরাল ব্যবস্থা নির্মাণ বর্তমান শাসনের একটি বিশিষ্ট ‘অবদান’। ‘সুপারনিউমেরারি’ বা অতিরিক্ত শূন্যপদ বন্দোবস্তকেও সেই প্রেক্ষাপটে দেখা সম্ভব। এসএসসি-র সিস্টেমকে এড়িয়ে আলাদা এই তালিকার ভাবনায় মন্ত্রিসভার সিলমোহর কিংবা রাজ্যপালের স্বাক্ষর থাকতেই পারে, তার ভিত্তিতে আদালতের রায়ে আজ তা ছাড়ও পেতে পারে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক নৈতিকতাকে পদদলনের দায় থেকে তা কোনও মতেই মুক্ত হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বারংবার বার্তা দিচ্ছেন যে তাঁরা চাকরিহারাদের ‘পাশে রয়েছেন’। তাঁদের বোঝা দরকার, মানবিক আস্থা কিংবা মহৎ আশ্বাস বিতরণের উচ্চভূমি থেকে তাঁরা বিচ্যুত হয়েছেন। এই বিপুল অপরাধের দায় সর্বাংশে স্বীকার করলে তবেই একমাত্র তাঁরা ‘পাশে’ জায়গাপেতে পারেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ ( ১০ এপ্রিল ২০২৫) থেকে নেওয়া হয়েছে)

⚖️ রচনাটি প্রবন্ধধর্মী বিশ্লেষণাত্মক গদ্যরচনা, একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও, তা কেবল অভিযোগ নয়— বরং কাঠামোগত বিশ্লেষণ। এখানে শুধুই সরকারবিরোধী বক্তব্য নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বিকল্প ব্যবস্থার অসারতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রশ্ন একত্রে আলোচিত হয়েছে।


বর্তমান ওয়েবডেস্ক

এপ্রিল ১০, ২০২৫

মৃণালকান্তি দাস: রুশ শব্দ ‘ক্রাসনভ’ বহু রাশিয়ান নাগরিকের নামের সঙ্গে জড়িত। উপাধি হিসেবে। ‘ক্রাসনভ’ এসেছে ‘ক্রাসনি’ থেকে, যার অর্থ লাল। আর এই ‘ক্রাসনভ’ শব্দটি ঘিরেই এখন গোটা দুনিয়ার গোয়েন্দা জগৎ তোলপাড়।
আসলে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে সম্প্রতি প্রাক্তন কেজিবি অফিসার আলনুর মুসায়েভের একটি ফেসবুক পোস্ট। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজাখস্তানের ওই প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান লিখেছেন, ১৯৮৭ সালে ‘ক্রাসনভ’ ছদ্মনামে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়োগ করেছিল রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি। সেই বছর ট্রাম্প মস্কো সফর করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪০। মস্কোর কাছে ট্রাম্প ছিলেন ‘অ্যাসেট’। আলনুর মুসায়েভ স্বীকার করেছেন, তিনি কেজিবির ‘সিক্সথ ডিরেক্টরেট’-এ কাজ করতেন। তবে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) ডকুমেন্ট-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায়, কেজিবির সিক্সথ ডিরেক্টরেট বিদেশি গোয়েন্দা নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। 

প্রাক্তন রুশ গোয়েন্দা মেজর ইউরি শভিৎসের দাবি, ১৯৭৭ সালে উদীয়মান ব্যবসায়ী ট্রাম্প যখন চেক মডেল ইভানা জেলনিকোভাকে বিয়ে করেন, তখন থেকেই চেক গোয়েন্দারা ট্রাম্পের উপর ব্যাপক নজরদারি শুরু করে। এরপর থেকে অজান্তেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে তৈরি করতে কাজ করে গিয়েছে কেজিবি। কখনও জেনেবুঝেও কেজিবির সাহায্য নিয়েছেন ট্রাম্প। ব্রিটিশ এমপি গ্রাহাম স্টুয়ার্ট, মার্কিন ডেমোক্র্যাট সেনেটর জেফ মের্কলি এবং অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা অফিসাররা প্রশ্ন তুলেছেন: ট্রাম্প কি তাহলে রাশিয়ার ‘এজেন্ট’? ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নীতি রাশিয়ার প্রতি এতটাই সহানুভূতিশীল যে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরও কপালে ভাঁজ পড়া শুরু করেছে!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এসব নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। রাশিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্কের বিষয়টিও উড়িয়ে দিয়েছেন। তাহলে কি সবই গুজব? প্রোপাগান্ডা? সবচেয়ে আলোচিত ‘গুজব’-এর সংকলন পাওয়া যায় ক্রিস্টোফার স্টিল নামে এমআই সিক্স-এর প্রাক্তন রাশিয়া ডেস্ক প্রধানের একটি ডসিয়ারে। তিনি ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প সম্পর্কে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর অনুসন্ধান এতটাই উদ্বেগজনক ছিল যে, তিনি তা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দেন। যেখানে তিনি দেখান, পুতিন সরকার ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতিয়ে আনার চেষ্টা করছিল এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা রুশ এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। হয়তো ষড়যন্ত্রের জন্য! এই ডসিয়ারের দু’টি দাবি পরবর্তীতে মার্কিন স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুলারের তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। তবে এটা কোনও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে পারেনি।

এমআই সিক্স-এর গোয়েন্দা অফিসার ক্রিস্টোফার স্টিল আরও কিছু বিষয় তুলে ধরে দাবি করেন, সম্ভবত এসব কখনওই আর যাচাই করা যাবে না। তার মধ্যে সবচেয়ে ‘ভয়ঙ্কর’ দাবি ছিল: কেজিবির ‘হানি ট্র্যাপ’-এও জড়িয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্প। ২০১৩ সালে মস্কোর এক হোটেলে ট্রাম্পের বিকৃত যৌনাচারের ভিডিও তুলে রেখেছে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি (যার আগে নাম ছিল কেজিবি), যেটা রাশিয়া ‘কমপ্রোম্যাৎ’ (চাপে ফেলার জন্য ব্ল্যাকমেলের উপকরণ) হিসেবে ব্যবহার করে। তবে ক্রিস্টোফার স্টিল এরও কোনও প্রমাণ দিতে পারেননি। এটা ঠিক, রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে ট্রাম্পের। ১৯৯০-এর দশকে বারবার দেউলিয়া হয়ে পড়ায় যখন মার্কিন ব্যাঙ্কগুলি ট্রাম্পের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন রাশিয়ার অর্থ তাঁর ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফেলিক্স স্যাটার নামে এক রুশ-মার্কিন মাফিয়া ট্রাম্পের ব্যবসায় বিপুল অর্থ ঢালেন। সেই ফেলিক্স ২০১৫ সালে একটি ইমেলে লিখেছিলেন: ‘আমাদের লোক (ট্রাম্প) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারে। আমি পুতিনের গোটা টিমকে এতে শামিল করব।’ একসময় ট্রাম্প তাঁর রিয়েল এস্টেট ব্যবসা রাশিয়ায় সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তা সফল হয়নি। তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা বলেন, ওই সময় নিউ ইয়র্কের রিয়েল এস্টেট জগতে রুশ বিনিয়োগ ছিল একেবারেই সাধারণ বিষয়। সেই প্রসঙ্গে ট্রাম্পের এক প্রাক্তন অংশীদার বলেছিলেন, ‘ওই সময় কিছু ভীষণ রুচিহীন রাশিয়ানই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ছিল। যাদের ঝোঁক ছিল, ট্রাম্পের অদ্ভুত, চটকদার সোনালি সাজসজ্জার জীবনের দিকে।’ ট্রাম্প এসব অভিযোগ বরাবরই ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে একথাও বলেছেন, ‘পুতিন আমার জন্য অনেক ঝড়ঝাপটা সয়েছেন।’

২০১৯ সালে ট্রাম্প ইউক্রেনকে অস্ত্র সাহায্য আটকে দিয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে চাপে ফেলতে চেয়েছিলেন। কারণ, জেলেনস্কিকে তিনি বলেছিলেন, জো বাইডেন এবং তাঁর ছেলে হান্টারের ব্যবসা নিয়ে তদন্ত শুরু করতে হবে। জেলেনস্কি এতে রাজি হননি। এই ঘটনার পর থেকে ট্রাম্প ইউক্রেনকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ এবং তাঁর রাজনৈতিক শত্রুদের সহযোগী বলে মনে করেন। ট্রাম্প খোলাখুলি ‘স্ট্রংম্যান’ নেতাদের প্রশংসা করেন, পুতিনকে সেই তালিকাতেই রাখেন। হয়তো সেই কারণেই, ইউক্রেনকে ন্যাটো সদস্য না করার অঙ্গীকার, ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ, রাষ্ট্রসঙ্ঘে রাশিয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া, মস্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার শুরু করার নীতিতে চলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেই নীতি একেবারে আমেরিকার দীর্ঘকালের বিদেশ নীতির উল্টো পথ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট থমাস এল ফ্রিডম্যান লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারি না তিনি রাশিয়ার এজেন্ট, কিন্তু তিনি টেলিভিশনে সেটার অভিনয়টা দারুণ করেন।’

এর আগেও বিস্ফোরক দাবি করেছিলেন প্রাক্তন রুশ গোয়েন্দা মেজর ইউরি শভিৎস। বলেছিলেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিকে বসানোর জন্য ৪০ বছর কাজ করেছে রুশ গোয়েন্দাদের মস্তিষ্ক। রহস্যের গন্ধ পেতে মার্কিন সাংবাদিক ক্রেগ অ্যাঙ্গারের লেখা বই ‘আমেরিকান কম্প্রোম্যাৎ’-এর পাতা উল্টে পিছিয়ে যেতে হবে চার দশক আগে। যেখানে ইউরি শভিৎস জানাচ্ছেন, টিভি কেনাই পরোক্ষভাবে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হতে সাহায্য করেছে। কীভাবে? এর নেপথ্যে রয়েছে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সেমিয়ন কিসলিন। তৎকালীন সময়ে কিসলিন ছিলেন জয়-লুড ইলেক্ট্রনিকস কোম্পানির মালিক। ট্রাম্প তাঁর নিউ ইয়র্ক হায়াত হোটেলের জন্য কিসলিনের কাছে ২০০টি টেলিভিশন সেট কিনতে গিয়েছিলেন। সেই কিসলিনের মারফত কেজিবির সঙ্গে যুক্ত হন ট্রাম্প। তবে কিসলিন অবশ্য কেজিবির সঙ্গে তাঁর সংযোগের কথা স্বীকার করেননি। যদিও শভিৎসের দাবি, কেজিবির ‘স্পটার এজেন্ট’ হয়ে আমেরিকায় ছিলেন কিসলিন। তাঁর কাজ ছিল, কেজিবির এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করার জন্য মার্কিন নাগরিকদের বাছাই করা।

২০২১ সালে প্রকাশিত ‘আমেরিকান কম্প্রোম্যাৎ’ বইটিতে লেখা আছে, ১৯৮৭ সালে যখন ট্রাম্প ও ইভানা মস্কো ভ্রমণে গিয়েছিলেন, তখন কেজিবি গোয়েন্দাদের বক্তব্যে ট্রাম্পের মনে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, সেই বছরই প্রচারে নেমে পড়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একাধিক সংবাদমাধ্যমে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তিনি। মার্কিন প্রতিরক্ষানীতি সম্পর্কেও এইসময় তিনি উল্টো মনোভাব প্রকাশ করা শুরু করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, জাপানের মতো মিত্র রাষ্ট্রগুলি আমেরিকাকে শোষণ করছে। আমেরিকার উচিত, তার মিত্র রাষ্ট্রগুলিকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির জন্য বাধ্য করা। এই মতবাদ প্রচার করার জন্য ট্রাম্প ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং ‘বোস্টন গ্লোব’ পত্রিকায় পৃষ্ঠাজুড়ে বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন। যার শিরোনাম ছিল: There’s nothing wrong with America’s Foreign Defense Policy that a little backbone can’t cure. বিজ্ঞাপনে মোট খরচ হয়েছিল ৯৪,৮০১ মার্কিন ডলার। এই বিজ্ঞাপন প্রকাশের পরই মস্কোতে কেবল মেসেজ পৌঁছে যায়। যেখানে লেখা ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প সত্যিই ‘কাজের লোক’। কেজিবি অফিসার শভেৎস তখন মস্কোর ইয়াসেনেভোতে কেজিবির ফার্স্ট চিফ ডিরেক্টরেট-এর সদর দপ্তরে উপস্থিত।
যদিও অ্যাঙ্গার এসব দাবির পক্ষে কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেননি। তাঁর মূল সূত্র, বর্তমানে আমেরিকায় বসবাসকারী দুই প্রাক্তন কেজিবি অফিসার ইউরি শভেৎস এবং ওলেগ কালুগিন। শভেৎস ছিলেন ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন ডিসিতে নিযুক্ত কেজিবির ফার্স্ট মেন ডিরেক্টরেটের ‘রেসিডেন্ট’। কালুগিন ছিলেন কেজিবির একজন জেনারেল এবং কেজিবির ফার্স্ট মেন ডিরেক্টরেটের অন্তর্গত ফরেন কাউন্টার–ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের প্রধান। সুতরাং, আমেরিকায় কেজিবির কার্যকলাপ সম্পর্কে তাঁদের দু’জনেরই বিস্তারিত জ্ঞান থাকা স্বাভাবিক এবং এজন্য সূত্র হিসেবে আপাতদৃষ্টিতে তাঁরা খুবই নির্ভরযোগ্য। শভেৎস ও কালুগিন দু’জনেই ‘ডিফেক্টর’। রুশদের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’। দু’জনেই ১৯৯০ সালে কেজিবি থেকে বহিষ্কৃত হন এবং আমেরিকায় পালিয়ে যান। ধারণা করা হয়, কালুগিন আগে থেকেই সিআইএর কাছে তথ্য পাচার করতেন।

‘আমেরিকান কম্প্রোম্যাৎ’ বইটিতে ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা শভেৎস ট্রাম্পের তুলনা করেছেন ‘কেমব্রিজ ফাইভ’-এর সঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ঠান্ডা যুদ্ধের শুরুতে যাঁরা ব্রিটিশ গোপন তথ্য মস্কোকে সরবরাহ করতেন, এমন একটি কুখ্যাত গুপ্তচর চক্র। কেজিবির জন্য সেটা ছিল এক ধরনের ‘চার্ম অফেন্সিভ’। তারা আগে থেকেই ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছিল, জানত তিনি কী ধরনের মানুষ। কেজিবি মনে করত, তিনি বুদ্ধিগত ও মানসিকভাবে খুব দুর্বল, এবং প্রশংসায় সহজেই ভাসতে পারেন। এটাই তারা কাজে লাগায়। এইসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পাল্টা জবাবে প্রাক্তন সিআইএ অফিসার জন সাইফার ‘আমেরিকান কম্প্রোম্যাৎ’ বইটি সম্পর্কে মার্কিন পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’–এ একটি রিভিউ লিখেছিলেন। যেখানে বলেছিলেন, অ্যাঙ্গারের বইয়ে শুরু থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছে, ট্রাম্প আমেরিকার জন্য খারাপ। এবং এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই গোটা বইটি লেখা হয়েছে।

ট্রাম্পের জয়ে রুশ কারচুপির অভিযোগ আগেই এসেছে, পরবর্তীকালে দেখা গিয়েছে ট্রাম্পের রাশিয়া প্রীতিও। সেক্ষেত্রে ‘আমেরিকান কম্প্রোম্যাৎ’-র অভিযোগ যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থেকে যাবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যা হলিউডের যেকোনও থ্রিলারকেও হার মানাবে!


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল