কৃষ্ণদাস কবিরাজ

Vaishanava

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

কৃষ্ণদাস কবিরাজ (Krishnadas Kaviraj) ছিলেন বৈষ্ণব ভক্তি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও গ্রন্থকার। তাঁর জীবনী ও কর্ম শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সাধারণভাবে ধরা হয়, তিনি ১৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমান জেলার ঝামটপুর গ্রামের বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কিছু গবেষক বলেন, তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে একই জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত ঝামটপুরেই হয়েছিল। “ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারানোর পর, তিনি তার প্রয়াত বাবার বোনের কাছে লালিত-পালিত হন। তিনি গ্রামের পাঠশালায় ফারসি ভাষা পড়েন এবং তারপর সংস্কৃত ভাষা অধ্যয়ন শুরু করেন, যাতে তিনি তার জাতির পেশা, হিন্দু চিকিৎসা অনুশীলনের জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন” (যদুনাথ সরকার) । তিনি ১৫৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ অক্টোবর বৃন্দাবনে পরলোকগমন করেন (আরেকটি দৃঢ় মত হল যে তিনি ১৬১৫ থেকে ১৬১৬ সালের মধ্যে মারা যান)। তাঁর সমাধি বৃন্দাবনের রাধা-দামোদর মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত।

চৈতন্যদেবের (১৪৮৬–১৫৩৩) জীবদ্দশায় কৃষ্ণদাসের বয়স ছিল সাতাশ-আটাশের কাছাকাছি। চৈতন্য মহাপ্রভুর তিরোধানের পর কৃষ্ণদাস বৃন্দাবনে (১৫৪২ সালে) গিয়ে রঘুনাথ দাস গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রঘুনাথ দাস (১৪৯৪–১৫৮৬) ও কৃষ্ণদাস বয়স ও অভিজ্ঞতায় প্রায় সমান ছিলেন। তাঁদের গুরু ও সমসাময়িক সঙ্গ থেকে কৃষ্ণদাসের ভক্তি ও সাধনার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।

প্রায় ১৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে, যখন তাঁর বয়স সত্তরের কাছাকাছি, কৃষ্ণদাস রচনা করেন মহাকাব্যতুল্য অমর কীর্তি শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত। সুকুমার সেনের মতে, এই গ্রন্থ ১৫৬০ থেকে ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত। আবার অনেকের মতে, নয় বৎসরের অনবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের পর ১৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে এই গ্রন্থ সমাপ্ত হয় এবং এর পরপরই কবিরাজের তিরোধান ঘটে। তাঁর স্বহস্তলিখিত চৈতন্যচরিতামৃত আজও বৃন্দাবনের রাধা-দামোদর মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। লোকনাথ গোস্বামী (জন্ম ১৪৮৩-১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে)এই সময়ে চৈতন্য চরিতামৃতের সমাপ্তির পর তাঁর সীতা চরিত্রগ্রন্থটি সম্পন্ন করেছিলেন এবং তিনি চৈতন্য চরিতামৃতের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

চৈতন্যভাগবতের (চৈতন্য-মঙ্গল) রচয়িতা বৃন্দাবন দাস (১৫০৭–১৫৮৯) ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর কাব্য সমাপ্ত করেন। এর প্রায় বিশ বছর পরে কৃষ্ণদাস চৈতন্যচরিতামৃত লেখা শুরু করেন। অপরদিকে, কাটোয়ার লোচন দাস (১৫২৭–১৫৯০) ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে চৈতন্যমঙ্গল রচনা করেছিলেন। সুতরাং কৃষ্ণদাসের রচনা বৈষ্ণব চরিতসাহিত্যে এক ভিন্ন উচ্চতা এনে দেয়, কারণ তিনি পূর্বসূরিদের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে নতুন দার্শনিক বিশ্লেষণ ও মহাপ্রভুর লীলার গভীরতর তাৎপর্য প্রকাশ করেছিলেন।

ভাগবতে কৃষ্ণলীলা বর্ণিল বেদব্যাস।

চৈতন্যমঙ্গলে ব্যাস বৃন্দাবন দাস।। – কৃষ্ণদাস কবিরাজ

কৃষ্ণদাস কবিরাজ মোট তিনটি গ্রন্থ রচনা করেন— দুটি সংস্কৃতে ও একটি বাংলায়। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি হলো: (১) সারঙ্গরঙ্গদা (কৃষ্ণকর্ণামৃতের টীকা), (২) গোবিন্দলীলামৃত (২৩ সর্গে রচিত মহাকাব্য), এবং (৩) শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত।

চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে মোট ১০,৫২৪টি পদ্য রচিত হয়েছে। এই গ্রন্থে ৭৬টি প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে ১,০১১টি সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য, যেমন অভিজ্ঞান শকুস্তলা, রঘুবংশ, উত্তবচরিত প্রভৃতি প্রাচীন সংস্কৃতসাহিত্য; উদ্বাহতত্ত্ব, মনুসংহিতা প্রভৃতি স্মৃতিশাস্ত্র; বিষ্ণুপুরাণ, কুর্মপুরাণ, পদ্মপুরাণ প্রভৃতি পুরাণশাস্ত্র; গীতা, ভাগবত, গীতগোবিন্দ, ভাগবতসন্দর্ভ, হরিভক্তি- বিলাস, জগন্নাথবল্লভ নাটক, বিদগ্ধমাধব নাটক, ললিতমাধব নাক, গোবিন্দ লীলামৃত প্রভৃতি ভক্তিশাস্ত্র; বৃহদ গৌতমীয় তন্ত্র, সাত্বত তন্ত্র প্রভৃতি আগম শাস্ত্র, প্রভৃতি থেকে উদ্ধৃতির মাধ্যমে কবিরাজ গোস্বামী তাঁর রচনা সমৃদ্ধ করেছেন।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী তাঁর শ্রীশ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে একেবারেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেননি; বরং তিনি নির্দিষ্ট শাস্ত্র, পূর্বসূরি ভক্ত ও গুরুজনদের স্মরণ করে, তাঁদের উপদেশ ও আদেশ মেনে এই মহান কীর্তি সম্পাদন করেছিলেন। এটা মেনে নেওয়া হয় যে তিনি স্বরূপ-দামোদর ও মুরারি গুপ্তের কড়চা, কবিকর্ণপুরের সংস্কৃত চরিতগ্রন্থকে অবলম্বন করেন। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব ভক্তগণ তাঁকে এই গ্রন্থ রচনার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।

এছাড়া সনাতন গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রীমদনগোপাল বিগ্রহের আজ্ঞাকেও তিনি গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রণাম জানিয়ে এই মহাগ্রন্থে হাত দেন। নিজের শিক্ষাগুরুদের মধ্যে রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, রঘুনাথ দাস গোস্বামী, জীব গোস্বামী ও গোপাল ভট্ট গোস্বামী এবং দীক্ষাগুরু রঘুনাথ ভট্ট গোস্বামীর চরণস্মরণ করে তিনি চৈতন্যচরিতামৃত রচনায় প্রবৃত্ত হন। অতএব এটা বলা ঠিক যে, চৈতন্যচরিতামৃত বইটি ১৬১৫ সালে (১৫৩৭ শকে) সম্পন্ন হয়েছিল যখন উপরোক্ত সমস্ত উপাদান তাঁর আগে উপলব্ধ ছিল। তখন তার বয়স অনেক বেশি ছিল:

বৃদ্ধ জরাতুর আমি অন্ধ বধির।
হস্ত হালে, মনোবুদ্ধি নহে মোর স্থির ॥ চৈ. চ. ৩।২০/৮৪

শ্রীচৈতন্যভাগবতে যেখানে শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সীশ্রেষ্ঠা শ্রীরাধার প্রসঙ্গ অনুপস্থিত, সেখানে কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে রাধা-কৃষ্ণ প্রেমতত্ত্বকে কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। তাঁর বর্ণনায় চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার মূল উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়—শ্রীকৃষ্ণ স্বীয় রাধার ভাব ও কান্তি অঙ্গীকার করে রাধা-প্রেমরসের আস্বাদন করেছিলেন। কৃষ্ণদাসের বর্ণনায় মহাপ্রভু অধিকাংশ সময় রাধাভাবে আবিষ্ট অবস্থায় কৃষ্ণলীলা কীর্তন করতেন। আশ্চর্যজনকভাবে চৈতন্যভাগবতের শ্রীচৈতন্যতত্ত্বে “রাধাভাবদ্যুতি- সমন্বিতৎ নৌমি তং কৃষ্ণস্বরূপং” এই কবিতা বা অনুরূপ কোনও ভাবের কথা পাওয়া যায় না। বৃন্দাবন দাসের (১৫০৭–১৫৮৯) কি এই বিষয়ে কোন জ্ঞান ছিল না, নাকি সে ইচ্ছাকৃতভাবে চৈতন্য সম্পর্কে বিকৃত ধারণা এড়িয়ে গিয়েছিল ?

চৈতন্যচরিতামৃতের আদিলীলার প্রথম দ্বাদশ পরিচ্ছেদে এবং মধ্যলীলার ১৯ থেকে ২৩ পরিচ্ছেদে তিনি কৃষ্ণতত্ত্ব, রাধাতত্ত্ব, গৌরতত্ত্ব, নিত্যানন্দতত্ত্ব, অদ্বৈততত্ত্ব, পঞ্চতত্ত্ব ইত্যাদির দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মধ্যলীলার অষ্টম পরিচ্ছেদে তিনি সাধ্যসাধনতত্ত্ব বিচার করেছেন এবং বিংশ পরিচ্ছেদে মানবজীবনের মূল প্রশ্ন—”আমি কে? কেন তাপত্রয়ে জর্জরিত? মুক্তির উপায় কী?”—তার উত্তর দিয়েছেন। মধ্যলীলার ২২তম পরিচ্ছেদে সনাতন গোস্বামীকে শিক্ষাদানের প্রেক্ষিতে বৈধী ও রাগানুগা ভক্তির মধ্যে পার্থক্য বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।

তবে কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচনায় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো নিত্যানন্দ প্রসঙ্গের অনুপ্রবেশ। অনেক গবেষকের মতে, নিত্যানন্দের বিধবা পত্নী জাহ্নবা দেবীর প্রভাবে, এমনকি কখনও বলা হয় তাঁর হুমকির কারণেই, কৃষ্ণদাস কবিরাজ নিত্যানন্দের প্রসঙ্গ সংযোজন করেন। যদিও চৈতন্য মহাপ্রভু নিত্যানন্দের গৃহস্থজীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তথাপি কবিরাজ গোস্বামীর রচনায় নিত্যানন্দের মাহাত্ম্য বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।

ড. সুকুমার সেন লিখেছেন—“চৈতন্যচরিতামৃত প্রচার হইবার পর হইতেই ইহা ভাগবত ও গীতা ছাড়া প্রায় সমস্ত বৈষ্ণব শাস্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় করিয়া দিয়াছে। মিষ্টিক বৈষ্ণব সাধকদের কাছে তাহাই একমাত্র শাস্ত্র।” এই মূল্যায়ন স্পষ্ট করে দেয় যে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্যচরিতামৃত কেবল বৈষ্ণব সাহিত্যের অমূল্য রত্ন নয়, বরং ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

আবার চৈতন্যচরিতামৃত কোনোভাবেই কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী নয়; বরং কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি সুনির্মিত বৈষ্ণব দর্শন ও তত্ত্বতত্ত্বের গ্রন্থ রচনা করা। তাই তিনি নিজেই গ্রন্থের মঙ্গলাচরণে ঘোষণা করেছেন—

“ভক্তরূপ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, ভক্তস্বরূপ নিত্যানন্দ, ভক্তাবতার অদ্বৈতাচার্য, ভক্তখ্য শ্রীবাসাদি এবং ভক্তশক্তিরূপ গদাধর—এই পঞ্চতত্ত্বাত্মক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে নমস্কার করি।”

অর্থাৎ এখানে জীবনীমূলক তথ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চৈতন্যকে ঈশ্বরতত্ত্বের অন্তিম প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন। চৈতন্যকে তিনি শ্রীরাধা-ভাবগ্রাহী কৃষ্ণরূপে নিরূপণ করেছেন—

“শ্রীরাধার প্রণয়মহিমা কিরূপ, সেই প্রেমে শ্রীরাধা যে অদ্ভুত মাধুর্য আস্বাদন করেন, আমার মাধুর্য আস্বাদনে শ্রীরাধার যে সুখ হয়—এসব জানিবার লোভে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতী রাধার ভাব-কান্তি গ্রহণ করিয়া শচীদেবীর গর্ভে চৈতন্যরূপে আবির্ভূত হইয়াছেন।”

এই ব্যাখ্যায় কৃষ্ণদাস কবিরাজ আসলে ভগবানের অবতারতত্ত্বকে এক নতুন আলোচনায় নিয়ে আসেন। ভগবদ্গীতা-য় যেমন অবতারতত্ত্বের মূল কারণ বলা হয়েছে—“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত”—অর্থাৎ ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান অবতীর্ণ হন; কিন্তু কৃষ্ণদাসের ব্যাখ্যায় দেখা যাচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ নিজেই নিজের আনন্দ, নিজের শক্তি (হ্লাদিনী শক্তি, অর্থাৎ রাধা) উপলব্ধির জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন। এই জায়গাটিই প্রকৃতপক্ষে দর্শনগত বিরোধ সৃষ্টি করে, কারণ এতে গীতার অবতারতত্ত্ব আড়াল হয়ে যায় এবং চৈতন্যকে এক স্বয়ং-আনন্দপ্রার্থী ঈশ্বর হিসেবে দেখানো হয়।

কিন্তু শ্রীচৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবন দাসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন:

তবে প্রভু যুগধৰ্ম্ম স্থাপন করিতে।
সাঙ্গোপাঙ্গে অবতীর্ণ হন পৃথিবীতে।
কলিযুগে ধৰ্ম্ম হয় ‘হরিসংকীর্ত্তন’।
এতদর্থে অবতীর্ণ শ্রীশচীনন্দন॥

কলিযুগে সর্ব-ধৰ্ম্ম হরিসংকীর্ত্তন
সব প্রকাশিলেন শ্রীচৈতন্য নারায়ণ ॥
কলিযুগে সঙ্কীর্ত্তন-ধৰ্ম্ম পালিবারে।
অবতীর্ণ হৈলা প্রভু সর্ব-পরিকরে।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ শুধু চৈতন্য নয়, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্যের মহিমাও আলাদা আলাদাভাবে দর্শনীয় ভিত্তিতে স্থাপন করেছেন। নিত্যানন্দকে তিনি বলরামের সমান করে তুলেছেন এবং লিখেছেন—

“সংকর্ষণ, কারণান্ধিশায়ী নারায়ণ, গর্ভোদশায়ী নারায়ণ, ক্ষীরোদশায়ী নারায়ণ এবং অনন্তদেব, ইহারা যাঁহার অংশকলা, সেই নিত্যানন্দ বলরামের শরণ গ্রহণ করি।”

এখানেই তিনি নিত্যানন্দকে একেবারে বিশ্বব্যাপী শাক্তিসম্পন্ন মহাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, যদিও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী নিত্যানন্দের পার্থিব জীবন অনেক বিতর্কিত। জানা যায়, নিত্যানন্দ তাঁর অদ্ভুত (অবাধুত) ব্রত ভঙ্গ করে দু’বার বিবাহ করেছিলেন, জমিদারসুলভ জীবনযাপন শুরু করেছিলেন, এমনকি দুর্গাপূজা ও কালীপূজার প্রচলন করেছিলেন। অদ্বৈতাচার্যও একসময় চৈতন্যের কাছে নালিশ করেছিলেন নিত্যানন্দ সম্পর্কে, যার ফলে চৈতন্য নিজেকে তাঁর থেকে আলাদা করে নেন। কিন্তু কবিরাজের রচনায় নিত্যানন্দের এই বিতর্কিত দিক সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, বরং তাঁকে মহিমামণ্ডিত করে চৈতন্যতত্ত্বের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কৃষ্ণদাস নিজেই লিখেছেন— “ইহা শ্রবণে চিত্তের অজ্ঞানাদি দোষ খণ্ডিত হইবে, কৃষ্ণে গাঢ় প্রেম জন্মিবে, মনও সন্তোষ লাভ করিবে। শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ, অদ্বৈতাচার্য, ভক্ততত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্ব, নামতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব ও রসতত্ত্ব বিষয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা এই গ্রন্থে করিয়াছি।”

তাঁর এই প্রচেষ্টা আসলে ভক্তিমূলক এক দর্শন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, যেখানে চৈতন্য মহাপ্রভুই “পরতত্ত্বের সীমা”—অর্থাৎ সমস্ত অবতারতত্ত্বের অন্তিম সোপান।

তবে দার্শনিক দিক থেকে এর একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়ে যায়—যদি ঈশ্বর স্বয়ং সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান হন, তবে কেন তিনি তাঁর নিজের হ্লাদিনী শক্তি (রাধা) উপলব্ধি করার জন্য নাদিয়ার এক মানবদেহে অবতীর্ণ হবেন? এটি অবতারতত্ত্বের মূল উদ্দেশ্যের (ধর্মরক্ষা) সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তাই সমালোচকেরা বলেন, কৃষ্ণদাস কবিরাজের এই উপস্থাপন আসলে অবতারতত্ত্বের এক নতুন রূপ, যা গীতার অবতারতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী সম্পর্কে যেসব রহস্য ও অস্পষ্টতা রয়েছে, তা তাঁর চৈতন্যচরিতামৃতকে নিছক জীবনীগ্রন্থ না করে বরং এক ধরনের ভক্তিতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বমিশ্রিত কাব্য-শাস্ত্রে পরিণত করেছে।

প্রথমত, কৃষ্ণদাস কবিরাজ কখনোই নাবদ্বীপ বা পুরী ভ্রমণ করেননি। ফলে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম, গৃহজীবন, সন্ন্যাসগ্রহণ ও তিরোধান বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা স্থানপরিদর্শনের সুযোগ তাঁর হয়নি। অথচ একটি জীবনীকারের জন্য এই বিষয়গুলো প্রত্যক্ষভাবে জানা জরুরি। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো—তিনি তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে চৈতন্যের মৃত্যু বা তিরোধানের প্রসঙ্গ একেবারেই উল্লেখ করেননি। এটি তাঁর রচনার অন্যতম বড় বৈপরীত্য।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়—চৈতন্য মহাপ্রভু ১৫৩৩ সালে, নিত্যানন্দ ১৫৪৫ সালে এবং অদ্বৈত আচার্য ১৫৫৮ সালে প্রয়াত হন। এদিকে কৃষ্ণদাস জন্মেছিলেন ১৪৯৬ সালে এবং প্রায় ১৫৪২ সালের দিকে, বয়স যখন ২৫, তিনি বৃন্দাবনে চলে যান। সেখান থেকে তিনি আর কখনো বাংলায় ফেরেননি। অর্থাৎ তিনি জীবনে নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, বা চৈতন্যভক্তদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার সুযোগই পাননি। তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়নি। অথচ চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে তিনি নিত্যানন্দ তত্ত্ব ও অদ্বৈত তত্ত্বকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এখানেই সন্দেহ জাগে যে তিনি এসব তথ্য কোথা থেকে পেলেন। বাস্তবে, কৃষ্ণদাসের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল বৃন্দাবনের রূপ-সনাতন গোস্বামীদের শিষ্যগোষ্ঠীর। রূপ-সনাতনই ভক্তিতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, রসতত্ত্ব ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন, আর কৃষ্ণদাস কবিরাজ সেই তত্ত্বকে অনুসরণ করে তাঁর রচনা সাজিয়েছিলেন। ফলে চৈতন্যচরিতামৃত মূলতঃ চৈতন্যজীবনের ভেতর দিয়ে কৃষ্ণতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করার একটি উপায়। এর ভেতরে যতটা জীবনী আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে তত্ত্বব্যাখ্যা।

তবে এখানে আরেকটি দিক উল্লেখযোগ্য—নিত্যানন্দতত্ত্ব। রূপ-সনাতন বা জীব গোস্বামীদের দ্বারা নিত্যানন্দের তত্ত্বতত্ত্ব কোনো শক্ত ভিত্তি পায়নি। বরং নিত্যানন্দের দ্বিতীয় পত্নী জাহ্নবা দেবীই ছিলেন যিনি নিত্যানন্দের মাহাত্ম্য ও প্রভাবকে বৈষ্ণব সমাজে দৃঢ় করার চেষ্টা করেন। জানা যায়, জাহ্নবা দেবী কৃষ্ণদাস কবিরাজকে নিত্যানন্দ প্রসঙ্গ সংযোজন করতে বলেন এবং নিয়মিতভাবে নাবদ্বীপ সংক্রান্ত সংবাদ জীব গোস্বামীকে (১৫১৩ – ১৫৯৮ সাল) জানাতেন। জীব গোস্বামী মূলত রুক্মিণী-সত্যভামাকে সমর্থন করলেও, জাহ্নবার দৃঢ়তার কারণে বৃন্দাবনের বৈষ্ণব মন্দিরগুলোতে রাধার মূর্তি স্থাপন শুরু হয় এর প্রতিফলন কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচনাতেও দেখা যায়। তবে গোপাল ভট্ট ও সনাতন গোস্বামী রচিত হরিভক্তিবিলাসে রাধার কথা কখনও উল্লেখ করা হয়নি।

তাঁর তথ্যসূত্র নিয়েও প্রশ্ন আছে। চৈতন্যের প্রথম জীবনীকার ছিলেন মুরারি গুপ্ত, যিনি শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য চরিতামৃতম্ নামে সংস্কৃত গ্রন্থ ১৫৪২ সালের দিকে রচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন চৈতন্যের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী এবং গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে তাঁর সহপাঠী। মুরারি চৈতন্যের জীবন সম্পর্কে লিখেছিলেন। বৃন্দাবন দাস পরে চৈতন্যভাগবত রচনা করেন এবং সেখানে মুরারি গুপ্তের নামও উল্লেখ করেন। নরহরি সরকার সর্ব প্রথমে গৌরগীতি রচনা করেন । মুরারি গুপ্ত নরহরির নাম প্রথম বার উল্লেখ করেন।

শ্রীসরকার ঠাকুরের পদামৃত পানে।
পদ্য প্রকাশিব বলি ইচ্ছা কৈল মনে ॥ (পদকর্তা বাসু ঘোষ)

কিন্তু কৃষ্ণদাস কবিরাজের কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না মুরারির সঙ্গে, এমনকি বৃন্দাবন দাস বা লোকনাথ দাসের সঙ্গেও নয়। অথচ তিনি তাঁদের কাজের পর বহু বছর পরে এসে একটি মহাকাব্যিক রূপে চৈতন্যজীবনকে নতুন করে বিন্যস্ত করলেন। এ কারণেই অনেক গবেষকের মতে, তাঁর রচনা ঐতিহাসিক জীবনী নয় ।

আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো রায় রামানন্দের পরিচয়। রামানন্দ রায় পট্টনায়ক ও তাঁর ভাই গোপীনাথ গজপতি সাম্রাজ্যের শাসক হিসেবে ১৪৯৭ থেকে ১৫৪০ অবধি দায়িত্ব পালন করেন। রামানন্দ রায় ১৫৮০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। পরে গৌরগণোদ্দেশ দীপিকা গ্রন্থে তাঁকে মহাভারতের অর্জুন বলে দাবি করা হয়, যা অনেকে জাল বা কল্পিত গ্রন্থ বলেও চিহ্নিত করেছেন।

সব মিলিয়ে কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতকে জীবনীগ্রন্থ হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখা যায়, কারণ লেখক প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহ করেননি, স্থল-পরিদর্শন করেননি, বরং ভক্তিতত্ত্ব ও রসতত্ত্বকে কেন্দ্র করে শ্রীচৈতন্যকে এক “তত্ত্বরূপী ঈশ্বর” হিসেবে স্থাপন করেছেন। এর ফলে তাঁর রচনা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল নয়, বরং বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের এক কাব্য-শাস্ত্র, যা কেবল গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের দ্বারাই নয়, স্বাধীন পাঠকদের দ্বারাও সম্মানিত। এই বই দিয়েই আধুনিক বাংলার সূচনা হয়েছিল।

উল্লেখিত বই

  • বৃন্দাবনদাস: শ্রীচৈতন্যভাগবত
  • লোচনদাস: চৈতন্যমঙ্গল
  • বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তী: ভাগবতের টীকা
  • মুরারি গুপ্ত: শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতম্-সাধারণতঃ করচা
  • রামানন্দ রায়: জগন্নাথবল্লভনাটকম্
  • রূপ গোস্বামী: উজ্জ্বলনীলমণিঃ
  • সনাতন গোস্বামী: বৃহত্তাগবতামৃতম্, বৃহদ্বৈষ্ণবতোষণী
  • বিল্বমঙ্গল: কৃষ্ণকর্ণামৃতম্
  • শ্রীধর স্বামী: ভাবার্থদীপিকা।
  • ঈশান নাগর: অদ্বৈতপ্রকাশ
  • জয়ানন্দ: চৈতন্যমঙ্গল (১৫৬০)।

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল