ফজলুল হকের রাজনৈতিক অভিযাত্রা: উত্থান, শাসন ও বিচ্ছেদের বিস্ময়কর অধ্যায়
আবুল কাসেম ফজলুল হকের (1873-1962) রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল বিশ শতকের শুরুর বাংলায়—তখনকার ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রধান কেন্দ্র, কিন্তু ব্রিটিশদের কৌশলী বিভাজনে অস্থির এক প্রদেশে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল স্পষ্টভাবে ব্রিটিশদের পরিকল্পনা; বাঙালিকে ভাগ করে মুসলিম পৃথকচেতনাকে বাড়ানো এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্বল করাই ছিল উদ্দেশ্য। এই দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতিতেই সামনে এলেন হক—অসাধারণ মেধার এক মানুষ, যিনি উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এমএ এবং পরে আইন ডিগ্রি লাভ করেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে আইনচর্চা ও প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসে চাকরি—সব মিলিয়ে বড় রাজনৈতিক যাত্রার প্রস্তুতি তৈরি হয়েছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর মুসলিম সমাজে যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেটাই তার রাজনৈতিক দীক্ষার প্রথম ভিত।
হকের উত্থান ছিল দ্রুত, বিচিত্র, এবং অনেকটাই তার নিজস্ব রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার ফল। ১৯১৩ সালে হিন্দু-অধ্যুষিত ঢাকা কেন্দ্র থেকে বিধান পরিষদে জয়ী হয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ পরিচিত হয়ে ওঠেন তার তীব্র বক্তৃতা, বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণের দাবি, এবং মুসলমানদের শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ বাড়ানোর পক্ষে সরব হওয়ার মাধ্যমে। একই সময়ে তিনি বুঝেছিলেন—বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের উন্নতি একা সম্ভব নয়; বাঙালি ঐক্য ছাড়া পথ নেই। এই দ্বৈত অবস্থান—নিজ সম্প্রদায়ের জন্য জোরালো দাবি তোলা এবং একই সঙ্গে বাঙালি মিলনের কথা ভাবা—তার রাজনীতির মূল চরিত্র হয়ে ওঠে। তাই তিনি একদিকে মুসলিম লীগের সভাপতি (১৯১৬–২১), অন্যদিকে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (১৯১৮)—দুই শিবিরেই সমান প্রভাবশালী। লখনউ চুক্তি (১৯১৬) তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছাড়া সম্ভব হতো না, যদিও সেখানে বাংলার মুসলমানদের মাত্র ৪০% আসন বরাদ্দ ভবিষ্যতের ক্ষোভের বীজ বুনে দেয়।
১৯২০-এর দশক তাকে দেখাল সাফল্য আর সীমাবদ্ধতা—দুটোই। চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে তার করা ‘বঙ্গ চুক্তি’ (১৯২৩) ছিল এক সাহসী সমঝোতা—মুসলমানদের সরকারি চাকরিতে ৫৫% ভাগ এবং স্থানীয় সংস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব। এটি তখন রাজনীতিতে নতুন জোয়ার তুললেও হিন্দু মহাসভার আপত্তি এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের অনীহায় তা টিকে থাকতে পারেনি। ১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তার কার্যকালও স্বরাজিস্টদের অবরোধে ভেঙে যায়। এরপর তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একা কণ্ঠ হয়ে মুসলমানদের অধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, আর কৃষিজীবী মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরতে থাকেন। নেহরু রিপোর্ট (১৯২৮) তিনি পৃথক নির্বাচকের প্রশ্নে বিরোধিতা করলেও তার রাজনীতি ছিল মাটি-নির্ভর, বাংলার বাস্তবতায় শিকড়-গাঁথা। ১৯২৯ সালে গড়া সর্ববাংলা প্রজা সমিতিই পরবর্তীতে তার গণভিত্তির প্রধান মুখ হয়ে ওঠে।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড তাকে দিল এক ঐতিহাসিক সুযোগ। ২৫০ সদস্যের পরিষদে মুসলমানদের ১১৯ আসন—বেশি হলেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নয়—এই বাস্তবতায় হক তার প্রজা সংগঠনকে রূপ দিলেন কৃষকপ্রজা পার্টিতে (কেপিপি)। জমিদারি শোষণ, কৃষকের দেনাজালে বন্দিত্ব, মহাজনদের অত্যাচার—সব মিলিয়ে তিনি গড়ে তুললেন কৃষক-ভিত্তিক এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কেপিপি ৩৬ আসন পেলেও মুসলিম লীগ পেল ৩৭; কিন্তু ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল হকের কাছেই। তিনি কেপিপি-লীগ জোটের নেতৃত্বে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। জমি সংস্কার, প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, ইসলামিয়া কলেজ স্থাপন—তার শাসন দাগ কাটে। তবে জোটটি ছিল খুবই টানাপোড়েনপূর্ণ—এক পাশে তার কৃষককেন্দ্রিক প্রাজা-রাজনীতি, অন্য পাশে জিন্নাহর কেন্দ্রীয়, সর্বভারতীয় মুসলিম জাতীয়তাবাদ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই দ্বন্দ্বকে প্রকট করল। ১৯৪১ সালে ভাইসরয়ের ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলে যোগ দেওয়াকে তিনি দায়িত্ব মনে করলেও মুসলিম লীগ তা দেখল শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে। জিন্নাহর পদত্যাগের নির্দেশে হকের কঠোর প্রতিক্রিয়া দুই নেতাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে ঠেলে দিল। তিনি জিন্নাহর ওপর “হিটলারি পদ্ধতি” প্রয়োগের অভিযোগ আনেন এবং সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলিম নেতাদের সমালোচনা করেন। বাংলার মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে তিনি দৃঢ় অবস্থান নেন। ডিসেম্বর ১৯৪১-এ তার বহিষ্কার ছিল রাজনৈতিক অর্থে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ। এরপর হক গঠন করেন ‘প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন’—হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে—যা ছিল তার বিশ্বাসের ঘোষণা: বাংলার রাজনীতি বাংলার মিলিত শক্তির মাধ্যমে চলবে।
কিন্তু ১৯৪৩ সালের মার্চে গভর্নরের চাল ও লীগের ভাঙনের ফলে তার মন্ত্রিসভা পড়ে যায়। এরপর লীগ-নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ক্ষমতায় আসে—বাংলার প্রাজা-ভিত্তিক রাজনীতির ওপর সর্বভারতীয় মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিজয় নিশ্চিত হয়। ১৯৪৬ সালে কেপিপির পরাজয় ছিল তার শেষ রাজনৈতিক পতনের সীল। দেশভাগের পর হক ঢাকায় পূর্ববাংলার প্রথম অ্যাডভোকেট জেনারেল হন। এরপরও তিনি থামেননি। পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন এবং পুলিশের আঘাত পর্যন্ত সহ্য করেন। ১৯৫৪ সালে ইউনাইটেড ফ্রন্টকে নেতৃত্ব দিয়ে মুসলিম লীগকে ভরাডুবি করান, যদিও তার মুখ্যমন্ত্রিত্ব দ্রুতই কেন্দ্র বাতিল করে দেয়। শেষদিকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন এবং ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পর গৃহবন্দি অবস্থায় থাকেন।
ফজলুল হকের যাত্রাপথ—হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অন্যতম স্থপতি থেকে বাঙালি মুসলিম আত্মপ্রতিষ্ঠার মুখ, এবং শেষাবধি পাকিস্তানি কেন্দ্রীয়তার কঠোর সমালোচক—মূলত বাংলারই পরিবর্তনশীল ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। তার উত্থানের পেছনে ছিল উচ্চশিক্ষা, মানবিকতা আর কৃষকের দুঃখবোধের গভীর উপলব্ধি। তার পতন এসেছিল এক সর্বভারতীয় মুসলিম জাতীয়তাবাদের কঠোর কেন্দ্রীকৃত রাজনীতির চাপে। তিনি ছিলেন এক বিরল, বহুস্তরীয় চরিত্র—মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও বহিষ্কৃত, একজন মুসলমান হয়েও হিন্দু মহাসভার সঙ্গে জোটনেতা, পাকিস্তানের নাগরিক হলেও বাঙালির মর্যাদার অক্লান্ত রক্ষক।
তার উত্তরাধিকার সেই অজানা পথের স্মৃতি—যেখানে বাঙালিত্ব গড়ে উঠত ভাষা, মাটি, আর মানুষের ন্যায্য অধিকারের ওপর; যে পথ আজও অসম্পূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসে তার প্রতিধ্বনি অম্লান।
৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Read More
- বাংলার ‘দিদি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক আধিপত্য ও ক্ষমতাশিল্প
- কলকাতায় সশস্ত্র মুসলিম দাঙ্গা ও কমিউনিস্ট পার্টি (১৯৪৬)
- শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক জাতিসংঘ ভাষণ (১৯৭৪)
