বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ই
ইউরোপীয় জলদস্যুরা অনেকেই প্রথমে রাজা বা কোম্পানির অনুমোদিত জাহাজে বৈধ নাবিক হিসেবে কাজ শুরু করেছিল, পরে সুযোগ ফুরিয়ে গেলে বা বলপ্রয়োগে বেশি লাভ হলে দস্যুবৃত্তিতে নেমে পড়ে। এই জলদস্যুরা শুধু মুঘল আর মারাঠাদের মতো ভারতীয় শাসকদেরই ক্ষতি করেনি, নিজেদের দেশীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলোকেও (ইংরেজ, ডাচ, ফরাসি) বিপাকে ফেলেছিল। প্রায়ই তারা মাদাগাস্কার দ্বীপকে (Ilha de Madagáscar) ঘাঁটি বানিয়ে ভারতীয়, আরব, এমনকি ইউরোপীয় জাহাজেও হামলা চালাতো।
পর্তুগালের স্কুলবইয়ে বীর নাবিক হিসেবে বর্ণিত ভাস্কো দা গামা আসলে ছিল এক সমুদ্র ডাকাত, যার পথযাত্রা রক্তে লেখা। তার নাম ভারত মহাসাগরের ইতিহাসে এক ক্ষতচিহ্ন—লোভ আর ধর্মীয় উন্মাদনার মোড়কে এক হামলাকারীর প্রতীক।
পর্তুগালে জন্মানো ভাস্কো দা গামা কোনো বণিক পরিবারের সন্তান ছিল না, অন্য ইউরোপীয় জলদস্যুদের মতো সেও সরকারের অনুমতিপত্র বয়ে বেড়াত, যা কার্যত ছিল ডাকাতির লাইসেন্স। ভারত ছাড়াও আফ্রিকার উপকূল জুড়ে তার ডাকাতি চলেছিল। মোজাম্বিক, কেনিয়া, জানজিবার—সবখানেই স্থানীয় সুলতানদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাবিকদের দক্ষতা আর জাহাজ ছাড়া গামার কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না।
১৪৯৭ সালে গামা লিসবন থেকে চারটি ছোট জাহাজ নিয়ে রওনা হয়। খ্রিস্টান দাস বিক্রি করা ছাড়া তার কাছে কোনো প্রকৃত বাণিজ্যিক দ্রব্য ছিল না। খ্রিস্টান দাস, বিশেষ করে মেয়েদের আফ্রিকায় বিক্রি করা ছিল ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে এক লাভজনক ব্যবসা। ইউরোপে তখনই জানা হয়ে গিয়েছিল যে দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল ঘুরে ভারত পৌঁছনোর সমুদ্রপথ রয়েছে। দা গামাই ছিল প্রথম পর্তুগিজ ডাকাত, যে গুজরাটি নাবিকের সাহায্যে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে এসে পৌঁছেছিল। সে না শিক্ষিত ছিল, না প্রশিক্ষিত কোনো পর্তুগিজ নাবিক, তবু কেমন করে যেন গভীর সমুদ্রযাত্রার অনুমতি পেয়ে গেল। পর্তুগাল থেকে খ্রিস্টান মেয়েদের ধরে এনে আফ্রিকায় বিক্রি করা, আর আফ্রিকান দাসদের ধরে এনে পর্তুগালে বিক্রি করা ছিল সে সময়ে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা, আর দা গামা ঠিক এই ব্যবসার ধারাতেই বেড়ে উঠেছিল।
পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে গামার নাবিকরা রোগে ভুগছিল, স্থানীয় সমুদ্রপথ সম্পর্কে কোনো জ্ঞানও গামার ছিল না। মোজাম্বিকের সুলতান তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, সংঘর্ষ বাধে, শেষে পিছু হটতে হয়। মোম্বাসায়ও প্রতিরোধের মুখে পড়ে। অবশেষে মালিন্দিতে এক গুজরাটি নাবিক ও বণিক—কেউ কেউ কানহা, কেউবা ইবন মাজিদ বলে তাকে উল্লেখ করেন—তার সাহায্যে আরব সাগর পার হয়। ভারতীয়দের যন্ত্রপাতি, যেমন মৎস্য যন্ত্র বা প্রাচীন দিকনির্দেশক ছাড়া গামার পক্ষে এমন সমুদ্রযাত্রা অসম্ভব ছিল।
১৪৯৮ সালের ২০ মে গামা কাপ্পাডে, কালীকটের কাছে পৌঁছায়। তখন কালীকট ছিল সামুদ্রিক বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র, যেখানে আরব, চীনা, পারসিক ও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আসত। রাজা সমুদ্রিন (জমোরিন) প্রথমে তাকে বাণিজ্যের অনুমতি দেন, কিন্তু সোনা বা মূল্যবান দ্রব্য দিতে না পারা এবং তার উদ্ধত আচরণ সন্দেহ জাগায়। কিছুদিনের মধ্যেই তাকে আটক করা হয়, পরে আলোচনার মাধ্যমে ছাড়া পায়। গামার —সস্তা কাপড়, প্রবাল আর পিতলের জিনিসপত্র—তা স্থানীয় অভিজাতদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়।
রাজা সমুদ্রিন জানতে পারেন যে ভাস্কো দা গামা আসলে খ্রিস্টান দাসী মেয়েদের ব্যবসায়ী এবং সে কেরলের বাজারে দাস ব্যবসার জন্যই খোঁজখবর করছে—আফ্রিকান দাসী হোক বা ইউরোপীয় খ্রিস্টান মেয়েই হোক। এই খবর শুনে রাজা প্রবল ক্রুদ্ধ হন এবং গামাকে এক স্থানীয় দুর্গা মন্দিরে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলেন। সেই মন্দিরে ছিল পার্বতীর মূর্তি, কোলে কার্তিকেয়। গামা সেই প্রতিমাকে ভেবে বসে মেরি ও শিশু যিশু, আর সেখানেই প্রণাম করে ক্ষমা ভিক্ষা চায়। পরে যখন সে নিজের ভুল বুঝতে পারে, দ্বিতীয় আক্রমণের সময় সেই মন্দির ধ্বংস করে দেয়। পরে সেই স্থানের উপরই একটি ক্যাথলিক গির্জা (Igreja católica) নির্মাণ করা হয়। তাই আবারও মনে রাখতে হবে, দা গামা কোনো নতুন জগতের ‘আবিষ্কারক’ ছিল না, বরং এক জলদস্যু এবং দাস ব্যবসায়ী।
সমুদ্রিন ভাস্কো দা গামাকে কেরলের তীর থেকে তাড়িয়ে দেন এবং তাড়া করতে করতে তানজানিয়া পর্যন্ত পাঠান। তার জাহাজ ছিল বহুতল, দ্রুতগামী আর শক্তপোক্ত, যা ইউরোপীয় কারাভেলকে অনেকাংশেই তুচ্ছ করে দিত। গামা পালিয়ে মাদাগাস্কারে গিয়ে কিছু মসলা ঋণে কিনে আনে এবং লিসবনে গিয়ে বিক্রি করে লোকজনকে বোঝায় যে সে নাকি সমুদ্রপথে সত্যিই ভারতে পৌঁছেছে। কিন্তু দেশে ফিরে তাকে কেউ বিশেষভাবে স্বাগত জানায়নি; বরং ঋণদাতারা তার কাছে ধার শোধ করার দাবি তোলে। এই বিচারের হাত থেকে বাঁচতে গামা এক নতুন পরিকল্পনা করে—সে ভারত আক্রমণের ছক কষে এবং দ্বিতীয় যাত্রার জন্য বিপুল ঋণ নেয়।
১৫০২ সালে গামার দ্বিতীয় যাত্রায় সে সশস্ত্র বহর নিয়ে আসে, সমুদ্রে নিরস্ত্র ভারতীয় ও আরব জাহাজে হামলা চালায়। মক্কাগামী মুসলিম তীর্থযাত্রীদের ভরা মিরিম নামের জাহাজ দখল করে ৪০০ জন নারী-পুরুষ-শিশুকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করা হয়। সমুদ্রিন (জমোরিন) বন্দর শুল্ক দাবি করেছিলেন— কিন্তু গামা শহরের উপর গোলাবর্ষণ, হিন্দু এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের বাড়িঘর ধ্বংস করে। গোয়াতেও সে মন্দির ধ্বংস, পুরোহিত হত্যা করে, মুহাম্মদ ঘুরির মতো তার দস্যু স্বভাব প্রকাশিত হয়ে পরে (a sua natureza exposta como Muhammad Ghuri)।
১৪৫২ আর ১৪৯৩ সালের পোপের ফরমান—Romanus Pontifex আর Inter Caetera—খ্রিস্টান রাউরোপীয় জলদস্যু ভাস্কো দা গামাজাদের অনুমতি দেয় অখ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ চালাতে, দখল নিতে আর দাসে পরিণত করতে। এই মতবাদ যেমন আমেরিকা আর আফ্রিকায় প্রয়োগ করা হয়েছিল, তেমনি এশিয়াতেও পর্তুগিজ আগ্রাসনের ভিত্তি হয়েছিল। এই “ডকট্রিন অব ডিসকভারি” পরবর্তীতে মার্কিন আইনের ইতিহাসেও স্বীকৃত হয় (যেমন Johnson v. M’Intosh, ১৮২৩ মামলায়), যেখানে বলা হয় খ্রিস্টান ইউরোপীয়রা অখ্রিস্টান ভূমির উপর বৈধ দাবি করতে পারে।
পর্তুগালে ফিরে গিয়ে গামা ঋণ শোধ না করতে পারায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। গামা বিভিন্ন অপরাধিক কার্যের জন্যবিচারাধীন হয়েছিল এবং প্রায় কুড়ি বছর ধরে দণ্ডিত অবস্থায় কাটিয়েছিল। আনুমানিক ১৫২০ সালের দিকে সে পর্তুগালে মারা যায়। আশ্চর্যের বিষয়, এই অপরাধীকেই ক্যাথলিক চার্চ নায়ক হিসেবে তুলে ধরে, যেন সে নাকি “ভারত আবিষ্কারক।” তাকে সন্ত ঘোষণার পরিকল্পনাও হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৫০২ সালের অভিযানে গামা কেরলের ক্ষত্রিয় রাজা সমুদ্রিনকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে পর্তুগালের রাজা কর্তৃক নিযুক্ত আফোঁসো দে আলবুকার্ক ১৫০৯ সালে গোয়া দখল করে একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যা টিকে ছিল ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। এদিকে বাংলার হুগলিতে পর্তুগিজ জলদস্যুরা তাদের কুঠি গড়ে তোলে, যেখান থেকে তারা স্থানীয় রাজা, হিন্দু ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সমুদ্র ডাকাতি চালাতে পারত।
পর্তুগিজরাই প্রথম ইউরোপীয় শক্তি (potência europeia) যারা হুগলি নদীর তীরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। ১৫৭৯–৮০ সালে সম্রাট আকবরের অনুমতিতে তারা সেখানে উপনিবেশ গড়ে তোলে, যা ধীরে ধীরে বান্ডেল এলাকায় প্রসারিত হয়। তবে তাদের জলদস্যুতা, চোরাচালান আর দাস ব্যবসার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। অবশেষে ১৬৩২ সালে সম্রাট শাহজাহান হুগলিতে আক্রমণ চালান এবং পর্তুগিজদের উৎখাত করেন।
১৬৩২ সালে সম্রাট শাহজাহান কাসিম খানকে আদেশ দেন হুগলির বান্দেল–চুঁচড়া অঞ্চলে পর্তুগিজদের উপর আক্রমণ চালিয়ে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করতে। সেই অভিযানের পর ওই এলাকায় আর একটি পর্তুগিজ ডাকাতও অবশিষ্ট ছিল না। হুগলি তখন ভূরশুট রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলায় ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের আগে বাইবেল প্রবেশ করতে পারেনি। এই সময়ে পর্তুগিজরা ব্যান্ডেলে একটি ছোট গির্জা (a igreja cristã) নির্মাণ করেছিল, তবে সেটি দাঁড়িয়েছিল সেই পুরনো পোড়া ব্যারাকের জায়গায়, যা একসময় জলদস্যু পর্তুগিজদের ঘাঁটি (base pirata portuguesa) ছিল এবং যেটি ১৬৩২ সালে শাহজাহানের অভিযানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আজ সেখানে সাঁওতাল, খড়িয়া প্রভৃতি সম্প্রদায়ের কিছু ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান মানুষ উপাসনা করে, কিন্তু ব্যান্ডেলে কোনো পর্তুগিজ আর নেই। ব্যান্ডেল আসলে ছিল প্রাচীন বন্দঘাটির অংশ, যা আদি সপ্তগ্রামের অধীনে পড়ত এবং গৌড় যুগে একটি খ্যাতনামা বন্দর ছিল। পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রি.) পর কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ইংরেজদের পক্ষে দাঁড়ান এবং তিনি নিশ্চিত করেন যে হুগলি জেলায় যেন আর একটিও দস্যুপ্রকৃতির পর্তুগিজ বসবাস করতে না পারে।
ভারতে খ্রিস্টীয় বাইবেলের প্রবেশ আসলে অনেক দেরিতে হয়েছিল। ল্যাটিন ভাষায় বাইবেল ভারতে আসে উদয়ম্পেরুর সিনড বা ডায়ম্পেরের ধর্মসভার (১৬০০ খ্রিস্টাব্দে) পর। এর আগে গোয়া বা কেরলসহ ভারতের কোথাও কোনো ভাষায় বাইবেল (Bíblia Cristã) প্রচলিত ছিল না। বাইবেলের কোনো কপি সাধারণ মানুষের হাতে আসেনি। উদয়ম্পেরুর সিনডের পর থেকেই প্রথমবারের মতো ল্যাটিন বাইবেল কেরলে প্রবেশ করে, এবং সেখান থেকেই ক্রমান্বয়ে ভারতে বাইবেলের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়।
প্রায় ৪৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে যে নেস্টোরিয়ান বা নাজারিন খ্রিস্টানরা কেরলে এসে বসতি গড়েছিল, পরবর্তীতে পর্তুগিজ জলদস্যুরা (১৫৫০-১৫৯৯ খ্রি) তাদের উপর ভয়াবহ দমননীতি চালায়। তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া হয়, নারীদের উপর নৃশংসতা চালানো হয়, প্রার্থনালয়গুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরপর গোয়ার আর্চবিশপ আলেইক্সো দে মেনেজেস জোর করে অবশিষ্ট সম্প্রদায়কে পোপের অধীনে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার চেষ্টা করে। বেশিরভাগই সেই রূপান্তর মেনে নিলেও অল্প কিছু নেস্টোরিয়ান তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যায় এবং তারা স্বতন্ত্রভাবে সিরিয়াক গির্জা (Church) প্রতিষ্ঠা করে। এই সিরিয়াক খ্রিস্টীয় ধারাই আজও বহুরূপে কেরলে টিকে আছে। তারা লাতিন বাইবেলকে সিরিয়াক ভাষায় পড়তে শুরু করে।
১৯৬১ সালে অপারেশন বিজয় চালিয়ে ভারত অবশেষে গোয়া মুক্ত করে।
