শরৎচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ বিরোধ

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র: শিক্ষা, স্বরাজ ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক বিরোধ

১৯২০-২১ সালের সময়কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে যে তীব্র মতভেদ ও প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়, তার কেন্দ্রে ছিল “শিক্ষা” ও “স্বরাজ” বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। রবীন্দ্রনাথ তখন পশ্চিমে ভ্রমণরত, আর দেশে শুরু হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন। বিদেশে থেকেই তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ১৯২১ সালের ১৬ই জুলাই দেশে ফিরে এসে শান্তিনিকেতনে ‘শিক্ষার মিলন’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন, যেখানে তিনি পশ্চিমের শিক্ষা ও সত্য বিদ্যার প্রশংসা করেন এবং প্রত্যক্ষভাবে অসহযোগ আন্দোলনের সমালোচনা করেন।

‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য ছিল, পশ্চিম আজ যে প্রগতির শিখরে পৌঁছেছে, তা কেবল তাদের সত্য বিদ্যার কারণে। তিনি বলেন—
“বিশ্বকে ভোগ করার অধিকার ওরা কেন পেয়েছে? নিশ্চয় যে-কোনও একটা সত্যের জোরে।”

এই বক্তব্যটি কংগ্রেসী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শরৎচন্দ্র তখন হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি। তিনি এই প্রবন্ধের প্রতিবাদে লেখেন ‘শিক্ষার বিরোধ’ নামে বিখ্যাত প্রতিবাদ-প্রবন্ধ। শরৎচন্দ্র সেখানে লেখেন—
“পশ্চিম যদি আজ জয়ী হয়ে থাকে, কেবলমাত্র জয় করেছে বলে সেই বিদ্যাটাও সত্য বিদ্যা, অতএব শেখা চাই-ই— এ কথা কোনমতেই মানা যায় না।”

শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের উদাহরণকে পাল্টা উদাহরণ দিয়ে বলেন, দুর্যোধন একদিন পাশাখেলায় জয়ী হয়েছিল বলে তো যুধিষ্ঠির সারাজীবন পাশাখেলা শিখতে বসে থাকেননি! জয়, লোভ ও শক্তির পিছনে সত্য থাকতে হবে এমন কথা নেই।

এই বিতর্ক শুধু প্রবন্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। কলকাতার বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতিতে বক্তৃতা, সংবাদপত্রে লেখালিখি, আড্ডায়-আলোচনায় তা তীব্রভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে। ভারতী ও গজেনদার আড্ডা ছাড়াও এমনকি ঠাকুরবাড়ির উঠোনে পর্যন্ত কংগ্রেস কর্মীরা বিলিতি কাপড় পোড়ান।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ আবার ‘সত্যের আহ্বান’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি চরকা ঘোরানো, বিলিতি কাপড় পোড়ানো ইত্যাদি গান্ধীয় কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করেন। এই প্রবন্ধ প্রকাশের পর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (২ অক্টো১৮৬৯ – ৩০ জানু ১৯৪৮) রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে আসেন বিচিত্রা ভবনে। সেই সাক্ষাৎকার চার ঘণ্টা স্থায়ী হয়, তবে তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।

১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে শরৎচন্দ্রের ‘শেষ অভিমান’ ধরণের একটি ঘটনা ঘটে। তিনি নাটক ‘ষোড়শী’ রচনা করেন, যা তাঁরই ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাস অবলম্বনে। শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেন, নাটকের জন্য কয়েকটি গান লিখতে। রবীন্দ্রনাথ অসুস্থতার কারণে সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এতে শরৎচন্দ্র ভীষণ মনক্ষুণ্ণ হন এবং তাঁকে ১৬ জানুয়ারি ১৯২৪ তারিখে একটি চিঠিতে লিখেন—
“তবুও ভাবলাম, গান লেখা তো কথাবার্তার মতো, যা আপনি প্রায়ই করেন; তার মধ্যে একটু লিখে দিলেই চলত। আমার বইটা আপনার গানের ছোঁয়ায় সফল হত।”

এই ঘটনার পর শরৎচন্দ্র দীর্ঘদিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আর কোনো চিঠিপত্র চালাননি বলে জানা যায়।

রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র বিরোধের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘পথের দাবী’ উপন্যাস। এটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রকে একটি চিঠি লেখেন (২৭ মাঘ, ১৩৩৩), যেখানে লেখেন—
“ইংরেজরাজ যদি তোমার বই প্রচার বন্ধ না করে দিত তাহলে এই বোঝা যেত যে সাহিত্যে তোমার শক্তি ও দেশে তোমার প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে তার নিরতিশয় অবজ্ঞা ও অজ্ঞতা।”

এই চিঠির উত্তরে শরৎচন্দ্র ২ ফাল্গুন, ১৩৩৩ তারিখে দীর্ঘ এক পত্রে লেখেন—
“বাংলাদেশের গ্রন্থকার হিসেবে গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যের আশ্রয় না নিয়ে থাকি, এবং তৎসত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তিভোগ করতে হয়, তবে করতেই হবে।”

তিনি আরও বলেন, প্রতিবাদ শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়, জাতির পক্ষেও অপরিহার্য।

এই চিঠিপত্র বিনিময়ের মাধ্যমে দুই মহাপুরুষের চিন্তার জগতের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পশ্চিমা শিক্ষা ও সহিষ্ণুতার কথা বললেও শরৎচন্দ্র ছিলেন মূলত সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, যেখানে শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নীতিকে তিনি স্বীকার করেছিলেন।

তথ্যসূত্র:

১) ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ – বিষ্ণু প্রভাকর (অনুবাদ-দেবলীনা ব্যানার্জি কেজরিওয়াল; ওরিয়েন্ট লংম্যান, মহালয়া ১৩৪৮)
২) শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন – শচীননন্দন চট্টোপাধ্যায় (ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং প্রাঃ লিঃ; মাঘ ১৩৮৩)
৩) শরৎচন্দ্র ও মানবতাবাদ – আবদুল হালিম (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা: ফাল্গুন ১৩৮৯)
৪) ভারতের মুক্তিসংগ্রামে বাংলা – কৃষ্ণ ধর (তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)
৫) শরৎ ও স্মৃতি – বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত (সাহিত্যম, বৈশাখ ১৩৯৬)
৬) Rabindranath Tagore’s Collected Letters, Visva-Bharati, 1961
৭) Sarat Chandra Chattopadhyay Rachanasamagra, Ananda Publishers, কলকাতা, ১৯৯২


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল