চণ্ডীদাস সমস্যা

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

চণ্ডীদাস সমস্যা

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আবিষ্কার ও পদাবলি-সংগৃহীত চণ্ডীদাস নামধারীদের পরিচয়-সংকট

বাংলা সাহিত্যচর্চায় “চণ্ডীদাস” নামটি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র পদাবলির প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে “চণ্ডীদাস” নামাঙ্কিত বহু পদ আবহমান কাল ধরে লোকমুখে প্রচলিত ছিল। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হবার পর চণ্ডীদাস নামটি ঘিরে এক জটিল পাণ্ডিত্যসমস্যার সৃষ্টি হয়, যা সাহিত্য-ইতিহাসে “চণ্ডীদাস সমস্যা” নামে পরিচিত।

এই সমস্যার মূল উৎস—একাধিক সাহিত্যকর্মে “চণ্ডীদাস” নামে পদলিপির উপস্থিতি, অথচ তাদের ভাষা, শৈলী, ভাব ও কাব্যনির্মাণরীতি স্বতন্ত্র।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বড়ু চণ্ডীদাস

প্রথমত, ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ যশোহর জেলার অন্ধিরপাড়া গ্রামে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে একটি পুথি আবিষ্কার করেন, যার রচয়িতার নামপত্রে “বড়ু চণ্ডীদাস” উল্লেখ ছিল। এই পুথিতে মোট ৪১৭টি পদ সংকলিত, যেগুলিতে রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্ক এবং বৈষ্ণব দেহতত্ত্ব এক অনাড়ম্বর, যৌন ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হয়েছে। ভাষা ছিল বাংলার আদিরূপ এবং রচনাশৈলী নাট্যধর্মী ও সংলাপপ্রধান।

পদাবলির দ্বিজ চণ্ডীদাস

তবে বাংলার পদাবলি-সংকলনে প্রচলিত চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত কবিতাগুলির ভাষা, ধ্বনি, অলংকার ও রস-প্রকাশ ভিন্নতর। দীনেশচন্দ্র সেন ও অন্য অনেক গবেষক এইসব পদগুলিকে এক অন্য চণ্ডীদাসের রচনা হিসেবে শনাক্ত করেন, যিনি সম্ভবত ছিলেন দ্বিজ চণ্ডীদাস। তাঁর রচনায় রাধাকৃষ্ণের রসলীলা রয়েছে এক আবেগময়, নান্দনিক, কল্পরস-ঘন বর্ণনায়। চৈতন্য-পরবর্তী বৈষ্ণব পদাবলির ধারায় এ পদগুলি অধিক আত্মীকৃত।

ড. দীনেশচন্দ্র সেন প্রথমে বড়ু চণ্ডীদাস ও দ্বিজ চণ্ডীদাসকে একই ব্যক্তি বলেই মতপ্রকাশ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, চণ্ডীদাস একজনই, এবং ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ তাঁরই একটি ব্যতিক্রমধর্মী রচনা। তবে পরবর্তীতে ভাষাতাত্ত্বিক, শৈল্পিক ও ভাবগত বিশ্লেষণ এই অনুমানকে দুর্বল করে তোলে।

দীন চণ্ডীদাসের আবিষ্কার

১৯৪১ সালে পণ্ডিত মণীন্দ্রনাথ বসু একটি নতুন চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত পুথির সন্ধান দেন, যেখানে যে কাব্যাংশগুলি পাওয়া যায়, তা না তো বড়ু চণ্ডীদাসের মতো নাট্যধর্মী, না তো দ্বিজ চণ্ডীদাসের মতো রসালংকৃত। এই কবিকে বলা হয় দীন চণ্ডীদাস, এবং গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী তিনি পূর্ব বঙ্গে (সম্ভবত ময়মনসিংহ অঞ্চলে) বসবাস করতেন এবং তাঁর ভাষা কিছুটা সহজিয়া ও পালাগানধর্মী।

তিন চণ্ডীদাস: পণ্ডিতসম্মত সিদ্ধান্ত

এই তিন পৃথকধর্মী সাহিত্যিক রীতির উপর ভিত্তি করে আধুনিক গবেষকরা তিনজন পৃথক চণ্ডীদাসের অস্তিত্বে একমত হন। তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিম্নরূপ:

  1. বড়ু চণ্ডীদাস – শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা; রচনা নাট্যনির্মিত, দেহতত্ত্বভিত্তিক, মধ্যবাংলার আদিরূপে গঠিত।
  2. দ্বিজ চণ্ডীদাস – প্রচলিত পদাবলির কবি; বৈষ্ণব প্রেমরস ও কাব্যশৈলীর ঐতিহ্যে শ্রেষ্ঠ প্রতিভা।
  3. দীন চণ্ডীদাস – কাব্যিক ও ভাবগতভাবে উভয়ের চেয়ে স্বতন্ত্র, সহজিয়া প্রবণ ও পালারীতি সংবলিত পদরচয়িতা।

সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার তাৎপর্য

চণ্ডীদাস সমস্যা বাংলা সাহিত্যচর্চায় একটি গবেষণার ক্ষেত্র উন্মোচন করে। এটি বাংলা ভাষার শৈল্পিক বিবর্তন, আঞ্চলিক ভাষারূপ, ধর্মতাত্ত্বিক ভাবচর্চা এবং পদাবলির নন্দনতত্ত্ব—এই সবের সন্ধান ও পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্র তৈরি করে। তিনজন পৃথক চণ্ডীদাসকে স্বীকার করায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ভাষা ও রীতির ভিন্নতাসমূহ নতুন দৃষ্টিকোণ পায়।

প্রামাণ্য গ্রন্থ ও সূত্র

  1. বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ (সম্পা.): শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯১৬
  2. দীনেশচন্দ্র সেন: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯২০
  3. মণীন্দ্রনাথ বসু: দীন চণ্ডীদাসের পদাবলি, ১৯৪১
  4. সুকুমার সেন: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি
  5. Edward C. Dimock: The Place of the Hidden Moon, University of Chicago Press
  6. Mohitlal Majumdar: Bangla Padavali Sahitya, Calcutta University
  7. Narayan Gangopadhyay (সম্পা.): চণ্ডীদাস: কবি ও সমস্যা, বিশ্বভারতী গ্রন্থবিভাগ

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল