ভগবত গীতা এবং ভাগবত পুরাণ বিমর্ষ

ভগবত গীতা এবং ভাগবত পুরাণ বিমর্ষ

গীতায় ঈশ্বরতত্ত্ব, ভাগবতে লীলার মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রাপ্তির জ্ঞানতত্ত্ব — ভক্তি, সত্য ও আত্মবিলয়ের সাহিত্যিক পর্যালোচনা।

ভগবদ্‌গীতা ও ভাগবতপুরাণ এই উভয় গ্রন্থের মূলতত্ত্ব ও উদ্দেশ্যদ্বয় সমূহ বিচিত্রভাবে পৃথক, যদিও দুইটি গ্রন্থেই ভগবানের নিকটবর্তী হওয়ার সাধনপথ পরিগ্রথিত। প্রাচীন ভারতীয় সাধনসংস্কৃতির ধারায়, মহাভারতের একটি সামরিক দর্শন-নির্মিত অংশকে যখন কিছু বিশিষ্ট ব্যাখ্যাতা ও পণ্ডিতবর্গ স্বাধীনভাবে পাঠোদ্ধার করিলেন, তখন তাহার নাম রাখিলেন “ভগবদ্‌গীতা”, অর্থাৎ ‘ঈশ্বর-কথিত জ্ঞানোপদেশ’। অপরদিকে, পৌরাণিকগণ ও কাহিনিকারের দল যখন রাজসভা ও জনসমাজে বিষ্ণুকথা প্রচার করিতে লাগিলেন, তখন তাহারা যাহা হইতে সর্বোৎকৃষ্ট অভিজ্ঞান ও অনুধ্যান লাভ করেন, তাহা ভাগবতপুরাণ নামে খ্যাত হইল।

পুরাণ শব্দের মূল অর্থ—সেই সকল প্রাচীন উপাখ্যান, যাহার কাল নির্ধারণ সম্ভব নহে, যাহা ইতিহাস নহে, ইহা স্মৃতি-প্রথার অন্তর্গত। বৈদিক যুগ হইতে উচ্চ বৈদিক সংস্কৃতির পরিণত অবধি স্মৃতি-সংবাহিকা এক অগ্রগণ্য অনুশাসনরূপে বিবেচিত হইত। শ্রুতি যেমন শ্রবণযোগ্য, স্মৃতিও ছিল স্মরণযোগ্য—কিন্তু কোন স্মৃতি স্মরণীয়, ইহাই ছিল বিতর্কযোগ্য। বৌদ্ধ সাহিত্যে পালি “আট্‌ঠকথা” নামে যাহা প্রচলিত, তাহা মূলত সংস্কৃত “হট্টকথা”র পরিণতি, অর্থাৎ বাজারের লোককথা, বণিকগণ হইতে সংগৃহীত উপাখ্যান।

এইসব স্মৃতি আবার তিন ভাগে বিভক্ত হইত—শ্রুতি, ইতিহাস-পুরাণ-ও বাক্-বাক্য। ইতিহাস, যাহা ক্রমবদ্ধ সময়রেখায় সংহত, পুরাণ, যাহা প্রথাগত কাহিনিরাশির রূপ, ও বাক্-বাক্য, যাহা হট্টকথার সমতুল্য, যাহারা এক প্রকার আখ্যান হইবে।

ভগবদ্‌গীতা এক সরল অথচ গভীর বাক্য-প্রবাহ, যাহা ‘ঈশ্বর’ স্বয়ং কহিয়াছেন—আর ভাগবতপুরাণ এক বিশাল ধ্যান-সম্বলিত আখ্যান-কাব্য, যাহাতে ভক্তগণ ‘ঈশ্বরের’ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করিয়াছেন। গীতায় ভগবান বক্তা, ভাগবতে ভক্তরা বক্তা। একত্রে উভয়েই চিরসত্যের সন্ধান করে, কিন্তু দৃষ্টিকোণ ভিন্ন—একটি ঈশ্বরকেন্দ্রিক, অপরটি ভক্তকেন্দ্রিক।

বৈদিক ঋষিসম্প্রদায়ে অপৌরুষেয় স্মৃতির শ্রবণ অপরিহার্য; ইহাতে বেদসংহিতা, বেদাঙ্গ (ব্যাকরণ, শব্দকোষ, গণিত-জ্যামিতি, যুদ্ধনীতি, কৃষি, পশুপালন, চিকিৎসা, রন্ধনশিল্প ও স্থাপত্যবিদ্যা) অন্তর্ভুক্ত। কৌটিল্য বিষ্ণুগুপ্ত (৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পরে শিক্ষাক্ষেত্রকে তিন বিভাগে শ্রেণীবদ্ধ করেন—ত্রয়ী (বেদ), বার্ত্তা (জীবনোপায়), দণ্ডনীতি (রাষ্ট্রনীতি)। পিশুন (পণ্ডিত নারদের ডাক নাম) ও বৃহস্পতির ঐতিহ্য অনুসরণে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় এই শিক্ষাদানের শ্রেষ্ঠতর প্রতিষ্ঠান ছিল। বিক্রমাদিত্যের সময়ে (খ্রি.পূ. ১০০–৫৭) উজ্জয়িনীতে দশবিদ্যা (চতুর্বেদ ও ষড়্বেদাঙ্গ) শিক্ষা দান করা হইত। শুক্র বা ম্লেচ্ছ নীতি ভারতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল এবং প্রাচীন পারস্যের জরাথুষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত হইয়াছিল ।

অপেশাদার বক্তাগণ, যাহারা সাধারণতঃ শূদ্র, কেবল কাহিনিকথকতার পেশা গ্রহণ করিয়া রাজসভায় ‘চাটভাট’ নামে পরিচিত হইতেন, তাহারাই সাধারণত পুরাণ কথা শুনাইতেন। পুরান শুনিবার উৎকৃষ্ট অবসর ছিল দ্বিপ্রহর অন্ন গ্রহণ করিবার পর । ভগবদ্‌গীতা, মহাভারতের এক প্রভূত ও জটিল দার্শনিক অংশ, সঞ্জয় নামক রাজদাস কর্তৃক অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি উপস্থাপিত হইতেছিল। এই মহাভারতের অন্তর্গত কথোপকথনের মহাকাব্যিক কাঠামো বৈশম্পায়ন ও লোমহর্ষের বর্ণনা যোগে, শিক্ষিত শ্রোতৃবর্গের নিকট সুস্পষ্টরূপে আত্মপ্রকাশ করিত। মহাভারতের স্রোতা বর্গ হইতেন সাধারণত পুরুষ শ্রেণী।

কথিত আছে, মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, যিনি ব্রাহ্মণ পরাশর মুনি ও সত্যবতী নামক শূদ্রনারীর গর্ভজাত সন্তান (মনুসংহিতায় নিষাদরূপে উল্লেখিত) । নিষাদজাতির বর্ণ ‘কৃষ্ণ’ বলিয়া উল্লেখিত হইয়াছে; সুতরাং ‘কৃষ্ণদ্বৈপায়ন’ নামটির অন্তর্নিহিত অর্থ হইতেছে—নিষাদদ্বৈপায়ন। তিনি স্বীয় অধ্যয়ন ও তপশ্চর্যায় ব্রাহ্মণ্যত্ব অর্জন করেন। ‘ব্রহ্ম’ অর্থ—শিক্ষা বা জ্ঞান। প্রকৃত ব্রাহ্মণ্যতা জন্মগত নহে, জ্ঞানের দ্বারা আরূঢ়। বেদ অপৌরুষেয়—ইহার অর্থ, বেদ কোন মানবচিন্তিত রচনা নহে; ইহার ভাষা এবং ভাব—উভয়ই কেহ রচনা করে নাই। জগতের এবং মানবচেতনার জন্মমুহূর্তেই এই বেদ-সত্য অনুধ্যানযোগে প্রাপ্ত হইয়াছে। অর্থাৎ, বিশ্বসৃষ্টির লগ্নেই এই জ্ঞান ঋষিদিগের ধ্যানচক্ষু দ্বারা উপলব্ধ হইয়াছে।

বেদ অন্তঃস্থিত দেবতা ও ছন্দ সহিত প্রকাশিত হইল। বিশ্বামিত্র তপস্যায় গায়ত্রী ছন্দ দর্শন করিলেন—”तत्सवितुर्वरेण्यं भर्गो देवस्य धीमहि धियो यो नः प्रचोदयात्”(ঋগ্বেদের ৩.৬২.১০ অন্তর্ভুক্ত) “আমরা সেই পরম সত্য সবিতা দেবতার তেজস্বী আলোকে ধ্যান করি, যিনি আমাদের বুদ্ধিকে সৎপথে প্রেরণা দান করুন।”—তৎ (সত্য), সবিতা (নাম), দেবতা তাহার তেজ (ভর্গ), এবং ধ্যানই সাধনার পথ। ইহাই ঈশ উপনিষদে ঈশ্বরের রূপে পরিগৃহীত।

বেদান্তীরা পরিমিত মানবস্থিতি ও ঈশ্বরের মধ্যবর্তী ব্যবধান পরিপূরণ করিবার জন্য মায়া নামক কৌশল অবলম্বন করেন। ভগবদ্‌গীতায় উল্লেখ—”ঈश्वর সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেऽর্জুন তিষ্ঠতি, ভ্রাময়ন্‌ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।” এই বচনেই ঈশ্বর ও মায়ার নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক ব্যাখ্যাত।

ভাগবতপুরাণ, অপরদিকে, বহু পরে বোপদেব নামক এক কাব্যপ্রতিভা ও ব্যাকরণাচার্য কর্তৃক সংকলিত বলিয়া বিবেচিত (খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর পরবর্তী কাল)। শঙ্করাচার্য ও রামানুজাচার্য ইহা উল্লেখ করেন নাই, যদিও বিষ্ণুপুরাণ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেন। সুতরাং প্রশ্নের উপসম হয়—যদি কৃষ্ণদ্বৈপায়নই মহাভারতের রচয়িতা, তবে কেন তিনি পুনরায় ভাগবতপুরাণ রচনা করিবেন?

ভাগবতপুরাণের প্রস্তাবনাশ্লোক—”জন্মাদ্যস্য যতোऽন্বয়াদিতরতশ্চার্থেষ্বভিজ্ঞঃ স্বরাট্…”—বিপুল দার্শনিক মূল্যধারক। সমগ্র সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় এক চৈতন্যময়, স্বয়ংপ্রকাশস্বরূপ সত্তার দ্বারাই নিকাশিত; যাহা মায়ার অন্তরালে রহিত, সৎ-অসতের পার্থক্যে বিহ্বল নহে। পরম সত্যরূপে ‘ধাম্না স্বেন সदा নিরস্তকুহকং সত্যং পরং ধীমহি’। এই ‘ধাম’ ঈশ্বর স্বয়ং, তাহার আবাস ও ব্যক্তিসত্তা অভিন্ন।

জন্মাদ্যস্য যতোऽন্বয়াদিতরতশ্চার্থেষ্বভিজ্ঞঃ স্বরাট্‌ তেনে ব্রহ্ম হৃদা য আদিকবয়ে মুহ্যন্তি যত্সূরয়ঃ। তেজোবারিমৃদাং যথা বিনিময়ো যত্র ত্রিসর্গোऽমৃষা ধাম্না স্বেন সদা নিরস্তকুহকং সত্যং পরং ধীমহি॥”—এই শ্লোক শ্রীমদ্ভাগবতের প্রারম্ভে প্রতিষ্ঠিত হইয়া সমগ্র পুরাণকাহিনীর আধ্যাত্মিক ভিত্তি প্রদান করে। ইহাতে সেই পরম সত্যস্বরূপ ঈশ্বরের ধ্যান প্রস্তাবিত, যাঁহার হইতে জগতের আদিসৃষ্টি, স্থিতি ও লয় সমূহ প্রসূত; যিনি সর্বপ্রকার তত্ত্ববস্তুর জ্ঞাত, চৈতন্যময়, স্বতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসিত; যিনি ব্রহ্মাকে, আদিকবিদের মধ্যে প্রথম, অন্তঃপ্রেরণার দ্বারা বেদজ্ঞানে প্রজ্জ্বলিত করিয়াছেন; যাঁহার গূঢ়তত্ত্ব উপলব্ধি করিতে সূর্যসম বিদ্বান্‌গণও বিভ্রান্ত হন; যাঁহার মধ্যে, তেজ, জল ও মৃত্তিকার পারস্পরিক বিভ্রমের ন্যায়, জগৎ তিনটি অবস্থায়—জাগৃতি, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি—ভ্রান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায়, যদিও তাহা মিথ্যা, তথাপি সেই মায়িক সৃষ্টিতে সত্যস্বরূপ প্রতিভাত হয়, কারণ তাহার আধার, ঈশ্বর স্বয়ং, চিরকাল স্বীয় জ্যোতিরূপ ধামে বিরাজমান, যিনি সকল কুহক হইতে নিবৃত্ত, চিরসত্যস্বরূপ পরমাত্মা। এইরূপ সেই নিরস্তমায়া, নিরবচ্ছিন্ন, অপৌরুষেয়, পরব্রহ্মতত্ত্বের উপাসনাই ভাগবতের মূল উদ্দেশ্য, যাহা উক্ত শ্লোকের “সত্যং পরং ধীমহি” ইত্যাদি পদে পরিস্ফুট। এই একশ্লোকের মধ্যেই, দার্শনিক, শাস্ত্রীয় ও কবিতাত্ম সৌন্দর্য ত্রিবিধ তত্ত্বের সংহতিতে সংযোজিত, যাহা ভারতীয় ভাবদর্শনের এক অনুপম নিদর্শন।

পরবর্তী শ্লোক—“ধর্মঃ প্রোজ্জিতকৈতবোऽত্র পরমঃ নির্মত্সরাণাং শতাম্‌। বেদ্যং বাস্তবমত্র বস্তু শিবদং তাপত্রয়োন্মূলনম্‌। শ্রীমদ্ভাগবতে মহামুনিকৃতে কিম্‌ বা পরৈরীশ্বরঃ। সদ্যো হৃদ্যবরুধ্যতেऽত্র কৃতিভিঃ শুশ্রূষুভিস্তৎক্ষণাত্‌॥”—ইহা শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বিতীয় শ্লোক, যাহাতে উক্ত পুরাণগ্রন্থের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি ও শ্রবণমূল্য স্বয়ং প্রতিপন্ন। এই শ্লোক অনুসারে, মহামুনি কর্তৃক সংকলিত এই ভাগবতপুরাণ কেবলমাত্র সেই ধর্ম অবলম্বন করে, যাহা মোক্ষসাধনায় ফলকামনা-রহিত এবং কপটতাসর্বস্ব কৈতবধর্ম হইতে সম্পূর্ণরূপে বিমুক্ত; এইখানে বর্ণিত বস্তু, বা জ্ঞেয়তত্ত্ব, বাস্তব এবং পরমেশ্বরীয়, যাহা নির্মলচিত্ত, হিংসাশূন্য, সদ্ব্রতসিদ্ধ ভক্তদের পক্ষে উপলব্ধিযোগ্য; ইহা দুঃখত্রয়—আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, এবং আধিদৈবিক—উচ্ছেদের ক্ষমতা রাখে এবং চূড়ান্ত কল্যাণদায়ক। অতএব, এই শ্রুতিগম্ভীর ভাগবতের শ্রবণের পর আর অপর কোন শাস্ত্র বা সাধনাগ্রন্থের প্রয়োজন পরিগণিত হয় না, কারণ যেই শুভকর্মপরায়ণ ব্যক্তি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে, সেই ব্যক্তির হৃদয়ে ঈশ্বর তৎক্ষণাৎ আবদ্ধ হইয়া থাকেন। এই “সদ্যো হৃদ্যবরুধ্যতে” ইহাই ইঙ্গিত করে যে, শ্রীমদ্ভাগবত কেবল পাঠ্য নহে—ইহা হৃদয়স্পন্দনের বিষয়, ঈশ্বরের সচেতন উপস্থিতির আধার।

ইহা সেই পরম ধর্ম, যাহা কপটতা, লোকধর্ম, মোক্ষফলাকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি কৈতব (অর্থাৎ আভাসধর্ম) হইতে সম্পূর্ণভাবে বর্জিত (প্রোজ্জিত) এবং নির্মল হৃদয়যুক্ত সদ্ব্রতবিশিষ্ট নির্মৎসর সাধুসজনদের জন্যই উপলব্ধিযোগ্য। এই ‘কৈতব’ শব্দটি ভাগবতের নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী—ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই চতুর্বিধ পুরুষার্থের মধ্যেও যাহা ফলাকাঙ্ক্ষা বা লোকপ্রশংসা ইত্যাদি দ্বারা কলুষিত, তাহাই ‘কৈতব’ নামে অভিহিত; এবং ভগবতপ্রাপ্তি ব্যতীত যাহা কিছু ধর্মীয় আচরণ, তাহা এই ভাগবতের দৃষ্টিতে পরিত্যাজ্য।

তৃতীয় শ্লোক—“নিগমকাল্পতারোর্গলিতং ফলং শুকমুখাদমৃতদ্রবসংযুতম্‌। পিবত ভাগবতং রসমালয়ং মুহুরহো রসিকা ভূবি ভাবুকাঃ॥”—এই ভাবধারাই আরো সুস্পষ্ট করেন। ইহাতে বলা হইয়াছে, এই শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্রের তুলনা গীত হয়েছে নিগমরূপ কল্পবৃক্ষের সার্থক ফলের সহিত, যাহা শুকদেবের মুখের মাধ্যমে অমৃতসঞ্চারী হইয়াছে; ইহাতে আবরণ বা গর্ভ নেই, অর্থাৎ ইহা নিঃশঙ্ক ও পরিশুদ্ধ রসরূপ। অতএব, রসিক, অনুভবক্ষম ভক্তগণ, যতদিন এই নশ্বর দেহে চেতনা বিরাজমান, ততদিন ইহা পুনঃ পুনঃ পান করিতে থাক—ইহাই ভগবদ্রসের মোক্ষপ্রদ প্রাণতত্ত্ব। ইহা পৃথিবীতেই লাভ করা সম্ভব, এবং পরম দার্শনিক গভীরতা সহকারে ভক্তির পরাকাষ্ঠা স্পর্শ করে।

উপরে বর্ণিত এই মহামুনি যথাসম্ভব নারদ, যিনি তত্ত্বজ্ঞান ও ভক্তির সম্মিলনে ভাগবতের অন্তর্জীবন প্রকাশ করিয়াছেন। সম্ভবতঃ নারদই (এক ঐতিহাসিক ব্যক্তি) ইহার উৎস, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন নহেন। বোপদেব নারদীয় ঐতিহ্যধারী বলিয়া প্রতীয়মান। ভাগবতের বর্ণনায় বলা হয়—”নিগমকাল্পতারোর্গলিতং ফলং শুকমুখাদমৃতদ্রবসংযুতম্‌…”—শুকদেবের মুখনিসৃত, নির্মল, গূঢ় ও অমৃতসম অংশ, জগতে ভাগবতের মত লীলারস সম্পন্ন গ্রন্থ আর একটিও নাই। পারীক্ষিত রাজাকে যিনি এই উপাখ্যান বলেন, তিনি হলেন কথাকার শ্রীশুক।

শুকদেব, মহাভাগবত ও কণ্ঠোপাসক, ধর্মসংকটাপন্ন সময়ে মহারাজ পরীক্ষিতকে শ্রীমদ্ভাগবত আখ্যানে বহু ভক্তের চরিত ও লীলার কথা বিবৃত করিতেছেন। ইহা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে—যখন শ্রীকৃষ্ণ, ধর্মের একমাত্র আশ্রয়, স্বীয় লীলাসংপূর্ণ অবতরণ শেষ করিয়া স্বধামে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন ব্রাহ্মণ্যতাপরায়ণ, ধর্মসিদ্ধি ও নৈতিক প্রতিষ্ঠার অবিচল রক্ষক, অতএব তাঁহার অন্তর্ধানে সমগ্র জগৎ ও রাজনীতি ধ্বস্ত, এবং অনিবার্যভাবে এই প্রশ্ন জাগে—এখন ধর্ম কোথায় আশ্রয় লইবে? মহারাজ পরীক্ষিত এই ভয়ানক সংকটের মুহূর্তে যখন গঙ্গাতীরে অনাহার-নিঃশ্বাসে দিন গনিয়া মৃত্যুর প্রহর প্রতীক্ষা করিতেছেন, তখন তিনি প্রশ্ন করেন—

“ব্রূহি যোগেশ্বরে কৃষ্ণে ব্রাহ্মণ্যে ধর্মবর্মণি।
স্বাং কাঠামধুনোপেতে ধর্মঃ কং শরণং গতঃ॥”

অর্থাৎ—“হে মুনিবর! যখন সেই যোগেশ্বর, ব্রাহ্মণভক্ত ও ধর্মবর্মাধারী শ্রীকৃষ্ণ স্বীয় ধামে গমন করিলেন, তখন ধর্ম কোন আশ্রয়ে স্থিত হইল?”—ইহাই পরীক্ষিতের প্রশ্ন। এই প্রশ্নের মূলে আছে যুগের পরিবর্তন ও ধর্মতত্ত্বের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ, দ্বাপর অন্তর্হিত, কলির সূচনা; পরিণামে শ্রীকৃষ্ণরূপী শাশ্বত ধর্মনিয়ন্তার অবর্তমানে কে হইবে নতুন ধর্মাশ্রয়?

তদুপলক্ষে বক্তা নানাবিধ অবতার ও লীলার বর্ণনা করেন; যেখানে ভক্তেরা ভাগ্যক্রমে ভগবানের সাহচর্য পাইয়াছেন। বেদের গূঢ় সত্য ও শ্রুতির বাণী, ভক্তদের অভিজ্ঞতায় রসগম্ভীর উপাখ্যানের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে; যাহা অনুসরণ করিলে মানবজীবনে শান্তি ও স্থৈর্য আসিতে পারে।

গীতা ঈশ্বরতত্ত্বের দার্শনিক প্রকাশ, ভাগবত ভগবদভিজ্ঞার মৌলিক ও বৌদ্ধিক প্রকাশ।

ভগবদ্‌গীতা যেখানে ঈশ্বরতত্ত্বের গূঢ় তাত্ত্বিক প্রকৃতি—তাঁহার অস্তিত্ব, স্বরূপ, শক্তি ও বিশ্বের সহিত সম্পর্কের অন্তরাত্মীয় মেটাফিজিক্স উপস্থাপন করে, সেখানে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ঈশ্বরের জ্ঞেয়তা বা উপলব্ধিযোগ্যতা, অর্থাৎ জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) বর্ণনা করে। গীতা ঈশ্বরকে ‘সত্য’ বলিয়া অভিহিত করে, ভাগবতও বলেন “সত্যং পরং ধীমহি”—কিন্তু ইহা বলেন “ধাম্না স্বেন সদা নিরস্তকুহকং”, অর্থাৎ ঈশ্বর স্বীয় ধামে, স্বীয় রূপেই, মায়ার আবরণশূন্য পরম সত্য। এই শ্লোকটি গায়ত্রীমন্ত্রের ন্যায়, কিন্তু গায়ত্রী যেখানে ‘তৎ’ বলিয়া ঈশ্বরের অনির্বচনীয়তাকে উপলব্ধি করিবার চেষ্টা করে, ভাগবত সেখানে ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশিত সত্যরূপে তাঁহাকে নির্ণয় করে।

‘ধাম’ অর্থে এখানে ঈশ্বর স্বয়ং বোঝান—তাঁহার আবাস ও স্বরূপ একই, তিনি “নিরস্তকুহকঃ”—মায়ার ছায়াহীন, মিথ্যার অতীত। ভাগবতে বলা হইয়াছে, ঈশ্বরকে ভক্তদের জীবনাচরণ ও অভিজ্ঞতা হইতেই জানা যায়। সেইজন্যই ভক্তগণই ভাগবত; ভক্তদিগের চরিত্র ও পথই প্রমাণ (প্রমাণ)। পক্ষান্তরে ভগবদ্‌গীতায় প্রমাণরূপে গৃহীত হইয়াছে আপ্তবাক্য, তথা “শাস্ত্রবিধান”, যাহা অপৌরুষেয় শ্রুতি-স্মৃতি দ্বারা প্রমাণিত। গীতা বলেন—

“তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্যাকার্যব্যবস্থিতৌ।
জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তং কর্ম কর্তুমিহারহসি॥”
(১৬.২৪)

অর্থাৎ—কার্য ও অকর্ম্য নির্ধারণে শাস্ত্রই প্রমাণ। শাস্ত্রে যাহা বিধান, তাহাই করণীয় কর্ম। এই দুই মহাগ্রন্থ—গীতা ও ভাগবত—যথাক্রমে নিয়মত্মক তত্ত্ব ও অভিজ্ঞাত্মক তত্ত্ব রূপে ঈশ্বরতত্ত্বকে একত্রে ব্যাখ্যা করিয়াছে। একে অপরের পরিপূরক। গীতা যাহা দর্শন দিয়াছে, ভাগবত তাহার লীলা-প্রমাণ, আত্মজীবন ও ভক্তিবৃত্তির ভিতর দিয়াই প্রকাশ করিয়াছে।

শাস্ত্রবিধান অপৌরুষেয় শ্রুতি ও তাহার অনুপ্রবাহমান শ্রুতি-পরম্পরারই সূচক। গীতা-শাস্ত্রে উক্ত হয়—“ওঁ তৎ সদ্‌ ইতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ। ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিধিতাঃ পুরা॥” (১৭.২৩)—ইহাতে ‘তৎ’ শব্দে পরমসত্য বোঝান হইয়াছে এবং ঈশ্বরকেই উক্ত সত্যপ্রাপ্তির অনুপ্রেরক বা শিক্ষয়িত্রী রূপে চিহ্নিত করা হইয়াছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, ঈশ্বর কেবল উপাস্য নন, তিনি সেই শক্তি যিনি শ্রুতির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উদ্ভাসিত করেন। ব্রহ্ম মানে শ্রুতি, আর ঈশ্বর হলেন সেই শ্রুতির অর্থভাবনা। অর্থাৎ, শ্রুতি শব্দভাবনা (শব্দবোধ) এবং ঈশ্বর তাহার অর্থভাবনা (তাত্ত্বিক বোধ)

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ নৈমিষীয় উপাখ্যানমাত্র—ইহা শাস্ত্র নহে, এবং শাস্ত্রবোধ বা শাস্ত্রজ্ঞানের সহায় গ্রন্থও নহে; ইহা একান্ত উপাখ্যান, যাহা ভক্তিপূর্ণ অনুষঙ্গ এবং অভিজ্ঞতামূলক ঈশ্বরতত্ত্বের কাহিনীমালা। আখ্যান কখনোই শ্রুতির ব্যাখ্যান নহে, কারণ আখ্যান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করিয়া গঠিত, আর শ্রুতি অপৌরুষেয়—সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ। পক্ষান্তরে ভগবদ্‌গীতা এক অদ্বিতীয় বক্তৃতা, যাহা শ্রুতির তত্ত্ব ও কর্তব্যপথের উপর নির্ভর করিয়া প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যান প্রদান করিয়াছে। এইরূপে গীতার স্থান, দার্শনিক গাম্ভীর্য ও কর্তব্যনির্ধারণে, শ্রীমদ্ভাগবতের ঊর্ধ্বে প্রতিপন্ন।

অতএব, মহাভারতের প্রেক্ষিতে ধৃতরাষ্ট্র, যিনি এক অন্ধ ও দিশাহীন রাষ্ট্রনায়কের প্রতীক, তিনি জাতির লক্ষ্যহীনতাকে প্রতিনিধিত্ব করেন; সঞ্জয়, যিনি দ্রষ্টা ও বর্ণনাকারী, তিনি জাতীয় চৈতন্যের রূপক; অর্জুন যোদ্ধা ও নীতিপালক, জাতির করণীয়কর্তা; আর ভগবান বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ—তিনি সেই জাতির নিত্যমনন, বিবেক ও আদর্শচিন্তার আধার।

প্রাচীন সম্পাদকগণ ভগবদ্‌গীতার প্রত্যেক অধ্যায়ের শেষে যেরূপভাবে উক্তি করিয়াছেন—“শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে”—তাহাতে গীতার প্রকৃতি স্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়; ইহা উপনিষৎসম, ব্রহ্মতত্ত্বপ্রকাশক ও যোগপথনির্দেশক গ্রন্থ, যাহার মুখ্যতত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে অনুষ্ঠিত মহাসংবাদ। পক্ষান্তরে, শ্রীমদ্ভাগবতের একাধিক অধ্যায়ের উপসংহারে পাওয়া যায়—“শ্রীমদ্ভাগবতে মহাপুরাণে পারমহংস্যাং সংহিতায়াং নৈমিষীয়োপাখ্যানে”—যা ইহা সূচিত করে যে, ইহা এক পারমহংস-উপযোগী সংহিতা, অর্থাৎ সেই শ্রোতাদের জন্য যাহারা সংযম, বৈরাগ্য, ও অপার ভক্তিতে প্রশান্তচিত্ত, এবং যাহারা নৈমিষারণ্যের উপাখ্যানমূলক আখ্যানরূপে সেই চিরসত্য লীলাত্মা ঈশ্বরকে শ্রবণ করিবার যোগ্য।

গীতা শ্রবণের উদ্দেশ্য হইতেছে—পরম সত্যে উপনীত হওয়া, এক বৈচারিক উত্তরণ, যাহাতে জীব এই সংসারধর্ম হইতে পরিত্রাণ পাইয়া স্বরূপ চিন্তনে প্রবিষ্ট হয়। পক্ষান্তরে শ্রীমদ্ভাগবতের রচয়িতা শ্রোতাকে প্রতিশ্রুতি দেন—তাহা শ্রবণ করিলে ব্রহ্ম(ঈশ্বর) লীলাবিগ্রহ রূপে শ্রোতার জীবনে অবতীর্ণ হন, এবং অন্তরঙ্গ সান্ত্বনা (शन्+तना > শিবত্ব) প্রদান করেন।

ভাগবতের দার্শনিক ভিত্তি এই যে, ভক্ত কখনোই কিছু অর্জনের জন্য ঈশ্বরচিন্তা করেন না; তাহার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হইল—লীলাপুরুষোত্তম ভগবানের প্রতি নিরহঙ্কার, অহৈতুকী ও অবিচ্ছিন্ন পরম ভক্তি। সংখ্যদর্শনের পুরুষোত্তম, যিনি নির্জীব নৈর্বাণিক চেতনা বলিয়া কল্পিত, ভাগবতের ভক্তিদর্শনে লীলারসপরায়ণ, সদাস্পন্দমান, ও সঞ্জীবিত ঈশ্বররূপে আত্মপ্রকাশ করেন।

এই লীলাদর্শন ইন্দ্রিয়ানন্দ নহে, ইহা অনিত্যাবদ্ধ জীবাত্মর ব্রাহ্মীকরণ—ভক্ত জানিতেও পারেন না কবে তাঁহার জন্ম, কবে তাঁহার মৃত্যু। তাহার সত্তা নিত্যলীলায় লীন, এবং সেই লীলা—সনাতনমায়ার সীমা অতিক্রম করিয়া সত্যরূপ ঈশ্বরে অবগাহন —ঈশ্বর স্বয়ং সত্য, স্বয়ং রস, স্বয়ং ধাম।

শনিবার, ২৮ জুন, ২০২৫


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল