অকিঞ্চন দাস (গৌড়ীয়)

Encyclopedia of Bengali Language and Literature

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

অকিঞ্চন দাস ছিলেন ১৭শ শতকের একজন বৈষ্ণব কবি ও পদ কার্তাশ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তিধারার প্রভাবেই তাঁর সাহিত্যচর্চা গড়ে উঠেছিল। বৈষ্ণব সাহিত্যের ভক্তিরস-সংলগ্ন যে স্নিগ্ধ ও গভীর ধারাটি চৈতন্য যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়, অকিঞ্চন দাস ছিলেন সেই ধারার এক নিষ্ঠাবান রচয়িতা। তিনি মূলত সাধুজনের ভক্তিসাধনা ও রসানুভূতির ভাষ্য রচনায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল— বিবর্ত্ত বিলাস, শ্রীচৈতন্যভক্তিরসাত্মিকা, শ্রীচৈতন্যভক্তিবিলাস, ভক্তিরসালিকা এবং ভক্তিরসচন্দ্রিকা। প্রতিটি গ্রন্থেই তিনি চৈতন্যভক্তির বিভিন্ন দিক—যেমন কৃষ্ণপ্রেম, কৃষ্ণলীলার রস, নামসংকীর্তনের মাহাত্ম্য ইত্যাদি সুচারুভাবে উপস্থাপন করেছেন।

তাঁর ভাষা ছিল সহজ ও মর্মস্পর্শী, যা সাধারণ পাঠকের হৃদয়েও পৌঁছতে সক্ষম হয়। শুধু মৌলিক রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি রামানন্দ রায় প্রণীত সংস্কৃত জগন্নাথবল্লভ নাটক বাংলায় অনুবাদ করে তা বাংলাভাষী ভক্তসমাজের নাগালে আনেন। এই অনুবাদ সাহিত্যিক দক্ষতা ও আন্তরিক অনুরাগের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। অকিঞ্চন দাসের সাহিত্য সাধনার মধ্যে দিয়ে চৈতন্য যুগের ভাবধারা আরও বিস্তার পায় এবং বাংলা ভক্তিসাহিত্য এক গভীর শক্তি লাভ করে।

অকিঞ্চন দাস ১৭শ শতকে বর্ধমান, হুগলি ও হাওড়া অঞ্চলে অবস্থানকারী নিম্নবিত্ত শ্রোতৃবর্গকে লক্ষ্য করে শ্রীচৈতন্যদেবের নামপ্রচারে নিবেদিত ছিলেন। সম্ভবত তিনি বৈদ্য বংশীয় ছিলেন এবং চৈতন্যভক্তদের “অকিঞ্চন” অর্থাৎ ‘অর্থহীন-নির্ভরহীন-অহংশূন্য’ দাসত্বের আদর্শ গ্রহণ করে ‘অকিঞ্চন দাস’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর সাহিত্যজীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল চৈতন্যলীলা ও রাধাকৃষ্ণরসের প্রচার। তাঁর রচিত বিবর্ত্ত বিলাস, শ্রীচৈতন্যভক্তিরসাত্মিকা, শ্রীচৈতন্যভক্তিবিলাস, ভক্তিরসালিকাভক্তিরসচন্দ্রিকা গ্রন্থসমূহে সেই সাধনার ছাপ স্পষ্ট। এই সকল রচনায় তিনি পরকীয়া প্রেম, গোপীভাব, অন্তরঙ্গ লাভ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে রসোপাসনার দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন। শুদ্ধ ভক্তি ও সাধুসঙ্গ ছাড়া যে এই পথ অনুধাবন করা যায় না, সেই সত্যই তিনি উচ্চারণ করেন—“শুদ্ধ সত্য স্বতঃসিদ্ধ বিশুদ্ধ করণ। সাধু সঙ্গ বিনে নাহি জানে কোন জন।”

তাঁর বিবর্ত্ত বিলাস–এ দেখা যায় তিনি কামগায়ত্রী, কামবীজ, দোহাকার উপাসনা প্রভৃতি রূপের ব্যাখ্যার মাধ্যমে রসিক বৈষ্ণব উপাসনার তত্ত্ব ও অনুশীলন ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে রাধাভাব গ্রহণ করে সাধক দোহাকার রূপে চৈতন্য-লীলা ও কৃষ্ণ-রস একাকারভাবে আস্বাদন করেন। সেই পরম সাধনার রসানুভব তিনি কেবল শ্রদ্ধেয় গুরু ও রসিক বৈষ্ণবদের কৃপায় সম্ভব বলেই বারবার উল্লেখ করেন।

অকিঞ্চন বারবার কবিরাজ কৃষ্ণদাস গোসাঞীর (১৪৯৬-১৫৯০) প্রতি প্রণতি জানান, তাঁকে নিজের গুরুপ্রেরণা রূপে স্বীকার করে বলেন—“জয় জয় কবিরাজ কৃষ্ণদাস গোসাঞী। তোমার চরিত্র যেন মহানন্দ গাই।” কবিরাজ কৃষ্ণদাসের চৈতন্যচরিতামৃত ও গুপ্ত রসোপাসনার গভীরতা অকিঞ্চন দাসের কাছে ছিল এক মাপকাঠি, যাঁর আশ্রয় ছাড়া নিজ সাধন অসম্পূর্ণ বলেই তিনি ভাবতেন। তিনি কৃষ্ণদাস গোসাঞীর শিষ্যত্বের দাবিদার না হলেও তাঁর ভাবানুসরণকারী বলেই নিজেকে স্থাপন করেন—“আমি দুরাচার কিছু নাহি বুঝি কাজ। মনে বসি হস্ত ধরি লেখে কবিরাজ।”

চৈতন্যচরিতামৃত সকল গ্ৰন্থ সার।

এই কথা কর্ণপুর কহে বার বার ৷

সমুদ্র মন্থনে যৈছে সুধা উঠাইল।

তৈছে কবিরাজ শাস্ত্ৰ মন্থে গ্রন্থ কৈল ॥

তাঁর ভাষা সহজ, ছন্দোবদ্ধ এবং রসসিদ্ধ; কিন্তু রচনার আভ্যন্তরীণ গূঢ়তা ও তত্ত্ববোধ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। শ্রীচৈতন্যদেবের অবতারতত্ত্ব, গৌর-নিত্যানন্দের বাঞ্ছাসিদ্ধ লীলা, সাধু-সংগ ও গুরু-কৃপায় প্রেমোপাসনার পথ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা চৈতন্য-পরবর্তী রসসাহিত্যের একটি মূল্যবান দিক নির্দেশ করে। তিনি ‘কবিরাজ চাঁদ’ বা কৃষ্ণদাস গোসাঞীর অনুপ্রেরণায় এই রচনাসমূহ করেন, এবং ‘ভক্তিরস’–এর প্রচারে নিজেকে এক ‘ভিক্ষুক’ ও ‘ঔষধী চাহনো কাঙ্গাল’ বলেই অভিহিত করেন।

শুদ্ধ সত্য স্বতঃসিদ্ধ বিশুদ্ধ করণ।

সাধু সঙ্গ বিনে নাহি জানে কোন জন ॥

উপসনা গোলমাল সিদ্ধাস্ত করায় ।

সিদ্ধের কারণ যেই প্রবৃত্তে ঘটায় ॥

কামগায়িত্রী কামবীজ হয় দুইরূপ।

কৃষ্ণের গায়ন্ত্রী বীজ রাধার স্বৰূপ॥

দোহে দোহাকার মন্ত্রে করে উপাসন।

দেহে দোহাকার রূপ করয়ে ভাবন॥

বাঞ্ছা লাগি রাধাভাব করি অঙ্গীকার।

আশ্রয় বিষয় দুই কৈল পরিচার॥

দুই মিলি হয় পূর্ণ মাধুৰ্য্যাস্বাদন।

কবিরাজ চাদ তাহা কৈল প্রকাশন ॥

অকিঞ্চন দাসের ভাবপ্রকাশ এই পঙ্ক্তিগুলিতে তাঁর রসোপাসনামূলক দর্শনের আন্তরিকতা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। তিনি মনে করেন, সাধু ও গুরুর কৃপা ছাড়া রাধাকৃষ্ণের মাধুর্য্যের আস্বাদ কখনোই সম্ভব নয়। বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণলীলা এক অভ্যন্তরীণ, অন্তরঙ্গ উপাসনার ক্ষেত্র—যেখানে সাধক দোহাকার রূপে (রাধা-কৃষ্ণ উভয়ভাবসম্পন্ন সাধনভাব) মগ্ন হন।

এই দোহা-ব্যবহারের আচরণ অর্থাৎ দ্বৈতরূপ ধারণের সাধনপদ্ধতি, তিনি মনে করেন কেবল রসিক সাধকদের দ্বারাই অনুধাবনযোগ্য, এবং সেই সাধু-সংগ ছাড়া এর বাস্তব চর্চা সম্ভব নয়। “সাধু সঙ্গ হইলে জানি এসব আচারে” — এই পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে তিনি জানান, আচার শুধু বাহ্য নয়, তা গভীর তত্ত্বে ও রসতত্ত্বে নিমজ্জিত।

অকিঞ্চন বলেন, এই লীলা আজও তদরূপেই সংঘটিত হয়—“অদ্যাবধি সেই লীলা এই রূপে হয়”—অর্থাৎ চৈতন্য-প্রবর্তিত রসোপাসনার ধারা অব্যাহত আছে, এবং ভক্তের হৃদয়ে গৌরাঙ্গ আজও সেই তিন বাঞ্ছা সাধন করেন—ভক্তির সাধনা, রসের আস্বাদন, ও পরকীয়াভাবের অধিকার। এই ভাবাদর্শে চৈতন্যদেব স্বয়ং এক রস-রূপে ধরা দেন ভক্তের অন্তরে।

অকিঞ্চন দাস এখানে গৌড়ীয় বৈষ্ণবতত্ত্বের গভীর ব্যাখ্যা রেখেছেন, যেখানে সাধু-সংগ, গুরু-কৃপা, দোহাকার রূপ, রসোপাসনার মৌলিক ভিত্তি হয়ে উঠেছে। তাঁর রচনাশৈলী ও চিন্তার ধারা দেখে বোঝা যায় যে তিনি শুধু প্রেরণাদাতা কৃষ্ণদাস কবিরাজকে অনুসরণই করেননি, বরং নিজের হৃদয়ে সেই রসকে ধারণ করে একান্তভাবে নিজস্ব ভাষায় তা প্রকাশ করেছেন।


শ্ৰীজীব গোসাঞী কলম হন্তে ধরি। টীকা করিলেন গ্ৰন্থ উল্লাস উপরি ৷ কবিরাজ গোসাঞী মহাচতুর শিরোমণি টীকার কারণে স্থান রাখিলা আপনি ৷ শ্ৰী রূপ রঘুনাথ বলিয়া লিখিলা। মধ্যে স্থান রাখি ইতি পরিচ্ছেদ করিলা ৷ তবেত শ্ৰীজীব গোসাঞী প্ৰেমানন্দ হইয়া। কৃষ্ণদাস কহে মধ্যে দিলেন লিখিয়৷ প্ৰেমানন্দ হইয়া গ্রন্থে করিলা অষ্টাঙ্গ। সকলে প্ৰণাম কৈল প্রেমের তরঙ্গ। তবেত শ্ৰীজীব গোসাঞী কহে নিজগণে । আস্বাদহ এই গ্ৰন্থ কায় বাক্য মনে । এই চরিতামৃত সুধাসারময়। পিব পিব পুনঃ পুনঃ কহে মহাশয় ৷ তাবৎ বৈষ্ণবগণ লিখিয়া লইল। চৈতন্যচরিত ব্ৰজে সৰ্ব্বত্র ব্যাপিলা৷৷

তবে কবিরাজ গোসাঞী গোপনে ডাকিয়া । মুকুন্দে কহেন বড় দয়াল হইয়া ৷ তুমি রাখিয়াছ যেই গ্ৰন্থ নিজ পাশে । সেই গ্ৰন্থ লইয়া বাপ যাহ পূৰ্ব্ব দেশে ৷৷ গ্ৰন্থ লইয়া যাঁহ বাপ শ্ৰীগৌড় মণ্ডল । লিখিয়া লয়েন নেন বৈষ্ণব সকল ৷৷ যারে তারে দিবা বাপ কহিলা বচন। এত কঁহি মুকুন্দৈরে কৈল আলিঙ্গন ॥

বিদায় করিল তারে প্রসাদ করিয়া । নবদ্বীপে আইলা তেঁহ প্ৰেমানন্দ হইঞা ৷৷ সকল গ্রন্থের আগে চৈতন্যচরিত। শ্ৰীগৌড় মণ্ডলে আসি হইল ব্যাকস্থত ৷ গুরু আজ্ঞায় শ্ৰীমুকুন্দ, দিলা যারে তারে। সিদ্ধ আজ্ঞায় গ্ৰন্থ দেখা হইল ঘরে ঘরে ৷ এইত কহিল গ্ৰন্থ টীকার কারণ ইস্থা বিশ্রণে ভক্তের জুড়ায় কর্ণমন ৷ কবিরাজ মুকুন্দের মহিমা অপার। আমি কি কহিতে জানি হইয়াজীব ছার ৷ দোহ গোসাঞী নিজ গুণ কহেন আপনি। দোহার চরিত্র কিবা কহিবারে জানি ৷৷

যৈছে তৈছে কহি মুই আপনা শোধিতে। টানা টানি করি এই ভব উদ্ধারিতে। শ্রদ্ধা করি এই গ্ৰন্থ করাহ আম্বাদ । অনায়াসে পাবে ইথে চৈতন্য প্ৰসাদ ৷ চৈতন্য পাদপদ্মে দৃঢ় ভক্তি হবে। চৈতন্যচরিতামৃত ছাড়িতে নারিবে ৷ কবিরাজ পাদপদ্ম করিয়া স্মরণ । বিবৰ্ত্তবিলাস গ্ৰন্থ করিয়া লিখনু ॥ আপনার আত্মা মুই শোধিবার তরে। কবিরাজে গুণলীলা করিনু প্রচারে ॥”


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল